খণ্ড 81
ফন্ট:100%
থিম:

১৩.৪ আধুনিক যুব বেকারত্ব (Youth Unemployment) দূরীকরণে নববী স্কিল ডেভেলপমেন্ট মডেলের প্রয়োগ

একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতির অন্যতম প্রধান সংকট হলো ক্রমবর্ধমান যুব বেকারত্ব। আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা মূলত তাত্ত্বিক জ্ঞান বা 'Theoretical Knowledge'-এর ওপর অত্যধিক গুরুত্বারোপ করলেও ব্যবহারিক দক্ষতা বা 'Practical Competency' অর্জনে অনেকাংশেই ব্যর্থ হচ্ছে। এর ফলে উচ্চশিক্ষিত যুবসমাজ কর্মসংস্থানের বাজারে নিজেদের অপ্রাসঙ্গিক হিসেবে আবিষ্কার করছে। এই সংকট নিরসনে এবং একটি টেকসই অর্থনৈতিক কাঠামো বিনির্মাণে মহানবি সা.-এর জীবন ও তাঁর শিক্ষণ পদ্ধতি থেকে উদ্ভূত 'স্কিল ডেভেলপমেন্ট মডেল' বা দক্ষতা উন্নয়ন মডেলটি একটি বৈপ্লবিক ও কার্যকর সমাধান হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। নববী মডেলটি কেবল তথ্য প্রদান নয়, বরং কর্মদক্ষতা অর্জন, মনস্তাত্ত্বিক প্রস্তুতি এবং সামাজিক শ্রম বিভাজনের এক সমন্বিত রূপরেখা প্রদান করে।

১. ব্যবহারিক শিক্ষা ও অভিজ্ঞতামূলক শিখন (Experiential Learning): নববী পদ্ধতির তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

আধুনিক বৃত্তিমূলক শিক্ষার (Vocational Education) মূল ভিত্তি হলো 'Learning by Doing' বা হাতে-কলমে শেখা। মহানবি সা.-এর শিক্ষণ পদ্ধতিতে এই নীতিটি অত্যন্ত সুসংহত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ধারণ করেছিল। তিনি কেবল মৌখিক উপদেশের মাধ্যমে জ্ঞান বিতরণ করতেন না, বরং জটিল ও ব্যবহারিক বিষয়গুলো সরাসরি প্রদর্শন বা 'Demonstration'-এর মাধ্যমে অনুধাবন করাতেন। এই পদ্ধতিটি আধুনিক 'Competency-Based Training' (CBT)-এর সমতুল্য, যেখানে শিক্ষার্থীর দক্ষতা যাচাই করা হয় তার কাজের মাধ্যমে, কেবল পরীক্ষার মাধ্যমে নয়।

রাসুলুল্লাহ সা.-এর এই শিক্ষণ পদ্ধতির গুরুত্ব সম্পর্কে বলা হয়েছে:

الأداء العملي النموذجي أمام المتعلمين أوقع في النفس وأثبت من القول ؛ لأنه يثبت في الذهن بصور أوسع، لذا اهتم الرسول صلى الله عليه وسلم بهذه الوسيلة لما لها من أهمية في التعليم، وبخاصة في تعليم أصحابه الأمور العملية.
[1]

উপরোক্ত ইবারতটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, একজন শিক্ষক বা প্রশিক্ষক যখন শিক্ষার্থীর সামনে আদর্শিক ও ব্যবহারিক কর্ম সম্পাদন করেন, তখন তা শিক্ষার্থীর হৃদয়ে ও মস্তিষ্কে অধিকতর স্থায়ী প্রভাব ফেলে। এটি কেবল জ্ঞানকে স্মৃতিতে গেঁথে দেয় না, বরং তা একটি 'Visual Memory' বা দৃশ্যমান স্মৃতি তৈরি করে, যা কর্মক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক প্রয়োগে সহায়তা করে। আধুনিক বেকারত্ব নিরসনে যুবকদের জন্য কেবল পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান যথেষ্ট নয়; বরং তাদের কারিগরি ও পেশাগত দক্ষতা অর্জনের জন্য এই 'Practical Demonstration' পদ্ধতিটি অপরিহার্য।

