৬.১ ইয়েমেনের রাজনৈতিক অস্থিরতা: হিমায়রীয় সাম্রাজ্য, ইহুদি শাসন ও খ্রিষ্টানদের নিপীড়ন
আরব উপদ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত ইয়েমেন প্রাচীনকাল থেকেই তার সমৃদ্ধি, কৌশলগত অবস্থান এবং উন্নত জলসেচ ব্যবস্থার জন্য বিশ্ববিখ্যাত ছিল। তবে ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বমুহূর্তে এই অঞ্চলটি এক চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা, ধর্মীয় সংঘাত এবং সাম্রাজ্যবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল। বিশেষ করে হিমায়রীয় সাম্রাজ্যের উত্থান, সেখানে ইহুদি ধর্মের রাষ্ট্রীয় প্রভাব এবং পরবর্তীতে খ্রিষ্টানদের ওপর চালানো নির্মম নিপীড়ন দক্ষিণ আরবের ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রকে আমূল বদলে দিয়েছিল। এই অস্থিরতা কেবল স্থানীয় সংঘাত ছিল না, বরং এর পেছনে ছিল রোমান (বাইজেন্টাইন) এবং পারস্য সাম্রাজ্যের এক অদৃশ্য ছায়াযুদ্ধ, যা ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছিল।
হিমায়রীয় সাম্রাজ্যের উত্থান ও ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব
দক্ষিণ আরবের প্রাচীন ইতিহাসে সাবা (Sheba) সাম্রাজ্যের পতন এবং হিমায়রীয় সাম্রাজ্যের উত্থান একটি যুগান্তকারী ঘটনা। সাবা সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় শাসন যখন দুর্বল হয়ে পড়ে এবং তাদের বিখ্যাত বাঁধটি ভেঙে অর্থনৈতিক বিপর্যয় নেমে আসে, তখন হিমায়রীয়রা সেই শূন্যতাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করে। ঐতিহাসিক তথ্যানুসারে, সাবা সাম্রাজ্যের দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই হিমায়রীয় রাজ্যের উত্থান ঘটে। এই প্রসঙ্গে বলা হয়েছে:
وبعد أن تضعضع ملك سبأ، وضعف أمر القائمين عليه قامت مملكة «حمير» ، وقد حاولت أن تصلح السدود الموجودة، ولكنها لم تلبث أن انهارت مرة أخرى [1] হিমায়রীয় শাসকরা কেবল সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করেননি, বরং তারা প্রশাসনিক সংস্কার এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের চেষ্টা করেছিলেন। তারা সাবা সাম্রাজ্যের ধ্বংসাবশেষ থেকে নতুন করে রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে তোলেন এবং জফাড় (Zafar) শহরকে তাদের রাজধানী হিসেবে নির্ধারণ করেন [2] । এই সাম্রাজ্যের রাজাদের বিশেষ উপাধি ছিল 'তুব্বা' (Tubba'), যা তাদের সার্বভৌম ক্ষমতা এবং বিশাল প্রভাবশক্তির প্রতীক হিসেবে গণ্য হতো। তুব্বা রাজাদের শাসনকাল ছিল অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং তারা আরব উপদ্বীপের বিভিন্ন গোত্রের ওপর নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, হিমায়রীয় সাম্রাজ্যের এই উত্থান ছিল মূলত একটি ভূ-রাজনৈতিক কৌশল। তারা দক্ষিণ আরবের বাণিজ্য পথ এবং সমুদ্রবন্দরগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হয়েছিল, যা তাদের অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী করে তোলে। তবে এই শক্তির পেছনে ছিল এক ধরনের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা। তুব্বা রাজাদের বংশপরম্পরায় ক্ষমতার লড়াই এবং বিভিন্ন উপজাতীয় গোষ্ঠীর সাথে তাদের দ্বন্দ্ব সাম্রাজ্যের স্থিতিশীলতাকে বারবার হুমকির মুখে ফেলেছিল। ঐতিহাসিক ইবনে খলদুন রহ. তার গবেষণায় উল্লেখ করেছেন যে, তুব্বা রাজাদের প্রথম শাসক ছিলেন আল-হারিস আল-রাঈশ, যার শাসনকাল থেকে হিমায়রীয়দের রাজনৈতিক প্রভাব সুসংহত হতে শুরু করে [3] ।
