মানব সভ্যতার ইতিহাসে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার এবং সমাজ পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে মনস্তাত্ত্বিক কারসাজি বা "সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং" (Social Engineering) সর্বদা একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছে। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগে "সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং" বা "ফিশিং" শব্দগুলো সাইবার নিরাপত্তার পরিমণ্ডলে বহুল ব্যবহৃত হলেও, এর তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক ভিত্তিটি মূলত মানুষের মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতা, জ্ঞানীয় পক্ষপাত (Cognitive Bias) এবং সামাজিক আচরণের সুযোগ নেওয়ার প্রাচীন কৌশলের ওপর প্রতিষ্ঠিত। সমাজবিজ্ঞানী ও ঐতিহাসিকদের মতে, কোনো সমাজ বা গোষ্ঠীকে বাহ্যিক শক্তি প্রয়োগ করে পরাজিত করার চেয়ে তাদের মনস্তাত্ত্বিক কাঠামোকে প্রভাবিত করে, বিভ্রান্তি ছড়িয়ে এবং পারস্পরিক বিশ্বাসে ফাটল ধরিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা অনেক বেশি কার্যকর। ইসলামের ইতিহাসের আদি পর্বে, বিশেষ করে মক্কী ও মাদানী যুগে, রাসুলুল্লাহ সা.-এর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা নতুন তাওহীদি সমাজব্যবস্থাকে ধ্বংস করার জন্য আরবের কুরাইশ এবং মদিনার মুনাফিক ও ইহুদিরা এই মনস্তাত্ত্বিক প্রকৌশল ও তথ্যগত জালিয়াতির নানাবিধ কৌশল অবলম্বন করেছিল।
সামাজিক প্রকৌশল বা সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং: তাত্ত্বিক রূপরেখা ও মানব মনস্তত্ত্বের দুর্বলতা
আধুনিক সমাজবিজ্ঞান এবং মনস্তত্ত্বের আলোকে সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং হলো এমন একটি পদ্ধতিগত প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে প্রভাবিত করে এমন কিছু কাজ করিয়ে নেওয়া হয়, যা তাদের নিজস্ব স্বার্থের পরিপন্থী কিংবা যা তাদের নিরাপত্তা ও সংহতিকে বিপন্ন করে। এই প্রক্রিয়ার মূল লক্ষ্য থাকে মানুষের আদিম প্রবৃত্তি—যেমন ভয়, লোভ, কৌতূহল, গোত্রীয় অহংকার এবং অন্ধ আনুগত্যের সুযোগ নেওয়া। সমাজবিজ্ঞানী আব্দুর রহমান শাবান তুহামি তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং মূলত মানুষের মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতাকে পুঁজি করে পরিচালিত একটি সূক্ষ্ম কারসাজি [1] । মানুষের এই মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতাগুলো যখন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা সামাজিক কাঠামোর মধ্যে প্রকাশ পায়, তখন তা সমগ্র সমাজকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
ইতিহাসবিদ উইল ডুরান্ট তাঁর বিখ্যাত "দ্য স্টোরি অব সিভিলাইজেশন" গ্রন্থে মানুষের আদিম প্রবৃত্তি এবং সামাজিক নিয়ন্ত্রণের পারস্পরিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ করতে গিয়ে লিখেছেন:
"فليست كل حضارة إلا توازناً وتجاذباً بين غرائز الإنسان ساكن الغابة وقيود القانون الأخلاقي"অর্থাৎ, "প্রতিটি সভ্যতাই মূলত অরণ্যচারী মানুষের আদিম প্রবৃত্তি এবং নৈতিক আইনের শৃঙ্খলের মধ্যকার এক সূক্ষ্ম ভারসাম্য ও পারস্পরিক আকর্ষণ-বিকর্ষণের ফল" [2] । সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বা সামাজিক প্রকৌশল মূলত মানুষের এই আদিম প্রবৃত্তিগুলোকে লক্ষ্য করে পরিচালিত হয়। যখন কোনো সমাজে নৈতিক আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন কুচক্রী মহল মানুষের ভয় ও লোভকে উস্কে দিয়ে সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। ইবনে খালদুন তাঁর "মুকাদ্দিমা" গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, মানব সমাজ যখন যাযাবর বা সরল অবস্থা থেকে জটিল ও নগরকেন্দ্রিক সভ্যতার দিকে ধাবিত হয়, তখন তাদের পারস্পরিক সামাজিক সম্পর্কগুলো আরও জটিল হয়ে ওঠে এবং এই জটিলতার সুযোগ নিয়েই একদল মানুষ ক্ষমতার অপব্যবহার ও মনস্তাত্ত্বিক কারসাজির আশ্রয় নেয় [3] ।
রাসুলুল্লাহ সা.-এর নবুয়ত প্রাপ্তির প্রাক্কালে আরবের সমাজব্যবস্থা ছিল এমনই এক মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক সংকটের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হওয়া সময়, যেখানে মানুষের আদিম প্রবৃত্তিগুলো কোনো সুনির্দিষ্ট নৈতিক আইনের অধীনে ছিল না। ফলে, তৎকালীন আরবের প্রভাবশালী নেতৃবৃন্দ সাধারণ মানুষের মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতা, কুসংস্কার এবং গোত্রীয় অন্ধত্বকে পুঁজি করে তাদের ওপর নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখত। এই সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রকৌশলকে চ্যালেঞ্জ করেই ইসলাম এক নতুন নৈতিক ও ঐশী সমাজকাঠামো প্রস্তাব করেছিল।
জাহেলী আরবের গোত্রীয় মনস্তত্ত্ব: 'আসাবিয়্যাহ' এবং সামাজিক কারসাজির উর্বর ক্ষেত্র
ইসলাম-পূর্ব আরবের সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেখানে কোনো কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা বা লিখিত সংবিধান ছিল না। মরুভূমির রুক্ষ পরিবেশে টিকে থাকার জন্য আরবরা সম্পূর্ণভাবে গোত্রীয় সংহতি বা "আসাবিয়্যাহ" (العصبية القبلية)-এর ওপর নির্ভরশীল ছিল। ঐতিহাসিক ড. আহমদ ইব্রাহিম আল-শরীফ তাঁর গবেষণায় উল্লেখ করেছেন:
"فالقبيلة هي الوحدة الاجتماعية التي تتقمص صفة الدولة، وتقوم بمهامها في البادية..."অর্থাৎ, "গোত্রই ছিল আরবের সেই সামাজিক একক যা মরুভূমিতে রাষ্ট্রের ভূমিকা পালন করত এবং রাষ্ট্রের যাবতীয় দায়িত্ব আঞ্জাম দিত..." [4] । এই গোত্রীয় কাঠামোর মূল ভিত্তি ছিল রক্ত ও বংশের ঐক্য, যার প্রতি অন্ধ আনুগত্য প্রকাশ করাকে আরবরা তাদের পরম ধর্ম মনে করত।
এই অন্ধ গোত্রীয় আনুগত্য বা "আসাবিয়্যাহ" সম্পর্কে ঐতিহাসিক জোয়াদ আলি তাঁর "তারিখুল আরব ফিল কাদীম" গ্রন্থে লিখেছেন:
"والإيمان بهذه الوحدة والتعصب لها هو ما يطلق عليه اسم العصبية القبلية"অর্থাৎ, "এই গোত্রীয় ঐক্যের প্রতি বিশ্বাস এবং এর জন্য অন্ধ পক্ষপাতিত্বকেই বলা হতো গোত্রীয় আসাবিয়্যাহ" [5] । এই আসাবিয়্যাহ ছিল তৎকালীন আরবের সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতা। কোনো গোত্রের একজন সদস্য অন্যায় করলেও পুরো গোত্র তার পক্ষে অস্ত্র ধারণ করত। এই অন্ধ আবেগকে পুঁজি করে গোত্রীয় প্রধানরা সাধারণ মানুষকে সহজেই যুদ্ধ ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত করতে পারত। এটি ছিল এক ধরনের সামাজিক কারসাজি, যেখানে সাধারণ মানুষের জীবনকে উৎসর্গ করা হতো গোত্রপ্রধানদের ব্যক্তিগত অহংকার ও রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য।
