খণ্ড 38
ফন্ট:100%
থিম:

৩.২ সাহাবিদের গণহত্যা: বির মাউনার সেই মর্মান্তিক ভোর

৩.২ সাহাবিদের গণহত্যা: বির মাউনার সেই মর্মান্তিক ভোর

১. পটভূমি ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট: উহুদ-পরবর্তী নাজুক পরিস্থিতি

উহুদ যুদ্ধের অবসান-পরবর্তী সময়কালটি ছিল মদিনার উদীয়মান ইসলামি রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং ভূ-রাজনৈতিকভাবে চরম ঝুঁকিপূর্ণ। উহুদের ময়দানে মুসলমানদের সাময়িক বিপর্যয় এবং জানমালের ক্ষয়ক্ষতি মদিনার চারপাশের শত্রুভাবাপন্ন আরব গোত্রগুলোর মনে এই ধারণার জন্ম দিয়েছিল যে, মুসলমানদের সামরিক শক্তি ও প্রতিরোধ ক্ষমতা বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে। এই মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে মদিনা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে নস্যাৎ করার জন্য আরবের বিভিন্ন পৌত্তলিক গোত্র ও বেদুইন দস্যুরা নানামুখী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হতে শুরু করে। বিশেষ করে নজদ এবং হেজাজের মধ্যবর্তী অঞ্চলের গোত্রগুলো মদিনার বিরুদ্ধে এক ধরনের অঘোষিত জোট গঠনে তৎপর হয়ে ওঠে, যা মদিনার সামগ্রিক নিরাপত্তা বলয়কে (Security Perimeter) হুমকির মুখে ফেলে দেয়। [1] এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যেই হিজরি চতুর্থ বর্ষের সফর মাসে (কোনো কোনো ঐতিহাসিক হিজরি তৃতীয় বর্ষের কথাও উল্লেখ করেছেন, তবে চতুর্থ বর্ষের মতটিই অধিকতর গ্রহণযোগ্য ও প্রামাণিক) মদিনার রাষ্ট্রীয় সীমানায় এক নতুন কূটনৈতিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। উহুদ যুদ্ধের মাত্র চার মাস পর সংঘটিত এই ঘটনাটি ইসলামের ইতিহাসে এক গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছিল। মদিনার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং আঞ্চলিক প্রভাবকে ক্ষুণ্ন করার জন্য কুরাইশদের পরোক্ষ উসকানি এবং স্থানীয় গোত্রগুলোর অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এই ট্র্যাজেডির পটভূমি তৈরিতে প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল। [2] তৎকালীন আরবের গোত্রীয় রাজনীতিতে "জিওয়ার" বা নিরাপত্তা প্রদানের প্রথাটি ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী একটি কূটনৈতিক হাতিয়ার। কোনো গোত্রের প্রধান যদি কাউকে নিরাপত্তা দেওয়ার ঘোষণা দিতেন, তবে সমগ্র আরব সমাজ তা মেনে চলতে বাধ্য থাকত। কিন্তু উহুদ-পরবর্তী সময়ে মুসলমানদের দুর্বল ভাবার কারণে এই সনাতন আরবিয় নৈতিক মূল্যবোধেও ফাটল ধরতে শুরু করে। মদিনার গোয়েন্দা বিভাগ যখন চারপাশের এই ষড়যন্ত্রের জাল উন্মোচনে ব্যস্ত, ঠিক তখনই নজদ অঞ্চলের বনু আমের গোত্রের এক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব মদিনায় আগমন করেন, যা এই মর্মান্তিক গণহত্যার প্রথম সোপান রচনা করে। [3] ২. আবু বারা-র আগমন এবং নিরাপত্তা চুক্তি (Jiwar)

