খণ্ড 93
ফন্ট:100%
থিম:

৬.২ এজেন্ডা সেটিং (Agenda Setting) থিওরি: কোনটি খবর হবে আর কোনটি লুকানো হবে তার পলিটিক্যাল ইকোনোমি

আধুনিক রাজনৈতিক যোগাযোগ ও গণমাধ্যম বিজ্ঞানের প্রেক্ষাপটে 'এজেন্ডা সেটিং' (Agenda Setting) বা 'আলোচ্যসূচি নির্ধারণ' একটি অত্যন্ত জটিল ও প্রভাবশালী প্রক্রিয়া। এটি কেবল সংবাদ পরিবেশনের একটি পদ্ধতি নয়, বরং এটি একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক কৌশল, যার মাধ্যমে জনমতের মনস্তাত্ত্বিক মানচিত্র রৈচিকার কাজ করা হয়। এজেন্ডা সেটিং থিওরির মূল নির্যাস হলো—গণমাধ্যম মানুষকে কী চিন্তা করতে হবে তা সরাসরি নির্দেশ না দিয়ে, বরং কোন বিষয়ে চিন্তা করতে হবে, সেই অগ্রাধিকার বা গুরুত্ব প্রদান করে। অর্থাৎ, কোনো একটি নির্দিষ্ট ঘটনা যখন সংবাদমাধ্যমে বারবার প্রচারিত হয়, তখন সাধারণ মানুষের অবচেতন মন সেই বিষয়টিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় বা আন্তর্জাতিক ইস্যু হিসেবে গ্রহণ করে। এই প্রক্রিয়ার গভীরে লুকিয়ে আছে একটি সুগভীর 'পলিটিক্যাল ইকোনোমি' বা রাজনৈতিক অর্থনীতি, যা নির্ধারণ করে দেয় কোন তথ্যটি জনসমক্ষে আসবে এবং কোন সত্যটি ইতিহাসের অন্ধকারাচ্ছন্ন গহ্বরে হারিয়ে যাবে।

রাজনৈতিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, এজেন্ডা সেটিং হলো ক্ষমতার একটি সূক্ষ্ম প্রয়োগ। যখন রাষ্ট্রীয় বা কর্পোরেট স্বার্থের সাথে গণমাধ্যমের স্বার্থের মিলন ঘটে, তখন একটি কৃত্রিম 'রিয়েলিটি' বা বাস্তবতা তৈরি করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় তথ্যের প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে জনমতের একটি নির্দিষ্ট ধারা তৈরি করা সম্ভব হয়। এটি কেবল সংবাদপত্রের শিরোনামের বিষয় নয়, বরং এটি একটি কাঠামোগত ব্যবস্থা যা সমাজ ও রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও সামাজিক চিন্তাধারাকে প্রভাবিত করে। এই অধ্যায়ে আমরা বিশ্লেষণ করব কীভাবে এজেন্ডা সেটিং-এর মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া, তথ্যের রাজনৈতিক অর্থনীতি এবং গেটকিপিংয়ের মাধ্যমে সত্যের বিকৃতি ঘটানো হয়।

এজেন্ডা সেটিং-এর মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত প্রক্রিয়া

এজেন্ডা সেটিং-এর মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তিটি মূলত মানুষের 'salience' বা কোনো বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব প্রদানের প্রবণতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। যখন কোনো সংবাদমাধ্যম একটি নির্দিষ্ট বিষয়কে বারবার গুরুত্বের সাথে উপস্থাপন করে, তখন মানুষের মস্তিষ্কে সেই বিষয়টি একটি 'গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু' হিসেবে গেঁথে যায়। এই প্রক্রিয়াটি কেবল তথ্য প্রদান নয়, বরং এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক প্ররোচনা। রাজনৈতিক বিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক আলোচনা অনুযায়ী, নাগরিকদের সামনে যখন বিভিন্ন রাজনৈতিক বিকল্প বা নীতি উপস্থাপিত হয়, তখন তাদের মূল্যায়ন করার ক্ষমতা অনেকাংশেই নির্ভর করে সেই বিকল্পগুলো কীভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে তার ওপর।

আরবি তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রক্রিয়াটি মূলত রাজনৈতিক আচরণের একটি অংশ। গবেষণায় দেখা গেছে:

"وضع الأجندة (agenda setting) ؛ وكيفية تقييمهم، أي المواطنين، للبدائل التي تضعها السياسة أمامهم (الإعداد والتهيئة)"
[1]
অর্থাৎ, এজেন্ডা সেটিং বা আলোচ্যসূচি নির্ধারণের মাধ্যমে নাগরিকদের সামনে যে রাজনৈতিক বিকল্পগুলো রাখা হয়, তাদের মূল্যায়ন করার প্রক্রিয়াটি মূলত একটি পূর্বনির্ধারিত কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়। এখানে 'التأطير' বা 'Framing' (ফ্রেমওয়ার্কিং) একটি অপরিহার্য উপাদান হিসেবে কাজ করে, যা কোনো বিষয়ের একটি নির্দিষ্ট দিককে বড় করে দেখায় এবং অন্য দিকগুলোকে আড়াল করে দেয় [2]

কাঠামোগতভাবে, এই প্রক্রিয়াটি একটি চক্রাকার গতিতে চলে। প্রথমে রাজনৈতিক এলিট বা প্রভাবশালী গোষ্ঠী একটি লক্ষ্য নির্ধারণ করে, এরপর সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য মিডিয়া বা গণমাধ্যমকে ব্যবহার করা হয়। গণমাধ্যম যখন সেই লক্ষ্যকে 'খবর' হিসেবে উপস্থাপন করে, তখন জনতা সেটিকে সত্য বলে গ্রহণ করে। এই মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব এতটাই গভীর যে, মানুষ অনেক সময় বুঝতেও পারে না যে তাদের চিন্তার ধারাটি আসলে একটি কৃত্রিমভাবে তৈরি করা এজেন্ডার ফসল। এই কাঠামোগত বিন্যাসটি সমাজ ও রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বা পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়, যা মূলত ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার একটি কৌশল।

তথ্যের রাজনৈতিক অর্থনীতি ও ক্ষমতার বিন্যাস

এজেন্ডা সেটিং-এর পেছনে যে চালিকাশক্তি কাজ করে, তা হলো তথ্যের রাজনৈতিক অর্থনীতি (Political Economy of Information)। সংবাদ বা তথ্য কোনো নিরপেক্ষ বস্তু নয়; বরং এটি একটি পণ্য, যা নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। মিডিয়া হাউজগুলোর মালিকানা এবং তাদের আর্থিক উৎস নির্ধারণ করে দেয় যে তারা কোন ধরনের সংবাদ প্রচার করবে। যখন বৃহৎ কর্পোরেশন বা রাষ্ট্রীয় শক্তিগুলো মিডিয়া খাতের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে, তখন সংবাদ পরিবেশন হয়ে ওঠে একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার।

বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, শক্তি ও নিরাপত্তার (Energy and Security) মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এজেন্ডা সেটিং-এর প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের সংঘাত যখন ঘটে, তখন মিডিয়া সেই সংঘাতের একটি নির্দিষ্ট চিত্র তুলে ধরে। উদাহরণস্বরূপ, জ্বালানি নিরাপত্তা বা ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার নামে অনেক সময় জনমতের একটি বিশেষ ধারা তৈরি করা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে যে, বিভিন্ন রাজনৈতিক কমিটি এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বরা এই এজেন্ডা নির্ধারণে সরাসরি ভূমিকা রাখেন:

كان المشروع في يد هنري واكسمان رئيس لجنة الطاقة والتجارة، وإدوارد ماركي رئيس اللجنة المختارة لاستقلال الطاقة والاحتباس الحراري...»"
[3]
এই ধরনের রাজনৈতিক কমিটি এবং তাদের সিদ্ধান্তগুলো কীভাবে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় এজেন্ডাকে প্রভাবিত করে, তা তথ্যের রাজনৈতিক অর্থনীতির একটি প্রকট উদাহরণ। এখানে তথ্যের প্রবাহ নিয়ন্ত্রিত হয় মূলত শক্তি ও নিরাপত্তার স্বার্থ রক্ষার প্রয়োজনে [4]

তদুপরি, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এজেন্ডা সেটিং একটি শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে। বিশ্বব্যাপী কিছু নির্দিষ্ট আদর্শ বা বিষয়কে (যেমন: গণতন্ত্র বা মানবাধিকার) এজেন্ডার শীর্ষে রাখা হয়, যা অনেক সময় অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক ইস্যুগুলোকে আড়াল করে ফেলে। আন্তর্জাতিক এজেন্ডার তালিকায় এই বিষয়গুলোর প্রাধান্য অত্যন্ত প্রবল:

"الديمقراطية وحقوق الإنسان، وحقوق الأقليات. وهذه القضايا إضافة إلى تلك التي تصدرت قائمة الأجندة الدولية..."
[5]
এইভাবে, 'গণতন্ত্র' বা 'মানবাধিকার'-এর মতো মহৎ ধারণাগুলোকে অনেক সময় এজেন্ডার শীর্ষে রেখে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখার কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হয় [6] । সুতরাং, তথ্যের এই বিন্যাস কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত ক্ষমতার বিন্যাস যা বিশ্ব রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করে।

