৬.১ বিশ্বাসঘাতক গোত্রগুলোর বিরুদ্ধে আইনি ও সামরিক ব্যবস্থা
মদিনা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর রাসুলুল্লাহ সা. যে অনন্য রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছিলেন, তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন ছিল ‘মদিনা সনদ’ (ميثاق المدينة)। এই ঐতিহাসিক চুক্তিটি কেবল একটি ধর্মীয় সমঝোতা স্মারক ছিল না, বরং এটি ছিল একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের লিখিত সংবিধান, যা মদিনার বহুত্ববাদী সমাজকে একটি একক রাজনৈতিক সত্তায় (Single Political Entity) রূপান্তরিত করেছিল। তবে মদিনার ইহুদি গোত্রগুলো—বনু কায়নুকা, বনু নাযির এবং বনু কুরাইযা—এই চুক্তির আইনি ও নৈতিক বাধ্যবাধকতাকে অগ্রাহ্য করে ক্রমাগত রাষ্ট্রদ্রোহিতা ও ষড়যন্ত্রের পথ বেছে নেয়। মদিনা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং আন্তর্জাতিক আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার স্বার্থে রাসুলুল্লাহ সা. এই বিশ্বাসঘাতক গোত্রগুলোর বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর আইনি ও সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এই অধ্যায়ে আমরা সেই পদক্ষেপগুলোর ঐতিহাসিক, আইনি ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিস্তারিত আলোচনা করব।
মদিনা সনদের আইনি কাঠামো এবং চুক্তিভঙ্গের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
মদিনা সনদ ছিল একটি দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক চুক্তি, যা মদিনার মুসলিম এবং ইহুদি গোত্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার উদ্দেশ্যে সম্পাদিত হয়েছিল। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় একে একটি ‘যৌথ নিরাপত্তা চুক্তি’ (Collective Security Pact) হিসেবে অভিহিত করা যায়। এই সনদের অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল যে, বহিঃশত্রু দ্বারা মদিনা আক্রান্ত হলে উভয় পক্ষ যৌথভাবে তা প্রতিরোধ করবে এবং কোনো পক্ষই কুরাইশ বা অন্য কোনো শত্রুর সাথে গোপনে আঁতাত করতে পারবে না। ড. মুহাম্মাদ হামিদুল্লাহ তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, এই সনদ মদিনাকে একটি ফেডারেল রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিল, যেখানে প্রতিটি গোত্রের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ স্বায়ত্তশাসন থাকলেও প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে তারা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অধীনে ঐক্যবদ্ধ ছিল [1] ।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, ইহুদি গোত্রগুলো মদিনা রাষ্ট্রের এই আইনি কাঠামোকে মনে-প্রাণে মেনে নিতে পারেনি। বিশেষ করে বদর যুদ্ধে মুসলমানদের অভাবনীয় বিজয়ের পর মদিনার ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ দ্রুত পরিবর্তিত হতে শুরু করে। মুসলমানদের এই উত্থানকে ইহুদিরা তাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আধিপত্যের জন্য চরম হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে। ফলে তারা মদিনা সনদের মৌলিক ধারাগুলো লঙ্ঘন করে মদিনার শত্রু কুরাইশদের সাথে গোপন যোগাযোগ স্থাপন করতে শুরু করে। এই চুক্তিভঙ্গের আইনি প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে সীরাত গবেষক ড. আকরাম জিয়া উমারী লিখেছেন:
অর্থাৎ, "ইহুদিরা আল্লাহর রাসুল সা.-এর সাথে সম্পাদিত চুক্তি মেনে চলেনি, বরং অতি দ্রুত তারা তা ভঙ্গ করে এবং কেবল চুক্তিভঙ্গ করেই তারা ক্ষান্ত হয়নি (বরং তারা সক্রিয় শত্রুতা শুরু করে)" [2] ।
আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে, মদিনা সনদ ভঙ্গ করার অর্থ ছিল মদিনা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা। আন্তর্জাতিক আইনের ‘প্যাক্টা সুন্ট সারভান্ডা’ (Pacta Sunt Servanda - চুক্তি অবশ্যই পালনীয়) নীতি অনুযায়ী, এক পক্ষ চুক্তি ভঙ্গ করলে অপর পক্ষ তার আইনি বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্ত হয়ে যায় এবং রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের অধিকার লাভ করে। ইহুদি গোত্রগুলোর এই ধারাবাহিক চুক্তিভঙ্গ ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার ফলেই রাসুলুল্লাহ সা. তাদের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বাধ্য হন, যা মদিনা রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য অপরিহার্য ছিল [3] ।
বনু কায়নুকার চুক্তিভঙ্গ, মদিনার বাজারে শ্লীলতাহানি এবং প্রথম সামরিক অভিযান
বদর যুদ্ধের পর মদিনার ইহুদি গোত্রগুলোর মধ্যে বনু কায়নুকা সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে চুক্তিভঙ্গ ও শত্রুতা প্রদর্শন করে। তারা ছিল মদিনার অন্যতম ধনী ও যুদ্ধবাজ গোত্র, যারা মূলত স্বর্ণালঙ্কার তৈরি ও ব্যবসার সাথে জড়িত ছিল। বদরের বিজয়ে ঈর্ষান্বিত হয়ে তারা মুসলমানদের উস্কানি দিতে শুরু করে। রাসুলুল্লাহ সা. তাদের বনু কায়নুকা বাজারে একত্রিত করে সতর্ক করে বলেন যে, কুরাইশদের মতো তাদের ওপরও যেন আল্লাহর আযাব নেমে না আসে, তাই তাদের উচিত চুক্তি মেনে চলা। কিন্তু তারা অত্যন্ত অহংকার প্রকাশ করে বলে যে, কুরাইশরা যুদ্ধ জানত না বলে মুসলমানরা জিতেছে, কিন্তু তাদের সাথে যুদ্ধ হলে মুসলমানরা বুঝতে পারবে যুদ্ধ কাকে বলে [4] ।
এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যেই একটি সুনির্দিষ্ট ঘটনা যুদ্ধকে অনিবার্য করে তোলে। একজন মুসলিম নারী বনু কায়নুকার বাজারে এক ইহুদি স্বর্ণকারের দোকানে কেনাকাটা করতে যান। সেখানে ইহুদিরা তাকে মুখমণ্ডল উন্মোচন করার জন্য উত্যক্ত করে। তিনি অস্বীকৃতি জানালে, স্বর্ণকারটি গোপনে তার কাপড়ের আঁচল পিঠের সাথে বেঁধে দেয়। ফলে তিনি যখন উঠে দাঁড়ান, তখন তার শরীর উন্মুক্ত হয়ে পড়ে এবং ইহুদিরা তা দেখে হাসাহাসি করতে থাকে। এই চরম শ্লীলতাহানি দেখে পাশে থাকা একজন মুসলিম সাহাবি ক্ষুব্ধ হয়ে সেই ইহুদি স্বর্ণকারকে হত্যা করেন। জবাবে ইহুদিরা একত্রিত হয়ে সেই মুসলিম সাহাবিকে নির্মমভাবে শহীদ করে [5] । এই ঘটনাটি কেবল একটি সাধারণ অপরাধ ছিল না, বরং এটি ছিল মদিনা সনদের স্পষ্ট লঙ্ঘন এবং মদিনা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত।
এই চরম উস্কানি ও চুক্তিভঙ্গের পর রাসুলুল্লাহ সা. ২য় হিজরির শওয়াল মাসে বনু কায়নুকা অবরোধ করেন। টানা পনেরো দিন অবরোধের পর তারা বিনাশর্তে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। মুনাফিকদের সর্দার আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সুলুলের অন্যায় ও জোরাজুরির কারণে রাসুলুল্লাহ সা. তাদের মৃত্যুদণ্ড না দিয়ে মদিনা থেকে নির্বাসনের নির্দেশ দেন। হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি এই অভিযানের সময়কাল ও প্রেক্ষাপট আলোচনা করতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন যে, বনু কায়নুকার এই নির্বাসন ছিল মদিনার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রথম বাস্তব পদক্ষেপ [6] । এই অভিযানের মাধ্যমে মদিনা রাষ্ট্র এই বার্তা দেয় যে, রাষ্ট্রের আইন ও নাগরিকদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না [7] ।
বনু নাযিরের ষড়যন্ত্র, রাসুলুল্লাহ সা.-কে হত্যার অপচেষ্টা এবং তাদের নির্বাসন
বনু কায়নুকার নির্বাসনের পর অন্য দুই ইহুদি গোত্র বনু নাযির ও বনু কুরাইযা সাময়িকভাবে শান্ত থাকলেও তাদের অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র বন্ধ হয়নি। বিশেষ করে উহুদ যুদ্ধে মুসলমানদের সাময়িক বিপর্যয়ের পর বনু নাযির অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে। তারা মদিনার বাইরে কুরাইশদের সাথে যোগাযোগ জোরদার করে এবং মদিনার ভেতরে মুসলমানদের দুর্বল করার চেষ্টা চালায়। ৪ঠা হিজরিতে বনু নাযিরের বিশ্বাসঘাতকতা চরম রূপ ধারণ করে, যখন তারা স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সা.-কে হত্যার এক জঘন্য ও কাপুরুষোচিত ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়।
