১২.৫ মিডিয়া ইথিকস (Media Ethics): জাহেলি যুগের কবিদের প্রোপাগান্ডা এবং আধুনিক ফেক নিউজের (Fake News) তুলনামূলক আলোচনা
মানব সভ্যতার বিবর্তনের ধারায় তথ্যের আদান-প্রদান এবং জনমত গঠন করার প্রক্রিয়াটি সর্বদা ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করেছে। আধুনিক যুগে আমরা যখন 'মিডিয়া এথিকস' বা গণমাধ্যম নৈতিকতা নিয়ে আলোচনা করি, তখন আমাদের মনে হয় এটি একটি সমসাময়িক সংকট। কিন্তু ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তথ্যের অপব্যবহার, প্রোপাগান্ডা এবং মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে ভাষাকে ব্যবহার করার প্রবণতা অত্যন্ত প্রাচীন। বিশেষ করে আরবের জাহেলি যুগে, যেখানে কোনো লিখিত গণমাধ্যম বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ছিল না, সেখানে 'কবিতা' এবং 'বাগ্মিতা' (Oratory) ছিল সমসাময়িক যুগের সবচেয়ে শক্তিশালী 'মাস মিডিয়া'। সেই সময়ের কবিরা কেবল সাহিত্যিক ছিলেন না, বরং তারা ছিলেন গোত্রীয় প্রোপাগান্ডিস্ট এবং মনস্তাত্ত্বিক কৌশলবিদ। আজকের ডিজিটাল যুগে 'ফেক নিউজ' বা মিথ্যা সংবাদ যেভাবে জনমতকে বিভ্রান্ত করছে, জাহেলি যুগের কবিদের কাব্যিক প্রোপাগান্ডা ছিল তার একটি আদিম ও অত্যন্ত কার্যকর সংস্করণ।
জাহেলি যুগের গণমাধ্যম হিসেবে কাব্য ও বাগ্মিতার আধিপত্য
জাহেলি যুগে আরবের সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামো ছিল মূলত গোত্রীয়। প্রতিটি গোত্রের অস্তিত্ব, মর্যাদা এবং রাজনৈতিক প্রভাব নির্ভর করত তাদের বীরত্বগাথা এবং সামাজিক অবস্থানের ওপর। এই সামাজিক অবস্থান বিনির্মাণে কবিতার ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। তৎকালীন আরবে কবিতা ছিল প্রধানতম প্রচার মাধ্যম। কবিরা তাদের লেখনীর মাধ্যমে একটি গোত্রকে মহিমান্বিত করতে পারতেন, আবার অন্য একটি গোত্রকে চরমভাবে লাঞ্ছিত ও অপমানিত করতে পারতেন। এই প্রক্রিয়াটি ছিল মূলত একটি 'Information Warfare' বা তথ্যযুদ্ধ।
তৎকালীন আরবের এই শক্তিশালী প্রচার মাধ্যম সম্পর্কে বলা হয়েছে:
অর্থাৎ, কাব্যিক কবিতা জাহেলি যুগের প্রচার ও প্রোপাগান্ডার ক্ষেত্রে প্রথম স্থান অধিকার করেছিল। এমনকি শ্রেষ্ঠ কবিতাগুলোকে স্বর্ণাক্ষরে লিখে কাবার দেয়ালে ঝুলিয়ে দেওয়া হতো (মুআল্লাকা), যা ছিল তৎকালীন সময়ের 'হাই-ইমপ্যাক্ট' বা উচ্চ-প্রভাবশালী মিডিয়ার একটি নিদর্শন। এই কবিতাগুলো কেবল বিনোদনের জন্য ছিল না, বরং এগুলো ছিল গোত্রীয় শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার। একজন কবি যদি কোনো গোত্রের বিরুদ্ধে নেতিবাচক কবিতা রচনা করতেন, তবে তা সেই গোত্রের সামাজিক মর্যাদা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে মুহূর্তের মধ্যে ধূলিসাৎ করে দিতে পারত। এটি ছিল এক প্রকার 'Psychological Warfare', যা যুদ্ধের ময়দানের চেয়েও বেশি কার্যকর ছিল।
একইভাবে, বাগ্মিতা বা 'খুতবা' (Oratory) ছিল জনসমাবেশ ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের অন্যতম মাধ্যম। আল-জাহিজ রহ. তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'আল-বায়ান ওয়াত-তাবিইন'-এ উল্লেখ করেছেন যে, জাহেলি যুগের আরবরা বাগ্মিতার ক্ষেত্রে অত্যন্ত পারদর্শী ছিল। তারা তাদের বক্তৃতার মাধ্যমে বিশাল জনতাকে প্রভাবিত করতে পারত এবং যুদ্ধের জন্য উদ্বুদ্ধ করতে পারত [2] । এই মৌখিক ঐতিহ্য (Oral tradition) বা মৌখিক ইতিহাস ছিল তথ্যের প্রধান উৎস, যা অত্যন্ত দ্রুততার সাথে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছড়িয়ে পড়ত।
