৩.১.২ কূটনৈতিক প্রতারণার মাস্টারমাইন্ড হিসেবে আমের ইবনে তুফাইল
ভূমিকা ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
আরব উপদ্বীপের ইতিহাসে হিজরি নবম শতক বা ‘আমুল উফুদ’ (প্রতিনিধি দলের বছর) ছিল এক অত্যন্ত সংবেদনশীল ও কৌশলগত সন্ধিক্ষণ। মক্কা বিজয়ের পর মদিনা কেন্দ্রিক ইসলামি রাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক (Geopolitical) প্রভাব সমগ্র আরবে একচ্ছত্রভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করে। এই পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আরবের বিভিন্ন গোত্র মদিনার সার্বভৌমত্ব স্বীকার করে নিতে বাধ্য হচ্ছিল। তবে নজদ অঞ্চলের অন্যতম শক্তিশালী ও যুদ্ধবাজ গোত্র বনু আমের ইবনে সা’সা’আ-এর নেতৃত্বাধীন জোট এই নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণকে সহজে মেনে নিতে পারেনি। বিশেষ করে, এই গোত্রের তৎকালীন প্রধান আমের ইবনে তুফাইল (Amer ibn al-Tufayl) ছিলেন অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী, দাম্ভিক এবং আরবের চিরাচরিত গোত্রীয় আধিপত্যবাদের একনিষ্ঠ পৃষ্ঠপোষক। তিনি মদিনার ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক ও ধর্মীয় শক্তিকে নিজের ব্যক্তিগত ও গোত্রীয় নেতৃত্বের জন্য এক বিরাট হুমকি হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন।
তৎকালীন আরবের ভূ-রাজনীতিতে বনু আমের গোত্রের অবস্থান ছিল অত্যন্ত কৌশলগত। নজদের বিস্তীর্ণ মরুভূমি এবং ইরাক ও সিরিয়ার বাণিজ্য পথের সংযোগস্থলে তাদের অবস্থান হওয়ায়, যেকোনো শক্তির জন্য তাদের উপেক্ষা করা অসম্ভব ছিল। আমের ইবনে তুফাইল এই ভৌগোলিক ও সামরিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে মদিনার বিরুদ্ধে এক জটিল কূটনৈতিক প্রতারণার জাল বুনেছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, সরাসরি সামরিক সংঘাতে মদিনার নবগঠিত সুশৃঙ্খল বাহিনীকে পরাজিত করা কঠিন হতে পারে। তাই তিনি ‘কূটনৈতিক প্রতারণা’ (Diplomatic Deception) এবং ‘ছদ্মবেশী আলোচনা’ (Pseudo-negotiation)-কে প্রধান অস্ত্র হিসেবে বেছে নেন। ইসলামের ইতিহাসে আমের ইবনে তুফাইল কেবল একজন সাধারণ শত্রু ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন এমন এক রাজনৈতিক চালবাজ, যিনি নিজের অহংকার ও ক্ষমতার লিপ্সাকে চরিতার্থ করতে কূটনৈতিক রীতিনীতি ও বিশ্বাসের চরম অবমাননা করতে দ্বিধাবোধ করেননি [1] .
আমের ইবনে তুফাইলের এই কূটনৈতিক প্রতারণার স্বরূপ উন্মোচন করতে হলে আমাদের তৎকালীন আরবের ‘আসাবিয়াত’ বা গোত্রীয় অন্ধত্ব এবং মদিনা রাষ্ট্রের ‘সম্মিলিত নিরাপত্তা’ (Collective Security) নীতির মধ্যকার দ্বন্দ্বকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে। মদিনা রাষ্ট্র যখন পারস্পরিক চুক্তি, শান্তি ও ধর্মীয় স্বাধীনতার ভিত্তিতে একটি স্থিতিশীল আরব বিনির্মাণে সচেষ্ট ছিল, তখন আমের ইবনে তুফাইল ক্ষমতার ভারসাম্য (Balance of Power) নিজের অনুকূলে রাখতে চরম বিশ্বাসঘাতকতা ও গুপ্তহত্যার মতো জঘন্য পথ বেছে নিয়েছিলেন। তাঁর এই নেতিবাচক কূটনীতি কেবল তৎকালীন আরবের রাজনৈতিক পরিবেশকেই উত্তপ্ত করেনি, বরং তা ছিল মদিনা রাষ্ট্রের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে এক গভীর ষড়যন্ত্র [2] .
