অধ্যায় ৬: হস্তীবর্ষের প্রেক্ষাপট: ইয়েমেনের ভূ-রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সংঘাত (Geopolitics of Yemen)
খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষভাগে আরবে যে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা পরিলক্ষিত হয়, তার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল দক্ষিণ আরবের ইয়েমেন। হস্তীবর্ষের সেই ঐতিহাসিক ঘটনার নেপথ্যে কেবল একটি মন্দিরের ধ্বংসের আকাঙ্ক্ষা ছিল না, বরং তার গভীরে প্রোথিত ছিল তৎকালীন বিশ্বের দুই পরাশক্তি—সাসানীয় পারস্য এবং বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের তীব্র ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা। ইয়েমেন ছিল সেই সময়ের কৌশলগত ভূখণ্ড (Strategic Terrain), যা নিয়ন্ত্রণ করার অর্থ ছিল ভারত মহাসাগর এবং লোহিত সাগরের বাণিজ্যপথের ওপর আধিপত্য বিস্তার করা। এই ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণটি বুঝতে হলে তৎকালীন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জটিল জাল এবং ইয়েমেনের ভৌগোলিক গুরুত্ব বিশ্লেষণ করা অপরিহার্য।
সাসানীয় পারস্যের ভূ-রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও দক্ষিণ আরব
সাসানীয় পারস্য সাম্রাজ্য তাদের সাম্রাজ্যবাদী সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে দক্ষিণ আরবের ইয়েমেনের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছিল। পারস্যের মূল লক্ষ্য ছিল লোহিত সাগরের প্রবেশপথে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করা, যাতে করে তারা বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে পারে। ইয়েমেনের ভূখণ্ডটি পারস্যের জন্য কেবল একটি আঞ্চলিক ভূখণ্ড ছিল না, বরং এটি ছিল একটি 'বাফার জোন' এবং কৌশলগত প্রস্থান পথ। পারস্যের এই উচ্চাকাঙ্ক্ষারই বহিঃপ্রকাশ ঘটে ইয়েমেনে তাদের সামরিক ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে।
ঐতিহাসিক তথ্যানুসারে, ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পারস্যের প্রভাব এতটাই গভীর ছিল যে, সেখানে পারস্য বংশোদ্ভূত ব্যক্তিদের একটি শক্তিশালী গোষ্ঠী গড়ে উঠেছিল। এই গোষ্ঠীটি পারস্যের রাজদরবারের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করত এবং স্থানীয় শাসনব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তার করত। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হয়:
أي أبناء أهل فارس في اليمن। এই ইবারাতটি প্রমাণ করে যে, ইয়েমেনের রাজনৈতিক কাঠামোতে পারস্যের রক্ত ও সংস্কৃতির সংমিশ্রণ ঘটেছিল, যা মূলত একটি পরিকল্পিত ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের অংশ ছিল।
পারস্যের এই হস্তক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য ছিল ইয়েমেনের সমৃদ্ধ কৃষি ব্যবস্থা এবং বাণিজ্য বন্দরগুলোকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনা। তারা জানত যে, ইয়েমেনের নিয়ন্ত্রণ থাকলে তারা আরব উপদ্বীপের অভ্যন্তরে তাদের প্রভাব বিস্তার করতে পারবে এবং মক্কাসহ হিজাজ অঞ্চলের বাণিজ্য পথগুলোকে পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করতে পারবে। এই কৌশলগত অবস্থানটি পারস্যকে বাইজেন্টাইনদের বিপরীতে একটি শক্তিশালী দরকষাকষির ক্ষমতা প্রদান করেছিল, যা তৎকালীন আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক নতুন মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য ও আকসুমীয় সাম্রাজ্যের কৌশলগত জোট
সাসানীয় পারস্যের ক্রমবর্ধমান প্রভাব রুখতে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য একটি অত্যন্ত সুনিপুণ 'প্রক্সি ওয়ার' (Proxy War) বা পরোক্ষ যুদ্ধের কৌশল অবলম্বন করে। তারা সরাসরি যুদ্ধে না নেমে ইথিওপিয়ার আকসুমীয় সাম্রাজ্যের সাথে একটি কৌশলগত জোট গঠন করে। আকসুমীয়রা ছিল খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী এবং বাইজেন্টাইনদের সাথে তাদের ধর্মীয় ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড় ছিল। এই জোটের মূল লক্ষ্য ছিল লোহিত সাগরের দুই তীরের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা এবং পারস্যের দক্ষিণ আরব অভিযানের পথ রুদ্ধ করা।