ঘটনার সূত্রপাত হয় যখন আমর ইবনে উমাইয়াহ আদ-দামরি রা. ভুলবশত বনু আমির গোত্রের দুই ব্যক্তিকে হত্যা করেন, যাদের সাথে মুসলমানদের চুক্তি ছিল। এই হত্যাকাণ্ডের রক্তপণ (Diyyah) পরিশোধের জন্য রাসুলুল্লাহ সা. বনু নাযিরের সাহায্য চাইতে তাদের দুর্গে যান, কারণ বনু নাযির ও বনু আমিরের মধ্যে পারস্পরিক চুক্তি ছিল। বনু নাযির বাহ্যিকভাবে সাহায্য করতে সম্মত হয় এবং রাসুলুল্লাহ সা.-কে একটি দেয়ালের পাশে বসিয়ে অপেক্ষা করতে বলে। কিন্তু গোপনে তারা ষড়যন্ত্র করে যে, উপর থেকে একটি ভারী পাথর ফেলে রাসুলুল্লাহ সা.-কে হত্যা করা হবে। এই জঘন্য কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয় আমর ইবনে জিহা নামক এক ইহুদিকে। কিন্তু জিবরাইল আ.-এর মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ সা. এই ঐশ্বরিক ওহী লাভ করেন এবং তৎক্ষণাৎ সেখান থেকে উঠে মদিনায় ফিরে আসেন [8] ।
এই রাষ্ট্রদ্রোহিতা ও হত্যার ষড়যন্ত্রের পর বনু নাযিরের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান অনিবার্য হয়ে পড়ে। রাসুলুল্লাহ সা. তাদের মদিনা ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য দশ দিনের সময় দেন। কিন্তু আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের প্ররোচনায় তারা মদিনা ছাড়তে অস্বীকার করে এবং যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়। ফলশ্রুতিতে, রাসুলুল্লাহ সা. তাদের দুর্গ অবরোধ করেন। অবরোধের মুখে তারা ভেঙে পড়ে এবং অবশেষে মদিনা ত্যাগের প্রস্তাব গ্রহণ করে। তারা তাদের স্থাবর সম্পত্তি ফেলে কেবল উটের পিঠে যতটুকু বহন করা যায়, ততটুকু মালামাল নিয়ে সিরিয়া ও খায়বারের দিকে চলে যায়। যাওয়ার সময় তারা নিজেদের ঘরবাড়ি নিজেদের হাতেই ধ্বংস করে দিয়েছিল, যা পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে:
অর্থাৎ, "তারা তাদের নিজেদের হাত দিয়ে এবং মুমিনদের হাত দিয়ে নিজেদের ঘরবাড়ি ধ্বংস করছিল। অতএব হে চক্ষুষ্মান ব্যক্তিগণ! তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করো" [9] । এই ঐতিহাসিক সত্যটি সীরাতের প্রাচীন উৎসগুলোতে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে সংরক্ষিত হয়েছে [10] ।
বনু কুরাইযার চরম বিশ্বাসঘাতকতা, খন্দকের যুদ্ধ এবং আইনি ফয়সালা
মদিনার ইহুদি গোত্রগুলোর মধ্যে বনু কুরাইযার বিশ্বাসঘাতকতা ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ এবং মদিনা রাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক। ৫ হিজরিতে যখন আরবের সমস্ত পৌত্তলিক শক্তি এবং নির্বাসিত বনু নাযির ইহুদিরা একত্রিত হয়ে ১০,০০০ সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী নিয়ে মদিনা আক্রমণ করে (যা খন্দকের যুদ্ধ বা আহযাবের যুদ্ধ নামে পরিচিত), তখন মদিনা এক চরম সংকটের মুখোমুখি হয়। মদিনার উত্তর সীমান্তে মুসলমানরা পরিখা খনন করে আত্মরক্ষা করলেও দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্ত অরক্ষিত ছিল, যার পাহারার দায়িত্বে ছিল বনু কুরাইযা। তারা মদিনা সনদের শর্তানুযায়ী মদিনা রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল।
কিন্তু বনু নাযিরের নেতা হুয়াই ইবনে আখতাবের প্ররোচনায় বনু কুরাইযার সর্দার কাব ইবনে আসাদ চুক্তি ভঙ্গ করে এবং মদিনা আক্রমণকারী সম্মিলিত বাহিনীর (আহযাব) সাথে হাত মেলায়। তারা মদিনার অভ্যন্তরে মুসলিম নারী ও শিশুদের ওপর আক্রমণের পরিকল্পনা করে, যা মুসলমানদের জন্য এক চরম মনস্তাত্ত্বিক ও সামরিক বিপর্যয় ডেকে আনে। পবিত্র কুরআনে এই ভয়াবহ পরিস্থিতির চিত্র অঙ্কন করে বলা হয়েছে যে, তখন চোখগুলো ছানাবড়া হয়ে গিয়েছিল এবং প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়েছিল। খন্দকের যুদ্ধে আল্লাহর বিশেষ রহমতে সম্মিলিত বাহিনী পরাজিত হয়ে ফিরে যাওয়ার পর, জিবরাইল আ.-এর নির্দেশে রাসুলুল্লাহ সা. তৎক্ষণাৎ বনু কুরাইযার দুর্গ অবরোধ করেন। ২৫ দিন অবরোধের পর তারা আত্মসমর্পণ করে এবং তাদের দীর্ঘদিনের মিত্র আওস গোত্রের নেতা সা'দ ইবনে মুআয রা.-এর ফয়সালা মেনে নিতে সম্মত হয় [11] ।
