খণ্ড 74
ফন্ট:100%
থিম:

৫.৩.১ মাক্কুমি নারীর চুরির ঘটনা: ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেমে (Criminal Justice System) জিরো টলারেন্স এবং ভিআইপি কালচার (VIP Culture) উচ্ছেদ

ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো পরম ন্যায়বিচার এবং আইনের শাসন (Rule of Law)। মক্কা বিজয়ের পরবর্তী সময়ে, যখন আরবের গোত্রীয় আভিজাত্য এবং সামাজিক স্তরবিন্যাস ভেঙে একটি নতুন সমতাবাদী রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে উঠছিল, তখন একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল অপরাধের ঘটনা ঘটে। বনু মাখজুম গোত্রের এক সম্ভ্রান্ত নারীর চুরির ঘটনা এবং তার বিচার প্রক্রিয়া তৎকালীন আরবের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা করে। এই ঘটনাটি কেবল একটি সাধারণ ফৌজদারি অপরাধের বিচার ছিল না, বরং এটি ছিল নবগঠিত ইসলামি রাষ্ট্রের ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেমে (Criminal Justice System) 'জিরো টলারেন্স' নীতি এবং যুগ যুগ ধরে চলে আসা 'ভিআইপি কালচার' (VIP Culture) বা অভিজাততান্ত্রিক দায়মুক্তির সংস্কৃতিকে চিরতরে উচ্ছেদ করার এক ঐতিহাসিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ঘোষণা।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও জাহেলী আরবের বিচারিক বৈষম্য

মক্কা বিজয়ের পর (গজওয়াতুল ফাতহ) কুরাইশদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সামাজিক আধিপত্যের অবসান ঘটে। তবে শত বছরের লালিত গোত্রীয় অহংকার এবং আভিজাত্যের মনস্তত্ত্ব রাতারাতি বিলুপ্ত হয়নি। কুরাইশদের অন্যতম প্রভাবশালী ও ক্ষমতাশালী উপগোত্র ছিল 'বনু মাখজুম'। এই গোত্রটি সামরিক শক্তি, সম্পদ এবং রাজনৈতিক প্রভাবের দিক থেকে কুরাইশদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় ছিল। জাহেলী যুগে এই গোত্রের কোনো সদস্য অপরাধ করলে তাদের সামাজিক প্রভাবের কারণে শাস্তি এড়িয়ে যাওয়ার অলিখিত নিয়ম ছিল। এই প্রেক্ষাপটে বনু মাখজুম গোত্রের ফাতিমা বিনতে আল-আসওয়াদ নামক এক নারী চুরির অপরাধে লিপ্ত হয় [1] । কোনো কোনো বর্ণনা মতে, সে অন্যের জিনিস ধার নিয়ে তা অস্বীকার করেছিল, যা তৎকালীন আইনে চুরির সমতুল্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় [2] .।

জাহেলী আরবের বিচারিক কাঠামো ছিল চরমভাবে বৈষম্যমূলক। সেখানে আইনের প্রয়োগ নির্ভর করত অপরাধীর সামাজিক মর্যাদার ওপর। যদি কোনো দুর্বল বা ক্রীতদাস অপরাধ করত, তবে তার ওপর কঠোরতম শাস্তি প্রয়োগ করা হতো। পক্ষান্তরে, কোনো প্রভাবশালী বা সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি অপরাধ করলে তাকে সামাজিক প্রভাব, অর্থ বা গোত্রীয় চাপের মুখে ছেড়ে দেওয়া হতো। এই দ্বিমুখী বিচারিক নীতি সমাজকে চরম নৈরাজ্য ও নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। বনু মাখজুমের এই নারীর চুরির ঘটনাটি যখন প্রমাণিত হলো, তখন কুরাইশদের মধ্যে এক তীব্র মনস্তাত্ত্বিক আলোড়ন সৃষ্টি হলো। তারা বুঝতে পারল যে, ইসলামি আইনের অধীনে এই নারীর হাত কাটা হতে পারে, যা তাদের গোত্রীয় সম্মানের ওপর এক বিরাট আঘাত হিসেবে গণ্য হবে [3]