সফর মাসের মাঝামাঝি সময়ে বনু আমের গোত্রের প্রধান আবু বারা আমের ইবনে মালিক মদিনায় আগমন করেন। তিনি আরবে "মুলাইবুল আসিন্না" বা "বর্শা নিয়ে ক্রীড়াকারী" হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন, যা তার অসামান্য যুদ্ধকৌশল ও গোত্রীয় প্রভাবের বহিঃপ্রকাশ ছিল। মদিনায় পৌঁছানোর পর রাসুলুল্লাহ সা. তাকে অত্যন্ত মর্যাদার সাথে স্বাগত জানান এবং তার সামনে ইসলামের সুমহান আদর্শ ও তাওহীদের দাওয়াত পেশ করেন। আবু বারা ইসলাম গ্রহণ করেননি বটে, তবে তিনি ইসলামের প্রতি কোনো ধরনের বৈরিতা বা শত্রুতাও প্রদর্শন করেননি। বরং তিনি অত্যন্ত চতুরতার সাথে একটি কূটনৈতিক প্রস্তাব পেশ করেন। তিনি রাসুলুল্লাহ সা.-কে অনুরোধ করেন যেন তিনি নজদ অঞ্চলের অধিবাসীদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানোর জন্য এবং তাদের কুরআন ও দ্বীন শিক্ষা দেওয়ার জন্য একদল যোগ্য শিক্ষক ও প্রচারক প্রেরণ করেন। [4] রাসুলুল্লাহ সা. তৎকালীন ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং নজদ অঞ্চলের গোত্রগুলোর চরম উগ্রতা ও বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকেফহাল ছিলেন। তাই তিনি অত্যন্ত দূরদর্শিতার সাথে এই প্রস্তাবে তাৎক্ষণিক সম্মতি না দিয়ে নিজের আশঙ্কা ব্যক্ত করে বলেন:

«إِنِّي أَخْشَى عَلَيْهِمْ أَهْلَ نَجْدٍ»

অর্থাৎ, "আমি তাদের (প্রচারক সাহাবিদের) ব্যাপারে নজদবাসীদের পক্ষ থেকে চরম আশঙ্কার বোধ করছি।" রাসুলুল্লাহ সা.-এর এই আশঙ্কা ছিল অত্যন্ত যৌক্তিক, কারণ নজদের বনু সুলাইম এবং বনু আমের গোত্রগুলো ছিল অত্যন্ত যুদ্ধবাজ এবং তাদের ওপর মদিনার কোনো প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ছিল না। [5] রাসুলুল্লাহ সা.-এর এই আশঙ্কার জবাবে আবু বারা আমের ইবনে মালিক অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে আরবের ঐতিহ্যবাহী "জিওয়ার" বা কূটনৈতিক নিরাপত্তার গ্যারান্টি প্রদান করেন। তিনি বলেন, "আমি তাদের নিরাপত্তার জিম্মাদার (জার) হলাম। নজদবাসী কেউ তাদের গায়ে হাত তোলার সাহস করবে না।" আরবের তৎকালীন সমাজব্যবস্থায় আবু বারা-র মতো একজন প্রভাবশালী নেতার এই প্রকাশ্য ঘোষণা ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী আইনি ও সামাজিক নিরাপত্তা কবচ। এই কূটনৈতিক নিশ্চয়তার (Diplomatic Assurance) ওপর ভিত্তি করে এবং দ্বীনের দাওয়াত ছড়িয়ে দেওয়ার মহান উদ্দেশ্যে রাসুলুল্লাহ সা. শেষ পর্যন্ত একটি উচ্চশিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত প্রতিনিধি দল প্রেরণে সম্মত হন। [6] ৩. বির মাউনার উদ্দেশ্যে যাত্রা: শিক্ষক ও প্রচারকদের কাফেলা

আবু বারা-র দেওয়া নিরাপত্তার ওপর ভরসা করে রাসুলুল্লাহ সা. মদিনার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের মধ্য থেকে প্রায় সত্তর জন সাহাবির একটি দল গঠন করেন। এই দলটির নেতৃত্ব প্রদান করা হয় বনু খাযরাজ গোত্রের বিশিষ্ট সাহাবি আল-মুনযির ইবনে আমর রা.-কে, যিনি তার অসীম সাহসিকতা ও দ্বীনি প্রজ্ঞার জন্য "আল-মুতীক লি-আমূতিহ" (যিনি মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও অবিচল থাকেন) উপাধিতে ভূষিত ছিলেন। এই কাফেলার প্রায় প্রত্যেকেই ছিলেন "কুররা" বা কুরআনের হাফেজ ও শিক্ষক। তারা দিনের বেলা মদিনার বনে কাঠ কেটে তা বিক্রি করে আহলে সুফফার দরিদ্র সাহাবিদের জন্য খাদ্যের ব্যবস্থা করতেন এবং রাতের বেলা গভীর মনোযোগের সাথে কুরআন অধ্যয়ন ও ইবাদতে মশগুল থাকতেন। [7] এই কাফেলাটি কেবল একটি সামরিক অভিযান ছিল না, বরং এটি ছিল একটি উচ্চমানের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় মিশন। তারা মদিনা থেকে যাত্রা শুরু করে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নজদের মরুভূমি পাড়ি দিতে থাকেন। তাদের যাত্রাপথের মূল লক্ষ্য ছিল নজদের সাধারণ মানুষের হৃদয়ে ইসলামের আলো জ্বালানো এবং তাদের বর্বরতার অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে আসা। যাত্রাপথে তারা কোনো ধরনের যুদ্ধংদেহী মনোভাব প্রদর্শন করেননি, বরং তাদের সাথে ছিল কেবল আত্মরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সামান্য কিছু অস্ত্র এবং রাসুলুল্লাহ সা.-এর পক্ষ থেকে নজদের গোত্রীয় নেতাদের উদ্দেশ্যে লেখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু চিঠি। [8] কয়েক দিনের ক্লান্তিকর যাত্রা শেষে এই পবিত্র কাফেলাটি নজদ অঞ্চলের বনু আমের এবং বনু সুলাইম গোত্রের মধ্যবর্তী সীমানায় অবস্থিত "বির মাউনা" বা মাউনা নামক একটি কূপের পাড়ে এসে পৌঁছায়। এই স্থানটি ছিল অত্যন্ত কৌশলগত এবং মরুভূমির মাঝে একটি গুরুত্বপূর্ণ পানির উৎস। এখানে তাঁবু খাটানোর পর সাহাবিগণ তাদের পরবর্তী কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। তারা জানতেন না যে, এই শান্ত ও নীরব কূপের চারপাশেই তাদের জন্য অপেক্ষা করছে এক ভয়াবহ ও কুটিল চক্রান্তের নীল নকশা। [9] ৪. বিশ্বাসঘাতকতার নীল নকশা: আমির ইবনুল তুফাইলের কুটিল চক্রান্ত