সা'ালিক কবিদের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা
জাহেলি যুগের সামাজিক কাঠামোর মধ্যে একটি বিশেষ ও বিতর্কিত গোষ্ঠী ছিল 'সা'ালিক' বা বিদ্রোহী কবিরা। এই কবিরা প্রচলিত গোত্রীয় নিয়মের বাইরে গিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এক ধরনের সামাজিক বিপ্লব বা প্রোপাগান্ডা চালায়। যদিও তাদের কর্মকাণ্ডকে আধুনিক সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সাথে তুলনা করা কিছুটা ত্রুটিপূর্ণ হতে পারে, তবে তাদের সামাজিক প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী [3] ।
সা'ালিক কবিরা মূলত সমাজের প্রান্তিক ও অবহেলিত যুবকদের প্রতিনিধিত্ব করত। তারা প্রচলিত গোত্রীয় শোষণের বিরুদ্ধে তাদের কাব্য ও কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জনমত গঠন করার চেষ্টা করত। তাদের এই বিদ্রোহ ছিল মূলত একটি সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া। তারা প্রচলিত সামাজিক রীতিনীতিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে এক ধরনের নতুন সামাজিক সংহতি তৈরির চেষ্টা করত, যা তৎকালীন গোত্রীয় ব্যবস্থার জন্য ছিল একটি বড় হুমকি। এই কবিদের কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা তথ্যের মাধ্যমে প্রচলিত ক্ষমতার কাঠামোকে (Power Structure) দুর্বল করার কৌশল অবলম্বন করত।
এই গোষ্ঠীটি ছিল জাহেলি সমাজের একটি জটিল উপাংশ। তারা একদিকে যেমন সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল, অন্যদিকে তাদের কর্মকাণ্ড অনেক ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা সৃষ্টি করত। তাদের এই 'Social Disruption' বা সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির ক্ষমতা ছিল মূলত তাদের শক্তিশালী কাব্যিক ও মৌখিক প্রচারণার ওপর নির্ভরশীল। তারা তাদের বীরত্ব ও সাহসিকতার গল্প প্রচার করে একটি বিশেষ ধরনের 'Outlaw' বা বিদ্রোহী ইমেজ তৈরি করেছিল, যা তৎকালীন আরবের যুবকদের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল [4] ।
আধুনিক ফেক নিউজ ও জাহেলি প্রোপাগান্ডার তুলনামূলক বিশ্লেষণ
বর্তমান যুগে আমরা 'ফেক নিউজ' (Fake News) বা অপপ্রচারের যে ভয়াবহতা দেখছি, তার সাথে জাহেলি যুগের কাব্যিক প্রোপাগান্ডার একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক সাদৃশ্য রয়েছে। জাহেলি যুগে কবিরা যেমন শব্দের কারুকার্য ও আবেগের মাধ্যমে সত্যকে আড়াল করে মিথ্যাকে মহিমান্বিত করতেন, আধুনিক যুগে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও অ্যালগরিদম ঠিক সেই কাজটিই করছে। উভয় ক্ষেত্রেই মূল লক্ষ্য হলো 'Perception Management' বা জনমতের নিয়ন্ত্রণ।
জাহেলি যুগের কবিরা যখন কোনো গোত্রকে আক্রমণ করতে গিয়ে অতিশয়োক্তি বা exaggerations ব্যবহার করতেন, তখন তা ছিল এক প্রকার 'Information Distortion'। আধুনিক যুগেও সোশ্যাল মিডিয়ায় যখন কোনো ভুল তথ্য বা বিকৃত সংবাদ ছড়ানো হয়, তখন তার উদ্দেশ্য থাকে মানুষের আবেগীয় প্রতিক্রিয়া (Emotional Response) জাগিয়ে তোলা। এই প্রক্রিয়াটিকে একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম উপমা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে:
অর্থাৎ, 'মধুতে বিষ মেশানো'। আধুনিক ফেক নিউজ বা প্রোপাগান্ডা ঠিক এইভাবেই কাজ করে। এটি অত্যন্ত আকর্ষণীয়, বিশ্বাসযোগ্য এবং আপাতদৃষ্টিতে সত্য মনে হওয়া তথ্যের আবরণে (মধু) বিষাক্ত মিথ্যা বা অপপ্রচার (বিষ) মিশিয়ে দেয়। জাহেলি যুগে কবিরা যেমন ছন্দ ও অলঙ্কারের মাধ্যমে মিথ্যাকে সত্যের মতো উপস্থাপন করতেন, আধুনিক যুগে 'Deepfake' প্রযুক্তি বা 'Clickbait' শিরোনামের মাধ্যমে ঠিক একই কাজ করা হচ্ছে।
