৯.২.২ গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলোর যৌক্তিকতা
১. ভূমিকা: ইসলামি রাষ্ট্রদর্শনে গোয়েন্দা ব্যবস্থার তাত্ত্বিক ভিত্তি
একটি নবগঠিত রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বিধান এবং বহিঃশত্রুর আগ্রাসন প্রতিহত করার ক্ষেত্রে নিখুঁত ও সময়োপযোগী তথ্য-উপাত্তের গুরুত্ব অপরিসীম। মদিনা কেন্দ্রিক প্রথম ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই রাসুলুল্লাহ সা. এই বাস্তবতাকে গভীরভাবে অনুধাবন করেছিলেন। ওহী বা ঐশী প্রত্যাদেশের ওপর পূর্ণ বিশ্বাস থাকা সত্ত্বেও তিনি পার্থিব কার্যকারণ ও কৌশলগত ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে একটি অত্যন্ত সুসংগঠিত ও কার্যকর গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। এটি কেবল সামরিক অভিযানের পূর্বপ্রস্তুতি ছিল না, বরং এটি ছিল একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার অপরিহার্য ভূ-রাজনৈতিক কৌশল [1] ।
ইসলামি রাষ্ট্রদর্শনে গোয়েন্দা তথ্যের ব্যবহার কেবল তাৎক্ষণিক আত্মরক্ষার হাতিয়ার ছিল না, বরং তা ছিল দূরদর্শী কূটনৈতিক ও সামরিক সিদ্ধান্তের মূল ভিত্তি। রাসুলুল্লাহ সা. তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপে তথ্য সংগ্রহ, যাচাই-বাছাই এবং তার ওপর ভিত্তি করে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। সমকালীন আরবের বিশৃঙ্খল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যেখানে গুজব এবং মিথ্যা তথ্যের ছড়াছড়ি ছিল, সেখানে একটি নির্ভরযোগ্য তথ্য সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা ছিল অত্যন্ত দুরূহ কাজ। রাসুলুল্লাহ সা. অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে বিশ্বস্ত সাহাবিগণের মাধ্যমে এই তথ্য নেটওয়ার্ক পরিচালনা করতেন [2] ।
ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মদিনার ইসলামি রাষ্ট্রের গোয়েন্দা তৎপরতা ছিল মূলত প্রতিরক্ষামূলক এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার অনুকূল। শত্রুর গতিবিধি আগে থেকেই জেনে নেওয়ার ফলে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ এড়ানো এবং ন্যূনতম ক্ষয়ক্ষতিতে শান্তি চুক্তি বা কৌশলগত বিজয় অর্জন করা সম্ভব হয়েছিল। এই ব্যবস্থার যৌক্তিকতা কেবল সামরিক বিজয়ের মাপকাঠিতে নয়, বরং একটি টেকসই রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও প্রমাণিত হয়েছে [3] ।
রাসুলুল্লাহ সা.-এর এই কর্মপদ্ধতি প্রমাণ করে যে, ইসলামে 'তাওয়াক্কুল' বা আল্লাহর ওপর ভরসা করার অর্থ এই নয় যে, বাস্তবসম্মত উপায়-উপকরণ ও কৌশল বর্জন করতে হবে। বরং সর্বোচ্চ বৈজ্ঞানিক ও কৌশলগত প্রচেষ্টা গ্রহণের পর ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর নির্ভর করাই হলো প্রকৃত তাওয়াক্কুল। গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো এই চিরন্তন সত্যেরই বাস্তব প্রতিফলন [4] ।
২. তাহাসসুস ও তাজাসসুস: ভাষাতাত্ত্বিক ও ফিকহী বিশ্লেষণ
ইসলামি আইনশাস্ত্র এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নীতিতে তথ্য সংগ্রহের দুটি ভিন্ন রূপ পরিদৃষ্ট হয়, যা ভাষাতাত্ত্বিকভাবে 'তাহাসসুস' (التحسس) এবং 'তাজাসসুস' (التجسس) নামে পরিচিত। সাধারণ দৃষ্টিতে এই দুটি শব্দকে সমার্থক মনে হলেও ইসলামি ফিকহ এবং ধ্রুপদী আরবি অভিধানে এদের মধ্যে সূক্ষ্ম ও গভীর পার্থক্য বিদ্যমান। এই পার্থক্যের ওপর ভিত্তি করেই ইসলামি রাষ্ট্রে গোয়েন্দা বৃত্তির বৈধতা ও সীমানা নির্ধারিত হয়েছে। প্রখ্যাত ভাষাবিদ ও সীরাত গবেষক আবু আল-কাসিম আল-সুহাইলি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'আল-রওদ আল-উনুফ'-এ এই পার্থক্যের চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন:
