৯.২.১ প্রাচীন কালের ইন্টেলিজেন্স গ্যাদারিং এবং বর্তমানের সাথে তুলনা
প্রাচীন সভ্যতায় তথ্য সংগ্রহ ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট (Geopolitical Context and Intelligence in Ancient Civilizations)
মানব সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকেই রাষ্ট্র ও সাম্রাজ্যের অস্তিত্ব রক্ষার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ বা 'ইন্টেলিজেন্স গ্যাদারিং' (Intelligence Gathering) ব্যবহৃত হয়ে আসছে। প্রাচীন মেসোপটেমিয়া, মিশর এবং সিন্ধু সভ্যতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সামরিক অভিযান পরিচালনা এবং অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমনের জন্য শাসকেরা সুসংগঠিত তথ্য সংগ্রহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতেন। উদাহরণস্বরূপ, প্রাচীন সুমেরীয় নগর-রাষ্ট্র লাগাশ (Lagash) এবং উম্মা (Umma)-এর মধ্যকার ঐতিহাসিক দ্বন্দ্বের কথা উল্লেখ করা যায়। উম্মা-এর উচ্চাভিলাষী শাসক লুগাল-জাগেসি (Lugal-zagesi) যখন লাগাশ আক্রমণ করেন, তখন তিনি লাগাশের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা এবং তাদের শান্তিবাদী জীবনযাত্রার সুযোগ নিয়েছিলেন, যা সুপরিকল্পিত সামরিক গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতেই সম্ভব হয়েছিল [1] । প্রাচীনকালের এই তথ্য সংগ্রহ প্রক্রিয়া মূলত মানবিয় উৎস বা হিউম্যান ইন্টেলিজেন্স (HUMINT)-এর ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হতো, যেখানে গুপ্তচর, দূত এবং বণিকেরা প্রধান ভূমিকা পালন করতেন।
পরবর্তীকালে, ষষ্ঠ শতাব্দীতে বাইজান্টাইন এবং সাসানীয় (পারস্য) সাম্রাজ্যের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রাচীন গোয়েন্দা ব্যবস্থার বিবর্তনকে আরও ত্বরান্বিত করে। এই দুই পরাশক্তি একে অপরের সামরিক শক্তি, অর্থনৈতিক অবস্থা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পর্যবেক্ষণ করার জন্য বিশাল গুপ্তচর নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিল। তবে এই সাম্রাজ্যগুলোর শেষ সময়ে তাদের গোয়েন্দা ও প্রশাসনিক কাঠামোতে চরম স্থবিরতা নেমে আসে। বিখ্যাত ব্রিটিশ ঐতিহাসিক এইচ. জি. ওয়েলস (H.G. Wells) তাঁর 'এ শর্ট হিস্ট্রি অব দ্য ওয়ার্ল্ড' গ্রন্থে তৎকালীন পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্যের এই ক্ষয়িষ্ণু ও পতনোন্মুখ অবস্থার বিবরণ দিয়ে লিখেছেন যে, এই দুই শাসনব্যবস্থার অধীনে বিজ্ঞান, দর্শন ও রাজনীতি তখন প্রায় মৃতপ্রায় এবং তাদের চিন্তাশক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল
[H.G. Wells,
A Short History of the World
(London, 1924), pp. 140-141; উদ্ধৃত, আবুল হাসান আলি নদভী,
সীরাতে নববী, পৃ. ৪২-৪৩; এবং الجامع الصحيح للسيرة النبوية: ২/২৮০]। এই বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক পতন তাদের গোয়েন্দা ব্যবস্থার কার্যকারিতাকেও পঙ্গু করে দিয়েছিল, যার ফলে তারা উদীয়মান নতুন ভূ-রাজনৈতিক শক্তিগুলোর উত্থান সঠিকভাবে অনুমান করতে ব্যর্থ হয়।