উইল ডুরান্টের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই ধরনের সমাজে যেখানে কোনো ঐশী বা সর্বজনীন নৈতিক আইন থাকে না, সেখানে মানুষের আদিম প্রবৃত্তিগুলোই সমাজকে পরিচালিত করে, যাকে তিনি "শরিআতুল গাব" বা অরণ্যের আইন হিসেবে অভিহিত করেছেন [6] । কুরাইশ নেতৃবৃন্দ যেমন আবু জেহেল, আবু লাহাব এবং ওতবা ইবনে রাবীআহ—সাধারণ কুরাইশদের এই গোত্রীয় অহংকার এবং পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্যের প্রতি অন্ধ ভালোবাসাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিল। তারা সাধারণ মানুষকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিল যে, মুহাম্মাদ সা.-এর আনীত তাওহীদের বাণী তাদের পূর্বপুরুষদের অবমাননা করছে এবং এর ফলে তাদের গোত্রীয় মর্যাদা ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। এটি ছিল হিউম্যান সাইকোলজির দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে একটি নতুন আদর্শের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার প্রাচীনতম সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং কৌশল।
তথ্য জালিয়াতি, ফিশিং ও ছদ্মবেশ ধারণ: মক্কার কুরাইশ ও মদিনার মুনাফিকদের কৌশলগত ধোঁকাবাজি
ইসলামের প্রচার ও প্রসারের সাথে সাথে এর শত্রুরা তাদের কৌশল পরিবর্তন করে। তারা কেবল শারীরিক নির্যাতনের পথেই হাঁটেনি, বরং অত্যন্ত সুক্ষ্মভাবে "তথ্য জালিয়াতি" (Information Warfare), "ফিশিং" (Phishing - এখানে বিভ্রান্তিকর ফাঁদ অর্থে ব্যবহৃত) এবং "ছদ্মবেশ ধারণ" (Impersonation)-এর মতো মনস্তাত্ত্বিক কৌশল প্রয়োগ করতে শুরু করে। আধুনিক সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে "প্রিটেন্সটিং" (Pretexting) বা ছদ্মবেশ ধারণের মাধ্যমে যেভাবে লক্ষ্যবস্তুর বিশ্বাস অর্জন করে তথ্য হাতিয়ে নেওয়া হয়, ঠিক একইভাবে মক্কার কুরাইশ এবং মদিনার মুনাফিকরা মুসলমানদের বিভ্রান্ত করার জন্য নানাবিধ ছদ্মবেশ ও মিথ্যা প্রচারণার আশ্রয় নিয়েছিল [7] ।
মক্কী যুগে কুরাইশরা হজ্জের মৌসুমে মক্কায় আগত বহিরাগত আরবদের মনস্তত্ত্বকে প্রভাবিত করার জন্য একটি সুপরিকল্পিত প্রচার অভিযান বা "প্রোপাগান্ডা ক্যাম্পেইন" পরিচালনা করত। তারা মক্কার প্রবেশপথগুলোতে লোক নিয়োগ করেছিল, যারা আগত মেহমানদের কাছে রাসুলুল্লাহ সা. সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য পরিবেশন করত। তারা বলত যে, মুহাম্মাদ (সা.) একজন জাদুকর, যিনি পিতা ও পুত্রের মধ্যে, ভাই ও বোনের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেন। এটি ছিল এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক "ফিশিং", যেখানে সত্যের সাথে মিথ্যার মিশ্রণ ঘটিয়ে মানুষের মনে ভীতি ও সন্দেহের বীজ বপন করা হতো, যাতে তারা রাসুলুল্লাহ সা.-এর সংস্পর্শে আসার আগেই একটি নেতিবাচক মানসিকতা বা "কগনিটিভ বায়াস" (Cognitive Bias)-এ আক্রান্ত হয়।
মদিনায় হিজরতের পর এই সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং আরও জটিল রূপ ধারণ করে। মদিনার মুনাফিকদের নেতা আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সুলুল এবং তার অনুসারীরা বাহ্যিকভাবে ইসলামের ছদ্মবেশ ধারণ করে মুসলমানদের অভ্যন্তরীণ সংহতি বিনষ্ট করার জন্য কাজ করত। তারা মদিনার আউস ও খাজরাজ গোত্রের মধ্যকার ঐতিহাসিক শত্রুতাকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য মনস্তাত্ত্বিক কারসাজি করত। গোত্রীয় প্রধানদের মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করে জোয়াদ আলি লিখেছেন যে, একজন গোত্রপ্রধানকে সর্বদা তার মর্যাদা ও প্রভাব ধরে রাখার জন্য রাজনৈতিক চাল চালতে হতো [8] । আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ঠিক এই কাজটিই করেছিল; সে মুসলমানদের মধ্যে মুহাজির ও আনসারদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টির জন্য বনু মুস্তালিকের যুদ্ধের সময় বলেছিল, "আমরা যদি মদিনায় ফিরে যাই, তবে আমাদের মধ্যকার সম্মানিত ব্যক্তিরা অবশ্যই অপদার্থদের (নাউযুবিল্লাহ) বহিষ্কার করবে।" এটি ছিল মানুষের আত্মমর্যাদা ও গোত্রীয় অহংকারের দুর্বল জায়গায় আঘাত করার একটি সুপরিকল্পিত মনস্তাত্ত্বিক চাল।
মুনাফিকদের এই মনস্তাত্ত্বিক কারসাজি এবং হিংসা-বিদ্বেষ ছড়ানোর কৌশলগুলো মূলত মানুষের অভ্যন্তরীণ নৈতিক স্খলনেরই বহিঃপ্রকাশ ছিল। পোপ গ্রেগরি এবং মধ্যযুগীয় ধর্মতত্ত্ববিদদের উদ্ধৃতি দিয়ে উইল ডুরান্ট মানুষের সাতটি প্রধান পাপের (Seven Deadly Sins) কথা উল্লেখ করেছেন, যার মধ্যে অহংকার (Pride), হিংসা (Envy) এবং ক্রোধ (Anger) অন্যতম [9] । মদিনার মুনাফিকরা এবং ইহুদি গোত্রগুলো মুসলমানদের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্থানে ঈর্ষান্বিত হয়ে এই হিংসা ও ক্রোধকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিল। তারা মুসলমানদের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস তৈরি করার জন্য মিথ্যা গুজব ছড়াত—যার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো "অপবাদের ঘটনা" বা "ওয়াকিয়াতুল ইফক", যেখানে উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা.-এর চরিত্র হননের চেষ্টা করা হয়েছিল। এটি ছিল ইসলামের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ মনস্তাত্ত্বিক আক্রমণ বা সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, যার লক্ষ্য ছিল স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সা.-এর পরিবার এবং মুসলিম সমাজের নৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া।
রাসুলুল্লাহ সা.-এর মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ ব্যূহ: কুসংস্কার ও বিভাজনের বিরুদ্ধে ঐশী প্রকৌশল
শত্রুপক্ষের এই সুপরিকল্পিত সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, ফিশিং এবং মনস্তাত্ত্বিক ম্যানিপুলেশনের বিরুদ্ধে রাসুলুল্লাহ সা. কোনো অনৈতিক বা প্রতারণামূলক কৌশলের আশ্রয় নেননি। বরং তিনি ঐশী ওহীর আলোতে মানুষের মনস্তত্ত্বকে পুনর্গঠন করার জন্য একটি "নৈতিক সামাজিক প্রকৌশল" (Ethical Social Engineering) এবং "রাজনৈতিক প্রকৌশল" (Political Engineering) গড়ে তুলেছিলেন। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মুহাম্মাদ আবদুল জব্বার আল-শাবুত তাঁর গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, একটি আধুনিক ও সভ্য রাষ্ট্র গঠনে সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রকৌশল কীভাবে মানুষের স্বভাবজাত প্রকৃতিকে ইতিবাচকভাবে পরিবর্তন করতে পারে [10] । তিনি লিখেছেন:
"...صنعها عامدا متعمدا في محاولة منه شبيهة بالهندسة الاجتماعية كي يحقق السلام الاجتماعي عن طريق تغيير الطبيعة البشرية ذاتها."অর্থাৎ, "তিনি (রাসুলুল্লাহ সা.) অত্যন্ত সচেতনভাবে এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সামাজিক প্রকৌশলের সদৃশ একটি প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন, যাতে মানুষের আদিম প্রকৃতিকে পরিবর্তন করার মাধ্যমে সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায়" [11] ।