হিমায়রীয়দের এই সাম্রাজ্যতাত্ত্বিক বিস্তার কেবল দক্ষিণ আরবে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তারা মধ্য আরব এবং উত্তর আরবের বিভিন্ন অঞ্চলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিল। তবে তাদের এই আধিপত্যের পেছনে ছিল এক ধরনের কঠোর সামরিক শাসন, যা অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় গোত্রগুলোর মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছিল। এই অভ্যন্তরীণ সংঘাত এবং বহিঃশক্তির প্রভাবই পরবর্তীতে ইয়েমেনের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পথ প্রশস্ত করে।
ইহুদি শাসনের প্রবর্তন ও রাজনৈতিক রূপান্তর
হিমায়রীয় সাম্রাজ্যের একপর্যায়ে একটি নাটকীয় ধর্মীয় ও রাজনৈতিক রূপান্তর ঘটে। প্রাচীন আরবের বহুঈশ্বরবাদী বিশ্বাস এবং স্থানীয় ধর্মাবলম্বী শাসনব্যবস্থা থেকে সরে এসে হিমায়রীয় রাজবংশ ইহুদি ধর্ম গ্রহণ করে। এই রূপান্তর কেবল ব্যক্তিগত বিশ্বাস বা আধ্যাত্মিক পরিবর্তনের ফল ছিল না, বরং এর পেছনে ছিল গভীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। তৎকালীন সময়ে ইহুদি ধর্ম একটি সুসংগঠিত আইনি ও প্রশাসনিক কাঠামো প্রদান করত, যা হিমায়রীয় রাজাদের জন্য তাদের সাম্রাজ্যকে আরও সুসংহত করতে সহায়ক হয়েছিল।
ইহুদি শাসন প্রবর্তনের ফলে ইয়েমেনের শাসনব্যবস্থায় এক ধরনের আমূল পরিবর্তন আসে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ইহুদি ধর্ম প্রচার শুরু হয় এবং রাজদরবারে ইহুদি পণ্ডিত ও উপদেষ্টাদের প্রভাব বৃদ্ধি পায়। এই রাজনৈতিক রূপান্তর সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মতে, হিমায়রীয় রাজারা ইহুদি ধর্মকে একটি ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন যাতে তারা রোমান সাম্রাজ্যের খ্রিষ্টান প্রভাব থেকে নিজেদের মুক্ত রাখতে পারেন। এই বিষয়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিক উৎসে আলোচনা করা হয়েছে, যার মধ্যে তাবারী এবং ইবনে খলদুনের বর্ণনা উল্লেখযোগ্য [4] ।
রাজনৈতিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে একে 'আইডেন্টিটি পলিটিক্স' বা পরিচয়বাদী রাজনীতি বলা যেতে পারে। হিমায়রীয় শাসকরা যখন দেখলেন যে খ্রিষ্টান ধর্ম মূলত রোমান এবং আবিসিনীয় (Habesha) সাম্রাজ্যের প্রভাব বহন করছে, তখন তারা তার বিপরীতে ইহুদি ধর্মকে রাষ্ট্রীয় আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেন। এর ফলে ইয়েমেনের শাসনকাঠামোতে এক ধরনের ধর্মতাত্ত্বিক কঠোরতা চলে আসে। ইহুদি শাসকরা কেবল ধর্মীয় নেতৃত্বই দেননি, বরং তারা ইয়েমেনের অর্থনীতি এবং কূটনীতিতেও ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেন। এর ফলে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে একটি নতুন মেরুকরণ সৃষ্টি হয়—একদিকে রাজকীয় ইহুদি শাসন এবং অন্যদিকে প্রান্তিক খ্রিষ্টান ও বহুঈশ্বরবাদী জনগোষ্ঠী।
এই ইহুদি শাসনকাল ইয়েমেনের ইতিহাসে এক জটিল অধ্যায়। একদিকে তারা প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি করেছিলেন, অন্যদিকে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা এবং জোরপূর্বক ধর্মান্তকরণের চেষ্টা রাজনৈতিক অস্থিরতাকে আরও তীব্র করে তোলে। বিশেষ করে যখন ইহুদি শাসকরা অনুভব করলেন যে খ্রিষ্টানদের প্রভাব তাদের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি, তখন তারা দমনমূলক নীতি গ্রহণ করেন। এই রাজনৈতিক রূপান্তরই ইয়েমেনের সামাজিক সংহতি নষ্ট করে এবং এক দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের পরিবেশ তৈরি করে, যা শেষ পর্যন্ত বহিঃশক্তির হস্তক্ষেপের পথ প্রশস্ত করে [5] ।