প্রাচীন যুগের এই গোয়েন্দা ব্যবস্থার সাথে আধুনিক যুগের ভূ-রাজনৈতিক তথ্য সংগ্রহের মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। প্রাচীনকালে তথ্য সংগ্রহের গতি ছিল ধীর এবং তা মূলত একক ব্যক্তির বিশ্বস্ততা ও শারীরিক দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল ছিল। পক্ষান্তরে, বর্তমান যুগে তথ্য সংগ্রহ কেবল ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা মহাকাশীয় উপগ্রহ, সাইবার নেটওয়ার্ক এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সমন্বয়ে এক জটিল বৈশ্বিক রূপ ধারণ করেছে। প্রাচীনকালের গোয়েন্দাবৃত্তি যেখানে ছিল মূলত যুদ্ধকেন্দ্রিক ও তাৎক্ষণিক কৌশলগত সুবিধা অর্জনের হাতিয়ার, আধুনিক যুগে তা পরিণত হয়েছে একটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় নিরাপত্তা নীতি এবং সমষ্টিগত নিরাপত্তা (Collective Security) নিশ্চিতকরণের অবিচ্ছেদ্য অংশে।
ইসলামি নিরাপত্তা দর্শনে গোয়েন্দাবৃত্তি ও এর শ্রেণিবিন্যাস (Intelligence and Security Classifications in Islamic Doctrine)
ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থার উন্মেষের সাথে সাথে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং জাতীয় নিরাপত্তার ধারণাটি একটি সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক ও নৈতিক রূপ লাভ করে। রাসুলুল্লাহ সা. মদিনা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই শত্রুভাবাপন্ন কুরাইশ এবং অন্যান্য গোত্রের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য একটি অত্যন্ত কার্যকর ও গতিশীল গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। ইসলামি নিরাপত্তা দর্শনে গোয়েন্দাবৃত্তিকে কেবল আগ্রাসনের হাতিয়ার হিসেবে দেখা হয়নি, বরং একে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, অভ্যন্তরীণ শান্তি বজায় রাখা এবং সম্ভাব্য বহিরাগত আক্রমণ প্রতিহত করার একটি প্রতিরক্ষামূলক কৌশল হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। ইসলামি পরিভাষায় একে 'আমলিয়াতুল আমন' (Security Operations) এবং 'ইস্তিখবারাত' (Intelligence) হিসেবে অভিহিত করা হয়, যা আধুনিক প্রতি-গোয়েন্দাবৃত্তি (Counter-Intelligence) এবং প্রতিরক্ষামূলক নিরাপত্তার সাথে হুবহু মিলে যায়।
ইসলামি নিরাপত্তা বিশ্বকোষে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষার এই প্রক্রিয়াকে অত্যন্ত চমৎকারভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে:
অনুবাদ:
"এটি হলো এমন কিছু পদক্ষেপের সমষ্টি যা রাষ্ট্র বা সংগঠন তার নিরাপত্তা অর্জন, গোপনীয়তা রক্ষা এবং শত্রুভাবাপন্ন সক্রিয় গোয়েন্দা তৎপরতার বিরুদ্ধে নিজের অস্তিত্ব ও স্থাপনাগুলোকে সুরক্ষিত রাখার উদ্দেশ্যে গ্রহণ করে থাকে।" [2] । এই সংজ্ঞা থেকে স্পষ্ট হয় যে, ইসলামি নিরাপত্তা দর্শনে গোয়েন্দা তথ্যের মূল লক্ষ্য ছিল শত্রুর 'অ্যাক্টিভ ইন্টেলিজেন্স' বা সক্রিয় গোয়েন্দা তৎপরতাকে নস্যাৎ করে দেওয়া, যা আধুনিক পরিভাষায় 'কাউন্টার-এস্পিওনাজ' (Counter-Espionage) নামে পরিচিত।
প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় অন্যান্য সাম্রাজ্যের গোয়েন্দা ব্যবস্থার সাথে ইসলামের এই ব্যবস্থার একটি বড় পার্থক্য ছিল এর নৈতিক ও আইনি কাঠামো। রোমান বা পারস্য সাম্রাজ্যে গোয়েন্দারা যেকোনো উপায়ে তথ্য সংগ্রহের জন্য চরম নিষ্ঠুরতা ও অনৈতিকতার আশ্রয় নিতে পারত। কিন্তু ইসলামি গোয়েন্দা ব্যবস্থায় তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রেও শরিয়তের সীমানা এবং মানবিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা বাধ্যতামূলক ছিল। রাসুলুল্লাহ সা. এবং পরবর্তীকালে খুলাফায়ে রাশেদিনের যুগে গোয়েন্দা তৎপরতা পরিচালনার সময় নিরপরাধ বেসামরিক জনগণের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন না করার ব্যাপারে কঠোর নির্দেশনা ছিল, যতক্ষণ না তা রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবে প্রমাণিত হয় [3] । এই ভারসাম্যপূর্ণ নীতিটিই ইসলামি গোয়েন্দা ব্যবস্থাকে সমকালীন অন্যান্য ব্যবস্থার চেয়ে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছিল।