আমের ইবনে তুফাইলের মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক প্রোফাইল
আমের ইবনে তুফাইলের রাজনৈতিক চরিত্র বুঝতে হলে তাঁর মনস্তাত্ত্বিক গঠন ও চরম অহংবোধের বিশ্লেষণ অপরিহার্য। তিনি ছিলেন এমন এক ব্যক্তিত্ব, যিনি নিজেকে আরবের সর্বশ্রেষ্ঠ নেতা মনে করতেন এবং অন্য কারো অধীনতা স্বীকার করাকে নিজের জন্য চরম অপমানজনক বলে জ্ঞান করতেন। যখন বনু আমের গোত্রের সাধারণ মানুষ এবং অন্যান্য নেতৃবৃন্দ মদিনার ইসলামের জোয়ারে শামিল হওয়ার জন্য তাঁকে তাগিদ দিচ্ছিল, তখন তাঁর অহংকার ও আত্মমর্যাদাবোধে চরম আঘাত লাগে। তাঁর গোত্রের লোকেরা যখন তাঁকে বলেছিল, "হে আমের! মানুষ তো দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করছে, আপনিও ইসলাম গ্রহণ করুন।" তখন তাঁর উত্তর ছিল অত্যন্ত অহংকারী ও দাম্ভিকতাপূর্ণ [3] .
আমের ইবনে তুফাইলের এই চরম অহংকার ও মদিনার নেতৃত্বকে অস্বীকার করার মানসিকতা সীরাতের মূল গ্রন্থগুলোতে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে সংরক্ষিত হয়েছে। তিনি শপথ করে বলেছিলেন:
অনুবাদ:
"আল্লাহর কসম! আমি তো শপথ করেছিলাম যে, সমগ্র আরব আমার পদানুসরণ না করা পর্যন্ত আমি ক্ষান্ত হব না; আর এখন আমি কুরাইশের এই যুবকের (রাসুলুল্লাহ সা.) পদানুসরণ করব?" [4] .
এই উক্তিটি আমের ইবনে তুফাইলের মনস্তাত্ত্বিক সংকটের গভীরতা প্রমাণ করে। তাঁর কাছে সত্যের চেয়ে নিজের ব্যক্তিগত অহংকার এবং গোত্রীয় শ্রেষ্ঠত্বই ছিল মুখ্য। তিনি রাসুলুল্লাহ সা.-এর নবুওয়াতকে একটি আধ্যাত্মিক মিশন হিসেবে দেখার পরিবর্তে একটি রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে দেখেছিলেন। তাঁর এই মনস্তাত্ত্বিক বিকার তাঁকে এমন এক অন্ধত্বের দিকে ঠেলে দিয়েছিল, যেখানে তিনি যেকোনো মূল্যে মদিনার রাষ্ট্রপ্রধানকে পরাস্ত বা হত্যা করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। রাজনৈতিক বিজ্ঞানের পরিভাষায় একে বলা যায় ‘মেগালোম্যানিয়া’ (Megalomania) বা ক্ষমতার চরম মোহ, যা একজন নেতাকে নৈতিকতার সমস্ত সীমা লঙ্ঘন করতে প্ররোচিত করে [5] .
মদিনা সফর ও কূটনৈতিক প্রতারণার জাল
আমের ইবনে তুফাইল যখন বুঝতে পারলেন যে, মদিনার অগ্রযাত্রাকে কেবল দূর থেকে প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়, তখন তিনি এক ধূর্ত কূটনৈতিক চাল চাললেন। তিনি বনু আমের গোত্রের একটি প্রতিনিধি দল (وفد بني عامر) গঠন করে মদিনায় আসার সিদ্ধান্ত নেন। বাহ্যিকভাবে এই সফরের উদ্দেশ্য ছিল মদিনা রাষ্ট্রের সাথে শান্তি আলোচনা ও গোত্রীয় সম্পর্ক নির্ধারণ করা, কিন্তু অভ্যন্তরীণভাবে আমেরের উদ্দেশ্য ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ ও কুটিল। তিনি এই সফরকে রাসুলুল্লাহ সা.-এর ওপর সরাসরি আঘাত হানার এবং মদিনার রাজনৈতিক নেতৃত্বকে খণ্ডিত করার একটি সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন [6] .
মদিনায় পৌঁছে আমের ইবনে তুফাইল সাধারণ কোনো দূতের মতো আচরণ করেননি, বরং তিনি অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ও দরকষাকষিমূলক (Aggressive Bargaining) অবস্থান গ্রহণ করেন। তিনি রাসুলুল্লাহ সা.-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে এমন কিছু অযৌক্তিক ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ শর্ত আরোপ করতে চান, যা কোনো স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না। তিনি মূলত মদিনা রাষ্ট্রকে দ্বিখণ্ডিত করার এবং ক্ষমতার অংশীদারিত্বের এক অবাস্তব প্রস্তাব পেশ করেন। সীরাতের ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, তিনি রাসুলুল্লাহ সা.-কে লক্ষ্য করে বলেছিলেন:
অনুবাদ:
"হে মুহাম্মাদ! আমি আপনাকে তিনটি বিষয়ের যেকোনো একটি বেছে নেওয়ার প্রস্তাব দিচ্ছি: (১) সমতল ভূমির (শহরাঞ্চলের) নেতৃত্ব থাকবে আপনার হাতে আর মরুভূমির নেতৃত্ব থাকবে আমার হাতে, অথবা (২) আপনার পর আমাকে আপনার স্থলাভিষিক্ত (খলিফা) মনোনীত করতে হবে, অথবা (৩) আমি গাতাফান গোত্রের এক হাজার লাল ঘোড়া ও এক হাজার লাল ঘোটকী নিয়ে আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করব।" [7] .