বির মাউনায় পৌঁছানোর পর কাফেলার পক্ষ থেকে ইসলামের দাওয়াত সংবলিত রাসুলুল্লাহ সা.-এর পবিত্র পত্রটি বনু আমের গোত্রের তৎকালীন প্রভাবশালী ও উগ্র নেতা আমের ইবনে তুফাইলের কাছে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আমের ইবনে তুফাইল ছিল আবু বারা-র ভাতিজা, কিন্তু সে তার চাচার মতো উদার বা কূটনৈতিক শিষ্টাচারে বিশ্বাসী ছিল না। সে ছিল চরম দাম্ভিক, অহংকারী এবং মদিনা রাষ্ট্রের ঘোর বিরোধী। রাসুলুল্লাহ সা.-এর এই চিঠি নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব অর্পণ করা হয় বিশিষ্ট সাহাবি হারাম ইবনে মিলহান রা.-এর ওপর। তিনি অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে আমের ইবনে তুফাইলের দরবারে উপস্থিত হন এবং রাসুলুল্লাহ সা.-এর চিঠিটি তার হাতে তুলে দেন। [10] আমের ইবনে তুফাইল ইসলামের প্রতি এতটাই বিদ্বেষী ছিল যে, সে কূটনৈতিক শিষ্টাচারের সমস্ত সীমা লঙ্ঘন করে রাসুলুল্লাহ সা.-এর চিঠিটি খুলে পড়ারও প্রয়োজন বোধ করেনি। উল্টো সে চরম ধৃষ্টতা প্রদর্শন করে তার এক অনুসারীকে ইশারা করে যেন সে পেছন থেকে হারাম ইবনে মিলহান রা.-কে আক্রমণ করে। হারাম ইবনে মিলহান রা. যখন আমেরের সাথে কথা বলছিলেন, ঠিক তখন জাব্বার ইবনে সুলমা নামক এক ঘাতক পেছন থেকে অত্যন্ত নির্মমভাবে তার পিঠে বর্শা দিয়ে আঘাত করে। বর্শাটি তার পিঠ ফুঁড়ে বুক দিয়ে বের হয়ে যায়। এই চরম মুহূর্তেও হারাম ইবনে মিলহান রা. বিন্দুমাত্র বিচলিত হননি। তিনি নিজের শরীর থেকে ফিনকি দিয়ে বের হওয়া রক্ত দুই হাতে মেখে নিজের মুখে ও মাথায় মাখতে মাখতে চিৎকার করে ওঠেন:

«اللهُ أَكْبَرُ، فُزْتُ وَرَبِّ الْكَعْبَةِ»