গোয়েন্দা কর্মকর্তার গুণাবলি ও মনস্তাত্ত্বিক যোগ্যতা: প্রাচীন বনাম আধুনিক মানদণ্ড
একটি সফল গোয়েন্দা অভিযানের মূল চাবিকাঠি হলো মাঠপর্যায়ে নিয়োজিত গোয়েন্দা কর্মকর্তার (Intelligence Officer) ব্যক্তিগত যোগ্যতা, মনস্তাত্ত্বিক দৃঢ়তা এবং নৈতিক সততা। প্রাচীনকাল থেকেই গোয়েন্দা নিয়োগের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোর মানদণ্ড অনুসরণ করা হতো। ইসলামি গোয়েন্দা ইতিহাসে একজন আদর্শ গোয়েন্দা কর্মকর্তার জন্য নৈতিক চরিত্র এবং মানসিক দৃঢ়তাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কারণ, একজন অনৈতিক বা লোভী গোয়েন্দা সহজেই শত্রুপক্ষের প্রলোভন বা ব্ল্যাকমেইলের শিকার হয়ে দ্বিমুখী এজেন্টে (Double Agent) পরিণত হতে পারে, যা সমগ্র রাষ্ট্রের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
ইসলামি নিরাপত্তা তত্ত্বে একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তার আবশ্যকীয় গুণাবলি সম্পর্কে বলা হয়েছে:
অনুবাদ:
"উত্তম চরিত্র, জাগ্রত বিবেক, সততা এবং নিষ্কলঙ্কতা; যাতে অন্যরা তাকে বিশ্বাস করতে পারে এবং সে তার সামনে আসা অসংখ্য প্রলোভনের মুখে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে।" [4] । এই গুণাবলি কেবল ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেই গুরুত্বপূর্ণ ছিল না, বরং তা ছিল একটি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। একজন গোয়েন্দা যখন শত্রুর সীমানায় প্রবেশ করে, তখন তাকে অর্থ, নারী এবং ক্ষমতার মতো নানাবিধ প্রলোভনের মুখোমুখি হতে হয়। কেবল সুদৃঢ় নৈতিক চরিত্র ও আদর্শিক দায়বদ্ধতাই তাকে এই ফাঁদ থেকে রক্ষা করতে পারে।
আধুনিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলো (যেমন সিআইএ, এমআইসিক্স বা মোসাদ) তাদের কর্মকর্তাদের নিয়োগের সময় অত্যন্ত জটিল মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা, ব্যাকগ্রাউন্ড চেক এবং পলিগ্রাফ টেস্টের মধ্য দিয়ে নিয়ে যায়। আধুনিক গোয়েন্দা বিজ্ঞানের ইতিহাসে দেখা গেছে, বহু দক্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তা কেবল নৈতিক স্খলন বা আর্থিক লোভের কারণে নিজের দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন, যার বিবরণ পশ্চিমা গোয়েন্দা ইতিহাসেও পাওয়া যায় [5] । প্রাচীন ইসলামি গোয়েন্দা নিয়োগের এই আধ্যাত্মিক ও নৈতিক ফিল্টারিং ব্যবস্থাটি আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক স্ক্রিনিংয়ের চেয়েও অনেক ক্ষেত্রে বেশি কার্যকর ছিল, কারণ এটি ব্যক্তির অন্তরে এক ধরনের স্বয়ংক্রিয় জবাবদিহিতা তৈরি করত, যা বাহ্যিক কোনো প্রযুক্তি বা আইন দিয়ে তৈরি করা সম্ভব নয়।
গোয়েন্দা কার্যক্রমে নারীর ভূমিকা: একটি ঐতিহাসিক ও তুলনামূলক বিশ্লেষণ
গোয়েন্দা তথ্যের ইতিহাসে নারীদের অংশগ্রহণ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল অধ্যায়। প্রাচীনকাল থেকেই নারীরা তাদের সহজাত পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এবং পুরুষশাসিত সমাজে সহজে অলক্ষিত থাকার যোগ্যতার কারণে গোয়েন্দা কার্যক্রমে অত্যন্ত সফলভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছেন। ইসলামি গোয়েন্দা ইতিহাসেও নারীদের এই কৌশলগত ভূমিকার অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল এবং মর্যাদাপূর্ণ নজির রয়েছে। তবে পশ্চিমা বা ধর্মনিরপেক্ষ গোয়েন্দা ব্যবস্থার মতো ইসলামে নারীদের অনৈতিক বা সম্মানহানিকর কাজে ব্যবহার করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিল।
ইসলামি ইতিহাসে নারীর গোয়েন্দা ভূমিকার ওপর আলোকপাত করে গবেষকেরা লিখেছেন যে, এটি মুসলিম উম্মাহর অস্তিত্ব রক্ষার অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের প্রমাণ বহন করে [6] । মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের সময় আসমা বিনতে আবি বকর রা.-এর ভূমিকা ছিল মূলত একটি উচ্চমানের গোয়েন্দা ও লজিস্টিক অপারেশন। তিনি কুরাইশদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে রাসুলুল্লাহ সা. এবং আবু বকর রা.-এর কাছে অত্যন্ত গোপনে তথ্য ও খাদ্য পৌঁছে দিতেন। একইভাবে, মদিনার অভ্যন্তরীণ মুনাফিক এবং ইহুদি গোত্রগুলোর ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করার জন্য মুসলিম নারীরা তাদের পারিবারিক ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করতেন, যা রাসুলুল্লাহ সা.-এর কাছে পৌঁছানো হতো [7] ।
আধুনিক যুগে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নারীদের ব্যাপকভাবে ব্যবহার করে থাকে, যা অনেক সময় 'হানি ট্র্যাপ' (Honey Trap) বা অনৈতিক ফাঁদ পাতার মতো বিতর্কিত কৌশলে রূপ নেয়। কিন্তু ইসলামি গোয়েন্দা দর্শনে নারীর মর্যাদা ও শরিয়তের বিধান অক্ষুণ্ণ রেখে কেবল তাদের বুদ্ধিমত্তা, বিশ্বস্ততা এবং সামাজিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হতো। আধুনিক গোয়েন্দা তত্ত্বে জেন্ডার ডাইভারসিটি বা লিঙ্গ বৈচিত্র্যের যে গুরুত্ব দেওয়া হয়, ইসলাম আজ থেকে চৌদ্দশত বছর আগেই অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও মর্যাদাপূর্ণ উপায়ে তার সফল প্রয়োগ ঘটিয়েছিল, যা সমকালীন সামরিক ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে [8] ।
প্রাচীন ও আধুনিক গোয়েন্দা পদ্ধতির তুলনামূলক রূপরেখা (Comparative Framework of Ancient and Modern Intelligence Methodologies)
প্রাচীন ও আধুনিক গোয়েন্দা পদ্ধতির মধ্যে প্রযুক্তির দিক থেকে বিশাল ব্যবধান থাকলেও তাদের মূল লক্ষ্য ও মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি অপরিবর্তিত রয়েছে। প্রাচীনকালে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের প্রধান উৎস ছিল 'আইন' বা স্কাউট (Scouts), যারা শত্রুর সীমানায় সশরীরে প্রবেশ করে তাদের সৈন্যসংখ্যা, রসদ এবং যুদ্ধপ্রস্তুতি পর্যবেক্ষণ করত। রাসুলুল্লাহ সা. বদর, উহুদ এবং খন্দকের যুদ্ধের পূর্বে এই ধরনের স্কাউট পাঠিয়ে শত্রুর অবস্থান ও গতিপথের নিখুঁত তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন, যা তৎকালীন যুদ্ধকৌশলে অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়েছিল [9] । এই পদ্ধতিটি সম্পূর্ণভাবে হিউম্যান ইন্টেলিজেন্স (HUMINT)-এর ওপর নির্ভরশীল ছিল, যেখানে তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য তথ্যদাতার সততা ও বুদ্ধিমত্তাই ছিল একমাত্র ভরসা।