রাসুলুল্লাহ সা. আরবের প্রাচীন গোত্রীয় আসাবিয়্যাহ বা অন্ধ আনুগত্যের বিপরীতে "আল-উখুওয়াহ" বা দ্বীনি ভ্রাতৃত্বের এক অভূতপূর্ব সামাজিক কাঠামো বিনির্মাণ করেন। মদিনায় হিজরতের পর মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যে "মুয়াখাত" বা ভ্রাতৃত্বের বন্ধন তিনি স্থাপন করেছিলেন, তা ছিল সমাজবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক বৈপ্লবিক সামাজিক প্রকৌশল। এর মাধ্যমে তিনি রক্তের সম্পর্কের চেয়ে বিশ্বাসের সম্পর্ককে ঊর্ধ্বে স্থান দিয়ে গোত্রীয় সংকীর্ণতার মনস্তাত্ত্বিক দেয়াল ভেঙে ফেলেন। ইবনে খালদুনের সমাজতাত্ত্বিক তত্ত্বের আলোকে বলা যায়, রাসুলুল্লাহ সা. আরবের যাযাবর ও বিশৃঙ্খল সমাজকে একটি সুসংহত, নৈতিক এবং আইনানুগ সমাজে রূপান্তরিত করেছিলেন, যা সভ্যতার বিকাশের জন্য অপরিহার্য ছিল [12] ।
এছাড়াও, মদিনার ইহুদি, মুশরিক এবং মুসলমানদের মধ্যে পারস্পরিক নিরাপত্তা ও সহাবস্থান নিশ্চিত করার জন্য তিনি "মিশাকে মদিনা" বা মদিনার সনদ প্রণয়ন করেন। এটি ছিল ইতিহাসের প্রথম লিখিত সংবিধান, যা আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় একটি "কালেক্টিভ সিকিউরিটি" বা যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থার চমৎকার উদাহরণ। এর মাধ্যমে তিনি বাহ্যিক শত্রুর মনস্তাত্ত্বিক বিভাজন সৃষ্টির সমস্ত পথ বন্ধ করে দেন।
রাসুলুল্লাহ সা. মানুষের মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতাগুলোকে দূর করার জন্য ঈমান ও তাকওয়ার প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন। আরবের ঐতিহ্যবাহী বীরত্ব, উদারতা এবং আত্মমর্যাদাবোধকে তিনি বাতিল করেননি, বরং সেগুলোকে ইসলামের ছাঁচে ঢেলে পরিমার্জিত করেছিলেন। জোয়াদ আলি আরবের গোত্রপ্রধানদের যে সমস্ত গুণাবলীর কথা উল্লেখ করেছেন—যেমন ধৈর্য (الحلم), ন্যায়বিচার (العدل) এবং সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা (سداد الرأي) [13] —রাসুলুল্লাহ সা. সেগুলোকে কেবল গোত্রীয় স্বার্থে নয়, বরং সমগ্র মানবজাতির কল্যাণে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করার শিক্ষা দেন।
উইল ডুরান্টের মতে, মানুষের আদিম প্রবৃত্তিগুলোকে দমন করে একটি সুশৃঙ্খল সমাজ গঠনে ধর্মের ভূমিকা অনস্বীকার্য, কারণ ধর্মীয় বিশ্বাস মানুষের অন্তরে এক অদৃশ্য ঐশী শক্তির ভয় ও ভালোবাসা জাগ্রত করে, যা বাহ্যিক কোনো আইনের পক্ষে সম্ভব নয় [14] । রাসুলুল্লাহ সা. ঠিক এই মনস্তাত্ত্বিক সত্যটিকেই কাজে লাগিয়েছিলেন। তিনি মুসলমানদের এমন এক নৈতিক উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন, যেখানে শত্রুদের কোনো মিথ্যা প্রচারণা, ফিশিং বা মনস্তাত্ত্বিক ম্যানিপুলেশন তাদের ঈমানী সংহতিকে দুর্বল করতে পারেনি। কুরাইশদের অপপ্রচার এবং মুনাফিকদের চক্রান্তের মুখে আল-কুরআনের ওহী অবতীর্ণ হয়ে মুসলমানদের মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ ক্ষমতাকে আরও সুদৃঢ় করত, যার ফলে মদিনার নবগঠিত ইসলামি রাষ্ট্রটি সমস্ত অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে একটি বিশ্বজনীন সভ্যতার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিল।