অধ্যায় ৬: কূটনৈতিক সম্পর্ক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়া (Diplomatic Relations and State Response)
মদিনা রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন এবং হুদায়বিয়ার সন্ধির পর ইসলামের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিধি এক নতুন ও বৈপ্লবিক মাত্রায় উন্নীত হয়। রাসুলুল্লাহ সা. কেবল একটি আধ্যাত্মিক সম্প্রদায়ের ধর্মীয় নেতাই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একটি উদীয়মান সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রধান স্থপতি, দূরদর্শী কূটনীতিবিদ এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রবক্তা। তৎকালীন বিশ্বরাজনীতির জটিল প্রেক্ষাপটে মদিনা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়ন এবং বিশ্বনেতৃবৃন্দের কাছে ইসলামের শাশ্বত বাণী পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর গৃহীত কূটনৈতিক কৌশল আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের গবেষকদের গভীরভাবে বিস্মিত করে। ইসলামের বৈদেশিক নীতি (Foreign Policy) কেবল সাময়িক রাজনৈতিক লাভ-ক্ষতি বা উপযোগবাদের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেনি, বরং তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সততা, ন্যায়পরায়ণতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং চুক্তির অলঙ্ঘনীয়তার মতো শাশ্বত নৈতিক ভিত্তির ওপর। এই অধ্যায়ে আমরা মদিনা রাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্কের তাত্ত্বিক ভিত্তি, চুক্তির অলঙ্ঘনীয়তা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সা.-এর অনুসৃত কালজয়ী নীতিমালার এক নিবিড় ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করব।
১. ইসলামি আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তি ও চুক্তি সম্পাদনের মূলনীতি (Foundations of Islamic International Law and Treaty Principles)
ইসলামি আন্তর্জাতিক আইনের (Siyar) অন্যতম প্রধান উৎস হলো রাষ্ট্রীয় চুক্তি ও দ্বিপাক্ষিক প্রতিশ্রুতি। আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনের অন্যতম মূল ভিত্তি 'Pacta sunt servanda' (চুক্তি অবশ্যই পালনীয়) নীতিটি দেড় হাজার বছর পূর্বেই ইসলাম অত্যন্ত কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করেছে। ইসলামে চুক্তি রক্ষা করা কেবল একটি রাজনৈতিক বা নৈতিক বাধ্যবাধকতা নয়, বরং এটি একটি অন্যতম প্রধান ধর্মীয় ইবাদত, যা সরাসরি ঈমানের সাথে সম্পৃক্ত। চুক্তির প্রতি বিশ্বস্ততা প্রদর্শন করা আল্লাহর প্রতি আনুগত্য প্রকাশেরই একটি অংশ।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মানব ইতিহাসের অধিকাংশ বিপর্যয় ও যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে রাষ্ট্রনায়কদের চুক্তিভঙ্গ এবং পারস্পরিক প্রতিশ্রুতির অমর্যাদার কারণে। উদাহরণস্বরূপ, আধুনিক ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, ১৯৩৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও নাৎসি জার্মানির মধ্যে সম্পাদিত অনাগ্রাসন চুক্তি (Molotov-Ribbentrop Pact) যেভাবে পারস্পরিক ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের দ্বন্দ্বে ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছিল [উইলিয়াম এল. শিরার,
দ্য রাইজ অ্যান্ড ফল অব দ্য থার্ড রাইখ, ১৯৬০], তার বিপরীতে ইসলামের চুক্তি রক্ষার নীতি ছিল সম্পূর্ণ আপসহীন ও ঐশ্বরিক নির্দেশনার অধীন [1] । ইসলামে চুক্তিভঙ্গকে মুনাফিকি ও চরম পাপাচার হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। ইসলামের দৃষ্টিতে, কোনো চুক্তি যদি মুসলমানদের জন্য সাময়িকভাবে ক্ষতিকরও প্রতীয়মান হয়, তবুও তা ভঙ্গ করার কোনো সুযোগ নেই, যতক্ষণ না অপর পক্ষ চুক্তি ভঙ্গ করছে।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা চুক্তি সম্পাদনের গুরুত্ব এবং তা পূর্ণ করার ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর নির্দেশ প্রদান করেছেন। ইরশাদ হয়েছে:
অনুবাদ: "এবং তোমরা প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করো; নিশ্চয়ই প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে।" ইসরা: ৩৪">[2] ।
অন্যত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা মুমিনদের সতর্ক করে বলেন:
অনুবাদ: "তোমরা আল্লাহর নামে অঙ্গীকার করার পর সেই অঙ্গীকার পূর্ণ করো এবং শপথ দৃঢ় করার পর তা ভঙ্গ করো না, অথচ তোমরা আল্লাহকে তোমাদের জামিনদার করেছ। নিশ্চয়ই তোমরা যা করো আল্লাহ তা জানেন।" [3] ।
এই আয়াতগুলোর মাধ্যমে স্পষ্ট হয় যে, অমুসলিম বা শত্রুভাবাপন্ন কোনো পক্ষের সাথেও যদি কোনো চুক্তি সম্পাদিত হয়, তবে তা রক্ষা করা মুসলমানদের জন্য বাধ্যতামূলক। চুক্তিভঙ্গকারীদের ইসলামে নিকৃষ্টতম জীব হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। যেমন কুরআনে বর্ণিত হয়েছে:
অনুবাদ: "নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট নিকৃষ্টতম জীব তারাই যারা কুফরি করেছে এবং ঈমান আনেনি। যাদের সাথে তুমি চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়ার পর তারা প্রতিবারই তাদের চুক্তি ভঙ্গ করে এবং তারা ভয় করে না।" [4] । এই আয়াতগুলোর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সততা ও বিশ্বস্ততা বজায় রাখা ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যতম অপরিহার্য স্তম্ভ [5] ।
২. চুক্তির অলঙ্ঘনীয়তা ও বাস্তব প্রয়োগ: হুদায়বিয়া ও বদরের ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত (Inviolability of Treaties in Practice: Hudaybiyyah and Badr)
রাসুলুল্লাহ সা. তাঁর ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় জীবনে চুক্তির এই অলঙ্ঘনীয়তা যেভাবে বাস্তবায়ন করেছেন, তার কোনো সমকক্ষ নজির মানব ইতিহাসের কূটনীতিতে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। হুদায়বিয়ার সন্ধির সময় মক্কার কুরাইশদের সাথে সম্পাদিত চুক্তির অন্যতম শর্ত ছিল যে, মক্কা থেকে কোনো ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করে মদিনায় আশ্রয় নিলে তাকে মক্কায় ফেরত পাঠাতে হবে। এই চুক্তি স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া চলাকালেই কুরাইশ প্রতিনিধি সুহাইল বিন আমরের পুত্র আবু জন্ডল রা. শিকল পরিহিত অবস্থায় মক্কার কারাগার থেকে পালিয়ে রাসুলুল্লাহ সা.-এর দরবারে এসে উপস্থিত হন এবং আকুল আবেদন জানান যেন তাকে কাফেরদের নির্যাতনে ফেরত পাঠানো না হয়।
কিন্তু সুহাইল বিন আমর চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিতে অনড় থাকেন। এই চরম মনস্তাত্ত্বিক ও মানবিক সংকটের মুহূর্তেও রাসুলুল্লাহ সা. চুক্তির মর্যাদা রক্ষার্থে আবু জন্ডল রা.-কে মক্কায় ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। তিনি অত্যন্ত ব্যথিত হৃদয়ে আবু জন্ডল রা.-কে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন:
অনুবাদ: "হে আবু জন্ডল! ধৈর্য ধারণ করো এবং সওয়াবের আশা রাখো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমার এবং তোমার সাথে থাকা দুর্বলদের জন্য মুক্তির কোনো পথ ও উপায় বের করে দেবেন। আমরা এই সম্প্রদায়ের সাথে একটি চুক্তি সম্পাদন করেছি এবং এর ওপর তাদেরকে আল্লাহর অঙ্গীকার দিয়েছি এবং তারাও আমাদের অঙ্গীকার দিয়েছে। আর আমরা তাদের সাথে বিশ্বাসভঙ্গ করতে পারি না।" [6] ।