বর্তমান একবিংশ শতাব্দীতে গোয়েন্দা প্রযুক্তির অভূতপূর্ব উন্নয়ন ঘটেছে। এখন আর কেবল মানুষের ওপর নির্ভর করতে হয় না; বরং সংকেতভিত্তিক গোয়েন্দা তথ্য বা সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স (SIGINT), উপগ্রহ চিত্রের মাধ্যমে প্রাপ্ত ইমেজারি ইন্টেলিজেন্স (IMINT) এবং উন্মুক্ত উৎসের তথ্য বা ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স (OSINT) আধুনিক গোয়েন্দা ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এই প্রযুক্তিগত আধিপত্যের যুগেও হিউম্যান ইন্টেলিজেন্স বা মানুষের মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্যের গুরুত্ব বিন্দুমাত্র কমেনি। কারণ, প্রযুক্তি কেবল তথ্য দিতে পারে, কিন্তু শত্রুর মনের উদ্দেশ্য বা মনস্তাত্ত্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করতে পারে না। এই বিশ্লেষণটি করার জন্য আজও প্রাচীনকালের মতোই দক্ষ ও তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন মানব এজেন্টের প্রয়োজন হয়।
তদুপরি, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর গোয়েন্দা ব্যবস্থা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং বিভ্রান্তিকর তথ্যের (Disinformation) শিকার হতে পারে। সাইবার যুদ্ধ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তৈরি ভুয়া তথ্য অনেক সময় বড় বড় গোয়েন্দা সংস্থাকে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে। এই ধরনের পরিস্থিতিতে তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের যে কঠোর পদ্ধতি ইসলামি ঐতিহ্যে রয়েছে—যেমন রাবীদের নির্ভরযোগ্যতা যাচাই বা 'জারহ ওয়া তাদিল'-এর মূলনীতি—তা আধুনিক গোয়েন্দা বিশ্লেষকদের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পাঠ হতে পারে [10] । প্রাচীনকালের সেই সততা ও যাচাই-বাছাইয়ের কঠোর নিয়ম এবং আধুনিক যুগের উন্নত প্রযুক্তির সঠিক সমন্বয়ই কেবল একটি দেশের জাতীয় নিরাপত্তাকে সম্পূর্ণ নিশ্ছিদ্র করে তুলতে পারে।
তথ্যসূত্র ও গ্রন্থপঞ্জি:
১.
(প্রাচীন নিকট প্রাচ্য: মিশর ও ইরাক), পৃষ্ঠা: ৪০০।
২. H.G. Wells,
A Short History of the World
(London, 1924), pp. 140-141; উদ্ধৃত, আবুল হাসান আলি নদভী,
সীরাতে নববী, পৃষ্ঠা: ৪২-৪৩; এবং
(আল-জামি আল-সহীহ লিস-সীরাত আন-নাবাবিয়্যাহ), খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ২৮০।
৩.
(জিহাদ, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা বিশ্বকোষ), খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৪৭-৪৮।
৪.
(বিশ্ব নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা বিশ্বকোষ), খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৬৪।
৫.
(নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থা), পৃষ্ঠা: ২৬-২৭।
৬.
(বিশ্ব নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা বিশ্বকোষ), খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৬৪।
৭.
(ইসলামি গোয়েন্দা সংস্থায় নারীর ভূমিকা), পৃষ্ঠা: ১০৮।
৮.
(ইসলামি গোয়েন্দা সংস্থায় নারীর ভূমিকা), পৃষ্ঠা: ১০৮।
৯.
(জিহাদ, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা বিশ্বকোষ), খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৪৭।
১০.
(আল-জামি আল-সহীহ লিস-সীরাত আন-নাবাবিয়্যাহ), খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ২৮১।
১১.
(আল-জামি আল-সহীহ লিস-সীরাত আন-নাবাবিয়্যাহ), খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ২৮২।