তদুপরি, জাহেলি যুগের 'গোত্রবাদ' (Tribalism) এবং আধুনিক যুগের 'ডিজিটাল ইকো চেম্বার' (Digital Echo Chambers) এর মধ্যে একটি সমান্তরাল সম্পর্ক বিদ্যমান। জাহেলি যুগে একজন ব্যক্তি তার গোত্রের প্রতি অন্ধ আনুগত্য প্রদর্শন করত এবং গোত্রীয় প্রোপাগান্ডাকেই পরম সত্য বলে গ্রহণ করত। বর্তমানেও সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম মানুষকে কেবল তাদের নিজস্ব মতাদর্শের তথ্য সরবরাহ করে, ফলে মানুষ একটি নির্দিষ্ট চিন্তাধারার বৃত্তে বন্দি হয়ে পড়ে। এই 'Polarization' বা মেরুকরণ সমাজকে বিভক্ত করে ফেলে, যা জাহেলি যুগে গোত্রীয় যুদ্ধের মূল কারণ ছিল।
মিডিয়া এথিকস ও তথ্যের নৈতিক সংকট
তথ্যের এই অপব্যবহার ও প্রোপাগান্ডার ফলে সমাজে যে বিশৃঙ্খলা ও নৈতিক অবক্ষয় সৃষ্টি হয়, তা উভয় যুগেই বিদ্যমান। জাহেলি যুগে প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ও সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হতো, আধুনিক যুগে ফেক নিউজের মাধ্যমে তা সামাজিক দাঙ্গা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং এমনকি বিশ্বব্যাপী বিশৃঙ্খলার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তথ্যের এই অনিয়ন্ত্রিত প্রবাহ এবং নৈতিকতার অভাব সমাজকে একটি 'Information Chaos' বা তথ্যের বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলে দেয়।
ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে, যখন গণমাধ্যম বা প্রচার মাধ্যম কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থা বা নৈতিক কাঠামোর (Ethical Framework) বাইরে চলে যায়, তখন তা স্বৈরাচারী শক্তির হাতিয়ার হয়ে ওঠে। যেমনটি ন্যাপোলিয়নের শাসনামলে দেখা গিয়েছিল, যেখানে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও প্রচারণার ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছিল যাতে জনমতকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় [5] । ন্যাপোলঁন বুঝতে পেরেছিলেন যে, যে ব্যক্তি মানুষের চিন্তার ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে, সেই প্রকৃত ক্ষমতাধর।
আধুনিক প্রেক্ষাপটে, যখন তথ্যের সত্যতা যাচাই করার চেয়ে দ্রুততা এবং উত্তেজনা (Sensationalism) বেশি গুরুত্ব পায়, তখন 'Media Ethics' বা গণমাধ্যম নৈতিকতা সম্পূর্ণভাবে ধসে পড়ে। জাহেলি যুগে কবিরা যেমন তাদের ব্যক্তিগত বা গোত্রীয় স্বার্থে সত্যকে বিসর্জন দিতেন, আধুনিক অনেক সংবাদমাধ্যম ও ইনফ্লুয়েন্সাররাও ঠিক তেমনি রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক স্বার্থে সত্যকে বিকৃত করছে। এই 'Intellectual Bankruptcy' বা বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্ব সমাজকে একটি নৈতিক সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়, যেখানে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
পরিশেষে বলা যায়, জাহেলি যুগের কবিদের প্রোপাগান্ডা এবং আধুনিক ফেক নিউজের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য কেবল প্রযুক্তির, কিন্তু মনস্তাত্ত্বিক কৌশল ও প্রভাব অত্যন্ত অভিন্ন। উভয় ক্ষেত্রেই তথ্যকে একটি 'Weapon of Mass Destruction' বা গণবিধ্বংসী অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এই ঐতিহাসিক ও সমসাময়িক প্রেক্ষাপট আমাদের শেখায় যে, তথ্যের অবাধ প্রবাহের চেয়ে তথ্যের নৈতিকতা ও সত্যতা নিশ্চিত করা একটি সভ্য সমাজের জন্য অনেক বেশি অপরিহার্য।