খণ্ড 92
ফন্ট:100%
থিম:

৬.৩ মিডিয়া হেজিমনি (Media Hegemony) এবং প্রোপাগান্ডা মডেল (Propaganda Model): ইসলামকে ভিলেন বানানোর ফ্রেমওয়ার্ক

মিডিয়া হেজিমনি বা গণমাধ্যমের আধিপত্য কেবল তথ্যের আদান-প্রদান নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ, যার লক্ষ্য হলো নির্দিষ্ট একটি আদর্শিক কাঠামো বা 'ওয়ার্ল্ডভিউ' (Worldview) জনগণের মগজে গেঁথে দেওয়া। যখন এই আধিপত্য কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম বা বিশ্বাসের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়, তখন তা রূপ নেয় একটি সুসংগঠিত 'প্রোপাগান্ডা মডেলে', যার মূল উদ্দেশ্য থাকে সেই বিশ্বাসকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা এবং বিশ্বমঞ্চে তাকে 'ভিলেন' বা খলনায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। ইসলামের ক্ষেত্রে এই ফ্রেমওয়ার্কটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী ভূ-রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক কৌশলের অংশ, যা প্রাচীন যুগের তথ্যযুদ্ধের আধুনিক রূপ।

১. তথ্যযুদ্ধের ঐতিহাসিক উৎস এবং প্রাথমিক পরিকাঠামো


গণমাধ্যমের মাধ্যমে কোনো আদর্শকে খণ্ডন করার বা বিকৃত করার প্রবণতা ইসলামের সূচনালগ্ন থেকেই বিদ্যমান ছিল। সপ্তম শতাব্দীর আরবে কবিতা এবং বাগ্মিতা ছিল তৎকালীন সময়ের প্রধান গণমাধ্যম। মক্কায় যখন ইসলামি দাওয়াত শুরু হয়, তখন কুরাইশরা কেবল শারীরিক নির্যাতনের আশ্রয় নেয়নি, বরং তারা একটি শক্তিশালী 'মিডিয়া ক্যাম্পেইন' শুরু করেছিল যাতে নবি সা.-এর ব্যক্তিত্ব এবং তাঁর প্রচারিত সত্যকে সাধারণ মানুষের কাছে বিকৃত করে উপস্থাপন করা যায়। এই প্রাথমিক পর্যায়টিই ছিল আধুনিক মিডিয়া হেজমনির আদি রূপ, যেখানে তথ্যের সত্যতার চেয়ে তার প্রভাব এবং প্রচারের ব্যাপকতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।

ঐতিহাসিক তথ্যানুসারে, এই তথ্যযুদ্ধ কেবল মক্কায় সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং হিজরতের পর এবং বদর যুদ্ধের পূর্ববর্তী সময়ে এটি এক নতুন মাত্রায় পৌঁছেছিল। তৎকালীন আরবের সামাজিক কাঠামোতে কবিতার প্রভাব ছিল অপরিসীম; একটি কবিতা পুরো গোত্রের সম্মান বাড়াতে বা কমাতে পারত। এই বাস্তবতাকে কাজে লাগিয়ে ইসলামের বিরোধীরা একটি সুসংগঠিত প্রচারণার জাল বিস্তার করেছিল। এই প্রক্রিয়ার গভীরতা বুঝতে হলে নিম্নোক্ত ইবারতটি লক্ষ্য করা প্রয়োজন:


السمة التاسعة عشرة: الحرب الإعلامية ودورها في المعركة. كانت بوادر الحرب الإعلامية قد ابتدأت منذ الهجرة، غير أن ملامحها بدأت تتضح رويدا رويدا في بعض السرايا قبيل بدر، لكنها انفجرت انفجارا ضخما بعد بدر. لأن الجانب الإعلامي للقبائل المجاورة كان هدفا مهما من أهداف الفريقين، ويظهر أن الأشعار سرعان ما تطير بها الركبان بين يثرب ومكة. فيأتي الرد من الطرف الآخر.

উপরোক্ত উদ্ধৃতিটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, বদর যুদ্ধের পর এই 'মিডিয়া ওয়ার' বা তথ্যযুদ্ধ এক প্রচণ্ড বিস্ফোরণের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল। মদিনা এবং মক্কার মধ্যবর্তী যোগাযোগ ব্যবস্থায় কবিতার মাধ্যমে যে বার্তাগুলো আদান-প্রদান করা হতো, তা ছিল মূলত জনমত গঠনের হাতিয়ার। এখানে লক্ষ্যণীয় যে, সত্যের বিপরীতে মিথ্যার একটি সুসংগঠিত কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল, যা আধুনিক প্রোপাগান্ডা মডেলের সাথে হুবহু মিলে যায়। যখন কোনো পক্ষ তথ্যের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ পায়, তখন তারা ইতিহাসের বয়ান বা ন্যারেটিভ পরিবর্তন করে দিতে পারে, যা মূলত মিডিয়া হেজমনির মূল লক্ষ্য।

এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটটি প্রমাণ করে যে, ইসলামকে ভিলেন বানানোর চেষ্টা কোনো আধুনিক পশ্চিমা উদ্ভাবন নয়, বরং এটি একটি প্রাচীন কৌশল। তবে আধুনিক যুগে প্রযুক্তির উৎকর্ষতার কারণে এই প্রোপাগান্ডা মডেলটি আরও জটিল এবং সূক্ষ্ম হয়েছে। প্রাচীন যুগে যেখানে কেবল কবিতার মাধ্যমে মিথ্যার প্রচার হতো, বর্তমানে তা গ্লোবাল নিউজ নেটওয়ার্ক, সোশ্যাল মিডিয়া অ্যালগরিদম এবং একাডেমিক ডিসকোর্সের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় ইসলামকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন এটি মানবসভ্যতার জন্য একটি হুমকি, যা মূলত সেই প্রাচীন কুরাইশদের কৌশলেরই একটি ডিজিটাল সংস্করণ।

২. মিডিয়া হেজমনির কৌশলগত প্রয়োগ এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা


মিডিয়া হেজিমনি বা আধিপত্যের মূল ভিত্তি হলো তথ্যের ফিল্টারিং এবং ফ্রেমওয়ার্কিং। যখন কোনো প্রভাবশালী শক্তি গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করে, তখন তারা নির্ধারণ করে দেয় যে কোন সংবাদটি প্রকাশিত হবে এবং কোন সংবাদটি চাপা দেওয়া হবে। এই প্রক্রিয়ায় 'ফ্রেমওয়ার্কিং' অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; অর্থাৎ একটি ঘটনাকে কোন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হবে তা আগে থেকেই নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। ইসলামি বিশ্বের ক্ষেত্রে এই ফ্রেমওয়ার্কটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যে, ইসলামের যেকোনো ইতিবাচক দিককে 'ব্যতিক্রম' হিসেবে দেখানো হয় এবং যেকোনো নেতিবাচক ঘটনাকে 'সার্বজনীন বৈশিষ্ট্য' হিসেবে প্রচার করা হয়।

এই আধিপত্যের একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ পাওয়া যায় ঔপনিবেশিক শাসনকালে, যেখানে ইউরোপীয় শক্তিগুলো স্থানীয় গণমাধ্যমগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে নিজেদের আধিপত্য বৈধ করতে চেষ্টা করত। মিশরের উদাহরণে দেখা যায়, কীভাবে ব্রিটিশ প্রভাবের অধীনে গণমাধ্যমগুলোকে বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্লকে বিভক্ত করে জাতীয় সংহতি নষ্ট করা হয়েছিল। এই কৌশলটি বর্তমানের প্রোপাগান্ডা মডেলের সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত, যেখানে মুসলিম উম্মাহর অভ্যন্তরে বিভেদ সৃষ্টি করে তাদের দুর্বল করে দেওয়া হয়। এই বিষয়ে ঐতিহাসিক বিবরণ নিম্নরূপ:


تمثل "العلم" اتجاهات الحزب الوطني الرسمية من خلفها "اللواء" وبعض الصحف الصغير ثم "المؤيد" وتعبر عن رأي حزب الإصلاح وهو حزب شديد الصلة بالقصر ومن ورائها صحف قليلة الأهمية أظهرها "الرقيب" ثم "الجريدة" أخيرًا وتنطق باسم حزب الأمة وهو حزب مسالم يرى الأمور في اتئاد ويرجو السير في مراحل الإصلاح على مهل. ويمضي "العلم" في عنفه وقد أغراه تغيير العميد البريطاني، فقد استطاع جورست بملاينته للقصر أن يفصم عرى الود بين الخديوي والحزب الوطني ويفتت الكتلة الوطنية ويقسمها شيعًا وأحزابًا، ويخلق من المسائل الصغيرة.