সা'দ ইবনে মুআয রা. তাদের পূর্ববর্তী চুক্তি, তাওরাতের বিধান এবং তাদের চরম বিশ্বাসঘাতকতার ভয়াবহতা বিবেচনা করে রায় দেন যে, বনু কুরাইযার যুদ্ধক্ষম পুরুষদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে এবং নারী ও শিশুদের বন্দী করা হবে। এই কঠোর রায়টি ছিল সম্পূর্ণ আইনি এবং তাদের নিজেদের ধর্মগ্রন্থ তাওরাতের (Deuteronomy 20:10-14) বিধানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন যে, রাসুলুল্লাহ সা. এই রায় শুনে বলেছিলেন, সা'দ সাত আসমানের ওপর থেকে আল্লাহর দেওয়া ফয়সালা অনুযায়ী রায় দিয়েছেন [12] । এই কঠোর পদক্ষেপের মাধ্যমে মদিনা রাষ্ট্রকে এক নিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা হয় এবং রাষ্ট্রদ্রোহিতার সর্বোচ্চ শাস্তি কার্যকর করা হয় [13] ।
রাষ্ট্রদ্রোহিতা ও জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় মদিনা রাষ্ট্রের আইনি ও সামরিক পদক্ষেপের যৌক্তিকতা
আধুনিক আন্তর্জাতিক আইন এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মদিনার ইহুদি গোত্রগুলোর বিরুদ্ধে রাসুলুল্লাহ সা. যে সমস্ত আইনি ও সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন, তা ছিল সম্পূর্ণ ন্যায়সঙ্গত এবং ঐতিহাসিক অনিবার্যতা। যেকোনো স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রথম এবং প্রধান দায়িত্ব হলো তার ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা করা এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। মদিনা রাষ্ট্রও এর ব্যতিক্রম ছিল না। ইহুদি গোত্রগুলো কেবল ভিন্ন মতাবলম্বী ছিল না, বরং তারা ছিল সক্রিয় রাষ্ট্রদ্রোহী (Traitors), যারা রাষ্ট্রের শত্রুদের সাথে হাত মিলিয়ে রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল।
আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনের অন্যতম পথিকৃৎ ড. মুহাম্মাদ হামিদুল্লাহ তাঁর 'মুসলিম কনডাক্ট অব স্টেট' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, মদিনা সনদের মাধ্যমে ইহুদিরা মদিনা রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব লাভ করেছিল এবং এর বিনিময়ে তারা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব নিয়েছিল। কিন্তু যখন তারা শত্রুর সাথে আঁতাত করে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল, তখন তারা ‘হাই ট্রিসন’ (High Treason) বা চরম রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে অপরাধী সাব্যস্ত হয় [14] । আধুনিক বিশ্বের যেকোনো সংবিধানেই রাষ্ট্রদ্রোহিতার শাস্তি হলো মৃত্যুদণ্ড বা নির্বাসন। অতএব, রাসুলুল্লাহ সা. কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপগুলো কোনো ধর্মীয় বিদ্বেষপ্রসূত ছিল না, বরং তা ছিল সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়া।
সীরাত গবেষক ড. আকরাম জিয়া উমারী তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, রাসুলুল্লাহ সা. প্রতিটি পদক্ষেপ গ্রহণের পূর্বে ইহুদিদের পর্যাপ্ত সুযোগ দিয়েছিলেন এবং তাদের সাথে সম্পাদিত চুক্তির প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করেছিলেন [15] । কিন্তু যখন তাদের পক্ষ থেকে একের পর এক চুক্তিভঙ্গ এবং হত্যার ষড়যন্ত্র করা হলো, তখন রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থেই সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল। এই পদক্ষেপগুলো যদি গ্রহণ করা না হতো, তবে মদিনা রাষ্ট্র অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যেত এবং আরবের বুকে ইসলামের আলো চিরতরে নিভে যেত। অতএব, এই সামরিক ও আইনি ব্যবস্থাগুলো ছিল মদিনা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, ন্যায়বিচার এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষার এক অনন্য ও ঐতিহাসিক প্রয়াস [16] ।