অনুরূপ আরেকটি বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছিল বদর যুদ্ধের প্রাক্কালে। সাহাবি হুজাইফা বিন ইয়ামান রা. এবং তাঁর পিতা হুসাইল রা. মক্কা থেকে মদিনায় আসার পথে কুরাইশদের হাতে বন্দী হন। কুরাইশরা এই শর্তে তাঁদের মুক্তি দেয় যে, তাঁরা মদিনায় গিয়ে রাসুলুল্লাহ সা.-এর সাথে কুরাইশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবেন না। তাঁরা মদিনায় পৌঁছে রাসুলুল্লাহ সা.-কে বিষয়টি অবহিত করলে তিনি তাঁদের যুদ্ধে অংশ নিতে নিষেধ করেন এবং বলেন:
অনুবাদ: "তোমরা উভয়ে ফিরে যাও (যুদ্ধক্ষেত্র থেকে দূরে থাকো)। আমরা তাদের সাথে কৃত চুক্তি রক্ষা করব এবং তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করব।" [7] ।
বদরের মতো একটি জীবন-মরণ সন্ধিক্ষণে, যেখানে প্রতিটি সৈন্যের উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সেখানেও রাসুলুল্লাহ সা. কাফেরদের সাথে কৃত চুক্তি ভঙ্গ করেননি। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, ইসলামি কূটনীতিতে সামরিক বা রাজনৈতিক স্বার্থের চেয়ে নৈতিক মূল্যবোধ ও প্রতিশ্রুতির মর্যাদা অনেক ঊর্ধ্বে [8] ।
৩. কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও দূতদের দায়মুক্তি: আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এক অনন্য দিগন্ত (Diplomatic Immunity and Etiquette: A Unique Horizon in International Relations)
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কূটনৈতিক অনাক্রম্যতা (Diplomatic Immunity) এবং দূতদের নিরাপত্তা প্রদান একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। আধুনিক যুগে ১৯৬১ সালের ভিয়েনা কনভেনশনের মাধ্যমে কূটনৈতিক দূতদের যে বিশেষ অধিকার ও নিরাপত্তা প্রদান করা হয়েছে, রাসুলুল্লাহ সা. দেড় হাজার বছর পূর্বেই তা মদিনা রাষ্ট্রে কার্যকর করেছিলেন। শত্রুভাবাপন্ন বা যুদ্ধরত দেশের দূত হলেও তাকে কোনো প্রকার শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করা যাবে না—এটি ছিল ইসলামি কূটনীতির অলঙ্ঘনীয় নিয়ম।
পারস্য সম্রাট খসরু পারভেজের (Chosroes II) নিকট রাসুলুল্লাহ সা. যখন ইসলামের দাওয়াত সংবলিত পত্র প্রেরণ করেন, তখন অহংকারী পারস্য সম্রাট অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে পত্রটি ছিঁড়ে ফেলেন এবং ইয়েমেনের গভর্নর বাযানকে নির্দেশ দেন রাসুলুল্লাহ সা.-কে বন্দী করে দরবারে হাজির করতে। বাযান তাঁর দুই দূতকে মদিনায় প্রেরণ করেন। এই দূতদ্বয় যখন মদিনায় এসে রাসুলুল্লাহ সা.-এর সামনে অত্যন্ত ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করেন এবং তাঁকে বন্দী করার রাজকীয় ফরমান শোনান, তখন রাসুলুল্লাহ সা. তাদের সাথে কোনো প্রকার দুর্ব্যবহার করেননি। তিনি তাদের কূটনৈতিক মর্যাদা রক্ষা করেন এবং অত্যন্ত শান্তভাবে তাদের বিদায় দেন। পরবর্তীতে পারস্য সম্রাটের পতন এবং বাযানের ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমে এই সংকটের peaceful সমাধান হয় [9] ।
দূতদের নিরাপত্তা রক্ষার সবচেয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয় ভণ্ড নবি মুসাইলিমা কাযযাবের প্রেরিত দুই দূত ইবনুন নাওয়াজাহ এবং ইবনে আথালের সাথে রাসুলুল্লাহ সা.-এর কথোপকথনে। তারা মদিনায় এসে মুসাইলিমা কাযযাবের নবুয়তের দাবি সংবলিত অত্যন্ত আপত্তিকর ও ধৃষ্টতাপূর্ণ চিঠি পাঠ করে শোনায়। রাসুলুল্লাহ সা. তাদের জিজ্ঞাসা করলেন, "তোমরা নিজেরা এ ব্যাপারে কী বলো?" তারা উত্তর দিল, "মুসাইলিমা যা বলে আমরাও তা-ই বলি।" তখন রাসুলুল্লাহ সা. তাদের কূটনৈতিক অনাক্রম্যতা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ঐতিহাসিক এক ঘোষণা দেন:
অনুবাদ: "আল্লাহর কসম! যদি দূতদের হত্যা না করার নিয়ম না থাকত, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের উভয়ের শিরঞ্ছদ করতাম।" [10] ।
