খণ্ড 81
ফন্ট:100%
থিম:

১৩.৫ সোশ্যাল অন্টারপ্রেনিউরশিপ (Social Entrepreneurship): ব্যবসার সাথে জনকল্যাণের মার্জিং (Merging)

আধুনিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় 'লাভ' বা 'প্রফিট' এবং 'জনকল্যাণ' বা 'সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার'-কে প্রায়শই দুটি বিপরীতমুখী মেরু হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যেখানে প্রথাগত ব্যবসায়িক মডেলের মূল লক্ষ্য হলো শেয়ারহোল্ডারদের মুনাফা সর্বোচ্চকরণ, সেখানে সোশ্যাল অন্টারপ্রেনিউরশিপ বা সামাজিক উদ্যোক্তা ধারণাটি এই প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। এটি এমন একটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক দর্শন, যেখানে ব্যবসায়িক কৌশল, উদ্ভাবনী ব্যবস্থাপনা এবং সম্পদের দক্ষ ব্যবহারকে কেবল ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক মুনাফার জন্য নয়, বরং সমাজের কাঠামোগত সমস্যা সমাধানের জন্য প্রয়োগ করা হয়। ইসলামের ইতিহাসে এই ধারণাটি কোনো নতুন উদ্ভাবন নয়; বরং এটি ইসলামের 'মাসলাহা' (জনকল্যাণ) এবং 'ইহসান' (উৎকর্ষতা) এর তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক প্রয়োগের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।

সামাজিক উদ্যোক্তা বা সোশ্যাল অন্টারপ্রেনিউরশিপের মূল ভিত্তি হলো সামাজিক প্রয়োজন এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতার মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ মেলবন্ধন ঘটানো। এটি কেবল দান বা চ্যারিটির মাধ্যমে সমাজসেবা নয়, বরং একটি টেকসই (Sustainable) ব্যবসায়িক মডেল তৈরি করা, যা নিজের খরচ নিজে চালাতে সক্ষম এবং একই সাথে সমাজের একটি নির্দিষ্ট সমস্যার সমাধান নিশ্চিত করে। এই প্রক্রিয়ায় উদ্যোক্তা কেবল একজন মুনাফা সন্ধানী ব্যক্তি নন, বরং তিনি একজন সামাজিক পরিবর্তনকারী (Social Change Agent), যিনি সম্পদের বণ্টন এবং ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি নতুন নৈতিক মানদণ্ড স্থাপন করেন।

সামাজিক চাহিদা ও অর্থনৈতিক আচরণের মনস্তাত্ত্বিক মিথস্ক্রিয়া

সামাজিক উদ্যোক্তা হওয়ার পূর্বশর্ত হলো সমাজের অবদমিত চাহিদা এবং বিদ্যমান অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যকার ব্যবধানটি অনুধাবন করা। মানুষের প্রয়োজনগুলো কেবল বস্তুগত নয়, বরং তা সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক কাঠামোর দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত। যখন একটি সমাজের প্রচলিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হয়, তখন সেখানে একটি মনস্তাত্ত্বিক অস্থিরতা তৈরি হয়। এই অস্থিরতা অনেক সময় সামাজিক অস্থিরতা বা নতুন কোনো আদর্শের উত্থানের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

ঐতিহাসিক ও সমাজতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটে দেখা যায় যে, সামাজিক প্রয়োজনগুলো প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয় এবং এই পরিবর্তনগুলো মানুষের অর্থনৈতিক আচরণের ওপর প্রভাব ফেলে। একটি সমাজ যখন তার প্রচলিত মূল্যবোধ বা বিশ্বাসের সংকটে পড়ে, তখন সেই পরিবর্তনের ঢেউ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও প্রতিফলিত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে যে, সামাজিক চাহিদাগুলো যখন নির্দিষ্ট রূপ ধারণ করে, তখন তা সমাজের বিদ্যমান কাঠামোর ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এই চাপ মোকাবিলা করতে গিয়ে অনেক সময় নতুন ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মডেলের উদ্ভব ঘটে।

