৯.৩.১ একটি রাষ্ট্র কীভাবে তার নাগরিক বা প্রতিনিধি হত্যার বদলা বা ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে?
একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের অস্তিত্ব, মর্যাদা এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বহুলাংশে নির্ভর করে তার নাগরিকদের নিরাপত্তা বিধান এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিদের অনাক্রম্যতা (Diplomatic Immunity) রক্ষার সক্ষমতার ওপর। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ভূ-রাজনীতিতে কোনো রাষ্ট্রের দূত বা প্রতিনিধিকে হত্যা করাকে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণার শামিল মনে করা হতো। মদিনা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর, রাসুলুল্লাহ সা. আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক অভূতপূর্ব আইনি ও কূটনৈতিক বিপ্লব সাধন করেন। তিনি কেবল অভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা করেননি, বরং রাষ্ট্রের সীমানার বাইরেও মদিনার নাগরিক ও কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোর ও আপসহীন নীতি গ্রহণ করেছিলেন। ইসলামি আইনশাস্ত্র (Siyar) এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসে এই নীতিটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং তাত্ত্বিকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত।
১. সার্বভৌমত্ব, কূটনৈতিক অনাক্রম্যতা এবং ইসলামি আইনের তাত্ত্বিক ভিত্তি
ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থায় সার্বভৌমত্ব ও নাগরিক সুরক্ষার বিষয়টি কেবল একটি রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা নয়, বরং এটি একটি ঐশ্বরিক ও আইনি চুক্তি। ইসলামি আইনশাস্ত্রের অন্যতম পথিকৃৎ ইমাম মুহাম্মাদ আশ-শায়বানী তাঁর ক্লাসিক্যাল গ্রন্থ 'আল-সিয়ার আল-কাবীর'-এ উল্লেখ করেছেন যে, রাষ্ট্রের সীমানার মধ্যে অবস্থানকারী যেকোনো নাগরিক বা চুক্তিবদ্ধ অমুসলিম (জিম্মি) এবং রাষ্ট্রের বাইরে প্রেরিত যেকোনো কূটনৈতিক প্রতিনিধির জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। যখন কোনো রাষ্ট্র অন্য কোনো রাষ্ট্রের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে বা দূত প্রেরণ করে, তখন সেখানে একটি অলিখিত পারস্পরিক নিরাপত্তা চুক্তি (عهد الأمان) সম্পাদিত হয়। এই চুক্তির লঙ্ঘন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে গণ্য হয়।
কূটনৈতিক অনাক্রম্যতার এই ধারণাকে সুদৃঢ় করতে ইমাম আশ-শায়বানী রাসুলুল্লাহ সা.-এর একটি বিখ্যাত হাদিসকে আইনি ভিত্তি হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তিনি বর্ণনা করেন:
“মুসলিম উম্মাহ এই বিষয়ে একমত যে, কূটনৈতিক দূতদের হত্যা করা যাবে না। কারণ রাসুলুল্লাহ সা. (মুসায়লিমার দুই দূতকে) বলেছিলেন: যদি দূতদের হত্যা না করার নিয়মটি না থাকত, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের শিরশ্ছেদ করতাম।” [1] এই আইনি সুরক্ষার পরিধি কেবল মুসলিম প্রতিনিধিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং মদিনা রাষ্ট্রে আগত অমুসলিম প্রতিনিধিদের জন্যও এটি সমানভাবে প্রযোজ্য ছিল। ইমাম আবু ইউসুফ তাঁর বিখ্যাত 'কিতাবুল খারাজ' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, সার্বভৌম রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তার সীমানার ভেতরে ও বাইরে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং যেকোনো মূল্যে তার প্রতিনিধিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। যদি কোনো বহিঃশক্তি এই অনাক্রম্যতা লঙ্ঘন করে কোনো প্রতিনিধিকে হত্যা করে, তবে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার স্বার্থে এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সামরিক বা কূটনৈতিক উপায়ে তার প্রতিশোধ নেওয়া বা ক্ষতিপূরণ আদায় করা রাষ্ট্রের জন্য বৈধ ও আবশ্যকীয় হয়ে পড়ে। [2] আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, এই নীতিটি বর্তমান আন্তর্জাতিক আইনের 'সার্বভৌম সমতা' (Sovereign Equality) এবং 'কূটনৈতিক সম্পর্ক বিষয়ক ভিয়েনা কনভেনশন'-এর সাথে হুবহু মিলে যায়। ইসলামি আইনবিদগণ বহু শতাব্দী আগেই এটি স্পষ্ট করে গেছেন যে, রাষ্ট্রের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে হলে তার প্রতিটি নাগরিকের রক্তের মূল্য নিশ্চিত করতে হবে, অন্যথায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সেই রাষ্ট্রের কোনো ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব অবশিষ্ট থাকে না। [3] ২. কূটনৈতিক দূত হত্যার ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত: মুতাহ অভিযানের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
ইসলামি ইতিহাসে কূটনৈতিক প্রতিনিধি হত্যার সবচেয়ে ভয়াবহ এবং যুগান্তকারী ঘটনাটি ঘটেছিল রোমান সাম্রাজ্যের মিত্র ঘাসানিদ রাজ্যের সীমানায়। রাসুলুল্লাহ সা. বসরার গভর্নরের নিকট ইসলামের দাওয়াতসহ একটি কূটনৈতিক পত্র প্রেরণের জন্য বিশিষ্ট সাহাবি হারিস বিন উমাইর আল-আজদি রা.-কে দূত হিসেবে প্রেরণ করেন। কিন্তু ঘাসানিদ শাসক শুরাহবিল বিন আমর আল-ঘাসানি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক আইন সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করে হারিস রা.-কে বন্দি করে এবং অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যা করে। এই ঘটনাটি ছিল মদিনা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ওপর এক চরম আঘাত এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রকাশ্য লঙ্ঘন।
ইতিহাসবিদ ইবনে কাসির এই ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে তাঁর 'আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ' গ্রন্থে লিখেছেন:
“রাসুলুল্লাহ সা. হারিস বিন উমাইর আল-আজদি রা.-কে তাঁর পত্রসহ বসরার রাজার উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন। তিনি যখন মুতাহ নামক স্থানে পৌঁছান, তখন শুরাহবিল বিন আমর আল-ঘাসানি তাঁর পথরোধ করে এবং জিজ্ঞেস করে, 'তুমি কোথায় যাচ্ছ?' তিনি উত্তর দিলেন, 'শামে।' সে আবার জিজ্ঞেস করল, 'তুমি কি মুহাম্মাদের দূত?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ।' তখন শুরাহবিলের নির্দেশে তাঁকে বেঁধে শিরশ্ছেদ করা হয়। রাসুলুল্লাহ সা.-এর কোনো দূতকে এটি ছাড়া আর কখনো হত্যা করা হয়নি।” [4] এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের সংবাদ মদিনায় পৌঁছামাত্রই রাসুলুল্লাহ সা. এটিকে একটি 'ক্যাসাস বেলি' (Casus Belli) বা যুদ্ধ ঘোষণার কারণ হিসেবে গ্রহণ করেন। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে তিন হাজার সৈন্যের একটি শক্তিশালী বাহিনী গঠন করেন এবং রোমান সাম্রাজ্যের মতো তৎকালীন পরাশক্তির বিরুদ্ধে মুতাহ অভিমুখে প্রেরণ করেন। সীরাত গবেষক ইবনে হিশাম উল্লেখ করেছেন যে, এই অভিযানের উদ্দেশ্য কেবল প্রতিশোধ গ্রহণ ছিল না, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মদিনা রাষ্ট্রের এই বার্তা পৌঁছে দেওয়া ছিল যে, মদিনার কোনো নাগরিক বা দূতের রক্ত সস্তা নয়। [5] মুতাহর যুদ্ধ ছিল মূলত একটি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ। রোমান ও তাদের মিত্রদের বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে মাত্র তিন হাজার মুসলিম সৈন্যের এই অসম লড়াই প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও কূটনৈতিক অনাক্রম্যতা রক্ষার প্রশ্নে রাসুলুল্লাহ সা. কোনো ধরনের আপস করতে প্রস্তুত ছিলেন না। এই সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে আরবের অন্যান্য গোত্র এবং পার্শ্ববর্তী সাম্রাজ্যগুলোর কাছে মদিনা রাষ্ট্রের সামরিক ও রাজনৈতিক দৃঢ়তার এক শক্তিশালী বার্তা প্রেরিত হয়। [6] ৩. নাগরিকদের সুরক্ষায় রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা: বীর মাউনা ও রাজি ট্র্যাজেডির বিচারিক বিশ্লেষণ
কূটনৈতিক দূতদের পাশাপাশি সাধারণ নাগরিক, বিশেষ করে শিক্ষক, প্রচারক ও বেসামরিক প্রতিনিধিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও মদিনা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার ছিল। হিজরি চতুর্থ সনে সংঘটিত 'রাজি' এবং 'বীর মাউনা'-এর বিশ্বাসঘাতকতামূলক হত্যাকাণ্ড মদিনার সমাজ ও রাষ্ট্রীয় নীতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। রাজি নামক স্থানে আদল ও কারাহ গোত্রের আমন্ত্রণে প্রেরিত দশজন শিক্ষককে এবং বীর মাউনায় বনু আমিরের আবু বারা-এর আশ্বাসে প্রেরিত সত্তরজন বিশিষ্ট কারী ও শিক্ষককে অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
এই বিশ্বাসঘাতকতা ও গণহত্যার ঘটনায় রাসুলুল্লাহ সা. চরমভাবে ব্যথিত হন এবং রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে এর কঠোর বিচারিক ও রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। সহীহ বুখারীতে এই ঘটনার ভয়াবহতা এবং রাসুলুল্লাহ সা.-এর প্রতিক্রিয়ার বিবরণ এভাবে এসেছে:
“রাসুলুল্লাহ সা. এক মাস পর্যন্ত নামাজে কুনুতে নাজেলা পাঠ করেন এবং রিল, জাকওয়ান ও উসাইয়্যাহ গোত্রের ওপর বদদোয়া করেন, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের অবাধ্য হয়েছিল।” [7] রাজনৈতিক ও সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে, এই কুনুতে নাজেলা কেবল একটি আধ্যাত্মিক প্রার্থনা ছিল না, বরং এটি ছিল রাষ্ট্রীয়ভাবে নাগরিকদের হত্যার বিরুদ্ধে এক ধরনের প্রকাশ্য কূটনৈতিক ও সামাজিক প্রতিবাদ এবং জনমত গঠন। এর পাশাপাশি, রাসুলুল্লাহ সা. এই অপরাধীদের শাস্তি দিতে সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন। যেমন, রাজি ট্র্যাজেডির প্রতিশোধ নিতে তিনি বনু লিহিয়ান গোত্রের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন। [8] এই ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যখন কোনো রাষ্ট্র তার নাগরিকদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হয় বা তাদের হত্যার বিচার করতে পারে না, তখন তার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ভেঙে পড়ে। রাসুলুল্লাহ সা. সামরিক অভিযানের মাধ্যমে অপরাধী গোত্রগুলোকে কঠোর শাস্তি প্রদান করে এটি প্রমাণ করেছিলেন যে, মদিনা রাষ্ট্র তার নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তা দিতে সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং যেকোনো বিশ্বাসঘাতকতার উপযুক্ত জবাব দিতে সক্ষম। [9] ৪. ইসলামি রাষ্ট্রে অমুসলিম দূতদের নিরাপত্তা ও পারস্পরিক চুক্তির মর্যাদা
ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থায় ন্যায়বিচার ও অনাক্রম্যতার নীতিটি দ্বিমুখী এবং অত্যন্ত সুষম ছিল। মদিনা রাষ্ট্র কেবল নিজের প্রতিনিধিদের সুরক্ষাই দাবি করেনি, বরং শত্রুভাবাপন্ন বা যুদ্ধরত পক্ষের প্রতিনিধিদেরও সর্বোচ্চ নিরাপত্তা প্রদান করেছে। এমনকি যখন কোনো চরম শত্রু বা মিথ্যা নবুয়তের দাবিদার মুসায়লিমাতুল কাযযাবের দূত মদিনায় এসে রাসুলুল্লাহ সা.-এর সামনে ধৃষ্টতা প্রদর্শন করেছিল, তখনও তিনি তাদের ওপর কোনো শারীরিক আঘাত বা শাস্তি প্রয়োগ করেননি।
সুনান আবু দাউদে বর্ণিত হয়েছে, মুসায়লিমার দুই দূত ইবনুন নুওয়াহাহ এবং ইবনে আছাল যখন মদিনায় আসে এবং রাসুলুল্লাহ সা.-এর নবুয়তকে অস্বীকার করে মুসায়লিমার নবুয়তের পক্ষে কথা বলে, তখন রাসুলুল্লাহ সা. তাদের কূটনৈতিক অনাক্রম্যতা রক্ষা করে বলেছিলেন:
“আল্লাহর কসম! যদি দূতদের হত্যা না করার নিয়মটি না থাকত, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের দুজনের শিরশ্ছেদ করতাম।” [10] এই ঘটনাটি ইসলামের আন্তর্জাতিক আইনের এক অনন্য মাইলফলক। সীরাত গবেষক ইবনে হিশাম তাঁর গ্রন্থে এই ঘটনার আইনি তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে লিখেছেন যে, আদর্শিক বা রাজনৈতিক মতপার্থক্য যতই তীব্র হোক না কেন, কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোকে সর্বদা সুরক্ষিত রাখতে হবে। [11] এই নীতিটি প্রমাণ করে যে, ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিশোধ গ্রহণের ক্ষেত্রেও অন্ধ বা আবেগতাড়িত ছিল না, বরং তা সর্বদা আইনি কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হতো। শত্রুপক্ষের দূতদের এই নিরাপত্তা প্রদানের মাধ্যমে মদিনা রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছিল, যা পরবর্তীতে বহু অমুসলিম গোত্র ও রাষ্ট্রকে মদিনার সাথে চুক্তি সম্পাদনে উদ্বুদ্ধ করেছিল। [12] ৫. আধুনিক আন্তর্জাতিক আইন ও ইসলামি সিয়ারের তুলনামূলক পর্যালোচনা
আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনের অন্যতম ভিত্তি হলো ১৯৬১ সালের 'ভিয়েনা কনভেনশন অন ডিপ্লোম্যাটিক রিলেশনস' (Vienna Convention on Diplomatic Relations)। এই কনভেনশনের ২৯ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, কূটনৈতিক প্রতিনিধিরা সম্পূর্ণ অনাক্রম্য থাকবেন এবং তাদের কোনোভাবেই গ্রেপ্তার বা আটক করা যাবে না। অথচ, এই আধুনিক আইনি কাঠামোর প্রায় চৌদ্দশত বছর আগে রাসুলুল্লাহ সা. মদিনা সনদের মাধ্যমে এবং তাঁর বাস্তব রাজনৈতিক পদক্ষেপের মাধ্যমে এই অনাক্রম্যতা ও রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার নীতি কার্যকর করেছিলেন।
বিখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও আইনবিদ আল-মাওয়ার্দী তাঁর 'আল-আহকাম আস-সুলতানিয়্যাহ' গ্রন্থে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্বাবলী আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছেন:
“ইসলামি রাষ্ট্রের সীমানা রক্ষা করা, তার সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা এবং নাগরিকদের জীবন ও সম্পদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা রাষ্ট্রপ্রধানের ওপর ফরজ বা আবশ্যকীয় কর্তব্য।” [13] আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনে অনেক সময় রাজনৈতিক স্বার্থে বা পরাশক্তিগুলোর চাপে কূটনৈতিক অনাক্রম্যতা বা নাগরিক হত্যার বিচারের ক্ষেত্রে দ্বিমুখী নীতি (Double Standard) দেখা যায়। কিন্তু ইসলামি সিয়ার বা আন্তর্জাতিক আইনে এই নীতি ছিল সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও সার্বজনীন। ইমাম শামসুদ্দিন আস-সারাকসী তাঁর 'আল-মাবসুত' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, কোনো মুসলিম বা অমুসলিম জিম্মি নাগরিকের রক্তপাত ঘটলে রাষ্ট্রকে অবশ্যই তার বিচার নিশ্চিত করতে হবে, অন্যথায় রাষ্ট্র তার নৈতিক ও আইনি বৈধতা হারাবে। [14] এই তুলনামূলক বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট হয় যে, রাসুলুল্লাহ সা. কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মদিনা রাষ্ট্র কেবল একটি আঞ্চলিক শক্তি ছিল না, বরং এটি ছিল একটি আদর্শিক ও আইনি মডেল। নাগরিকদের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক অনাক্রম্যতা রক্ষার ক্ষেত্রে মদিনা রাষ্ট্র যে আপসহীন ও সুষম নীতি গ্রহণ করেছিল, তা সমকালীন বিশ্বের যেকোনো আধুনিক রাষ্ট্রের জন্য সার্বভৌম মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে অনন্য আইনি রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করতে পারে। [15]