এই ঘোষণার মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ সা. আন্তর্জাতিক আইনের একটি চিরন্তন মূলনীতি প্রতিষ্ঠা করেন যে, দূতেরা কেবল বার্তা বাহক, তাই বার্তার ভালো-মন্দের জন্য দূতকে দায়ী করা বা শাস্তি দেওয়া যাবে না। শুধু তা-ই নয়, রাসুলুল্লাহ সা. বিভিন্ন সময় বিদেশি দূতদের সাথে অত্যন্ত অমায়িক আচরণ করতেন, তাদের মদিনার রাষ্ট্রীয় মেহমান হিসেবে আপ্যায়ন করতেন এবং বিদায়বেলায় মূল্যবান উপহার সামগ্রী প্রদান করতেন [11] ।
৪. দ্বিপাক্ষিক নিরাপত্তা ও বিশ্বাসঘাতকতার আশঙ্কা: কুরআনিক সমাধান (Bilateral Security and Fear of Betrayal: The Quranic Resolution)
ইসলামি কূটনীতিতে যেমন চুক্তি রক্ষার ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হয়েছে, তেমনি শত্রুপক্ষের সম্ভাব্য বিশ্বাসঘাতকতা বা ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে সম্পূর্ণ অসচেতন থাকতে বলা হয়নি। তবে এক্ষেত্রেও ইসলাম কোনো প্রকার গোপন আক্রমণ বা চোরাগোপ্তা হামলা সমর্থন করে না। যদি কোনো মিত্র গোত্র বা রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে চুক্তির শর্ত লঙ্ঘনের সুনির্দিষ্ট আলামত বা বিশ্বাসঘাতকতার আশঙ্কা দেখা দেয়, তবে ইসলামি রাষ্ট্রকে অবশ্যই আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি বাতিলের ঘোষণা দিতে হবে।
পবিত্র কুরআনে এই ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত নির্দেশনাবলী অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে:
অনুবাদ: "আর যদি তুমি কোনো সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে বিশ্বাসঘাতকতার আশঙ্কা করো, তবে তোমার চুক্তিও তাদের প্রতি একইভাবে নিক্ষেপ করো (অর্থাৎ আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি বাতিলের ঘোষণা দাও)। নিশ্চয়ই আল্লাহ বিশ্বাসঘাতকদের পছন্দ করেন না।" [12] ।
এই আয়াতটি ইসলামি কূটনীতির এক অনন্য সততার পরিচয় বহন করে। শত্রুপক্ষ যদি গোপনে চুক্তিভঙ্গের ষড়যন্ত্র করে, তবুও মুসলমানরা তাদের ওপর আকস্মিক আক্রমণ করবে না, যতক্ষণ না তাদের জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে চুক্তিটি বাতিল করা হয়েছে। অন্যদিকে, যেসকল অমুসলিম পক্ষ চুক্তির শর্তাবলী পূর্ণভাবে মেনে চলে এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে কোনো ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় না, তাদের ব্যাপারে ইসলামের নির্দেশ হলো চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করা। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন:
অনুবাদ: "তবে মুশরিকদের মধ্যে যাদের সাথে তোমরা চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছ, অতঃপর তারা তোমাদের চুক্তির কোনো শর্ত লঙ্ঘন করেনি এবং তোমাদের বিরুদ্ধে কাউকে সাহায্যও করেনি, তাদের সাথে কৃত চুক্তি নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত পূর্ণ করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ মুত্তাকীদের ভালোবাসেন।" [13] ।
এই নীতিমালার মাধ্যমে মদিনা রাষ্ট্র তার অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক অনন্য নৈতিক উচ্চতা অর্জন করে। মদিনার চারপাশের বিভিন্ন গোত্র ও শক্তির সাথে রাসুলুল্লাহ সা.-এর এই কূটনৈতিক মিথস্ক্রিয়া এবং চুক্তিভিত্তিক সম্পর্ক স্থাপন তৎকালীন আরবের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল। তবে এই শান্তিপূর্ণ কূটনৈতিক প্রচেষ্টার সমান্তরালে যখন কোনো কোনো পক্ষ মদিনা রাষ্ট্রের অস্তিত্ব বিনাশের জন্য চরম বিশ্বাসঘাতকতা ও গোপন ষড়যন্ত্রের পথ বেছে নেয়, তখন মদিনা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষার্থে আইনি ও কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ অনিবার্য হয়ে পড়ে।