১২.৪ রেসিজম ও ন্যাশনালিজম (Racism & Nationalism): আধুনিক আসাবিয়্যাহ বা উগ্র জাতীয়তাবাদের সাইকোলজিক্যাল ডিকনস্ট্রাকশন
মানব সভ্যতার বিবর্তনের ইতিহাসে সামাজিক সংহতি বা 'Social Cohesion' একটি অপরিহার্য উপাদান হিসেবে বিবেচিত। তবে এই সংহতি যখন একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী, জাতি বা বর্ণের সংকীর্ণ গণ্ডিতে আবদ্ধ হয়ে পড়ে এবং অন্য সকল গোষ্ঠীর প্রতি বিদ্বেষ বা শ্রেষ্ঠত্ববোধে রূপান্তরিত হয়, তখন তা 'আসাবিয়্যাহ' (Asabiyyah) বা উগ্র জাতীয়তাবাদের (Ultra-nationalism) রূপ ধারণ করে। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রেক্ষাপটে রেসিজম (Racism) বা বর্ণবাদ এবং ন্যাশনালিজম (Nationalism) বা জাতীয়তাবাদ কেবল রাজনৈতিক মতাদর্শ নয়, বরং এগুলো একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া, যা মানুষের আদিম গোষ্ঠীগত প্রবৃত্তি বা 'Tribal Instinct'-কে পুঁজি করে গড়ে ওঠে। এই অধ্যায়ে আমরা আসাবিয়্যাহর তাত্ত্বিক কাঠামো থেকে শুরু করে আধুনিক বর্ণবাদের মনস্তাত্ত্বিক ও ভূ-রাজনৈতিক (Geopolitical) ভিত্তিগুলোর একটি গভীর বিশ্লেষণ প্রদান করব।
আসাবিয়্যাহর বিবর্তন: মনস্তাত্ত্বিক বন্ধন থেকে রাজনৈতিক হাতিয়ার
প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ও সমাজবিজ্ঞানী ইবনে খালদুন তাঁর তত্ত্বে 'আসাবিয়্যাহ' শব্দটিকে একটি সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক শক্তি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। আসাবিয়্যাহ মূলত একটি গোষ্ঠীগত সংহতি বা 'Group Feeling', যা রক্ত সম্পর্ক বা নিকটাত্মীয়তার ভিত্তিতে তৈরি হয়। এই সংহতি যখন একটি প্রাথমিক পর্যায়ে থাকে, তখন এটি একটি গোষ্ঠীকে টিকে থাকতে এবং প্রতিকূল পরিবেশে নিজেদের রক্ষা করতে সাহায্য করে। তবে এই মনস্তাত্ত্বিক বন্ধন যখন একটি কাঠামোগত শক্তিতে রূপান্তরিত হয়, তখন তা রাষ্ট্র গঠন এবং সাম্রাজ্য বিস্তারের মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়।
ইবনে খালদুনীয় দর্শনে আসাবিয়্যাহর এই রূপান্তর অত্যন্ত জটিল। একটি গোষ্ঠী যখন তাদের সংহতির মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে এবং একটি রাষ্ট্র বা রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করে, তখন সেই আসাবিয়্যাহ ধীরে ধীরে শিথিল হতে শুরু করে। কারণ, ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু যখন বিলাসিতা ও স্থিতিশীলতার দিকে ঝুঁকে পড়ে, তখন সেই আদিম ও কঠোর গোষ্ঠীগত সংহতি বা 'Psychological Bond' তার কার্যকারিতা হারায়। [1] । এই বিবর্তনটি নির্দেশ করে যে, আসাবিয়্যাহ কেবল একটি সামাজিক বাস্তবতা নয়, বরং এটি একটি গতিশীল মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া যা রাজনৈতিক ক্ষমতার উত্থান ও পতনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