এই ঘটনার ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিশ্লেষণ করতে গিয়ে হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'ফাতহুল বারী'-তে উল্লেখ করেছেন যে, কুরাইশরা এই ঘটনাকে তাদের গোত্রীয় অস্তিত্ব ও সম্মানের প্রশ্ন হিসেবে গ্রহণ করেছিল [4] । তারা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিল না যে, বনু মাখজুমের মতো একটি অভিজাত গোত্রের নারীর হাত চুরির অপরাধে কেটে ফেলা হবে। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, জাহেলী আরবের মনস্তত্ত্বে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা ছিল এই আভিজাত্যবাদী অহংকার বা ভিআইপি কালচার। মূল হাদিসের ইবারতটি নিম্নরূপ:

«أَنَّ قُرَيْشًا أَهَمَّهُمْ شَأْنُ المَرْأَةِ المَخْزُومِيَّةِ الَّتِي سَرَقَتْ، فَقَالُوا: وَمَنْ يُكَلِّمُ فِيهَا رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ؟»

অনুবাদ: "কুরাইশদেরকে সেই মাখজুমী নারীর চুরির ঘটনাটি অত্যন্ত চিন্তিত করে তুলল। তারা বলতে লাগল, এই বিষয়ে রাসুলুল্লাহ সা.-এর সাথে কে কথা বলবে?" [5] [6] [7]

কুরাইশদের মনস্তাত্ত্বিক সংকট ও সুপারিশের অপচেষ্টা

বনু মাখজুমের নারীর অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পর কুরাইশরা এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক সংকটে পতিত হয়। তারা সরাসরি রাসুলুল্লাহ সা.-এর কাছে গিয়ে শাস্তি মওকুফের দাবি জানানোর সাহস পাচ্ছিল না, কারণ তারা জানত যে রাসুলুল্লাহ সা. আল্লাহর আইনের ব্যাপারে আপসহীন। তাই তারা এমন একজন মধ্যস্থতাকারী বা সুপারিশকারী (Shafi') খুঁজতে শুরু করল, যার কথা রাসুলুল্লাহ সা. প্রত্যাখ্যান করবেন না। এই উদ্দেশ্যে তারা উসামা বিন জায়দ রা.-কে নির্বাচন করে। উসামা বিন জায়দ রা. ছিলেন রাসুলুল্লাহ সা.-এর অত্যন্ত প্রিয়ভাজন এবং তাঁর পালক পুত্র জায়দ বিন হারিসা রা.-এর সন্তান। রাসুলুল্লাহ সা. উসামা রা.-কে অত্যন্ত ভালোবাসতেন, যার কারণে তাঁকে 'হিব্বু রাসুলিল্লাহ' (রাসুলুল্লাহর প্রিয়পাত্র) বলা হতো [8]

কুরাইশদের এই কৌশলটি ছিল আধুনিক রাজনৈতিক বিজ্ঞানের ভাষায় 'নেপোটিজম' (Nepotism) বা স্বজনপ্রীতি এবং 'লবিং' (Lobbying)-এর একটি ধ্রুপদী উদাহরণ। তারা ভেবেছিল যে, রাসুলুল্লাহ সা.-এর ব্যক্তিগত স্নেহ ও ভালোবাসাকে কাজে লাগিয়ে আইনের প্রয়োগকে বাধাগ্রস্ত করা সম্ভব হবে। উসামা বিন জায়দ রা. তাঁর সরলতা এবং কুরাইশদের অনুনয়-বিনয়ের কারণে এই সুপারিশের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি রাসুলুল্লাহ সা.-এর দরবারে গিয়ে সেই নারীর শাস্তি মওকুফ বা শিথিল করার জন্য সুপারিশ পেশ করেন [9]

এই সুপারিশের ঘটনাটি ইসলামি বিচার ব্যবস্থার জন্য একটি চরম পরীক্ষা ছিল। যদি রাসুলুল্লাহ সা. উসামা রা.-এর সুপারিশ গ্রহণ করে শাস্তি মওকুফ করতেন, তবে তা হতো আইনের শাসনের চরম পরাজয় এবং ভিআইপি কালচারের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সা. এই সুপারিশ শোনার সাথে সাথে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তাঁর পবিত্র চেহারা রাগে লাল হয়ে যায়। হাদিসের বর্ণনায় এসেছে:

«فَلَمَّا كَلَّمَهُ أُسامَةُ فِيهَا تَلَوَّنَ وَجْهُ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ»

অনুবাদ: "যখন উসামা এই বিষয়ে তাঁর সাথে কথা বললেন, তখন রাসুলুল্লাহ সা.-এর চেহারা বিবর্ণ (ক্রোধে লাল) হয়ে গেল।" [10] [11] [12]

রাসুলুল্লাহ সা.-এর ক্রোধ ও ঐতিহাসিক খুতবা: আইনের চোখে সমতা

উসামা বিন জায়দ রা.-এর সুপারিশ শুনে রাসুলুল্লাহ সা. অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন এবং তাৎক্ষণিকভাবে তাকে প্রশ্ন করেন, "তুমি কি আল্লাহর নির্ধারিত সীমার (হুদুদ) ব্যাপারে সুপারিশ করছ?" এই প্রশ্নটি ছিল উসামা রা.-এর জন্য এক বিরাট সতর্কবার্তা এবং একই সাথে সমগ্র উম্মাহর জন্য একটি চিরন্তন শিক্ষা। রাসুলুল্লাহ সা. কেবল ব্যক্তিগতভাবে উসামা রা.-কে তিরস্কার করেই ক্ষান্ত হননি, বরং এই ঘটনাটিকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্য এবং জনগণের মন থেকে ভিআইপি কালচারের বীজ উপড়ে ফেলার জন্য তিনি মসজিদে গিয়ে এক ঐতিহাসিক খুতবা (ভাষণ) প্রদান করেন [13]

এই খুতবায় রাসুলুল্লাহ সা. পূর্ববর্তী জাতিসমূহের ধ্বংসের মূল কারণ বিশ্লেষণ করেন। তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, আইনের প্রয়োগে বৈষম্যই হলো সভ্যতার পতনের প্রধান কারণ। যখন কোনো সমাজের অভিজাতরা অপরাধ করে পার পেয়ে যায় এবং দুর্বলরা শাস্তির মুখোমুখি হয়, তখন সেই সমাজের নৈতিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি ধসে পড়ে। রাসুলুল্লাহ সা.-এর এই ভাষণটি ছিল আইনের চোখে সকলের সমতার (Equality before the Law) এক অনন্য দলিল। তিনি তাঁর ভাষণে যে ঐতিহাসিক ঘোষণাটি দিয়েছিলেন, তা মানব ইতিহাসের বিচারিক দর্শনে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তিনি বলেছিলেন:

«أَتَشْفَعُ فِي حَدٍّ مِنْ حُدُودِ اللَّهِ؟ ثُمَّ قَامَ فَاخْتَطَبَ، فَقَالَ: أَيُّهَا النَّاسُ، إِنَّمَا أَهْلَكَ الَّذِينَ قَبْلَكُمْ أَنَّهُمْ كَانُوا إِذَا سَرَقَ فِيهِمُ الشَّرِيفُ تَرَكُوهُ، وَإِذَا سَرَقَ فِيهِمُ الضَّعِيفُ أَقَامُوا عَلَيْهِ الحَدَّ، وَأَيْمُ اللَّهِ لَوْ أَنَّ فَاطِمَةَ بِنْتَ مُحَمَّدٍ سَرَقَتْ لَقَطَعْتُ يَدَهَا»

অনুবাদ: "তুমি কি আল্লাহর নির্ধারিত সীমার (হুদুদ) ব্যাপারে সুপারিশ করছ? অতঃপর তিনি দাঁড়িয়ে খুতবা দিলেন এবং বললেন: হে লোকসকল! তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিসমূহ ধ্বংস হয়ে গেছে কেবল এই কারণে যে, যখন তাদের মধ্যে কোনো সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি চুরি করত, তখন তারা তাকে ছেড়ে দিত; আর যখন কোনো দুর্বল ব্যক্তি চুরি করত, তখন তারা তার ওপর শাস্তি প্রয়োগ করত। আল্লাহর কসম! যদি মুহাম্মাদের কন্যা ফাতিমাও চুরি করত, তবে আমি অবশ্যই তার হাত কেটে দিতাম।" [14] [15] [16]

এই খুতবার মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ সা. স্পষ্ট করে দিলেন যে, আল্লাহর আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। এমনকি যদি তাঁর নিজের সবচেয়ে প্রিয় কন্যা ফাতিমা রা.-ও এই অপরাধ করতেন, তবে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তিনি তাঁর ওপরও একই আইন প্রয়োগ করতেন। এই ঘোষণাটি ছিল তৎকালীন আরবের বংশীয় আভিজাত্য এবং আধুনিক যুগের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দায়মুক্তির (Executive Immunity) ধারণার ওপর এক চরম আঘাত। এটি প্রমাণ করে যে, ইসলামি রাষ্ট্রে আইনের শাসন কোনো আপসের বিষয় নয়, বরং এটি একটি পরম ও অলঙ্ঘনীয় নীতি।

ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেমে 'জিরো টলারেন্স' এবং ভিআইপি কালচার উচ্ছেদ

আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অপরাধবিজ্ঞানের (Criminology) আলোকে রাসুলুল্লাহ সা.-এর এই পদক্ষেপটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি ছিল অপরাধ বিচার ব্যবস্থায় 'জিরো টলারেন্স' (Zero Tolerance) নীতির বাস্তবায়ন। জিরো টলারেন্স বলতে বোঝায় অপরাধের ধরন বা অপরাধীর সামাজিক অবস্থান বিবেচনা না করে আইনের কঠোর ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ। রাসুলুল্লাহ সা. এই ঘটনার মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে, অপরাধী যত বড় প্রভাবশালী গোত্রেরই হোক না কেন, আইনের হাত থেকে তার বাঁচার কোনো সুযোগ নেই। এটি ছিল তৎকালীন আরবের 'ভিআইপি কালচার' বা অভিজাততান্ত্রিক সংস্কৃতির সম্পূর্ণ উচ্ছেদ [17]

ইসলামি আইনশাস্ত্রে (Fiqh) এই ঘটনাটি থেকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনি নীতি (Legal Maxim) প্রণয়ন করা হয়েছে। তা হলো: "যখন কোনো অপরাধের মামলা বিচারকের (সুলতান বা কাজী) দরবারে পৌঁছে যায়, তখন আল্লাহর নির্ধারিত শাস্তির (হুদুদ) ক্ষেত্রে কোনো প্রকার সুপারিশ বা আপস গ্রহণযোগ্য নয়।" ইমাম আল-মাওয়ার্দী তাঁর 'আল-আহকাম আস-সুলতানিয়্যাহ' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, হুদুদের ক্ষেত্রে সুপারিশ গ্রহণ করা বিচারকের জন্য হারাম এবং এটি রাষ্ট্রের বিচারিক সততাকে বিনষ্ট করে [18] । এই নীতিটি আধুনিক বিচার ব্যবস্থার 'জুডিশিয়াল ইন্ডিপেন্ডেন্স' (Judicial Independence) বা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ধারণার সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে নির্বাহী বিভাগ বা কোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠী বিচারিক প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করতে পারে না [19]

তৎকালীন আরবে যেখানে গোত্রীয় যুদ্ধ হতো সামান্য কারণে, সেখানে একটি প্রভাবশালী গোত্রের নারীর হাত কেটে ফেলা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সা. কোনো রাজনৈতিক সমীকরণ বা গোত্রীয় অসন্তোষের ভয় করেননি। তিনি জানতেন যে, একটি টেকসই ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের জন্য আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ অপরিহার্য। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থায় 'আইনের শাসন' কেবল একটি তাত্ত্বিক ধারণা নয়, বরং এটি ছিল একটি বাস্তবায়িত প্রশাসনিক নীতি, যা সমাজের প্রতিটি স্তরে সমতা নিশ্চিত করেছিল।

সমাজতাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন

বনু মাখজুমের নারীর ওপর চুরির শাস্তি (হাত কাটা) বাস্তবায়নের পর মদিনা ও মক্কার সমাজে এর এক সুদূরপ্রসারী সমাজতাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব পড়ে। প্রথমত, সমাজের সাধারণ ও দুর্বল শ্রেণীর মানুষের মধ্যে এই বিশ্বাস দৃঢ় হয় যে, ইসলামি রাষ্ট্র তাদের অধিকার রক্ষা করবে এবং কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি তাদের ওপর জুলুম করে পার পাবে না। এটি রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকদের আনুগত্য ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। দ্বিতীয়ত, অভিজাত শ্রেণীর মধ্যে এই বার্তা পরিষ্কারভাবে পৌঁছে যায় যে, তাদের বংশীয় মর্যাদা বা রাজনৈতিক প্রভাব অপরাধের ক্ষেত্রে কোনো ঢাল হিসেবে কাজ করবে না [20]

এই ঘটনার আরেকটি অত্যন্ত মানবিক ও শিক্ষণীয় দিক হলো অপরাধীর সামাজিক পুনর্বাসন (Social Rehabilitation)। শাস্তি কার্যকর হওয়ার পর সেই নারী কিন্তু সমাজচ্যুত বা লাঞ্ছিত হয়নি। উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, শাস্তি পাওয়ার পর সেই নারী আন্তরিকভাবে তাওবা করে এবং তার জীবন সংশোধন করে। পরবর্তীতে সে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয় এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন শুরু করে। সে প্রায়শই আয়েশা রা.-এর কাছে আসত এবং আয়েশা রা. তার বিভিন্ন প্রয়োজন ও অভাবের কথা রাসুলুল্লাহ সা.-এর দরবারে পেশ করতেন, যা রাসুলুল্লাহ সা. পূরণ করতেন [21] [22] । হাদিসের মূল ইবারতটি নিম্নরূপ:

«قَالَتْ عَائِشَةُ: فَحَسُنَتْ تَوْبَتُهَا بَعْدُ وَتَزَوَّجَتْ، وَكَانَتْ تَأْتِي بَعْدَ ذَلِكَ فِأَرْفَعُ حَاجَتَهَا إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ»

অনুবাদ: "আয়েশা রা. বলেন: অতঃপর তার তাওবা অত্যন্ত সুন্দর হলো এবং সে বিয়ে করল। এরপর সে আমার কাছে আসত এবং আমি তার প্রয়োজনসমূহ রাসুলুল্লাহ সা.-এর দরবারে পেশ করতাম।" [23] [24] [25]

এই বিবরণটি প্রমাণ করে যে, ইসলামি বিচার ব্যবস্থায় শাস্তির উদ্দেশ্য কেবল প্রতিশোধ বা শারীরিক নির্যাতন নয়, বরং এর মূল উদ্দেশ্য হলো সমাজকে অপরাধমুক্ত করা এবং অপরাধীকে সংশোধন করে পুনরায় সমাজে মর্যাদার সাথে প্রতিষ্ঠিত করা। শাস্তি কার্যকর হওয়ার পর অপরাধীর প্রতি কোনো সামাজিক কুসংস্কার বা ঘৃণা পোষণ করা হতো না, যা আধুনিক অপরাধবিজ্ঞানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। রাসুলুল্লাহ সা.-এর এই জিরো টলারেন্স নীতি এবং একই সাথে মানবিক পুনর্বাসন প্রক্রিয়া ইসলামি রাষ্ট্রকে পৃথিবীর ইতিহাসে এক অনন্য ও আদর্শ কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল।

""
৫.৩.১ মাক্কুমি নারীর চুরির ঘটনা: ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেমে (Criminal Justice System) জিরো টলারেন্স এবং ভিআইপি কালচার (VIP Culture) উচ্ছেদ
আমাদের নবী সা. সীরাত বিশ্বকোষ
ha-mims.world
এ আর্টিকেলের কুইজ(5টি প্রশ্ন)

৫.৩.১ মাক্কুমি নারীর চুরির ঘটনা: ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেমে (Criminal Justice System) জিরো টলারেন্স এবং ভিআইপি কালচার (VIP Culture) উচ্ছেদ কুইজ

1 / 5

চুরির অপরাধে অভিযুক্ত নারী কোন গোত্রের অন্তর্ভুক্ত ছিল?

এই আর্টিকেলটি কেমন লাগলো?

এই গবেষণাকে সহায়তা করুন

সীরাত বিশ্বকোষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আপনার সামান্য সহায়তা এই গবেষণাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

bKash / Nagad01XXXXXXXXXX(Send Money)
☕ Ko-fi দিয়ে সহায়তা

রেফারেন্স: "সীরাত বিশ্বকোষ" লিখুন

🌟 Ha-mim's World-এর একটি গবেষণা ও জ্ঞান-প্রযুক্তি প্রকল্প

কমিউনিটি রিফ্লেকশন

এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি কী শিখলেন বা আপনার অনুভূতি কী, তা সবার সাথে শেয়ার করুন।

আপনার রিফ্লেকশন শেয়ার করতে দয়া করে লগইন করুন।

লোড হচ্ছে...