খণ্ড 93
ফন্ট:100%
থিম:

৮.২ ইমোশনাল কনটাজিয়ন (Emotional Contagion): সোশ্যাল মিডিয়ায় অ্যাঙ্গার (Anger) এবং আউটরেজ (Outrage) ভাইরালিটির ইকোনোমিক্স

একবিংশ শতাব্দীর ডিজিটাল ভূ-প্রকৃতিতে মানুষের আবেগ কেবল ব্যক্তিগত অনুভূতির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। 'ইমোশনাল কনটাজিয়ন' বা আবেগীয় সংক্রামকতার ধারণাটি যখন সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদমিক কাঠামোর সাথে মিলিত হয়, তখন এটি একটি ভয়াবহ 'আউটরেজ ইকোনোমি' বা ক্ষোভের অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হয়। এই প্রক্রিয়ায় মানুষের সহজাত ক্রোধ (Anger) এবং সামাজিক ক্ষোভ (Outrage) কৃত্রিমভাবে ত্বরান্বিত ও বহুগুণিত করা হয়, যা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর মুনাফা অর্জনের প্রধান চালিকাশক্তি। এই নিবন্ধে আমরা বিশ্লেষণ করব কীভাবে অ্যালগরিদম মানুষের মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতাকে পুঁজি করে ক্রোধের একটি ভাইরালিটি তৈরি করে এবং কীভাবে এই প্রক্রিয়াটি বিশ্বব্যাপী সামাজিক ও ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলছে।

ডিজিটাল ইকোসিস্টেমে ক্রোধের মনস্তাত্ত্বিক ও অ্যালগরিদমিক মেকানিজম

সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদমগুলো মূলত 'এনগেজমেন্ট' বা ব্যবহারকারীর সক্রিয়তা বৃদ্ধির ওপর ভিত্তি করে ডিজাইন করা হয়েছে। মনস্তাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে যে, মানুষের মস্তিষ্ক ইতিবাচক সংবাদের চেয়ে নেতিবাচক বা উস্কানিমূলক সংবাদের প্রতি দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখায়। যখন কোনো ব্যবহারকারী কোনো উস্কানিমূলক বা ক্ষোভ উদ্রেককারী পোস্টের সংস্পর্শে আসেন, তখন তার মস্তিষ্কের 'অ্যামিগডালা' (Amygdala) সক্রিয় হয়ে ওঠে, যা ভয় ও ক্রোধের কেন্দ্র। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো এই জৈবিক প্রতিক্রিয়াকে পুঁজি করে ব্যবহারকারীকে দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনে আটকে রাখতে চায়।

এই প্রক্রিয়ায় মানুষের যৌক্তিক চিন্তাশক্তি বা 'Rational Knowledge' (المعرفة العقلانية) লোপ পায়। স্পিনোজার দর্শনের আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যখন মানুষ কোনো ঘটনার প্রকৃত কারণ বা প্রেক্ষাপট বুঝতে ব্যর্থ হয়, তখন সে আবেগের দাসে পরিণত হয়।

"وبقدر ما يفهم الذهن كل الأشياء على أنها ضرورية لازمة، يكون اكثر سيطرة على العواطف، وأقل سلبية نحوها"
[1] । অর্থাৎ, যখন মন কোনো বিষয়কে তার অনিবার্য কারণসহ বুঝতে পারে না, তখন সে আবেগের কাছে আত্মসমর্পণ করে এবং বাহ্যিক প্রভাবের শিকার হয়। ডিজিটাল ইকোসিস্টেমে অ্যালগরিদমগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে তথ্যের প্রেক্ষাপট বা 'Context' গোপন রাখে, যাতে ব্যবহারকারী কেবল উস্কানিমূলক অংশটুকুই দেখে এবং দ্রুত ক্ষোভ প্রকাশ করে।

এই মনস্তাত্ত্বিক বিচ্যুতিটি ব্যবহারকারীকে 'নেহা্বন লিল ইনফিয়ালাত' (نهباً للانفعالات والأهواء) বা আবেগের শিকার হিসেবে পরিণত করে [2] । অ্যালগরিদমিক ফিডগুলো এমনভাবে সাজানো হয় যে, একজন ব্যবহারকারী যখন একবার ক্রোধ প্রকাশ করেন, তখন তার ফিডে আরও বেশি উস্কানিমূলক কন্টেন্ট আসতে থাকে। এটি একটি 'ফীডব্যাক লুপ' তৈরি করে, যেখানে ক্রোধের মাত্রা ক্রমাগত বৃদ্ধি পায়। ফলে ব্যবহারকারী বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি কৃত্রিম ও উস্কানিমূলক ডিজিটাল বাস্তবতায় বন্দি হয়ে পড়েন, যা তার বিচারবুদ্ধিকে অবশ করে দেয়।

আউটরেজ ইকোনোমিক্স: মনোযোগের অর্থনীতি ও সংবেদনশীলতার বাণিজ্যিকীকরণ

বর্তমান যুগে 'মনোযোগ' (Attention) হলো সবচেয়ে মূল্যবান মুদ্রা। 'আউটরেজ ইকোনোমি' বা ক্ষোভের অর্থনীতি মূলত এই মনোযোগকে আহরণ করার একটি পদ্ধতি। সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলোর জন্য ব্যবহারকারীর ক্রোধ বা ক্ষোভ অত্যন্ত লাভজনক, কারণ ক্ষোভের মাধ্যমে সৃষ্ট কন্টেন্ট বা 'আউটরেজ' সাধারণ তথ্যের তুলনায় অনেক বেশি দ্রুত এবং ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে (Viral)। এই ভাইরালিটি যত বেশি হয়, প্ল্যাটফর্মের বিজ্ঞাপন আয় এবং ব্যবহারকারীর সময় তত বৃদ্ধি পায়।

এই বাণিজ্যিকীকরণ প্রক্রিয়ায় মানুষের সংবেদনশীলতাকে একটি পণ্যে রূপান্তরিত করা হয়। যখন কোনো সামাজিক বা রাজনৈতিক ইস্যুকে উস্কানিমূলকভাবে উপস্থাপন করা হয়, তখন তা কেবল আলোচনার বিষয় থাকে না, বরং তা একটি বাণিজ্যিক সম্পদে পরিণত হয়।

"وسنبحث الآن في العناصر العاطفية. التي يساعد انتشارُها أيام الثورات على تغيير شخصيات الأفراد"
[3] । এই উক্তিটি নির্দেশ করে যে, আবেগের বিস্তার কীভাবে মানুষের চরিত্র এবং সামাজিক কাঠামো পরিবর্তন করতে পারে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো এই পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করে মুনাফা অর্জন করে।

আউটরেজ ইকোনোমি মূলত 'Polarization' বা মেরুকরণ তৈরি করে। প্ল্যাটফর্মগুলো এমন কন্টেন্ট প্রমোট করে যা ব্যবহারকারীর পূর্বনির্ধারিত বিশ্বাসকে উসকে দেয় এবং বিপরীত মতাদর্শের প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করে। এই ঘৃণা বা 'Outrage' যত তীব্র হয়, ব্যবহারকারীর এনগেজমেন্ট তত বাড়ে। ফলে, একটি সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ আলোচনার পরিবর্তে ডিজিটাল স্পেসটি একটি 'Echo Chamber'-এ পরিণত হয়, যেখানে কেবল উস্কানিমূলক কণ্ঠস্বরগুলোই প্রতিধ্বনিত হয়। এটি মূলত একটি মনস্তাত্ত্বিক কারসাজি, যেখানে মানুষের নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক মানদণ্ডকে বিসর্জন দিয়ে কেবল বাণিজ্যিক মুনাফাকে প্রাধান্য দেওয়া হয় [4]

ইমোশনাল কনটাজিয়ন ও সামাজিক অস্থিরতা: একটি ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ

ইমোশনাল কনটাজিয়ন বা আবেগীয় সংক্রামকতা কেবল ব্যক্তিগত স্তরে সীমাবদ্ধ নয়, এটি একটি শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। যখন কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা রাষ্ট্রীয় স্বার্থের জন্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে কৃত্রিমভাবে ক্ষোভ বা ঘৃণা ছড়িয়ে দেওয়া হয়, তখন তা সরাসরি সামাজিক অস্থিরতা এবং গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। এই প্রক্রিয়াটি মূলত 'Hybrid Warfare' বা হাইব্রিড যুদ্ধের একটি অংশ, যেখানে সরাসরি সামরিক শক্তির পরিবর্তে মনস্তাত্ত্বিক ও ডিজিটাল উপায়ে একটি জাতির অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নষ্ট করা হয়।

ডিজিটাল মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এই ক্ষোভ কীভাবে মানুষের চরিত্র এবং সামাজিক সংহতি পরিবর্তন করে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

"التي يساعد انتشارُها أيام الثورات على تغيير شخصيات الأفراد"
[5] । এই উক্তিটি প্রমাণ করে যে, আবেগের ব্যাপক বিস্তার মানুষের ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত চরিত্রকে বদলে দিতে সক্ষম। যখন কোনো জাতি বা সমাজ ডিজিটাল মাধ্যমে ক্রমাগত উস্কানিমূলক ও ক্ষোভজনক তথ্যের সম্মুখীন হয়, তখন তাদের মধ্যে সহনশীলতা ও সহমর্মিতা লোপ পায় এবং পরিবর্তে তৈরি হয় চরমপন্থা ও বিভাজন।

ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, এই 'আউটরেজ ভাইরালিটি' ব্যবহার করে একটি দেশের জনমতকে প্রভাবিত করা, নির্বাচনকে প্রভাবিত করা এবং এমনকি জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত করা সম্ভব। আবেগীয় সংক্রামকতার মাধ্যমে সৃষ্ট এই বিশৃঙ্খলা একটি দেশের সামাজিক পুঁজি (Social Capital) ধ্বংস করে দেয়। যখন মানুষ একে অপরের প্রতি কেবল ঘৃণা ও ক্ষোভ অনুভব করতে শুরু করে, তখন রাষ্ট্রের প্রতি তাদের আনুগত্য এবং সামাজিক নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধা হ্রাস পায়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী সংকট তৈরি করে, যা কোনো দেশের গণতান্ত্রিক ও সামাজিক কাঠামোর ভিত্তি নাড়িয়ে দিতে পারে [6]

নববী আদর্শ ও আবেগীয় নিয়ন্ত্রণ: একটি মনস্তাত্ত্বিক ও নৈতিক সমাধান

ডিজিটাল যুগের এই বিশৃঙ্খল আবেগীয় প্রবাহ এবং 'আউটরেজ ইকোনোমি'র বিপরীতে একটি শক্তিশালী মনস্তাত্ত্বিক ও নৈতিক সমাধান প্রদান করে নবি সা.-এর জীবন ও আদর্শ। আধুনিক মনস্তত্ত্ব যেখানে আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে নবি সা. শিখিয়েছেন কীভাবে তীব্র আবেগের মুহূর্তেও আত্মসংযম ও ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়। মানুষের স্বভাবজাত আবেগ—তা আনন্দ হোক বা ক্রোধ—তাকে দমন করা নয়, বরং তাকে সঠিক পথে পরিচালিত করা বা 'Regulation' করাই হলো প্রকৃত নৈতিকতা।

ইসলামি নীতিশাস্ত্র অনুযায়ী, উত্তম চরিত্র বা 'Khuluq' হলো আবেগের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা।

"وليس الخلق الحسن إلا التعديل بين هذه الأحوال، وإقامة الوزن بالقسط بين العواطف القوية والنوازع الثائرة"
[7] । অর্থাৎ, প্রবল আবেগ এবং উত্তাল প্রবৃত্তির মধ্যে ন্যায়বিচারের সাথে ভারসাম্য স্থাপন করাই হলো উত্তম চরিত্রের মূল ভিত্তি। নবি সা. ছিলেন এই ভারসাম্যের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। তিনি মানুষের আবেগীয় অস্থিরতার সময় কীভাবে শান্ত ও স্থির থাকতে হয়, তার পূর্ণাঙ্গ মডেল প্রদান করেছেন।