ধর্মীয় সংঘাত ও রাজনৈতিক নিপীড়নের প্রেক্ষাপট
ইহুদি শাসনের প্রবর্তনের পর ইয়েমেনের রাজনৈতিক পরিবেশ অত্যন্ত বিষাক্ত হয়ে ওঠে। বিশেষ করে নাজরান (Najran) অঞ্চলের খ্রিষ্টানদের সাথে হিমায়রীয় ইহুদি শাসকদের সংঘাত চরম আকার ধারণ করে। নাজরানের খ্রিষ্টানরা কেবল ধর্মীয়ভাবে স্বতন্ত্র ছিল না, বরং তারা রাজনৈতিকভাবে আবিসিনীয় সাম্রাজ্যের (Axumite Empire) সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখত। হিমায়রীয় রাজাদের দৃষ্টিতে এটি ছিল রাষ্ট্রদ্রোহিতা এবং সার্বভৌমত্বের পরিপন্থী। ফলে, ধর্মীয় সংঘাত এখানে রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রশ্নে রূপ নেয়।
হিমায়রীয় শাসকরা, বিশেষ করে তাদের শেষ দিকের রাজারা, খ্রিষ্টানদের ওপর চরম নিপীড়ন শুরু করেন। এই নিপীড়নের মূল লক্ষ্য ছিল নাজরানের খ্রিষ্টানদের রাজনৈতিক প্রভাব খর্ব করা এবং তাদের আবিসিনীয় সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা। ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, এই নিপীড়ন কেবল ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে ছিল না, বরং এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক কৌশল যাতে দক্ষিণ আরবের ওপর একক আধিপত্য বজায় রাখা যায় [6] । এই নিপীড়নের ফলে নাজরানের খ্রিষ্টানরা চরম মানবেতর জীবন যাপন করতে বাধ্য হয় এবং তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকার খর্ব করা হয়।
এই রাজনৈতিক অস্থিরতার পেছনে কাজ করছিল একটি বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ। রোমান সাম্রাজ্য এবং আবিসিনীয় সাম্রাজ্য খ্রিষ্টানদের রক্ষাকর্তা হিসেবে নিজেদের দাবি করত, আর হিমায়রীয় ইহুদি শাসকরা পারস্যের সাথে গোপন আঁতাত করে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চেয়েছিলেন। ফলে ইয়েমেন হয়ে ওঠে দুটি পরাশক্তির প্রক্সি ওয়ার বা ছায়াযুদ্ধের রণক্ষেত্র। নাজরানের খ্রিষ্টানদের ওপর চালানো নিপীড়ন কেবল স্থানীয় ঘটনা ছিল না, বরং এটি ছিল আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক অংশ। এই নিপীড়নের তীব্রতা এতটাই বৃদ্ধি পায় যে, তা আবিসিনীয় সম্রাটদের উত্তেজিত করে তোলে এবং তারা ইয়েমেনে সামরিক হস্তক্ষেপের পরিকল্পনা করতে শুরু করেন [7] ।
সামাজিকভাবে এই নিপীড়ন ইয়েমেনের ভেতরে এক গভীর বিভাজন সৃষ্টি করে। একদিকে রাজকীয় ক্ষমতার দাপটে ভীত সাধারণ মানুষ এবং অন্যদিকে ধর্মীয় বিশ্বাসের জন্য জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত একদল খ্রিষ্টান। এই চরম অসহিষ্ণুতা এবং রাজনৈতিক দমন-পীড়ন ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়। রাজকীয় বাহিনীর নির্মমতা এবং খ্রিষ্টানদের প্রতি ঘৃণা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার এক চরম সীমায় পৌঁছেছিল, যা দক্ষিণ আরবের ইতিহাসে এক অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। এই রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নিপীড়নের চরম পরিণতি যা ছিল, তা পরবর্তী সময়ের এক ভয়াবহ ঘটনার দিকে ইশারা করছিল, যা ইয়েমেনের ইতিহাসে চিরস্থায়ীভাবে খোদাই করা থাকে।