৮.১.১ জীবনের নশ্বরতা ও পরকালের চিরস্থায়ী জীবনের প্রস্তুতি
ইসলামি জীবনদর্শনের মূল ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে তাওহীদ, রিসালাত এবং আখিরাত বা পরকালবিশ্বাসের ওপর। এই ত্রিমাত্রিক বিশ্বাসের অবয়বে পরকালমুখী জীবনচেতনা মানুষের ইহজাগতিক কর্মধারাকে এক সুনির্দিষ্ট ও অর্থপূর্ণ লক্ষ্যপানে পরিচালিত করে। পার্থিব জীবনের ক্ষণস্থায়ীত্ব বা নশ্বরতা এবং পরকালের চিরন্তনতার ধারণা কেবল কোনো তাত্ত্বিক দর্শন নয়, বরং এটি মানুষের মনস্তত্ত্ব, সমাজকাঠামো এবং নৈতিক আচরণের নিয়ন্ত্রক শক্তি। রাসুলুল্লাহ সা. তাঁর দাওয়াতের সূচনা থেকেই মানুষকে এই নশ্বর পৃথিবীর মোহ থেকে মুক্ত করে এক অনন্ত ও শাশ্বত জীবনের প্রস্তুতি গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধে আমরা কুরআন, সুন্নাহ এবং ইসলামি দর্শনের আলোকে জীবনের নশ্বরতা ও পরকালীন প্রস্তুতির নানাবিধ দিক অত্যন্ত নিবিড় ও প্রাতিষ্ঠানিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করব।
পার্থিব জীবনের অসারতা ও কুরআনিক দৃষ্টিভঙ্গি
পবিত্র কুরআনে পার্থিব জীবনকে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও আলঙ্কারিক ভাষায় সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। ইহজগতের এই দৃশ্যমান রূপ, ঐশ্বর্য ও জৌলুস যে আসলে এক মরীচিকা এবং ক্ষণস্থায়ী পরীক্ষাকেন্দ্র, তা কুরআন মাজীদের বহু আয়াতে দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষিত হয়েছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা মানুষের চিন্তাজগতকে নাড়া দেওয়ার জন্য পার্থিব জীবনের উপমাকে বৃষ্টির পর গজিয়ে ওঠা সবুজ উদ্ভিদের সাথে তুলনা করেছেন, যা দ্রুতই শুকিয়ে খড়কুটোয় পরিণত হয়। এই ক্ষণস্থায়ী জীবনের পেছনে অন্ধের মতো ছুটে চলা মানুষের জন্য এক চরম বুদ্ধিবৃত্তিক পরাজয়।
পার্থিব জীবনের এই অসারতা ও ক্রীড়া-কৌতুকের স্বরূপ উন্মোচন করে মহান আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন:
“আর পার্থিব জীবন তো কেবল খেলাধুলা ও তামাশা বৈ কিছু নয়। আর যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য পরকালের আবাসই উত্তম। তোমরা কি অনুধাবন করবে না?” [1] । এই আয়াতে ব্যবহৃত ‘লা’ইব’ (খেলাধুলা) এবং ‘লাহও’ (আমোদ-প্রমোদ) শব্দ দুটি মানুষের পার্থিব ব্যস্ততার অসারতা ও ক্ষণস্থায়ীত্বকে নির্দেশ করে। এটি প্রমাণ করে যে, আখিরাতের তুলনায় দুনিয়ার জীবন অত্যন্ত তুচ্ছ এবং তা কেবলই এক সাময়িক পরীক্ষার ক্ষেত্র।
মানবজাতির মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে কুরআন মাজীদ দেখিয়েছে যে, অধিকাংশ মানুষই তাৎক্ষণিক প্রাপ্তি বা ইহজাগতিক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের পেছনে নিজেদের সমস্ত শক্তি ব্যয় করে ফেলে। তারা পরকালের চিরস্থায়ী কল্যাণের কথা বিস্মৃত হয়। এই প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা মানুষের দুই ধরনের মানসিকতার চিত্র তুলে ধরেছেন:
“অতঃপর মানুষের মধ্যে এমনও আছে যে বলে, ‘হে আমাদের রব, আমাদেরকে দুনিয়াতেই দান করুন।’ অথচ পরকালে তার জন্য কোনো অংশ নেই।” [2] । এই আয়াতটি মানুষের সেই বস্তুবাদী ও সেক্যুলার দৃষ্টিভঙ্গিকে চিহ্নিত করে, যা কেবল ইহলৌকিক স্বার্থ ও বস্তুগত উন্নয়নকেই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য মনে করে। কুরআন এই সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির অসারতা প্রমাণ করে মানুষকে এক বৃহত্তর ও শাশ্বত লক্ষ্যের দিকে আহ্বান জানায়, যেখানে ইহকাল ও পরকালের মাঝে এক অপূর্ব সমন্বয় সাধিত হয়।