আধুনিক প্রেক্ষাপটে, এই আসাবিয়্যাহর ধারণাটি যখন 'Nationalism' বা জাতীয়তাবাদের ছদ্মবেশে আবির্ভূত হয়, তখন এটি আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। আধুনিক রাষ্ট্রগুলো তাদের নাগরিকদের মধ্যে একটি কৃত্রিম 'Collective Identity' বা সামষ্টিক পরিচয় তৈরি করার জন্য জাতীয়তাবাদকে ব্যবহার করে। যেখানে ইবনে খালদুনীয় আসাবিয়্যাহ ছিল মূলত টিকে থাকার একটি জৈবিক ও সামাজিক প্রয়োজন, সেখানে আধুনিক উগ্র জাতীয়তাবাদ হলো একটি রাজনৈতিক প্রকৌশল (Political Engineering), যা মানুষের মধ্যে 'Us vs. Them' বা 'আমরা বনাম তারা'—এই দ্বান্দ্বিক মানসিকতা তৈরি করে। এই মনস্তাত্ত্বিক বিভাজনটিই মূলত বর্ণবাদ ও উগ্র জাতীয়তাবাদের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
জৈবিক বর্ণবাদ ও তাত্ত্বিক ভ্রান্তি: রেনান ও গুবিনোর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ
ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে ইউরোপীয় চিন্তাবিদদের মধ্যে একটি ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত ছিল যে, মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব তার বংশগতি বা 'Biological Inheritance'-এর ওপর নির্ভরশীল। এই মতবাদটি মূলত বর্ণবাদ বা Racism-এর তাত্ত্বিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছিল। বিশেষ করে গুবিনো (Gobineau) এবং আর্নেস্ট রেনান (Ernest Renan)-এর মতো চিন্তাবিদগণ জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের এমন কিছু তত্ত্ব প্রদান করেন, যা মূলত ঔপনিবেশিক আধিপত্য বিস্তারের একটি মনস্তাত্ত্বিক হাতিয়ার ছিল।
আর্নেস্ট রেনান দাবি করেছিলেন যে, সেমিটিক (Semitic) বা Semitic জাতিগোষ্ঠীর মানুষের একটি বিশেষ মনস্তাত্ত্বিক ধরন রয়েছে, যা আর্য (Aryan) জাতির থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি দাবি করেন যে, সেমিটিক জাতিগোষ্ঠীর মানুষ মূলত আংশিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পন্ন এবং অতিপ্রাকৃত বা গায়েবীয় (Mystical) বিষয়ের প্রতি অধিক আসক্ত। তাঁর মতে, এই বৈশিষ্ট্যগুলো কোনো সামাজিক প্রভাব নয়, বরং তাদের জৈবিক বৈশিষ্ট্যের অংশ। তিনি তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেন:
রেনানের এই তত্ত্বটি ছিল অত্যন্ত কুটিল এবং এটি মূলত উনিশ শতকের ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী (Imperialist) মানসিকতার প্রতিফলন। তিনি সেমিটিক বা প্রাচ্যের জাতিগুলোকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে অনুন্নত হিসেবে চিহ্নিত করার মাধ্যমে ইউরোপীয় আর্যদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন। এই ধরনের 'Biological Determinism' বা জৈবিক নিয়তিবাদ মূলত একটি মনস্তাত্ত্বিক কৌশল ছিল, যার লক্ষ্য ছিল প্রাচ্যের মানুষের আত্মমর্যাদাবোধকে ধ্বংস করা এবং তাদের ওপর ঔপনিবেশিক শাসনকে বৈধতা দেওয়া।