আমের ইবনে তুফাইলের এই প্রস্তাবগুলো বিশ্লেষণ করলে তাঁর কূটনৈতিক প্রতারণা ও ব্ল্যাকমেইলিং (Blackmailing) কৌশল স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রথমত, তিনি মদিনা রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে খণ্ডিত করতে চেয়েছিলেন। দ্বিতীয়ত, তিনি ইসলামের আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বকে একটি বংশীয় বা গোত্রীয় সম্পত্তিতে পরিণত করার অপচেষ্টা করেছিলেন। এবং তৃতীয়ত, এই দাবিগুলো মানা না হলে তিনি সরাসরি সামরিক আগ্রাসনের হুমকি দিয়েছিলেন। এটি ছিল একাধারে কূটনৈতিক শিষ্টাচারের চরম লঙ্ঘন এবং মদিনা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ [8] .
আরবাদ ইবনে কায়সের সাথে গোপন চুক্তি ও গুপ্তহত্যার ব্যর্থ ষড়যন্ত্র
আমের ইবনে তুফাইলের কূটনৈতিক প্রতারণার সবচেয়ে অন্ধকার দিকটি ছিল রাসুলুল্লাহ সা.-কে আলোচনার টেবিলে রেখে পেছন থেকে হত্যা করার এক জঘন্য ষড়যন্ত্র। মদিনা সফরের পূর্বেই তিনি তাঁর বিশ্বস্ত সহযোগী আরবাদ ইবনে কায়সের (Arbad ibn Qays) সাথে একটি গোপন চুক্তি করেছিলেন। আমেরের পরিকল্পনা ছিল অত্যন্ত সুচতুর ও কাপুরুষোচিত। তিনি আরবাদকে বলেছিলেন, "আমরা যখন মুহাম্মাদের কাছে যাব, তখন আমি তাঁর মনোযোগ আকর্ষণ করে তাঁর সাথে তর্কে লিপ্ত হব এবং তাঁর মুখমণ্ডলের সামনে হাত নাড়াচাড়া করব। যখন তুমি দেখবে যে আমি তাঁর মনোযোগ সম্পূর্ণভাবে কেড়ে নিয়েছি, তখন তুমি তরবারি দিয়ে তাঁর ওপর আঘাত হানবে।" [9] .
এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, আমের ইবনে তুফাইল রাসুলুল্লাহ সা.-এর অত্যন্ত নিকটে গিয়ে কথা বলতে শুরু করেন এবং পূর্বপরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন অবান্তর প্রশ্ন ও তর্কে লিপ্ত হন। তিনি বারবার আরবাদের দিকে ইশারা করছিলেন যাতে সে তরবারি বের করে আঘাত করে। কিন্তু আরবাদ ইবনে কায়স বারবার চেষ্টা করেও তরবারি কোষমুক্ত করতে পারছিলেন না। এক অদৃশ্য ঐশী শক্তি ও মনস্তাত্ত্বিক ভীতি আরবাদকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল। রাসুলুল্লাহ সা. তাদের এই কুটিল চক্রান্ত ও চোখের ইশারা বুঝতে পেরেছিলেন, কারণ আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসুলকে ওহীর মাধ্যমে এই ষড়যন্ত্রের কথা অবহিত করেছিলেন [10] .
যখন এই গুপ্তহত্যার প্রচেষ্টা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়, তখন আমের ও আরবাদ অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ও লজ্জিত অবস্থায় মদিনা ত্যাগ করতে বাধ্য হন। মদিনা থেকে বের হওয়ার সময়ও আমেরের অহংকার কমেনি। সে অত্যন্ত ঔদ্ধত্যের সাথে চিৎকার করে বলতে থাকে, "হে মুহাম্মাদ! আল্লাহর কসম, আমি আপনার এই শহরকে অশ্বারোহী বাহিনী ও পদাতিক সৈন্য দিয়ে পূর্ণ করে দেব।" রাসুলুল্লাহ সা. তখন তাঁর এই চরম ঔদ্ধত্য ও ষড়যন্ত্রের জবাবে আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করেছিলেন:
অনুবাদ:
"হে আল্লাহ! আমের ইবনে তুফাইলের বিরুদ্ধে আপনিই আমার জন্য যথেষ্ট হোন। হে আল্লাহ! বনু আমের গোত্রকে হেদায়েত দান করুন।" [11] .
এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, আমের ইবনে তুফাইলের কূটনীতি কোনো নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংলাপ ছিল না, বরং তা ছিল একাধারে প্রতারণা, ব্ল্যাকমেইল এবং রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যার এক সুপরিকল্পিত চক্রান্ত। ইসলামের ইতিহাসে এই ঘটনাটি ‘কূটনৈতিক অনাক্রম্যতা’ (Diplomatic Immunity) এবং বিশ্বাসের চরম অবমাননার এক নিকৃষ্টতম উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে [12] .
ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ: কূটনৈতিক প্রতারণা বনাম ইসলামি কূটনীতি
আমের ইবনে তুফাইলের এই ধূর্ত ও প্রতারণামূলক কূটনীতিকে আধুনিক রাজনৈতিক বিজ্ঞানের আলোকে বিশ্লেষণ করলে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক উন্মোচিত হয়। প্রথমত, আমেরের কূটনীতি ছিল ‘রিয়েলপলিটিক’ (Realpolitik) বা চরম স্বার্থবাদী রাজনীতির এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ, যেখানে নৈতিকতা, চুক্তি বা বিশ্বাসের কোনো স্থান ছিল না। তাঁর কাছে কূটনীতি ছিল কেবলই যুদ্ধ জয়ের বা প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার একটি বিকল্প কৌশল। অন্যদিকে, রাসুলুল্লাহ সা.-এর কূটনীতি ছিল ‘নৈতিক কূটনীতি’ (Ethical Diplomacy) এবং ‘স্বচ্ছতা’ (Transparency)-র ওপর প্রতিষ্ঠিত। মদিনা রাষ্ট্র কখনোই কোনো গোত্র বা শক্তির সাথে প্রতারণামূলক চুক্তি বা আলোচনার আড়ালে গুপ্তহত্যার মতো পথ অবলম্বন করেনি [13] .
দ্বিতীয়ত, আমের ইবনে তুফাইলের এই ব্যর্থতা প্রমাণ করে যে, কেবল চাতুর্য ও প্রতারণা দিয়ে কোনো দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব নয়। তাঁর এই হীন চক্রান্তের ফলে বনু আমের গোত্র মদিনার সাথে একটি সম্মানজনক চুক্তিতে পৌঁছানোর ঐতিহাসিক সুযোগ হারায়। আমেরের ব্যক্তিগত অহংকার ও ক্ষমতার লোভ পুরো গোত্রকে এক চরম অনিশ্চয়তা ও সামরিক ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছিল। এটি ছিল একজন নেতার ভুল রাজনৈতিক দর্শনের কারণে পুরো গোত্রের জন্য এক বিরাট বিপর্যয় [14] .
আমের ইবনে তুফাইলের পরিণতিও ছিল অত্যন্ত শিক্ষণীয় ও ভয়াবহ। মদিনা থেকে ফেরার পথে আল্লাহ তাআলা তাঁর ওপর গজব নাজিল করেন। তিনি বনু সালুল গোত্রের এক মহিলার ঘরে অবস্থানকালে প্লেগ বা এক ধরণের মারাত্মক ফোড়ায় (غدة كغدة البعير - উটের ফোড়ার মতো ফোড়া) আক্রান্ত হন। মৃত্যুর যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে তিনি বলেছিলেন, "উটের ফোড়ার মতো ফোড়া, আর মৃত্যু কি বনু সালুলের এক মহিলার ঘরে?" অবশেষে অত্যন্ত অপমানজনকভাবে নজদের মরুভূমিতে তাঁর মৃত্যু হয় এবং তাঁর সহযোগী আরবাদ ইবনে কায়সের ওপর বজ্রপাত হলে সেও পুড়ে ছাই হয়ে যায় [15] .
ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে, আমের ইবনে তুফাইলের এই কূটনৈতিক প্রতারণার অধ্যায়টি মদিনা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কৌশলে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছিল। এই ঘটনার পর মদিনার নেতৃত্ব বহিরাগত প্রতিনিধি দলগুলোর সাথে আলোচনার ক্ষেত্রে আরও বেশি সতর্ক ও কৌশলগত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে শুরু করে। আমেরের এই ব্যর্থ ষড়যন্ত্র প্রমাণ করে যে, সত্য ও ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রব্যবস্থাকে কেবল চাতুর্য ও প্রতারণার জাল বুনে ধ্বংস করা যায় না [16] .