এর একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো ওযুর শিক্ষা প্রদান। যখন একজন সাহাবি ওযুর পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে চাইলেন, তখন রাসুলুল্লাহ সা. কেবল বর্ণনা করেননি, বরং নিজেই ওজু করে তা প্রদর্শন করেছেন। বর্ণিত আছে যে, তিনি পাত্রে পানি নিয়ে নিজের হাত, মুখ, বাহু এবং পা ধৌত করে দেখালেন এবং বললেন:

"هكذا الوضوء، فمن زاد على هذا أو نقص فقد أساء وظلم"
[2]

এই ঘটনাটি নির্দেশ করে যে, যেকোনো পেশাগত দক্ষতা বা 'Skill' অর্জনের ক্ষেত্রে 'Model Behavior' বা আদর্শিক প্রদর্শন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে যখন আমরা যুবকদের কারিগরি প্রশিক্ষণ দেব, তখন প্রশিক্ষকদের উচিত হবে কেবল তাত্ত্বিক লেকচার না দিয়ে সরাসরি কাজের মাধ্যমে দক্ষতা প্রদর্শন করা। এটি যুবকদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করে এবং তাদের পেশাগত উৎকর্ষতা (Professional Excellence) অর্জনে সহায়তা করে, যা বেকারত্ব দূরীকরণের প্রধান চাবিকাঠি।

২. মনস্তাত্ত্বিক প্রস্তুতি ও গ্রহণের সক্ষমতা (Psychological Readiness and Receptivity)

দক্ষতা উন্নয়ন কেবল বাহ্যিক কারিগরি প্রশিক্ষণের বিষয় নয়, বরং এটি একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া। আধুনিক বেকারত্বের একটি বড় কারণ হলো যুবকদের মধ্যে 'Growth Mindset' বা শেখার মানসিকতার অভাব। নববী দর্শনে কোনো জ্ঞান বা দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা বা 'Receptivity' অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো একটি শিক্ষা বা চিকিৎসা তখনই কার্যকর হয়, যখন গ্রহণকারীর মন ও প্রাণ তা গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত থাকে।

এই মনস্তাত্ত্বিক দিকটি বুঝতে হলে আমরা কুরআন ও সুন্নাহর নিরাময় ও শিক্ষা সংক্রান্ত আলোচনার সাহায্য নিতে পারি। কোনো প্রতিকার বা শিক্ষা তখনই ফলপ্রসূ হয় যখন গ্রহণকারীর 'Acceptance' বা গ্রহণের ক্ষমতা থাকে। যেমনটি বলা হয়েছে:

تستدعى قبول المحل، وقوة همة الفاعل وتأثيره، فمتى تخلف الشفاء كان لضعف تأثير الفاعل، أو لعدم قبول المحل المنفعل...
[3]

এখানে 'قبول المحل' বা গ্রহণকারীর গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। দক্ষতা উন্নয়নের প্রেক্ষাপটে এর অর্থ হলো, একজন প্রশিক্ষণার্থী যদি মানসিকভাবে শেখার জন্য প্রস্তুত না থাকে বা তার মধ্যে শেখার প্রবল ইচ্ছা (Willpower) না থাকে, তবে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম প্রশিক্ষণ পদ্ধতিও তাকে দক্ষ করে তুলতে পারবে না। আধুনিক বেকারত্ব নিরসনে যুবকদের কেবল কারিগরি প্রশিক্ষণ দিলেই হবে না, বরং তাদের মধ্যে 'Learning Agility' বা দ্রুত শেখার মানসিকতা ও ধৈর্য তৈরি করতে হবে।

তদুপরি, প্রশিক্ষকের বা 'Factor'-এর সক্ষমতা ও উদ্যমও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। নববী মডেলে একজন শিক্ষক বা প্রশিক্ষক কেবল তথ্য প্রদানকারী নন, বরং তিনি একজন 'Motivator' বা অনুপ্রেরণাদাতা। যখন প্রশিক্ষকের দক্ষতা ও উদ্যম (همة) এবং শিক্ষার্থীর গ্রহণের ক্ষমতা (قبول) এই দুইয়ের সমন্বয় ঘটে, তখনই প্রকৃত 'Skill Acquisition' বা দক্ষতা অর্জন সম্ভব হয়। বেকার যুবকদের জন্য কর্মমুখী শিক্ষার ক্ষেত্রে এই মনস্তাত্ত্বিক সমন্বয়টি অত্যন্ত জরুরি, যাতে তারা কেবল সনদধারী না হয়ে প্রকৃত দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত হতে পারে।

৩. সামাজিক শ্রম বিভাজন ও অর্থনৈতিক কাঠামো (Social Division of Labor and Economic Structure)

একটি রাষ্ট্র বা সমাজের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নির্ভর করে তার জনশক্তির সঠিক বিন্যাস ও শ্রম বিভাজনের ওপর। বেকারত্ব তখনই প্রকট হয় যখন সমাজের দক্ষতাসম্পন্ন জনশক্তি এবং বাজারের চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য থাকে না। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন সভ্যতায় শ্রম বিভাজনের যে মডেল দেখা যায়, তা আধুনিক 'Human Resource Management' বা মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার একটি আদিম ও কার্যকর রূপ।

ঐতিহাসিক গ্রন্থ 'মিরআতুয জামান'-এ প্রাচীন রাজবংশ ও সমাজ কাঠামোর বর্ণনায় দেখা যায় যে, সমাজকে সুসংগঠিত রাখতে বিভিন্ন স্তরের পেশাদার শ্রেণি তৈরি করা হয়েছিল। যেমনটি জামশিদ (Jamshid)-এর শাসনামলের বর্ণনায় পাওয়া যায়:

ورتَّب الناس أربع طبقات: طبقة مقاتلة، وطبقة علماء، وطبقة خدماء، وطبقة كتّابًا وصناعًا وحرّاثين ونحوهم.
[4]

এই ঐতিহাসিক তথ্যটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, সমাজকে চারটি প্রধান স্তরে বিন্যস্ত করা হয়েছিল: যোদ্ধা (Warriors), আলেম বা জ্ঞানতাত্ত্বিক (Scholars), সেবক (Servants), এবং লেখক, কারিগর ও কৃষক (Writers, Craftsmen, and Farmers)। এই বিন্যাসটি আধুনিক 'Specialized Labor Market'-এর একটি প্রাচীন প্রতিচ্ছবি। বেকারত্ব দূরীকরণের জন্য এই মডেলটি আমাদের শেখায় যে, একটি দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নির্ভর করে প্রতিটি স্তরের পেশাদার শ্রেণির দক্ষতার ওপর।

আধুনিক যুব বেকারত্ব নিরসনে এই 'Stratification of Skills' বা দক্ষতার স্তরবিন্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের কেবল উচ্চশিক্ষিত 'White-collar' পেশাজীবী তৈরি করলেই চলবে না, বরং কারিগর (Craftsmen), কৃষিবিদ (Farmers) এবং প্রযুক্তিবিদদের (Technicians) একটি শক্তিশালী ও দক্ষ স্তর তৈরি করতে হবে। নববী সমাজব্যবস্থায় প্রতিটি পেশাকে মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল এবং প্রতিটি কাজের জন্য নির্দিষ্ট দক্ষতা ও দায়িত্ব নির্ধারিত ছিল। যখন একজন যুবক তার নির্দিষ্ট পেশাগত দক্ষতা (Specialized Skill) অর্জন করে এবং সমাজ সেই দক্ষতাকে যথাযথ মর্যাদা ও অর্থনৈতিক সুযোগ প্রদান করে, তখনই বেকারত্ব দূরীকরণ সম্ভব হয়।

৪. ভূ-রাজনৈতিক ও সামষ্টিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে দক্ষতা উন্নয়ন

দক্ষতা উন্নয়ন কেবল ব্যক্তিগত বা অর্থনৈতিক বিষয় নয়, এটি একটি ভূ-রাজনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়। একটি দক্ষ জনশক্তি একটি রাষ্ট্রের 'Collective Security' বা সামষ্টিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। বেকার যুবসমাজ যখন অর্থনৈতিকভাবে অবহেলিত ও কর্মহীন থাকে, তখন তারা সামাজিক অস্থিরতা, অপরাধ প্রবণতা এবং উগ্রবাদের শিকার হওয়ার উচ্চ ঝুঁকিতে থাকে।

নববী মডেলে অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার মধ্যে একটি অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক বিদ্যমান। রাসুলুল্লাহ সা.-এর নির্দেশিত জীবনধারা ও তাঁর সাহাবিদের কর্মতৎপরতা নির্দেশ করে যে, প্রতিটি মুমিনকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য উৎসাহিত করা হয়েছে। যখন যুবসমাজ কারিগরি ও পেশাগতভাবে দক্ষ হয়, তখন তারা কেবল নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করে না, বরং তারা রাষ্ট্রের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করে এবং জাতীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে।

উপসংহারে বলা যায়, আধুনিক যুব বেকারত্ব নিরসনে নববী স্কিল ডেভেলপমেন্ট মডেলটি তিনটি প্রধান স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে:


  • ব্যবহারিক প্রয়োগ (Practical Application): তাত্ত্বিক জ্ঞানের পরিবর্তে হাতে-কলমে শেখার ওপর গুরুত্বারোপ।

  • মনস্তাত্ত্বিক প্রস্তুতি (Psychological Readiness): শিক্ষার্থীর শেখার মানসিকতা ও প্রশিক্ষকের দক্ষতা নিশ্চিতকরণ।

  • পেশাগত বিশেষায়ন (Professional Specialization): সমাজের প্রতিটি স্তরে দক্ষ জনশক্তি ও শ্রম বিভাজন নিশ্চিতকরণ।


এই মডেলটি যদি আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা ও জাতীয় কর্মসংস্থান নীতিতে সমন্বিত করা যায়, তবে তা কেবল বেকারত্বই দূর করবে না, বরং একটি সমৃদ্ধ, স্থিতিশীল ও আত্মনির্ভরশীল সমাজ বিনির্মাণে যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করবে।

""
১৩.৪ আধুনিক যুব বেকারত্ব (Youth Unemployment) দূরীকরণে নববী স্কিল ডেভেলপমেন্ট মডেলের প্রয়োগ
আমাদের নবী সা. সীরাত বিশ্বকোষ
ha-mims.world
এ আর্টিকেলের কুইজ(5টি প্রশ্ন)

১৩.৪ আধুনিক যুব বেকারত্ব (Youth Unemployment) কুইজ

1 / 5

আধুনিক বৃত্তিমূলক শিক্ষার মূল ভিত্তি 'Learning by Doing'-এর সাথে নববী শিক্ষণ পদ্ধতির কোন দিকটি সাদৃশ্যপূর্ণ?

এই আর্টিকেলটি কেমন লাগলো?

এই গবেষণাকে সহায়তা করুন

সীরাত বিশ্বকোষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আপনার সামান্য সহায়তা এই গবেষণাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

bKash / Nagad01XXXXXXXXXX(Send Money)
☕ Ko-fi দিয়ে সহায়তা

রেফারেন্স: "সীরাত বিশ্বকোষ" লিখুন

🌟 Ha-mim's World-এর একটি গবেষণা ও জ্ঞান-প্রযুক্তি প্রকল্প

কমিউনিটি রিফ্লেকশন

এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি কী শিখলেন বা আপনার অনুভূতি কী, তা সবার সাথে শেয়ার করুন।

আপনার রিফ্লেকশন শেয়ার করতে দয়া করে লগইন করুন।

লোড হচ্ছে...