তবে আধুনিক নৃবিজ্ঞান ও ইতিহাসবিদগণ এই দাবিগুলোকে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। গবেষকদের মতে, কোনো জাতির মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক বা চারিত্রিক পার্থক্য কোনো বিশুদ্ধ বা 'Pure Race' থেকে উদ্ভূত হয় না। বরং মানুষের মধ্যে যে বৈচিত্র্য দেখা যায়, তা মূলত সামাজিক পরিবেশ, ভৌগোলিক অবস্থান এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ের ফল। মানুষের মধ্যে যে মিশ্রণ বা 'Intermixing' ঘটে, তা একটি বৈশ্বিক সত্য। কোনো জাতিই সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ নয়, বরং মানবসভ্যতা হলো বিভিন্ন জাতি ও সংস্কৃতির এক অবিরাম সংমিশ্রণ। [3] । সুতরাং, রেনান বা গুবিনোর মতো চিন্তাবিদদের তত্ত্বগুলো ছিল মূলত রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য তৈরি করা একটি মনস্তাত্ত্বিক বিভ্রম।
ঔপনিবেশিক প্রকৌশল ও কৃত্রিম জাতীয়তাবাদ: আলজেরিয়ার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
বর্ণবাদ ও জাতীয়তাবাদের এই মনস্তাত্ত্বিক খেলাটি যখন বাস্তব রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়, তখন তা অত্যন্ত ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। আলজেরিয়ার ঔপনিবেশিক ইতিহাস এই কৃত্রিম পরিচয় নির্মাণের (Identity Construction) একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসকরা আলজেরিয়ার জনগণের মধ্যে ইসলামি ও আরবিয় সংহতি ভেঙে দেওয়ার জন্য 'Divide and Rule' বা 'বিভাজন ও শাসন' নীতি প্রয়োগ করেছিল। তারা বার্বার (Berber) জনগোষ্ঠীর মধ্যে একটি কৃত্রিম জাতীয়তাবাদ বা 'Berber Nationalism' তৈরির চেষ্টা করে, যাতে তারা আরব ও ইসলামি প্রভাব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
ফরাসি শাসকরা বার্বারদের মধ্যে এমন একটি ধারণা প্রচার করতে চেয়েছিল যে, তাদের মূল উৎস আর্য বা রোমান, যা তাদের ইসলামি পরিচয়ের সাথে সাংঘর্ষিক। তারা বার্বারদের মধ্যে একটি বিশেষ 'National Identity' বা জাতীয় পরিচয় তৈরি করতে চেয়েছিল যা মূলত ফরাসি সংস্কৃতির অনুগত হবে। এই প্রক্রিয়ার একটি অংশ ছিল 'Musulmans d'Etiquette' বা 'পরিচয়বাদী মুসলিম' (Muslims of Etiquette) তৈরি করা। এর উদ্দেশ্য ছিল এমন এক জনগোষ্ঠী তৈরি করা যারা নামমাত্র মুসলিম হবে কিন্তু তাদের মূল আনুগত্য থাকবে ফরাসি সংস্কৃতি ও জাতীয়তাবাদের প্রতি। [4] ।
এই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের একটি অন্যতম লক্ষ্য ছিল বার্বার ও আরবদের মধ্যে ভাষাগত ও ধর্মীয় বিভাজন তৈরি করা। ফরাসি শাসকরা বার্বারদের মধ্যে ইসলামি শিক্ষার বিস্তার রোধ করতে এবং তাদের নিজস্ব 'জাতীয় প্রথা' বা 'National Customs'-এর প্রতি আসক্ত করতে চেয়েছিল। তারা বিশ্বাস করত যে, বার্বারদের মধ্যে বিদ্যমান প্রথাগত আইন বা 'Customary Law' (العرف) ফরাসি আইনের সাথে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং এটি তাদের ইসলামি শরিয়াহ থেকে দূরে রাখতে সাহায্য করবে। তারা নির্দেশ দিয়েছিল:
এই কৌশলটি ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। তারা বার্বারদের মধ্যে একটি কৃত্রিম শ্রেষ্ঠত্ববোধ তৈরি করার চেষ্টা করেছিল যাতে তারা নিজেদের আরবদের চেয়ে আলাদা এবং উন্নত মনে করে। এই ধরনের কৃত্রিম জাতীয়তাবাদ মূলত একটি মনস্তাত্ত্বিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল, যার লক্ষ্য ছিল আলজেরিয়ার মানুষের মধ্যকার শক্তিশালী সামাজিক ও ধর্মীয় সংহতিকে (Social Cohesion) ছিন্নভিন্ন করে দেওয়া। এটি প্রমাণ করে যে, জাতীয়তাবাদ যখন একটি কৃত্রিম রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তখন তা কেবল বিভাজনই ঘটায় না, বরং একটি জাতির আত্মপরিচয়কে বিকৃত করে দেয়।
উগ্র জাতীয়তাবাদের মনস্তাত্ত্বিক বিনির্মাণ ও আধুনিক সংকট
আধুনিক বিশ্বে আমরা যে উগ্র জাতীয়তাবাদ বা 'Ultra-nationalism' প্রত্যক্ষ করছি, তা মূলত সেই প্রাচীন আসাবিয়্যাহর একটি বিকৃত ও প্রযুক্তিগত সংস্করণ। আধুনিক রাষ্ট্রগুলো যখন তাদের সীমানা রক্ষা বা রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের জন্য জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ব বা বর্ণবাদের আশ্রয় নেয়, তখন তারা আসলে মানুষের সেই আদিম গোষ্ঠীগত প্রবৃত্তিকেই উসকে দেয়। এই প্রক্রিয়াটি একটি মনস্তাত্ত্বিক চক্রের মতো কাজ করে: প্রথমে একটি 'In-group' (আমরা) এবং একটি 'Out-group' (তারা) তৈরি করা হয়, তারপর 'Out-group'-কে শত্রু বা নিম্নতর হিসেবে চিত্রিত করা হয়, এবং পরিশেষে 'In-group'-এর মধ্যে একটি কৃত্রিম ও উগ্র সংহতি তৈরি করা হয়।
এই মনস্তাত্ত্বিক বিভাজনটি অত্যন্ত বিপজ্জনক কারণ এটি মানুষের বিচারবুদ্ধিকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। যখন একজন ব্যক্তি তার জাতীয় বা জাতিগত পরিচয়ের সাথে নিজেকে একীভূত করে ফেলে, তখন সে তার নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের চেয়েও তার গোষ্ঠীর স্বার্থকে ঊর্ধ্বে স্থান দেয়। এটিই হলো আধুনিক আসাবিয়্যাহর মূল বৈশিষ্ট্য। এই অবস্থায়, অন্যের প্রতি অবিচার বা বর্ণবাদী আচরণ করাও তার কাছে 'দেশপ্রেম' বা 'জাতিপ্রেম' হিসেবে বৈধতা পায়। এই মনস্তাত্ত্বিক বিচ্যুতিটিই বিশ্বজুড়ে সংঘাত, যুদ্ধ এবং বর্ণবাদী নিপীড়নের মূল কারণ।
পরিশেষে বলা যায়, বর্ণবাদ ও উগ্র জাতীয়তাবাদ কোনো প্রাকৃতিক বা অনিবার্য সত্য নয়; বরং এগুলো হলো একটি সুপরিকল্পিত মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক নির্মাণ। ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয় যে, যখনই কোনো গোষ্ঠী বা রাষ্ট্র কৃত্রিমভাবে শ্রেষ্ঠত্ব বা বিভাজন তৈরি করার চেষ্টা করেছে, তখনই তা মানবজাতির জন্য বিপর্যয় ডেকে এনেছে। আসাবিয়্যাহর এই অন্ধকার দিকটিকে মোকাবিলা করার একমাত্র উপায় হলো একটি সার্বজনীন মানবিক মূল্যবোধ এবং ন্যায়বিচার ভিত্তিক বিশ্বদর্শন প্রতিষ্ঠা করা, যা মানুষের জাতিগত বা বর্ণগত পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে তার মানবিক সত্তাকে সম্মান জানাবে।