অর্থাৎ, "আল্লাহু আকবার! কাবার রবের কসম, আমি সফল হয়ে গেছি!" এই দৃশ্য দেখে ঘাতক জাব্বার ইবনে সুলমা এতটাই স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল যে, পরবর্তীতে এই ঘটনাই তার ইসলাম গ্রহণের মূল কারণ হিসেবে কাজ করেছিল। [11] হারাম ইবনে মিলহান রা.-কে নির্মমভাবে হত্যা করার পর আমের ইবনে তুফাইলের হিংস্রতা আরও বৃদ্ধি পায়। সে কেবল একজন দূতকে হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং বির মাউনায় অবস্থানরত অবশিষ্ট সাহাবিদের সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করার জন্য এক ভয়াবহ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। সে তার নিজস্ব গোত্র বনু আমেরকে মুসলমানদের ওপর আক্রমণ করার জন্য আহ্বান জানায়। কিন্তু বনু আমের গোত্রের সাধারণ মানুষ তাদের নেতা আবু বারা-র দেওয়া "জিওয়ার" বা নিরাপত্তা চুক্তির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে আমের ইবনে তুফাইলের এই অন্যায় ও বিশ্বাসঘাতকতামূলক প্রস্তাবে সাড়া দিতে পরিষ্কার অস্বীকৃতি জানায়। এতে আমের ইবনে তুফাইল ক্ষিপ্ত হয়ে বনু সুলাইম গোত্রের অন্যান্য উগ্র শাখাগুলোর দিকে হাত বাড়ায়। [12] ৫. রক্তরঞ্জিত ভোর: বীরত্ব ও নির্মম গণহত্যার মহাকাব্য

বনু আমের গোত্রের অস্বীকৃতির পর আমের ইবনে তুফাইল বনু সুলাইমের অত্যন্ত উগ্র ও যুদ্ধবাজ তিনটি শাখা গোত্র—রিল, জাকওয়ান এবং উসাইয়া-র কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে। এই গোত্রগুলো মদিনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য আগে থেকেই উন্মুখ হয়ে ছিল। আমেরের প্ররোচনায় তারা দ্রুত সাড়া দেয় এবং এক বিশাল সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে বির মাউনার দিকে রওনা হয়। এদিকে বির মাউনার কূপে অবস্থানরত সাহাবিগণ দীর্ঘ সময় ধরে হারাম ইবনে মিলহান রা.-এর ফিরে না আসায় অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন। ঠিক এমন সময় হঠাৎ করেই তারা দেখতে পান যে, শত শত সশস্ত্র অশ্বারোহী বেদুইন সৈন্য চারপাশ থেকে তাদের ঘিরে ফেলছে। [13] সাহাবিগণ বুঝতে পারলেন যে, তারা এক চরম বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়েছেন এবং তাদের পালানোর কোনো পথ নেই। এই অবরুদ্ধ ও অসম পরিস্থিতিতেও মদিনার এই বীর সন্তানেরা বিন্দুমাত্র ভীতি প্রদর্শন করেননি। আল-মুনযির ইবনে আমর রা.-এর নেতৃত্বে তারা অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে নিজেদের তলোয়ার কোষমুক্ত করেন। তারা জানতেন যে, এই বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে তাদের বিজয় অসম্ভব, কিন্তু তারা আল্লাহর দ্বীনের মর্যাদা রক্ষা এবং নিজেদের আত্মসম্মান বজায় রাখতে শাহাদাতের মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার সিদ্ধান্ত নেন। বনু সুলাইমের ঘাতক বাহিনী সাহাবিদের ওপর চারপাশ থেকে তীর ও বর্শা বর্ষণ করতে শুরু করে। [14] বির মাউনার সেই রক্তরঞ্জিত ভোরে এক অভূতপূর্ব অসম যুদ্ধ সংঘটিত হয়। একদিকে ছিলেন মাত্র সত্তর জন নিরস্ত্রপ্রায় কুরআনের শিক্ষক, আর অন্যদিকে ছিল আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত শত শত পেশাদার খুনি। সাহাবিগণ একে একে বীরত্বের সাথে লড়াই করে শাহাদাতের সুধা পান করতে থাকেন। বর্শার আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়েও তারা শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তাওহীদের বাণী উচ্চারণ করে গেছেন। এই নির্মম গণহত্যায় কাফেলার প্রায় সমস্ত সাহাবি শাহাদাত বরণ করেন। কেবল কা'ব ইবনে জায়েদ রা. অত্যন্ত গুরুতরভাবে আহত হয়ে লাশের স্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকায় ঘাতকরা তাকে মৃত ভেবে ফেলে রেখে যায়, যিনি পরবর্তীতে মদিনায় ফিরে আসতে সক্ষম হয়েছিলেন এবং খন্দকের যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন। [15] ৬. মদিনায় শোকের ছায়া এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া