একটি গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক দিক হলো, সামাজিক বিশ্বাস বা আকাইদ (العقائد) যখন সমাজের জৈবিক বা মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়াগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়, তখন স্বার্থের সংঘাত বা 'Conflict of Interest' তৈরি হয়। এই পরিস্থিতিতে সামাজিক প্রণোদনাগুলো (Social Incentives) সমালোচনার মুখে পড়ে এবং ভেঙে পড়তে শুরু করে। এই প্রক্রিয়াটি নিম্নোক্তভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে:


"وتسيء الحاجات بتشكيل صورها، وتكتفي بما تستطيع تحقيقه من أين؟ وكيف؟ وتتوقف العقائد التي قام عليها المجتمع، عن السيطرة على الاستجابات العضوية، ولكنها تتعرض للهجمات على أساس المصالح. وتدافع عن نفسها، على هذا الأساس أيضا، وتتهدم الحوافز الاجتماعية العظيمة في النفس، التي تمثلها هذه العقائد عن طريق النقد"

উপরোক্ত আরবি ইবারতটি নির্দেশ করে যে, মানুষের প্রয়োজনগুলো যখন তাদের রূপ পরিবর্তন করে এবং বিদ্যমান সামাজিক বিশ্বাসগুলো মানুষের জৈবিক বা মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়, তখন স্বার্থের ভিত্তিতে সেই বিশ্বাসগুলোর ওপর আক্রমণ চালানো হয়। এই প্রক্রিয়ায় মানুষের অন্তরে থাকা মহান সামাজিক প্রণোদনাগুলো সমালোচনার শিকার হয়ে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। একজন সফল সোশ্যাল অন্টারপ্রেনিউর এই মনস্তাত্ত্বিক সংকটকে বুঝতে পারেন এবং এমন একটি ব্যবসায়িক মডেল তৈরি করেন যা কেবল মুনাফা নয়, বরং মানুষের এই সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক শূন্যতা পূরণে সক্ষম।

ক্যালভিনিস্ট অর্থনৈতিক মডেল ও সামষ্টিক উপযোগিতার তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

সোশ্যাল অন্টারপ্রেনিউরশিপের ধারণাটি বোঝার জন্য ইতিহাসের বিভিন্ন অর্থনৈতিক দর্শন পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে, যখন ব্যক্তিগত সম্পদ এবং সামষ্টিক কল্যাণকে একত্রিত করার কথা আসে, তখন ক্যালভিনিস্ট (Calvinist) অর্থনৈতিক দর্শনের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ পাওয়া যায়। যদিও এটি একটি খ্রিস্টীয় প্রেক্ষাপট থেকে উদ্ভূত, তবে এর মূল দর্শন—অর্থাৎ সম্পদের ব্যবহারকে জনকল্যাণের সাথে যুক্ত করা—সামাজিক উদ্যোক্তার মূলনীতির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।

ক্যালভিনিস্ট দর্শনে কঠোর পরিশ্রম, সংযম এবং অর্থনৈতিক শৃঙ্খলাকে একটি ধর্মীয় কর্তব্য হিসেবে দেখা হতো। এখানে অর্থনীতি কেবল একটি জাগতিক বিষয় ছিল না, বরং এটি একটি ধর্মীয় আইনের (Religious Law) মতো কাজ করত। এই মডেলে ব্যক্তিগত সম্পদ অর্জনের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ছিল সেই সম্পদকে সমাজের বৃহত্তর কল্যাণে ব্যবহার করা। ক্যালভিন ব্যক্তিগত মিতব্যয়িতা এবং কঠোর পরিশ্রমের ওপর জোর দিলেও, তিনি অর্থনীতির ক্ষেত্রে ব্যক্তিবাদী (Individualistic) মডেলকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তার মতে, সমাজের ঐক্য কোনো একক ব্যক্তির স্বাধীনতার ওপর নয়, বরং একটি কঠোর নিয়মানুবর্তী সামাজিক কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল।

ক্যালভিনের এই দর্শনটি সামাজিক উদ্যোক্তার 'Collective Benefit' বা সামষ্টিক উপযোগিতার ধারণাকে শক্তিশালী করে। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, কোনো ব্যক্তির মেধা বা সম্পদ কেবল তার নিজের ব্যবহারের জন্য নয়, বরং তা সমাজের অন্যান্য সদস্যদের সাথে ভাগ করে নেওয়া উচিত। এই ধারণাটি আধুনিক সোশ্যাল অন্টারপ্রেনিউরশিপের সেই মূলনীতির সাথে মিলে যায় যেখানে উদ্যোক্তার উদ্ভাবনী ক্ষমতা বা সম্পদকে সমাজের বৃহত্তর কল্যাণে নিয়োজিত করা হয়। এই প্রেক্ষাপটে আরবি ইবারতটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ:


"وليس لأحد من أعضاء الجماعة المسيحية أن يحتفظ بمواهبه لنفسه، وأن يقصرها على استعماله الخاص، بل يجب أن يشرك فيها زملاءه من الأعضاء، وأن يجني فائدة إلا من تلك الأشياء، التي تنشأ من النفع العام للهيئة، باعتبارها كلاً لا يتجزأ"
[1]

এই ইবারতটি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে যে, কোনো খ্রিস্টীয় সম্প্রদায়ের সদস্যের উচিত নয় তার মেধা বা ক্ষমতা কেবল নিজের ব্যবহারের জন্য সীমাবদ্ধ রাখা; বরং তাকে তার সহকর্মীদের সাথে তা ভাগ করে নিতে হবে। একজন ব্যক্তি কেবল সেই উৎস থেকেই মুনাফা অর্জন করতে পারেন যা একটি সামগ্রিক সত্তা বা 'Body' হিসেবে জনস্বার্থ বা 'النفع العام' (Public Benefit) থেকে উদ্ভূত হয়। এই দর্শনটি নির্দেশ করে যে, ব্যবসা বা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তখনই সার্থক হয় যখন তা সমাজের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে কাজ করে এবং সামষ্টিক উপযোগিতা নিশ্চিত করে।

তাছাড়া, এই মডেলটি অন্যায্য মুনাফা অর্জন এবং সম্পদের মজুদকরণ (Hoarding) রোধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছিল। ক্যালভিনিস্ট ব্যবস্থায় সুদখোর বা যারা মানুষের সুযোগের অপব্যবহার করে মুনাফা অর্জন করত, তাদের কঠোরভাবে দমন করা হতো। এটি আধুনিক সোশ্যাল অন্টারপ্রেনিউরশিপের সেই নৈতিক দিকটিকে তুলে ধরে যেখানে 'Ethical Profit' বা নৈতিক মুনাফার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। অর্থাৎ, মুনাফা অর্জন করা যাবে, কিন্তু তা হতে হবে সামাজিক ন্যায়বিচার এবং স্বচ্ছতার ভিত্তিতে, যা সমাজের সামগ্রিক স্থিতিশীলতাকে বিঘ্নিত করবে না।

সংকটকালীন সমাজ বিনির্মাণে জনকল্যাণমূলক কাঠামোর ভূমিকা: আলজেরীয় বিপ্লবের একটি দৃষ্টান্ত

সোশ্যাল অন্টারপ্রেনিউরশিপের একটি অত্যন্ত কার্যকর এবং বাস্তবমুখী প্রয়োগ দেখা যায় চরম সংকটকালীন বা বিপ্লবী পরিস্থিতিতে। যখন একটি রাষ্ট্র বা সমাজ প্রচলিত কাঠামোর বাইরে গিয়ে নতুন করে আত্মপরিচয় ও স্বাধীনতা অর্জনের চেষ্টা করে, তখন সেখানে সামাজিক সেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলো অনেকটা 'সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ' হিসেবে কাজ করে। আলজেরীয় বিপ্লবের প্রেক্ষাপটটি এই বিষয়ে একটি অনন্য ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত প্রদান করে।

আলজেরীয় বিপ্লবের সময়, যখন ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থা মানুষের মৌলিক অধিকার ও জীবনযাত্রাকে অবদমিত করে রেখেছিল, তখন বিপ্লবীরা কেবল সামরিক লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং তারা একটি বিকল্প সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তারা স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং বিচার ব্যবস্থার মতো মৌলিক ক্ষেত্রগুলোতে নিজস্ব ব্যবস্থাপনা তৈরি করেছিলেন। এই উদ্যোগগুলো ছিল মূলত তৃণমূল পর্যায়ের সামাজিক উদ্যোগ, যা বিপ্লবের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার জন্য অপরিহার্য ছিল।

বিপ্লবীরা স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষার ক্ষেত্রে যে কার্যক্রম পরিচালনা করেছিলেন, তা ছিল অত্যন্ত সুসংগঠিত। তারা কেবল যুদ্ধক্ষেত্রেই নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নেও কাজ করেছিলেন। বিশেষ করে, গ্রামীণ এলাকায় শিক্ষার প্রসার এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন ছিল একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। এই কার্যক্রমগুলো পরিচালনার জন্য তারা এমন একটি কাঠামো তৈরি করেছিলেন যা অনেকটা আধুনিক সামাজিক উদ্যোগের মতো কাজ করত। এই প্রেক্ষাপটে আলজেরীয় বিপ্লবের সামাজিক কাঠামোর গুরুত্ব নিম্নরূপ:


"وبالموازاة مع العمل على تنظيم القواعد الشعبية ووضع أسس النظام القضائي، كانت قيادات الثورة في الولايات تولي أهمية خاصة بإقامة المنشآت الصحية عبر مختلف أنحاء الوطن وتبذل جهوداً جبارة لتقديم أدنى ما يمكن من التعليم لأبناء الريف الجزائري ولتنظيم حملات محو الأمية للحملات الكبار."
[2]

উপরোক্ত ইবারতটি নির্দেশ করে যে, জনতাকে সংগঠিত করার পাশাপাশি বিপ্লবের নেতৃত্ব স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন এবং গ্রামীণ শিশুদের জন্য শিক্ষা ও বয়স্কদের জন্য নিরক্ষরতা দূরীকরণ কর্মসূচীর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিল। এই কার্যক্রমগুলো কেবল সেবা প্রদান ছিল না, বরং এগুলো ছিল একটি নতুন সমাজ গঠনের হাতিয়ার। স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো কেবল আহতদের চিকিৎসা দিত না, বরং তারা নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণেও ভূমিকা রাখত, যা একটি টেকসই মানবসম্পদ তৈরির প্রক্রিয়া ছিল।

একইভাবে, শিক্ষা ও বিচার ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও তারা একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ কাঠামো তৈরি করেছিলেন। আলজেরীয় বিপ্লবীরা যখন স্থানীয় বিচার কমিটি বা 'লজান আল-আদল' (لجان العدل) গঠন করেছিলেন, তখন তারা মূলত একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করেছিলেন যা মানুষের মধ্যকার বিবাদ মীমাংসা করত এবং সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখত। এই ধরনের উদ্যোগগুলো প্রমাণ করে যে, যখন প্রচলিত ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, তখন সামাজিক উদ্যোক্তা বা সংগঠিত গোষ্ঠীগুলো কীভাবে জনকল্যাণমূলক সেবা প্রদানের মাধ্যমে একটি নতুন ও স্থিতিশীল সমাজ বিনির্মাণ করতে পারে। এটি আধুনিক সোশ্যাল অন্টারপ্রেনিউরশিপের সেই ধারণাকে সমর্থন করে যেখানে সামাজিক সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে একটি নতুন ও টেকসই সামাজিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়।

ইসলামি আর্থ-সামাজিক দর্শনে সোশ্যাল অন্টারপ্রেনিউরশিপের সমন্বয়

পরিশেষে, সোশ্যাল অন্টারপ্রেনিউরশিপের এই তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ থেকে এটি স্পষ্ট যে, ব্যবসার সাথে জনকল্যাণের মেলবন্ধন কোনো আধুনিক বিলাসিতা নয়, বরং এটি একটি মৌলিক সামাজিক ও নৈতিক প্রয়োজন। ইসলামি দর্শন এই ধারণাকে 'তাজাব্বুন' (উদ্ভাবন) এবং 'মাসলাহা' (জনকল্যাণ) এর সমন্বয়ে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ইসলামি অর্থনীতিতে মুনাফা অর্জন একটি বৈধ ও প্রশংসনীয় কাজ, তবে সেই মুনাফা অবশ্যই সামাজিক ন্যায়বিচার এবং সম্পদের সুষম বণ্টনের নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।

ইসলামি মডেলে একজন উদ্যোক্তা কেবল নিজের সম্পদের মালিক নন, বরং তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত আমানতদার। এই আমানতদারিতার ধারণাটি সোশ্যাল অন্টারপ্রেনিউরশিপের 'Stewardship' বা তত্ত্বাবধানের ধারণার সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। একজন মুসলিম উদ্যোক্তা যখন কোনো ব্যবসায়িক উদ্যোগ গ্রহণ করেন, তখন তার লক্ষ্য থাকে কেবল ব্যক্তিগত সমৃদ্ধি নয়, বরং সমাজের অবদমিত প্রয়োজনগুলো পূরণ করা। যাকাত, সাদাকাহ এবং ওয়াকফ—এই তিনটি শক্তিশালী আর্থিক হাতিয়ার ইসলামি সমাজে সোশ্যাল অন্টারপ্রেনিউরশিপের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। ওয়াকফ হলো এমন একটি স্থায়ী সামাজিক উদ্যোগ, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং জনকল্যাণমূলক সেবা প্রদান করে আসছে, যা আধুনিক সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজের একটি ধ্রুপদী ও সফলতম উদাহরণ।

আধুনিক বিশ্বে যখন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং সামাজিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, তখন ইসলামি ও ঐতিহাসিক এই মডেলগুলো অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। ব্যবসার সাথে জনকল্যাণের এই মার্জিং বা মেলবন্ধন কেবল একটি অর্থনৈতিক কৌশল নয়, বরং এটি একটি নৈতিক বিপ্লব। এটি এমন এক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করে যেখানে মানুষের প্রয়োজন ও মর্যাদাকে মুনাফার ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া হয় এবং যেখানে প্রতিটি ব্যবসায়িক লেনদেন সমাজের সামগ্রিক উন্নয়নে অবদান রাখে।

""
১৩.৫ সোশ্যাল অন্টারপ্রেনিউরশিপ (Social Entrepreneurship): ব্যবসার সাথে জনকল্যাণের মার্জিং (Merging)
আমাদের নবী সা. সীরাত বিশ্বকোষ
ha-mims.world
এ আর্টিকেলের কুইজ(5টি প্রশ্ন)

১৩.৫ সোশ্যাল অন্টারপ্রেনিউরশিপ (Social Entrepreneurship) কুইজ

1 / 5

আধুনিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় 'লাভ' এবং 'জনকল্যাণ'-কে সাধারণত কীভাবে বিবেচনা করা হয়?

এই আর্টিকেলটি কেমন লাগলো?

এই গবেষণাকে সহায়তা করুন

সীরাত বিশ্বকোষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আপনার সামান্য সহায়তা এই গবেষণাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

bKash / Nagad01XXXXXXXXXX(Send Money)
☕ Ko-fi দিয়ে সহায়তা

রেফারেন্স: "সীরাত বিশ্বকোষ" লিখুন

🌟 Ha-mim's World-এর একটি গবেষণা ও জ্ঞান-প্রযুক্তি প্রকল্প

কমিউনিটি রিফ্লেকশন

এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি কী শিখলেন বা আপনার অনুভূতি কী, তা সবার সাথে শেয়ার করুন।

আপনার রিফ্লেকশন শেয়ার করতে দয়া করে লগইন করুন।

লোড হচ্ছে...