খণ্ড 74
ফন্ট:100%
থিম:

৫.৩ রুল অফ ল (Rule of Law): শাসকের উর্ধ্বে আইনের অবস্থান এবং বিচারিক সমতা

মানব সভ্যতার ইতিহাসে রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং মৌলিক ধারণাগুলোর একটি হলো 'আইনের শাসন' বা 'রুল অফ ল' (Rule of Law)। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এই ধারণাকে সাংবিধানিক শাসন ও নাগরিক অধিকার সুরক্ষার মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তাবিদগণ সপ্তদশ বা অষ্টাদশ শতাব্দীতে এসে এই ধারণার যে তাত্ত্বিক রূপরেখা দাঁড় করিয়েছেন, আজ থেকে চৌদ্দশত বছর পূর্বে মদিনার বুকে মহানবি হযরত মুহাম্মাদ সা. তার চেয়েও সুসংহত, প্রায়োগিক এবং ঐশ্বরিক ভিত্তিসম্পন্ন একটি আইনি ব্যবস্থার সফল বাস্তবায়ন ঘটিয়েছিলেন। ইসলামের এই আইনি দর্শনের মূল কথা ছিল—আইন কোনো ব্যক্তি বা শাসকের খেয়ালখুশির অধীন নয়, বরং স্বয়ং শাসকই আইনের অধীন। এই অধ্যায়ে আমরা আলোচনা করব কীভাবে রাসুলুল্লাহ সা. মদিনার রাষ্ট্রে আইনের সর্বোচ্চ সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং কীভাবে জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও সামাজিক মর্যাদা নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের জন্য বিচারিক সমতা নিশ্চিত করেছিলেন।

রুল অফ ল বা আইনের শাসন: একটি আধুনিক রাষ্ট্রদর্শন ও ইসলামি শরীআতের তাত্ত্বিক ভিত্তি


আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এ. ভি. ডাইসি (A. V. Dicey) তাঁর বিখ্যাত 'Introduction to the Study of the Law of the Constitution' গ্রন্থে আইনের শাসনের তিনটি মূল উপাদানের কথা উল্লেখ করেছেন: আইনের শ্রেষ্ঠত্ব (Supremacy of Law), আইনের দৃষ্টিতে সমতা (Equality before the Law), এবং সাংবিধানিক অধিকারের সুরক্ষা। আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তায় যেখানে আইনকে জনগণের প্রতিনিধি বা আইনসভার ইচ্ছার প্রতিফলন হিসেবে দেখা হয়, সেখানে ইসলামি রাষ্ট্রদর্শনে আইনের উৎস সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং অধিকতর স্থায়ী। ইসলামে সার্বভৌমত্ব ও আইন প্রণয়নের চূড়ান্ত ক্ষমতা একমাত্র মহান আল্লাহ তাআলার। ফলে, ইসলামি শরীআতে আইন কোনো রাজনৈতিক দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা বা শাসকের মর্জির ওপর ভিত্তি করে পরিবর্তিত হয় না। এটি একটি চিরন্তন ও অপরিবর্তনীয় আইনি কাঠামো প্রদান করে, যা শাসক ও শাসিত উভয়কে সমানভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখে।

আইনের এই শ্রেষ্ঠত্ব ও অলঙ্ঘনীয়তা সম্পর্কে আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আইনি দর্শনের গ্রন্থে বলা হয়েছে যে, আইনের শাসন তখনই কার্যকর হয় যখন রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তি নিজেও আইনের অনুগত থাকতে বাধ্য হন। যেমনটি বর্ণিত হয়েছে:


"ويمكن القول إن حكم القانون لا يوجد إلا حيث توجد مسبقا جملة من القوانين المتفوقة على التشريع، أي إن الفرد المتمتع بالسلطة السياسية يشعر بأنه ملزم بطاعة القانون."

অনুবাদ: "বলা যেতে পারে যে, আইনের শাসন কেবল তখনই অস্তিত্ব লাভ করে যখন আইনসভার সাধারণ আইনের ঊর্ধ্বে কিছু উচ্চতর আইনের সমষ্টি পূর্ব থেকেই বিদ্যমান থাকে; অর্থাৎ, রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তি নিজেও অনুভব করেন যে তিনি আইন মেনে চলতে বাধ্য।" [1]

ইসলামি শাসনব্যবস্থায় এই 'উচ্চতর আইন' হলো আল্লাহর কিতাব ও রাসুলের সুন্নাহ। মদিনা সনদের মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ সা. যে রাষ্ট্র কাঠামো তৈরি করেছিলেন, তার মূল ভিত্তিই ছিল এই ঐশ্বরিক আইনের শাসন। প্রশাসনের প্রতিটি স্তর এবং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তসমূহকে এই আইনের অধীনস্থ করা হয়েছিল, যা নাগরিক অধিকারের সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করত। এই প্রশাসনিক আইনি বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক আলোচনায় বলা হয়েছে:


"ويؤدي هذا المبدأ إلى مبدأ آخر وهو سيادة القانون، ويقصد بالإدارة جميع أجهزة الدولة، وإذا خضعت الإدارة للقانون فإن ذلك يؤدي إلى حماية حقوق الأفراد وحرياتهم"

অনুবাদ: "এই নীতিটি (প্রশাসনিক বৈধতা) অন্য একটি নীতির দিকে পরিচালিত করে, যা হলো আইনের সার্বভৌমত্ব। প্রশাসন বলতে রাষ্ট্রের সকল সংস্থাকে বোঝায়; আর প্রশাসন যদি আইনের অধীনস্থ হয়, তবে তা ব্যক্তির অধিকার ও স্বাধীনতা সুরক্ষার দিকে নিয়ে যায়।" [2]

ইসলামি আইন ব্যবস্থার এই অনন্য বৈশিষ্ট্যটি পশ্চিমা বা অন্যান্য প্রাচীন সভ্যতার আইনি বিবর্তন থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। উদাহরণস্বরূপ, প্রাচীন চীনের আইনি ইতিহাসে দেখা যায় যে, তারা একটি অতিপ্রাকৃতিক বা অতিমানবিক ধর্মীয় আইনের ধারণা গড়ে তুলতে পারেনি, যার ফলে সেখানে আইনের শাসন দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিতে ব্যর্থ হয়েছিল। এই ঐতিহাসিক সত্যটি আধুনিক গবেষকগণও স্বীকার করেছেন:


"الحضارة العالمية الوحيدة التي لم تطور سيادة القانون بهذا المعنى كانت الصين، غالبا لأنها لم تطور أبدا دينا متساميا يقوم عليه القانون."

অনুবাদ: "একমাত্র বৈশ্বিক সভ্যতা যা এই অর্থে আইনের শাসন বা সার্বভৌমত্ব বিকাশ করতে পারেনি তা হলো চীন; সম্ভবত এর কারণ তারা এমন কোনো অতিপ্রাকৃতিক ধর্ম গড়ে তোলেনি যার ওপর আইন প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।" [3]


রাসুলুল্লাহ সা. মদিনার বুকে যে ঐশ্বরিক আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তা কেবল তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় ছিল না, বরং তা ছিল একটি জীবন্ত ও প্রায়োগিক বাস্তবতা, যা তৎকালীন বিশ্বকে এক নতুন রাজনৈতিক ও আইনি দিশা প্রদান করেছিল।

জাহেলী যুগের আইনহীনতা ও আভিজাত্যের দম্ভ বনাম ইসলামি আইনের সাম্যবাদী বিপ্লব


ইসলাম-পূর্ব আরব উপদ্বীপে কোনো লিখিত আইন বা কেন্দ্রীয় বিচার বিভাগ ছিল না। গোত্রীয় প্রথা, পেশীশক্তি এবং সামাজিক আভিজাত্যই ছিল তৎকালীন সমাজ পরিচালনার মূল চালিকাশক্তি। প্রাক-ইসলামি আরবে 'আশ-শরীফ' বা অভিজাত শ্রেণীর জন্য এক ধরনের আইন এবং দুর্বল ও দাসদের জন্য অন্য ধরনের আইন প্রচলিত ছিল। অভিজাত গোত্রের কোনো ব্যক্তি অপরাধ করলে তাকে শাস্তি থেকে রেহাই দেওয়া হতো অথবা নামমাত্র ক্ষতিপূরণ নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হতো। পক্ষান্তরে, কোনো দুর্বল বা সাধারণ গোত্রের মানুষ অপরাধ করলে তার ওপর আইনের কঠোরতম প্রয়োগ ঘটানো হতো। অভিজাত শ্রেণীর এই সংজ্ঞা ও তাদের দম্ভ সম্পর্কে আরবি অভিধানে বলা হয়েছে:


"الشريف: هو الرجل العالي في قومه، والجمع أشراف"

অনুবাদ: "শরীফ হলেন নিজ সম্প্রদায়ের মধ্যে উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি, এর বহুবচন হলো আশরাফ।" [4]

জাহেলী যুগের এই বৈষম্যমূলক বিচার ব্যবস্থার কারণে সমাজে প্রতিনিয়ত রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ও বিশৃঙ্খলা লেগে থাকত। গোত্রীয় পক্ষপাতিত্বের কারণে কোনো সুনির্দিষ্ট আইনি মানদণ্ড বজায় রাখা সম্ভব হতো না। তৎকালীন আরবের আইনি অরাজকতা ও গোত্রীয় পক্ষপাতিত্বের চিত্র তুলে ধরে ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন:


"كانت القوانين الجاهلية تفرق بين الشريف والضعيف في تطبيق الحدود والقصاص"

অনুবাদ: "জাহেলী যুগের আইনসমূহ দণ্ডবিধি (হুদুদ) এবং প্রতিশোধের (কিসাস) ক্ষেত্রে অভিজাত ও দুর্বলের মধ্যে পার্থক্য করত।" [5]

রাসুলুল্লাহ সা. নবুওয়াত প্রাপ্তির পর এই সামাজিক ও আইনি বৈষম্যের বিরুদ্ধে এক অভূতপূর্ব বিপ্লব সাধন করেন। তিনি ঘোষণা করেন যে, আল্লাহর আইনের দৃষ্টিতে সকল মানুষ সমান। বংশমর্যাদা, ধন-সম্পদ বা সামাজিক প্রতিপত্তি কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে স্থান দিতে পারে না। রাসুলুল্লাহ সা. বিদায় হজ্জের ঐতিহাসিক ভাষণে এই সাম্যের ঘোষণা দিয়ে বলেন যে, কোনো অনারবের ওপর আরবের এবং কোনো আরবের ওপর অনারবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই; শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মাপকাঠি হলো তাকওয়া বা খোদাভীতি [6] । ইসলামের এই সাম্যবাদী আইনি সংস্কারের ফলে আরবের শত বছরের পুঞ্জীভূত গোত্রীয় অহংকার ধূলিসাৎ হয়ে যায় এবং একটি সুশৃঙ্খল, ন্যায়ভিত্তিক ও সমতাভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের পথ সুগম হয়।

শাসকের উর্ধ্বে আইনের অবস্থান: খিলাফতের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ও জবাবদিহিতা


ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, রাষ্ট্রের প্রধান বা খলীফাও আইনের ঊর্ধ্বে নন। তিনি আইনের স্রষ্টা নন, বরং আইনের কেবল একজন বিশ্বস্ত ট্রাস্টি বা বাস্তবায়নকারী মাত্র। আধুনিক সাংবিধানিক পরিভাষায় একে 'সীমিত সরকার' (Limited Government) বা 'সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা' বলা যেতে পারে। রাসুলুল্লাহ সা. নিজে আল্লাহর রাসুল এবং মদিনা রাষ্ট্রের প্রধান হওয়া সত্ত্বেও সর্বদা নিজেকে আইনের অধীন হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তিনি কখনো নিজের জন্য কোনো বিশেষ আইনি সুবিধা (Legal Immunity) দাবি করেননি। এমনকি তিনি তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলোতেও মদিনার মসজিদে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেছিলেন যে, যদি তিনি কারো ওপর কোনো অন্যায় করে থাকেন, তবে সে যেন তাঁর কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করে [7]

রাসুলুল্লাহ সা.-এর এই মহান আদর্শের ওপর ভিত্তি করেই প্রথম খলীফা হযরত আবু বকর রা. তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম ঐতিহাসিক ভাষণে ঘোষণা করেছিলেন:


"أطيعوني ما أطعت الله ورسوله، فإن عصيت الله ورسوله فلا طاعة لي عليكم"

অনুবাদ: "আমি যতক্ষণ আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করি, তোমরা ততক্ষণ আমার আনুগত্য করো। কিন্তু আমি যদি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের অবাধ্যতা করি, তবে আমার প্রতি তোমাদের আনুগত্যের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।" [8]

এই ঘোষণাটি ইসলামি রাষ্ট্রদর্শনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক মূলনীতি নির্ধারণ করে। এটি স্পষ্ট করে দেয় যে, শাসকের প্রতি জনগণের আনুগত্য শর্তহীন নয়, বরং তা শাসকের আইনের প্রতি আনুগত্যের ওপর শর্তযুক্ত। যদি শাসক নিজেই আইন লঙ্ঘন করেন, তবে জনগণ তাঁর আদেশ অমান্য করতে বাধ্য। এই বিষয়ে রাসুলুল্লাহ সা.-এর বহু হাদিস রয়েছে, যা শাসকের ক্ষমতার সীমানা নির্ধারণ করে দেয়। যেমন সহীহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে:


"لا طاعة في معصية، إنما الطاعة في المعروف"

অনুবাদ: "আল্লাহর অবাধ্যতায় কোনো আনুগত্য নেই; আনুগত্য কেবল সৎ ও ন্যায়সঙ্গত কাজে।" [9]

এই আইনি কাঠামোর কারণে ইসলামি খিলাফতে কোনো স্বৈরাচারী বা একনায়কতান্ত্রিক শাসনের সুযোগ ছিল না। খলীফাকে সর্বদা মজলিসে শূরার কাছে এবং সর্বোপরি সাধারণ জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হতো। আইনের এই পরম সার্বভৌমত্বই মদিনার রাষ্ট্রকে একটি আদর্শ কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল, যেখানে শাসকের ক্ষমতাকে আইনের কঠোর শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছিল।

বিচারিক সমতা ও আইনি প্রক্রিয়া: বাইয়্যিনাহ, ইয়ামীন এবং প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতা


একটি কার্যকর আইনি ব্যবস্থার প্রাণ হলো তার বিচারিক প্রক্রিয়া ও নিরপেক্ষতা। রাসুলুল্লাহ সা. মদিনার বিচার ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণের ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তিনি বিচারিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ, আত্মীয়তা বা রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে কেবল অকাট্য প্রমাণ ও সাক্ষ্যের ভিত্তিতে রায় প্রদানের নীতি প্রবর্তন করেন। ইসলামি বিচার ব্যবস্থার এই মৌলিক আইনি নীতিটি 'বাইয়্যিনাহ' (প্রমাণ) এবং 'ইয়ামীন' (শপথ) নামে পরিচিত, যা আধুনিক বিচার ব্যবস্থার 'Burden of Proof' বা প্রমাণের দায়ের সমতুল্য। রাসুলুল্লাহ সা. ঘোষণা করেন:


"البينة على المدعي، واليمين على من أنكر"

অনুবাদ: "দাবীদার বা বাদীর ওপর প্রমাণ উপস্থাপনের দায়িত্ব এবং যে অস্বীকার করবে (বিবাদী) তার ওপর শপথ করা আবশ্যক।" [10]

এই আইনি মূলনীতিটি নিশ্চিত করে যে, কেবল মৌখিক অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যাবে না, যতক্ষণ না বাদীপক্ষ উপযুক্ত প্রমাণ বা সাক্ষী উপস্থাপন করতে পারছে। এটি নাগরিকের আইনি সুরক্ষার এক অনন্য দলিল। রাসুলুল্লাহ সা. যখন তাঁর সাহাবি হযরত মুআয বিন জাবাল রা.-কে ইয়ামেনের গভর্নর ও বিচারক হিসেবে প্রেরণ করেন, তখন তিনি তাঁকে বিচারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে একটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতিগত নির্দেশনা প্রদান করেছিলেন, যা ইসলামি আইনের ইতিহাসে 'ইজতিহাদ' ও বিচারিক প্রজ্ঞার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত:


"أقضي بكتاب الله، فإن لم أجد فبسنة رسول الله، فإن لم أجد أجتهد رأيي ولا آلو"

অনুবাদ: "(মুআয রা. বললেন) আমি আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী ফয়সালা করব। যদি সেখানে না পাই, তবে রাসুলুল্লাহ সা.-এর সুন্নাহ অনুযায়ী ফয়সালা করব। আর যদি সেখানেও না পাই, তবে আমি আমার নিজস্ব প্রজ্ঞা ও ইজতিহাদের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেব এবং এতে কোনো ত্রুটি করব না।" [11]

ইসলামি বিচারিক সমতার আরেকটি অনন্য দিক হলো অমুসলিম নাগরিকদের (জিম্মী) অধিকার সুরক্ষা। মদিনা রাষ্ট্রে বসবাসকারী অমুসলিম ইহুদী ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায় মুসলিমদের মতোই সমান আইনি অধিকার ভোগ করত। তাদের ধর্মীয় ও ব্যক্তিগত বিষয়গুলো তাদের নিজস্ব আইন অনুযায়ী বিচার করা হতো, এবং দেওয়ানী ও ফৌজদারী মামলায় তাদের সাথে কোনো বৈষম্য করা হতো না। অমুসলিম নাগরিকদের অধিকার ক্ষুণ্ন করার ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সা. কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছিলেন:


"من ظلم معاهدا أو انتقصه أو كلفه فوق طاقته أو أخذ منه شيئا بغير طيب نفس فأنا حجيجه يوم القيامة"

অনুবাদ: "যে ব্যক্তি কোনো চুক্তিবদ্ধ অমুসলিম নাগরিকের (মুয়াহিদ) ওপর জুলুম করবে, তার অধিকার খর্ব করবে, তার সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে দেবে অথবা তার অমতে তার কোনো সম্পদ কেড়ে নেবে, কিয়ামতের দিন আমি স্বয়ং তার বিরুদ্ধে বাদী হব।" [12]

এই প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতা ও বিচারিক সমতার ফলেই মদিনার বিচার ব্যবস্থা তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও ন্যায়নিষ্ঠ বিচার ব্যবস্থা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছিল। যেখানে একজন সাধারণ নাগরিক, এমনকি একজন অমুসলিমও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ শাসকের বিরুদ্ধে আদালতে দাঁড়িয়ে নিজের অধিকার আদায় করতে পারত। আইনের এই পরম সমতা ও নিরপেক্ষতাই ছিল ইসলামি রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব ও সফলতার মূল চাবিকাঠি।

""
৫.৩ রুল অফ ল (Rule of Law): শাসকের উর্ধ্বে আইনের অবস্থান এবং বিচারিক সমতা
আমাদের নবী সা. সীরাত বিশ্বকোষ
ha-mims.world
এ আর্টিকেলের কুইজ(5টি প্রশ্ন)

৫.৩ রুল অফ ল (Rule of Law): শাসকের উর্ধ্বে আইনের অবস্থান এবং বিচারিক সমতা কুইজ

1 / 5

ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থায় আইনের শাসনের (Rule of Law) মূল বৈশিষ্ট্য কী?

এই আর্টিকেলটি কেমন লাগলো?

এই গবেষণাকে সহায়তা করুন

সীরাত বিশ্বকোষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আপনার সামান্য সহায়তা এই গবেষণাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

bKash / Nagad01XXXXXXXXXX(Send Money)
☕ Ko-fi দিয়ে সহায়তা

রেফারেন্স: "সীরাত বিশ্বকোষ" লিখুন

🌟 Ha-mim's World-এর একটি গবেষণা ও জ্ঞান-প্রযুক্তি প্রকল্প

কমিউনিটি রিফ্লেকশন

এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি কী শিখলেন বা আপনার অনুভূতি কী, তা সবার সাথে শেয়ার করুন।

আপনার রিফ্লেকশন শেয়ার করতে দয়া করে লগইন করুন।

লোড হচ্ছে...