ডিজিটাল মাধ্যমে যখন মানুষ উস্কানিমূলক তথ্যের দ্বারা প্ররোচিত হয়, তখন নবি সা.-এর আদর্শ আমাদের 'Kabh al-Nafs' বা আত্মসংযমের শিক্ষা দেয়।

"ولا يحظى بنصيبه من مكارم الأخلاق إلا الذي يعرف كيف يكبح النفس عند جموحها، ويحسن التصرف فيها وقت ثورتها"
[8] । অর্থাৎ, যে ব্যক্তি তার প্রবৃত্তির উন্মত্ততার সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং তার উত্তাল মুহূর্তগুলোতে সঠিক আচরণ করতে পারে, কেবল সেই প্রকৃত নৈতিকতার অধিকারী হতে পারে। নবি সা.-এর এই শিক্ষা বর্তমানের 'ইমোশনাল কনটাজিয়ন' বা আবেগীয় সংক্রামকতার বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী ঢাল হিসেবে কাজ করতে পারে।

নবি সা.-এর জীবন থেকে প্রাপ্ত এই শিক্ষা কেবল ব্যক্তিগত প্রশান্তিই দেয় না, বরং এটি একটি সুস্থ ও স্থিতিশীল সমাজ গঠনের মূল চাবিকাঠি। যখন একজন মুমিন ডিজিটাল মাধ্যমে কোনো উস্কানিমূলক বা ক্ষোভজনক খবর পান, তখন তিনি নবি সা.-এর আদর্শ অনুসরণ করে তা যাচাই (Tabayyun) করেন এবং আবেগের বশবর্তী না হয়ে যুক্তিনির্ভর ও ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এই আত্মসংযম এবং ভারসাম্যপূর্ণ আচরণই পারে ডিজিটাল জগতের এই কৃত্রিম ক্ষোভ ও বিভাজন থেকে সমাজকে রক্ষা করতে এবং একটি স্থিতিশীল ও শান্তিপূর্ণ বিশ্ব বিনির্মাণে সহায়তা করতে।

""
৮.২ ইমোশনাল কনটাজিয়ন (Emotional Contagion): সোশ্যাল মিডিয়ায় অ্যাঙ্গার (Anger) এবং আউটরেজ (Outrage) ভাইরালিটির ইকোনোমিক্স
আমাদের নবী সা. সীরাত বিশ্বকোষ
ha-mims.world
এ আর্টিকেলের কুইজ(5টি প্রশ্ন)

৮.২ ইমোশনাল কনটাজিয়ন (Emotional Contagion): সোশ্যাল মিডিয়ায় অ্যাঙ্গার (Anger) এবং আউটরেজ (Outrage) ভাইরালিটির ইকোনোমিক্স কুইজ

1 / 5

সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদমগুলো মানুষের মস্তিষ্কের কোন অংশটিকে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় করতে চায়?

এই আর্টিকেলটি কেমন লাগলো?

এই গবেষণাকে সহায়তা করুন

সীরাত বিশ্বকোষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আপনার সামান্য সহায়তা এই গবেষণাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

bKash / Nagad01XXXXXXXXXX(Send Money)
☕ Ko-fi দিয়ে সহায়তা

রেফারেন্স: "সীরাত বিশ্বকোষ" লিখুন

🌟 Ha-mim's World-এর একটি গবেষণা ও জ্ঞান-প্রযুক্তি প্রকল্প

কমিউনিটি রিফ্লেকশন

এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি কী শিখলেন বা আপনার অনুভূতি কী, তা সবার সাথে শেয়ার করুন।

আপনার রিফ্লেকশন শেয়ার করতে দয়া করে লগইন করুন।

লোড হচ্ছে...