অর্থাৎ, "হা (ح) বর্ণযোগে 'তাহাসসুস' হলো নিজেই কোনো সংবাদ বা তথ্য শোনার চেষ্টা করা, আর জীম (ج) বর্ণযোগে 'তাজাসসুস' হলো অন্যের মাধ্যমে কোনো গোপন বিষয়ের অনুসন্ধান করা বা গোয়েন্দাগিরি করা।" [5] ।
ইসলামি শরীয়তের পরিভাষায়, 'তাজাসসুস' সাধারণত নেতিবাচক অর্থে ব্যবহৃত হয়, যা কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বা দোষত্রুটি খোঁজার সাথে সম্পর্কিত। পবিত্র কুরআনে এই ধরনের অনধিকার চর্চাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে [6] । পক্ষান্তরে, 'তাহাসসুস' বা রাষ্ট্রীয় ও সামরিক প্রয়োজনে শত্রুর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তথ্য সংগ্রহ করা কেবল বৈধই নয়, বরং তা রাষ্ট্রীয় কর্তব্যের অন্তর্ভুক্ত। ইমাম কুরতুবী তাঁর তাফসীরে উল্লেখ করেছেন যে, যখন কোনো মুসলিম রাষ্ট্র বহিঃশত্রুর আক্রমণের ঝুঁকিতে থাকে, তখন শত্রুর শক্তি ও পরিকল্পনা জানার জন্য তথ্য সংগ্রহ করা ওয়াজিব বা আবশ্যিক দায়িত্বে পরিণত হয় [7] ।
রাসুলুল্লাহ সা. তাঁর রাষ্ট্রীয় ও সামরিক নীতিতে এই দুইয়ের মধ্যে স্পষ্ট সীমারেখা টেনে দিয়েছিলেন। তিনি একদিকে যেমন মদিনার নাগরিকদের ব্যক্তিগত জীবনকে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ ও গুপ্তচরবৃত্তি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত রেখেছিলেন, অন্যদিকে তেমনি রাষ্ট্রের সীমান্ত রক্ষা এবং কুরাইশ ও তাদের মিত্রদের ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করতে 'তাহাসসুস' বা কৌশলগত গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করেছিলেন [8] । এই ভারসাম্যপূর্ণ নীতিই ইসলামি রাষ্ট্রকে একটি কল্যাণকামী ও একই সাথে সুরক্ষিত রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল।
৩. বদর যুদ্ধ: কৌশলগত গোয়েন্দা অভিযান ও তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ
দ্বিতীয় হিজরিতে সংঘটিত বদরের যুদ্ধ ছিল মদিনা রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার প্রথম বড় পরীক্ষা। এই যুদ্ধে রাসুলুল্লাহ সা. গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং তার যৌক্তিক বিশ্লেষণের যে অনন্য নজির স্থাপন করেছিলেন, তা আধুনিক সামরিক বিজ্ঞানীদেরও বিস্মিত করে। কুরাইশদের বাণিজ্যিক কাফেলার গতিপথ এবং তাদের সামরিক শক্তির সঠিক তথ্য পাওয়ার জন্য রাসুলুল্লাহ সা. নিজেই আলি রা., যুবায়র রা. এবং সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রা.-এর নেতৃত্বে একটি বিশেষ টহল দল বদরের কূপের দিকে প্রেরণ করেন [9] ।
এই টহল দল কুরাইশ বাহিনীর পানি সরবরাহকারী দুজন গোলামকে আটক করে রাসুলুল্লাহ সা.-এর দরবারে নিয়ে আসে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা কুরাইশদের সঠিক সংখ্যা বলতে পারছিল না। তখন রাসুলুল্লাহ সা. তাঁর অসাধারণ বিশ্লেষণাত্মক বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগ করলেন। তিনি তাদের জিজ্ঞেস করলেন, "তারা প্রতিদিন কয়টি করে উট জবাই করে?" গোলামরা উত্তর দিল, "কোনো দিন নয়টি, কোনো দিন দশটি।" এই তথ্য শোনামাত্রই রাসুলুল্লাহ সা. তাৎক্ষণিকভাবে শত্রুর সংখ্যা অনুমান করে বললেন, "তাহলে তাদের সৈন্য সংখ্যা নয়শত থেকে এক হাজারের মধ্যে।" [10] ।
এই তথ্যটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত গোয়েন্দা তথ্য (Strategic Intelligence)। এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই রাসুলুল্লাহ সা. বুঝতে পেরেছিলেন যে, এটি কেবল একটি বাণিজ্যিক কাফেলার মুখোমুখি হওয়া নয়, বরং মক্কার সুসজ্জিত নিয়মিত বাহিনীর বিরুদ্ধে একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ। এই যৌক্তিক বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করেই তিনি সাহাবিগণের সাথে পরামর্শ (শূরা) করেন এবং আনসার ও মুহাজিরদের সমন্বয়ে যুদ্ধের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন [11] ।
যদি এই সঠিক গোয়েন্দা তথ্যটি সময়মতো না পাওয়া যেত, তবে মুসলিম বাহিনী হয়তো অসতর্ক অবস্থায় মক্কার বিশাল বাহিনীর মুখোমুখি হতো, যা নবজাতক ইসলামি রাষ্ট্রের জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে আনতে পারত। অতএব, বদরের যুদ্ধে গোয়েন্দা তথ্যের যৌক্তিক বিশ্লেষণ ও তার ভিত্তিতে গৃহীত সিদ্ধান্ত ছিল মুসলিমদের বিজয়ের অন্যতম প্রধান চাবিকাঠি।
৪. উহুদ ও খন্দক যুদ্ধ: আগাম তথ্য সংগ্রহ ও প্রতিরক্ষামূলক কৌশল
উহুদ ও খন্দকের যুদ্ধে মদিনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাসুলুল্লাহ সা. আগাম তথ্য সংগ্রহ বা 'আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম' (Early Warning System) অত্যন্ত সফলভাবে ব্যবহার করেছিলেন। উহুদ যুদ্ধের পূর্বে মক্কায় অবস্থানরত রাসুলুল্লাহ সা.-এর চাচা আব্বাস রা. (যিনি মক্কায় মুসলিমদের গোপন তথ্যসূত্র বা 'ইনফরমার' হিসেবে কাজ করছিলেন) কুরাইশদের যুদ্ধপ্রস্তুতি ও মদিনা আক্রমণের পরিকল্পনার কথা বিস্তারিত লিখে একটি গোপন চিঠি পাঠান [12] ।
চিঠিটি পাওয়ার পর রাসুলুল্লাহ সা. তা অত্যন্ত গোপন রাখেন এবং বিশ্বস্ত সাহাবি উবাই ইবনে কা'ব রা.-কে দিয়ে তা পাঠ করান। তথ্যের সত্যতা যাচাই করার জন্য তিনি অবিলম্বে আনাস ও মুনিস রা. নামক দুই সাহাবিকে মদিনার বাইরে কুরাইশদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে পাঠান। তারা ফিরে এসে নিশ্চিত করেন যে, কুরাইশ বাহিনী মদিনার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে এবং তাদের ঘোড়াগুলো চারণভূমিতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে [13] । এই আগাম তথ্যের ভিত্তিতেই রাসুলুল্লাহ সা. মদিনার প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন এবং উহুদ পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
অনুরূপভাবে, পঞ্চম হিজরিতে খন্দকের (আহযাব) যুদ্ধে যখন আরবের সমস্ত পৌত্তলিক গোত্র ও ইহুদিরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে মদিনা অবরোধ করে, তখন চরম সংকটময় মুহূর্তে রাসুলুল্লাহ সা. গোয়েন্দা তথ্যের ওপর নির্ভর করেছিলেন। অবরোধের শেষ দিকে তীব্র শীত ও ঝড়ের রাতে তিনি হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান রা.-কে শত্রুর শিবিরে অনুপ্রবেশ করার নির্দেশ দেন। হুযায়ফা রা. অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে কুরাইশ ও তাদের মিত্রদের শিবিরে প্রবেশ করেন এবং তাদের চরম হতাশা, খাদ্য সংকট এবং আবু সুফিয়ানের পিছু হটার সিদ্ধান্তের কথা সচক্ষে দেখে এসে রাসুলুল্লাহ সা.-কে অবহিত করেন [14] ।
এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই রাসুলুল্লাহ সা. নিশ্চিত হন যে, শত্রুর মনোবল ভেঙে গেছে এবং অবরোধের অবসান ঘটতে চলেছে। এই সঠিক ও সময়োপযোগী তথ্য মুসলিম বাহিনীকে চরম মানসিক স্বস্তি প্রদান করে এবং পরবর্তী কৌশল নির্ধারণে সহায়তা করে।
৫. হুদায়বিয়া ও মক্কা বিজয়: গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ভূ-রাজনৈতিক বিজয়
ষষ্ঠ হিজরিতে হুদায়বিয়ার সন্ধি এবং অষ্টম হিজরিতে মক্কা বিজয়ের ঘটনাপ্রবাহে রাসুলুল্লাহ সা.-এর গোয়েন্দা ও তথ্য বিশ্লেষণ ক্ষমতা এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছিল। হুদায়বিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রার সময় কুরাইশদের মনোভাব ও সামরিক প্রস্তুতি জানার জন্য তিনি খুযাআ গোত্রের বুসর ইবনে সুফিয়ান রা.-কে গোয়েন্দা হিসেবে মক্কার দিকে প্রেরণ করেন। বুসর রা. উসফান নামক স্থানে রাসুলুল্লাহ সা.-এর সাথে সাক্ষাৎ করে জানান যে, কুরাইশরা খালিদ বিন ওয়ালিদের নেতৃত্বে একটি অগ্রবর্তী বাহিনী প্রেরণ করেছে এবং তারা মুসলিমদের মক্কায় প্রবেশ করতে না দেওয়ার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ [15] ।
এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে রাসুলুল্লাহ সা. মূল রাস্তা পরিহার করে একটি দুর্গম ও পাহাড়ি পথ দিয়ে হুদায়বিয়ায় পৌঁছানোর সিদ্ধান্ত নেন, যার ফলে খালিদ বিন ওয়ালিদের বাহিনীর সাথে অহেতুক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এড়ানো সম্ভব হয়। এটি ছিল একটি অত্যন্ত যৌক্তিক ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত, যা পরবর্তীতে হুদায়বিয়ার ঐতিহাসিক সন্ধির পথ সুগম করেছিল।
মক্কা বিজয়ের প্রাক্কালে রাসুলুল্লাহ সা. তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষার ক্ষেত্রে কঠোরতম নীতি অবলম্বন করেছিলেন। তিনি মদিনা থেকে মক্কার দিকে সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন, যাতে মক্কা অভিযানের খবর কুরাইশদের কাছে না পৌঁছায়। এই সময় সাহাবি হাতিব ইবনে আবী বালতাআ রা. মক্কায় তাঁর পরিবারের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে কুরাইশদের কাছে রাসুলুল্লাহ সা.-এর অভিযানের খবর জানিয়ে একটি গোপন চিঠি পাঠান [16] ।
ওহীর মাধ্যমে এই বিশ্বাসঘাতকতার খবর জানার পর রাসুলুল্লাহ সা. অবিলম্বে আলি রা., যুবায়র রা. এবং মিকদাদ রা.-কে প্রেরণ করেন এবং 'রওদাতু খাক' নামক স্থানে সেই নারী বাহককে আটক করে চিঠিটি উদ্ধার করেন [17] । এই সফল কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স (Counter-Intelligence) অভিযানের ফলে মক্কা অভিযানের গোপনীয়তা সম্পূর্ণ বজায় থাকে। ফলস্বরূপ, মুসলিম বাহিনী যখন হঠাৎ করে মক্কায় প্রবেশ করে, তখন কুরাইশদের প্রতিরোধ গড়ে তোলার কোনো সুযোগই ছিল না। ফলে প্রায় বিনা রক্তপাতে মক্কা বিজয়ের মতো এক মহান ভূ-রাজনৈতিক সাফল্য অর্জিত হয়।
৬. আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সামরিক কৌশলের আলোকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা
আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সামরিক কৌশল এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আলোকে রাসুলুল্লাহ সা.-এর গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলোর যৌক্তিকতা বিশ্লেষণ করলে এর গভীরতা ও কার্যকারিতা স্পষ্টভাবে অনুধাবন করা যায়। আধুনিক সামরিক তত্ত্বের জনক সান জু (Sun Tzu) তাঁর বিখ্যাত 'দ্য আর্ট অব ওয়ার' (The Art of War) গ্রন্থে লিখেছেন:
"If you know the enemy and know yourself, you need not fear the result of a hundred battles."