বাইজেন্টাইনদের এই কূটনীতি ছিল মূলত 'কালেক্টিভ সিকিউরিটি' (Collective Security) বা যৌথ নিরাপত্তার একটি আদি রূপ। তারা আকসুমীয়দের উৎসাহিত করে ইয়েমেনে সামরিক হস্তক্ষেপ করতে, যাতে করে পারস্যের প্রভাব নির্মূল হয় এবং খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। এই সামরিক পদক্ষেপটি কেবল ধর্মীয় নয়, বরং চরমভাবে রাজনৈতিক ছিল। লোহিত সাগরের নৌ-চলাচল এবং সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছিল এই জোটের প্রধান লক্ষ্য। এই প্রসঙ্গে নৌ-কৌশলের গুরুত্ব উল্লেখ করা হয়েছে:
هجرة المسلمين إلى الحبشة كانت الأولى في ركوب البحر: عرف المسلمون البحر منذ فجر الإسلام، وذلك من خلال هجرة فريق منهم إلى الحبشة هرباً من إيذاء... [1] । যদিও এই উদ্ধৃতিটি পরবর্তী সময়ের হিজরতের কথা বলে, তবে এটি প্রমাণ করে যে তৎকালীন সময়ে লোহিত সাগরের নৌ-পথ এবং আকসুম (হাবশা)-ইয়েমেন সংযোগটি কতটা সক্রিয় এবং গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
আকসুমীয়দের ইয়েমেন অভিযান ছিল বাইজেন্টাইনদের ভূ-রাজনৈতিক দাবার একটি চাল। এর ফলে ইয়েমেনে একটি নতুন শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়, যা পারস্যের প্রভাবকে সাময়িকভাবে স্তিমিত করে দেয়। তবে এই পরিবর্তন ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকে আরও নড়বড়ে করে তোলে, কারণ স্থানীয় আরবরা এই বিদেশি শাসনকে সহজভাবে গ্রহণ করেনি। ফলে ইয়েমেন হয়ে ওঠে এক আন্তর্জাতিক রণক্ষেত্র, যেখানে পরাশক্তিদের স্বার্থের সংঘাত সাধারণ মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে [2] ।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথ ও অর্থনৈতিক ভূ-রাজনীতি
ইয়েমেনের গুরুত্বের একটি প্রধান কারণ ছিল এর অর্থনৈতিক অবস্থান। প্রাচীনকাল থেকেই ইয়েমেন ছিল 'ধূপ পথ' (Incense Route) এবং মশলা বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র। দক্ষিণ আরব থেকে আসা মূল্যবান সুগন্ধি, লোবান এবং মশলাগুলো ইয়েমেনের বন্দর দিয়ে আরবের অভ্যন্তরে প্রবেশ করত এবং সেখান থেকে মক্কার কাফেলাগুলোর মাধ্যমে সিরিয়া ও মিশরে পৌঁছাত। এই বাণিজ্য পথটি ছিল তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম লাভজনক অর্থনৈতিক করিডোর।
ইয়েমেনের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি কেবল কৃষির ওপর নয়, বরং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল ছিল। ইয়েমেনের বিশেষ পোশাক এবং বস্ত্রশিল্প বিশ্বজুড়ে সমাদৃত ছিল, যা তাদের অর্থনৈতিক শক্তির অন্যতম উৎস ছিল। যেমন উল্লেখ আছে:
هي برود اليمن منسوبة إلى معافر، وهي قبيلة باليمن [3] । এই ধরণের উচ্চমানের পণ্য উৎপাদন এবং রপ্তানি ইয়েমেনকে একটি অর্থনৈতিক শক্তিকেন্দ্রে পরিণত করেছিল, যা আন্তর্জাতিক পরাশক্তিদের লোভাতুর করে তুলেছিল।
যখন ইয়েমেনের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়, তখন তার প্রভাব সরাসরি মক্কার কুরাইশদের ওপর পড়ে। কুরাইশদের বাণিজ্য কাফেলাগুলো ইয়েমেনের স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভরশীল ছিল। ইয়েমেনে যখনই কোনো সংঘাত বা শাসন পরিবর্তন ঘটত, তখন বাণিজ্য পথগুলো অনিরাপদ হয়ে পড়ত। এই অর্থনৈতিক যুদ্ধ (Economic Warfare) কেবল ইয়েমেনের ভেতরে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা পুরো আরব উপদ্বীপের অর্থনীতিতে কম্পন সৃষ্টি করত। পারস্য এবং বাইজেন্টাইনদের এই লড়াইয়ের মূল লক্ষ্য ছিল এই বাণিজ্য পথের নিয়ন্ত্রণ দখল করা, যাতে করে তারা বৈশ্বিক বাণিজ্যের ওপর একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করতে পারে [4] ।
পরিশেষে, হস্তীবর্ষের সেই ঘটনাটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না, বরং এটি ছিল দীর্ঘদিনের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার চরম বহিঃপ্রকাশ। ইয়েমেনের মাটি ছিল সেই দাবার বোর্ড, যেখানে পারস্যের উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং বাইজেন্টাইন-আকসুমীয় জোটের কৌশলগত লড়াই চূড়ান্ত রূপ নিয়েছিল। এই আন্তর্জাতিক সংঘাতের ফলে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা চরম অস্থিরতার মুখে পড়ে, যা পরবর্তীতে এক ভয়াবহ রাজনৈতিক সংকটের জন্ম দেয়।