গেটকিপিং এবং ঐতিহাসিক সত্যের বিলুপ্তি

এজেন্ডা সেটিং-এর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নেতিবাচক দিক হলো 'গেটকিপিং' (Gatekeeping)। গেটকিপিং হলো সেই প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে সংবাদ বা তথ্যের প্রবাহকে নির্দিষ্ট ফিল্টার বা ছাকনির মধ্য দিয়ে প্রবাহিত করা হয়। একজন সম্পাদক, একজন সাংবাদিক বা একটি মিডিয়া কর্পোরেশন হলো সেই 'গেটকিপার', যারা সিদ্ধান্ত নেন কোন তথ্যটি জনসমক্ষে আসবে এবং কোনটি বাদ যাবে। এই প্রক্রিয়ায় যে তথ্যগুলো বাদ দেওয়া হয়, সেগুলো কেবল অবহেলিত হয় না, বরং সেগুলো ধীরে ধীরে জনস্মৃতি ও ইতিহাস থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায়।

এই গেটকিপিং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ইতিহাসের একটি বিকৃত বা একপাক্ষিক সংস্করণ তৈরি করা হয়। যখন কোনো জাতির বা কোনো উম্মাহর রাজনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্বকে বিশ্বমঞ্চে অবমূল্যায়ন করা হয়, তখন বুঝতে হবে সেখানে গেটকিপিংয়ের একটি শক্তিশালী প্রক্রিয়া কাজ করছে। উদাহরণস্বরূপ, একটি উম্মাহর রাজনৈতিক অবস্থান এবং বিশ্বব্যবস্থা নির্মাণে তার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও, অনেক ক্ষেত্রে এই বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক এজেন্ডা থেকে সরিয়ে রাখা হয়। গবেষণায় এই বিষয়টি গুরুত্বের সাথে আলোচিত হয়েছে:

"دور الأمة ومكانتها في بناء النظام السياسي"
[7]
উম্মাহর রাজনৈতিক ভূমিকা এবং বিশ্বব্যবস্থা নির্মাণে এর অবস্থান নিয়ে আলোচনা করা অত্যন্ত জরুরি, কিন্তু গেটকিপিংয়ের কারণে এই ধরনের আলোচনা অনেক সময় মূলধারার মিডিয়া বা রাজনৈতিক এজেন্ডা থেকে দূরে রাখা হয় [8]

যখন কোনো সত্য বা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে গেটকিপাররা 'অপ্রাসঙ্গিক' বা 'বিপজ্জনক' হিসেবে চিহ্নিত করে, তখন সেই সত্যটি জনসমক্ষে আসার পথ হারায়। এটি কেবল বর্তমানের সংবাদকে প্রভাবিত করে না, বরং এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ইতিহাস পৌঁছানোর প্রক্রিয়াকেও বাধাগ্রস্ত করে। তথ্যের এই কৃত্রিম ফিল্টারিং বা ছাঁকন প্রক্রিয়াটি একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক হাতিয়ার, যা দিয়ে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর উত্থান বা পতন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। ফলে, ইতিহাসের প্রকৃত সত্য এবং মিডিয়া দ্বারা নির্মিত 'ভার্চুয়াল রিয়ালিটি'-র মধ্যে একটি বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়। এই ব্যবধানটিই হলো আধুনিক এজেন্ডা সেটিং-এর সবচেয়ে বড় ও ভয়াবহ প্রভাব, যা সত্যের বিলুপ্তি ঘটিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহারকে বৈধতা প্রদান করে।

""
৬.২ এজেন্ডা সেটিং (Agenda Setting) থিওরি: কোনটি খবর হবে আর কোনটি লুকানো হবে তার পলিটিক্যাল ইকোনোমি
আমাদের নবী সা. সীরাত বিশ্বকোষ
ha-mims.world
এ আর্টিকেলের কুইজ(5টি প্রশ্ন)

৬.২ এজেন্ডা সেটিং (Agenda Setting) থিওরি: কোনটি খবর হবে আর কোনটি লুকানো হবে তার পলিটিক্যাল ইকোনোমি কুইজ

1 / 5

এজেন্ডা সেটিং থিওরির মূল কাজ কী?

এই আর্টিকেলটি কেমন লাগলো?

এই গবেষণাকে সহায়তা করুন

সীরাত বিশ্বকোষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আপনার সামান্য সহায়তা এই গবেষণাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

bKash / Nagad01XXXXXXXXXX(Send Money)
☕ Ko-fi দিয়ে সহায়তা

রেফারেন্স: "সীরাত বিশ্বকোষ" লিখুন

🌟 Ha-mim's World-এর একটি গবেষণা ও জ্ঞান-প্রযুক্তি প্রকল্প

কমিউনিটি রিফ্লেকশন

এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি কী শিখলেন বা আপনার অনুভূতি কী, তা সবার সাথে শেয়ার করুন।

আপনার রিফ্লেকশন শেয়ার করতে দয়া করে লগইন করুন।

লোড হচ্ছে...