এই ইবারতটি থেকে স্পষ্ট হয় যে, ব্রিটিশ প্রতিনিধি 'জোরস্ট' কীভাবে কৌশলে মিশরের জাতীয়তাবাদী ব্লককে বিভক্ত করেছিলেন এবং গণমাধ্যমকে সেই বিভাজনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। এই পদ্ধতিটিই বর্তমানে 'ডিভাইড অ্যান্ড রুল' (Divide and Rule) নীতির অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। যখন বিশ্ব গণমাধ্যম ইসলামকে উপস্থাপন করে, তখন তারা প্রায়শই মুসলিম বিশ্বের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বগুলোকে এমনভাবে হাইলাইট করে যেন এই দ্বন্দ্বগুলো ইসলামের সহজাত বৈশিষ্ট্য। এটি মূলত একটি পরিকল্পিত প্রোপাগান্ডা, যার মাধ্যমে মুসলিমদের ঐক্য নষ্ট করা হয় এবং তাদের একটি 'অস্থির' ও 'সহিংস' জাতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

মিডিয়া হেজমনির এই প্রক্রিয়ায় তথ্যের একপাক্ষিকতা তৈরি করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, যখন কোনো পশ্চিমা দেশ কোনো মুসলিম দেশে আক্রমণ করে, তখন গণমাধ্যমে তাকে 'গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা' বা 'সন্ত্রাসবাদ দমন' হিসেবে ফ্রেম করা হয়। কিন্তু যখন মুসলিমরা তাদের অধিকারের জন্য লড়াই করে, তখন তাকে 'জঙ্গিবাদ' হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এই শব্দচয়ন বা 'টার্মিনোলজি'র পরিবর্তনই হলো প্রোপাগান্ডা মডেলের মূল অস্ত্র। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের অবচেতন মনে ইসলাম সম্পর্কে একটি নেতিবাচক ধারণা গেঁথে দেওয়া হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে ইসলামকে একটি ভিলেন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

৩. প্রোপাগান্ডা মডেল এবং 'ভিলেন' তৈরির মনস্তাত্ত্বিক ফ্রেমওয়ার্ক


প্রোপাগান্ডা মডেলের একটি প্রধান স্তম্ভ হলো 'আদারিং' (Othering) বা অন্যকরণ। এই প্রক্রিয়ায় একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা ধর্মকে সমাজের মূলধারা থেকে আলাদা করে দেখানো হয় এবং তাদের এমন কিছু বৈশিষ্ট্য আরোপ করা হয় যা ভীতি এবং ঘৃণার জন্ম দেয়। ইসলামকে ভিলেন বানানোর ক্ষেত্রে এই মনস্তাত্তাত্ত্বিক কৌশলটি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে। এখানে ইসলামকে কেবল একটি ধর্ম হিসেবে নয়, বরং একটি 'রাজনৈতিক হুমকি' হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এই ফ্রেমওয়ার্কটি মূলত তিনটি স্তরে কাজ করে: প্রথমত, তথ্যের বিকৃতি; দ্বিতীয়ত, নেতিবাচক শব্দের পুনরাবৃত্তি; এবং তৃতীয়ত, ইতিবাচক তথ্যের সম্পূর্ণ বর্জন।

এই প্রোপাগান্ডা মডেলের কার্যকারিতা বাড়াতে গণমাধ্যমগুলো প্রায়শই 'সিলেক্টিভ রিপোর্টিং' বা বাছাইকৃত সংবাদ প্রচারের আশ্রয় নেয়। তারা ইসলামের শান্তি, সহনশীলতা এবং ন্যায়বিচারের শিক্ষাগুলোকে উপেক্ষা করে কেবল চরমপন্থীদের বিচ্ছিন্ন কর্মকাণ্ডকে ইসলামের প্রতিনিধিত্ব হিসেবে দেখায়। এই প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের মনে একটি ভ্রান্ত ধারণা তৈরি হয় যে, ইসলাম মানেই সহিংসতা। এই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের লক্ষ্য হলো মুসলিমদের প্রতি বিশ্বব্যাপী একটি 'কলেক্টিভ ফিয়ার' বা সমষ্টিগত ভীতি তৈরি করা, যাতে করে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যেকোনো দমনমূলক পদক্ষেপকে বিশ্ব সম্প্রদায় সমর্থন করে।

অন্যদিকে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার কথা বলা হলেও বাস্তবে তা নির্দিষ্ট কিছু কর্পোরেট এবং রাজনৈতিক স্বার্থের অধীন। ডাচ গণমাধ্যমের ইতিহাসের সাথে তুলনা করলে এই বৈপরীত্য আরও স্পষ্ট হয়। ডাচ গণমাধ্যম একসময় অত্যন্ত স্বাধীন ছিল, যা তাদের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বিপ্লবে সহায়তা করেছিল। নিম্নোক্ত ইবারতটি সেই স্বাধীনতার কথা বলে:


وكانت الصحافة الهولندية أول صحافة حرة. وكانت صحيفة "الأخبار " الأسبوعية في ليدن، وصحيفة "الجازيت" في أمستردام تقرآن في سائر أنحاء أوربا الغربية، لأنهما كانتا تتحدثان في حرية تامة، على حين كانت الصحافة في تلك الأيام في أية بقعة أخرى خاضعة لسيطرة الحكومة ورقابتها.

তবে বর্তমানের গ্লোবাল মিডিয়া ল্যান্ডস্কেপে এই স্বাধীনতার ধারণাটি কেবল একটি মুখোশ মাত্র। যখন কথা আসে ইসলামের কথা বলার প্রশ্নে, তখন তথাকথিত 'ফ্রি প্রেস' বা মুক্ত গণমাধ্যমগুলো কঠোর সেন্সরশিপের মুখে পড়ে। যারা ইসলামের প্রকৃত রূপ তুলে ধরার চেষ্টা করে, তাদের 'ইসলামোফোবিক' ন্যারেটিভের মাধ্যমে স্তব্ধ করে দেওয়া হয়। এই যে তথ্যের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ এবং ভিন্নমতের দমন, এটাই হলো আধুনিক মিডিয়া হেজমনির চরম বহিঃপ্রকাশ। এখানে সত্যের চেয়ে 'পারসেপশন' বা ধারণাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, কারণ প্রোপাগান্ডা মডেলের লক্ষ্য সত্য প্রতিষ্ঠা করা নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট মিথ্যাকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা।

৪. ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ এবং ইসলামোফোবিয়ার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ


মিডিয়া হেজিমনি এবং প্রোপাগান্ডা মডেল কেবল সাংস্কৃতিক বিদ্বেষ থেকে জন্ম নেয় না, বরং এর পেছনে থাকে গভীর ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ। মধ্যপ্রাচ্যের তেল সম্পদ, কৌশলগত অবস্থান এবং মুসলিম বিশ্বের বিপুল মানবসম্পদকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য পশ্চিমা শক্তিগুলো ইসলামকে একটি 'ভিলেন' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়োজন মনে করেছে। যখন ইসলামকে একটি সহিংস ধর্ম হিসেবে চিহ্নিত করা যায়, তখন মুসলিম দেশগুলোতে সামরিক হস্তক্ষেপ এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করা সহজ হয়। এই পুরো প্রক্রিয়াটি একটি সুসংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে, যাকে আমরা 'ইসলামোফোবিয়া' বলে জানি।

এই প্রাতিষ্ঠানিক ইসলামোফোবিয়া তৈরি করতে গণমাধ্যমগুলো নির্দিষ্ট কিছু 'কি-ওয়ার্ড' বা মূলশব্দ ব্যবহার করে। যেমন: 'রাডিক্যালিজম', 'এক্সট্রিমিস্ট', 'শারিআহ ল'—এই শব্দগুলোকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন এগুলো কেবল ভীতি এবং দমনের প্রতীক। এই শব্দগুলোর মাধ্যমে একটি মানসিক প্রাচীর তৈরি করা হয়, যা সাধারণ মানুষকে ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্য এবং মানবিক মূল্যবোধ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। এই প্রক্রিয়ায় ইসলামের ইতিহাসকে বিকৃত করা হয় এবং ইসলামের স্বর্ণযুগ বা বৈজ্ঞানিক অবদানগুলোকে হয় অস্বীকার করা হয় অথবা সেগুলোকে অন্য কোনো সভ্যতার অবদান হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হয়।

এই প্রোপাগান্ডা মডেলের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো এর 'লুপ' বা চক্রাকার প্রভাব। গণমাধ্যম একটি মিথ্যা সংবাদ প্রচার করে, সেই সংবাদটি রাজনৈতিক নীতিতে রূপান্তরিত হয়, এবং সেই নীতিটি আবার গণমাধ্যমে বৈধতা পায়। এভাবে একটি মিথ্যে ন্যারেটিভ সময়ের সাথে সাথে 'ঐতিহাসিক সত্য' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই চক্রটি ভাঙতে হলে কেবল তথ্যের সংশোধন যথেষ্ট নয়, বরং একটি বিকল্প মিডিয়া কাঠামোর প্রয়োজন, যা সত্য এবং বস্তুনিষ্ঠতার ভিত্তিতে ইসলামকে উপস্থাপন করতে পারবে। বর্তমানের ডিজিটাল যুগে সোশ্যাল মিডিয়ার উত্থান এই হেজিমনিকে কিছুটা চ্যালেঞ্জ জানালেও, অ্যালগরিদমের মাধ্যমে তথ্যের নিয়ন্ত্রণ এখন আরও সূক্ষ্মভাবে পরিচালিত হচ্ছে।

পরিশেষে বলা যায় না, বরং এটি একটি চলমান বাস্তব যে, মিডিয়া হেজিমনি এবং প্রোপাগান্ডা মডেলের এই ফ্রেমওয়ার্কটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং সুসংগঠিত। ইসলামকে ভিলেন বানানোর এই চেষ্টা কেবল একটি ধর্মীয় সংঘাত নয়, বরং এটি তথ্যের আধিপত্য বিস্তারের একটি যুদ্ধ। এই যুদ্ধের মোকাবিলা করতে হলে মুসলিম উম্মাহর জন্য প্রয়োজন উচ্চতর জ্ঞান, গবেষণাধর্মী বিশ্লেষণ এবং একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, যা মিথ্যার এই দুর্গকে ভেঙে সত্যের আলো ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হবে। এই লড়াইটি কেবল তর্কের নয়, বরং এটি একটি বুদ্ধিবৃত্তিক এবং কৌশলগত লড়াই, যেখানে তথ্যের সঠিক ব্যবহারই হবে সবচেয়ে বড় অস্ত্র।

""
৬.৩ মিডিয়া হেজিমনি (Media Hegemony) এবং প্রোপাগান্ডা মডেল (Propaganda Model): ইসলামকে ভিলেন বানানোর ফ্রেমওয়ার্ক
আমাদের নবী সা. সীরাত বিশ্বকোষ
ha-mims.world
এ আর্টিকেলের কুইজ(5টি প্রশ্ন)

৬.৩ মিডিয়া হেজিমনি (Media Hegemony) এবং প্রোপাগান্ডা মডেল (Propaganda Model): ইসলামকে ভিলেন বানানোর ফ্রেমওয়ার্ক কুইজ

1 / 5

মিডিয়া হেজিমনি বা আধিপত্যের মূল ভিত্তি কী?

এই আর্টিকেলটি কেমন লাগলো?

এই গবেষণাকে সহায়তা করুন

সীরাত বিশ্বকোষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আপনার সামান্য সহায়তা এই গবেষণাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

bKash / Nagad01XXXXXXXXXX(Send Money)
☕ Ko-fi দিয়ে সহায়তা

রেফারেন্স: "সীরাত বিশ্বকোষ" লিখুন

🌟 Ha-mim's World-এর একটি গবেষণা ও জ্ঞান-প্রযুক্তি প্রকল্প

কমিউনিটি রিফ্লেকশন

এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি কী শিখলেন বা আপনার অনুভূতি কী, তা সবার সাথে শেয়ার করুন।

আপনার রিফ্লেকশন শেয়ার করতে দয়া করে লগইন করুন।

লোড হচ্ছে...