অর্থাৎ, "তুমি যদি শত্রু এবং নিজেকে সঠিকভাবে চেনো, তবে শত যুদ্ধের ফলাফল নিয়েও তোমার ভয় পাওয়ার কিছু নেই।" [18] । রাসুলুল্লাহ সা. চৌদ্দশত বছর পূর্বেই এই তত্ত্বের বাস্তব প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন।
আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় একে বলা হয় 'কৌশলগত প্রতিবন্ধকতা' (Strategic Deterrence) এবং 'তথ্য যুদ্ধ' (Information Warfare)। রাসুলুল্লাহ সা. কেবল শত্রুর তথ্য সংগ্রহই করতেন না, বরং শত্রুর কাছে নিজের তথ্য গোপন রাখার ক্ষেত্রেও সমান পারদর্শী ছিলেন। মক্কা বিজয়ের সময় তাঁর এই কৌশল শত্রুকে মানসিকভাবে পঙ্গু করে দিয়েছিল, যা আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের (Psychological Warfare) একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ [19] ।
এছাড়াও, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে রাসুলুল্লাহ সা. যে সমস্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তা সর্বদা 'ন্যূনতম ক্ষয়ক্ষতি ও সর্বোচ্চ অর্জন' (Minimum Casualty, Maximum Gain) নীতি দ্বারা পরিচালিত হতো। তিনি কখনোই অন্ধ আবেগের বশবর্তী হয়ে বা অপরীক্ষিত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কোনো সামরিক অভিযান পরিচালনা করেননি। প্রতিটি অভিযানের পূর্বে শত্রুর ভৌগোলিক অবস্থান, জনবল, অস্ত্রশস্ত্র এবং মিত্রদের সম্পর্কে নিখুঁত তথ্য সংগ্রহ করা হতো, যা আধুনিক সামরিক পরিভাষায় 'থ্রেট অ্যাসেসমেন্ট' (Threat Assessment) বা ঝুঁকি নিরূপণ নামে পরিচিত [20] ।
৭. ইসলামি গোয়েন্দাবৃত্তির নৈতিক সীমারেখা ও নাগরিক অধিকার
ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থায় গোয়েন্দা তৎপরতার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর নৈতিক সীমারেখা। আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রগুলোতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো প্রায়শই নিজস্ব নাগরিকদের ব্যক্তিগত জীবন, গোপনীয়তা এবং মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করে থাকে। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সা. প্রতিষ্ঠিত গোয়েন্দা ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য ছিল কেবল বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে রাষ্ট্রকে রক্ষা করা এবং অভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা; নাগরিকদের ব্যক্তিগত দোষত্রুটি বা গোপনীয়তা অন্বেষণ করা নয়। পবিত্র কুরআনে স্পষ্ট ঘোষণা করা হয়েছে:
অর্থ: "হে মুমিনগণ! তোমরা বহুবিধ ধারণা থেকে বেঁচে থাকো; কারণ কোনো কোনো ধারণা পাপ এবং তোমরা একে অপরের গোপনীয় বিষয় অনুসন্ধান করো না।" [21] ।
এই আয়াতের আলোকে ইসলামি ফিকহবিদগণ একমত হয়েছেন যে, সাধারণ নাগরিকদের ব্যক্তিগত জীবন ও গোপনীয়তা রক্ষা করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। রাসুলুল্লাহ সা. নিজেও ইরশাদ করেছেন, "তুমি যদি মানুষের গোপন ত্রুটি অনুসন্ধান করতে লাগো, তবে তুমি তাদের ধ্বংস করে দেবে।" [22] ।
অতএব, ইসলামি রাষ্ট্রে গোয়েন্দা তৎপরতার যৌক্তিকতা কেবল তখনই স্বীকৃত, যখন তা জাতীয় নিরাপত্তা, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং ষড়যন্ত্রকারীদের দমন করার জন্য অপরিহার্য হয় [23] । এই নৈতিক সীমারেখা বজায় রাখার ফলেই মদিনার ইসলামি সমাজ ছিল একই সাথে নিরাপদ এবং নাগরিকদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার গ্যারান্টিযুক্ত এক অনন্য আদর্শ রাষ্ট্র। গোয়েন্দা তথ্যের এই নৈতিক ও যৌক্তিক ব্যবহারই রাসুলুল্লাহ সা.-এর রাষ্ট্রনায়কোচিত দূরদর্শিতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।