বির মাউনার এই মর্মান্তিক গণহত্যার খবর যখন মদিনায় পৌঁছায়, তখন সমগ্র মদিনা রাষ্ট্রে এক অভূতপূর্ব শোকের ছায়া নেমে আসে। একই সময়ে সংঘটিত রাজী-র ঘটনার পর বির মাউনার এই ট্র্যাজেডি রাসুলুল্লাহ সা.-এর হৃদয়কে গভীরভাবে ক্ষতবিক্ষত করেছিল। ঐতিহাসিকদের মতে, রাসুলুল্লাহ সা. তার সমগ্র নবুয়তি জীবনে আর কোনো ঘটনায় এতটা গভীর শোক ও তীব্র মানসিক কষ্ট পাননি, যতটা তিনি পেয়েছিলেন এই সত্তর জন কুরআ ও শিক্ষক সাহাবির নির্মম হত্যাকাণ্ডে। মদিনার প্রতিটি ঘরে ঘরে তখন ক্রন্দনের রোল উঠেছিল, কারণ এই সত্তর জন সাহাবি ছিলেন মদিনার আধ্যাত্মিক ও সামাজিক জীবনের মূল চালিকাশক্তি। [16] এই চরম বিশ্বাসঘাতকতার বিরুদ্ধে রাসুলুল্লাহ সা. এক অভূতপূর্ব আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তিনি টানা এক মাস ধরে প্রতিদিনের ফরয নামাজে, বিশেষ করে ফজরের সালাতে রুকু থেকে উঠে হাত তুলে অত্যন্ত কাতরস্বরে এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের হোতা—রিল, জাকওয়ান, উসাইয়া এবং বনু লিহয়ানের বিরুদ্ধে আল্লাহর দরবারে বদদোয়া করেন, যা ইসলামি শরিয়তের ইতিহাসে "কুনুতে নাজেলা" (Qunut al-Nazila) নামে পরিচিত। এই কুনুতে নাজেলা কেবল একটি প্রার্থনা ছিল না, বরং এটি ছিল এই উগ্র গোত্রগুলোর বিরুদ্ধে মদিনা রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এক ধরনের আধ্যাত্মিক ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ ঘোষণা। [17] ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বির মাউনার এই ট্র্যাজেডি মদিনার নিরাপত্তা নীতিতে (Security Policy) এক আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসে। রাসুলুল্লাহ সা. বুঝতে পেরেছিলেন যে, কেবল কূটনৈতিক চুক্তি বা আরবের সনাতন "জিওয়ার" প্রথার ওপর ভরসা করে মদিনার বাইরে কোনো মিশন পাঠানো আর নিরাপদ নয়। এই ঘটনার পর মদিনা রাষ্ট্র তার গোয়েন্দা তৎপরতা আরও জোরদার করে এবং বিশ্বাসঘাতক গোত্রগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক অভিযান পরিচালনার নীতি গ্রহণ করে। বির মাউনার এই রক্তক্ষয়ী ভোর মুসলমানদের এই শিক্ষাই দিয়েছিল যে, একটি আদর্শিক রাষ্ট্রের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে আধ্যাত্মিক শক্তির পাশাপাশি সামরিক ও কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করা কতটা অপরিহার্য। [18]

""
৩.২ সাহাবিদের গণহত্যা: বির মাউনার সেই মর্মান্তিক ভোর
আমাদের নবী সা. সীরাত বিশ্বকোষ
ha-mims.world
এ আর্টিকেলের কুইজ(5টি প্রশ্ন)

৩.২ সাহাবিদের গণহত্যা: বির মাউনার সেই মর্মান্তিক ভোর কুইজ

1 / 5

বির মাউনায় সাহাবিদের গণহত্যা কখন সংঘটিত হয়েছিল?

এই আর্টিকেলটি কেমন লাগলো?

এই গবেষণাকে সহায়তা করুন

সীরাত বিশ্বকোষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আপনার সামান্য সহায়তা এই গবেষণাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

bKash / Nagad01XXXXXXXXXX(Send Money)
☕ Ko-fi দিয়ে সহায়তা

রেফারেন্স: "সীরাত বিশ্বকোষ" লিখুন

🌟 Ha-mim's World-এর একটি গবেষণা ও জ্ঞান-প্রযুক্তি প্রকল্প

কমিউনিটি রিফ্লেকশন

এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি কী শিখলেন বা আপনার অনুভূতি কী, তা সবার সাথে শেয়ার করুন।

আপনার রিফ্লেকশন শেয়ার করতে দয়া করে লগইন করুন।

লোড হচ্ছে...