হাদিসের আলোকে নশ্বরতার স্বরূপ ও 'মুসাফির' তত্ত্ব
রাসুলুল্লাহ সা.-এর সুন্নাহ ও হাদিসের বিশাল ভাণ্ডারে পার্থিব জীবনের নশ্বরতা এবং পরকালের প্রস্তুতির গুরুত্ব অত্যন্ত চমৎকার ও হৃদয়গ্রাহী উপমা দিয়ে বোঝানো হয়েছে। আল্লাহর রাসুল সা. নিজে অত্যন্ত অনাড়ম্বর জীবন যাপন করে উম্মাহর সামনে এক বাস্তব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তিনি দুনিয়াকে একটি ক্ষণস্থায়ী বিশ্রামের স্থান এবং মানুষকে একজন মুসাফির বা পথচারী হিসেবে কল্পনা করেছেন, যার আসল গন্তব্য হলো পরকাল।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত অত্যন্ত বিখ্যাত একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ সা. মানুষের পার্থিব অবস্থানের স্বরূপ তুলে ধরেছেন। তিনি ইবনে উমর রা.-এর কাঁধে হাত রেখে এক ঐতিহাসিক নসীহত পেশ করেন:
“তুমি দুনিয়াতে এমনভাবে বসবাস করো, যেন তুমি একজন প্রবাসী (অপরিচিত ব্যক্তি) অথবা একজন পথচারী।” [3] । এই হাদিসের গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য রয়েছে। একজন প্রবাসী বা পথচারী যেমন তার সাময়িক অবস্থানস্থলে স্থায়ী ঘরবাড়ি নির্মাণের পেছনে তার সমস্ত সম্পদ ও শ্রম ব্যয় করে না, বরং তার মূল মনোযোগ থাকে স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের পাথেয় সংগ্রহের দিকে; ঠিক তেমনি একজন মুমিনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত পরকালের পাথেয় সংগ্রহ করা।
রাসুলুল্লাহ সা. পার্থিব জীবনের তুচ্ছতা বোঝাতে গিয়ে বিভিন্ন সময় সাহাবিগণকে বাস্তব উদাহরণ দিতেন। একবার তিনি একটি মৃত কানকাটা ছাগলের বাচ্চার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সাহাবিগণকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের মধ্যে কেউ কি এটি এক দিরহামের বিনিময়ে কিনতে রাজি আছ? সাহাবিগণ বললেন, আমরা তো এটি বিনামূল্যেও নিতে চাই না। তখন রাসুলুল্লাহ সা. বললেন, আল্লাহর কসম! এই মৃত ছাগলছানাটি তোমাদের কাছে যেমন তুচ্ছ, আল্লাহর কাছে এই দুনিয়া তার চেয়েও অনেক বেশি তুচ্ছ [4] । এই শিক্ষাগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল মানুষের অন্তর থেকে দুনিয়ার মোহ দূর করা এবং পরকালের চিরস্থায়ী জীবনের প্রতি তীব্র আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি করা, যা মানুষকে পাপাচার থেকে দূরে রাখে এবং সৎকর্মে উদ্বুদ্ধ করে।
পরকালীন প্রস্তুতির মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক প্রভাব
পরকালের চিরস্থায়ী জীবনের প্রতি বিশ্বাস এবং মৃত্যুর পর আল্লাহর দরবারে জবাবদিহিতার চেতনা মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক জীবনে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনয়ন করে। যখন একজন ব্যক্তি বিশ্বাস করে যে তার এই জীবনই শেষ নয়, বরং মৃত্যুর পর তাকে প্রতিটি কাজের জন্য হিসাব দিতে হবে, তখন তার মধ্যে এক গভীর নৈতিক সচেতনতা জাগ্রত হয়। এই চেতনা মানুষকে কেবল বাহ্যিক আইনের ভয়ে নয়, বরং অন্তরের গভীর থেকে সৎ ও ন্যায়পরায়ণ হতে বাধ্য করে।
মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে, পরকালমুখী চেতনা মানুষকে চরম হতাশা ও মানসিক অবসাদ থেকে রক্ষা করে। পার্থিব জীবনে মানুষ যখন কোনো অন্যায়, অবিচার বা বঞ্চনার শিকার হয়, তখন আখিরাতের বিশ্বাস তাকে সান্ত্বনা দেয় যে, এই জগতের সমস্ত অপূর্ণতা ও অবিচারের চূড়ান্ত ও নিখুঁত বিচার হবে পরকালে। এই বিশ্বাস মানুষের মধ্যে এক ধরনের মানসিক প্রশান্তি ও সহনশীলতা (Resilience) তৈরি করে [5] । ফলে পার্থিব কোনো ক্ষতি বা ব্যর্থতা তাকে চরমভাবে ভেঙে ফেলতে পারে না, কারণ সে জানে যে তার আসল প্রাপ্তি ও সফলতা পরকালের চিরস্থায়ী জান্নাতে নিহিত।
সামাজিক ক্ষেত্রে এই পরকালমুখী দর্শনের প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। এটি সমাজে পারস্পরিক অধিকার রক্ষা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং সামষ্টিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রধান ভূমিকা পালন করে। যখন কোনো সমাজের মানুষ পরকালের শাস্তির ভয় এবং পুরস্কারের আশা বুকে ধারণ করে, তখন সেখানে দুর্নীতি, শোষণ, জুলুম এবং অন্যের অধিকার হরণের প্রবণতা শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। প্রত্যেকেই তখন অন্যের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করতে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয় [6] । সম্পদকে তখন কেবল নিজের ভোগের বস্তু মনে না করে আল্লাহর দেওয়া আমানত মনে করা হয়, যা দরিদ্র ও অভাবী মানুষের মাঝে বণ্টন করার মাধ্যমে পরকালের পাথেয় হিসেবে সঞ্চয় করা হয় [7] । এভাবে পরকালীন প্রস্তুতি সমাজকে একটি কল্যাণমুখী ও মানবিক সমাজে রূপান্তরিত করে।
নশ্বরতার বোধ ও ইসলামি জীবনদর্শনের ভারসাম্য
ইসলামি জীবনদর্শনের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো—এটি চরম বৈরাগ্যবাদ (Monasticism) সমর্থন করে না, আবার লাগামহীন বস্তুবাদকেও (Materialism) প্রশ্রয় দেয় না। জীবনের নশ্বরতা ও পরকালের প্রস্তুতির অর্থ এই নয় যে, মানুষ দুনিয়ার সমস্ত কাজকর্ম বর্জন করে কেবল নির্জন কোণে ইবাদতে মগ্ন থাকবে। ইসলাম মানুষকে দুনিয়াতে আল্লাহর খলীফা বা প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়েছে। তাই পার্থিব দায়িত্ব পালন এবং পরকালের প্রস্তুতি—এই দুয়ের মাঝে এক অপূর্ব ভারসাম্য রক্ষা করাই ইসলামের মূল শিক্ষা।
পবিত্র কুরআনে এই ভারসাম্যের কথা অত্যন্ত চমৎকারভাবে তুলে ধরা হয়েছে। মুমিনদের প্রার্থনা শিক্ষা দিতে গিয়ে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন:
“আর তাদের মধ্যে এমনও আছে যে বলে, ‘হে আমাদের রব, আমাদেরকে দুনিয়াতেও কল্যাণ দান করুন এবং আখিরাতেও কল্যাণ দান করুন এবং আমাদেরকে আগুনের আজাব থেকে রক্ষা করুন’।” [8] । এই আয়াতটি প্রমাণ করে যে, ইসলামে ইহকালীন কল্যাণ ও পারত্রিক মুক্তির মাঝে কোনো বিরোধ নেই। বরং ইহকাল হলো পরকালের শস্যক্ষেত্র (দুনিয়া মাজরাআতুল আখেরাহ)। দুনিয়াতে সৎভাবে জীবনযাপন, হালাল উপার্জন, পরিবার ও সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালন এবং মানবকল্যাণে অবদান রাখার মাধ্যমেই পরকালের চিরস্থায়ী সুখের জান্নাত অর্জন করতে হয় [9] ।
রাসুলুল্লাহ সা. এবং তাঁর সাহাবিগণের জীবন ছিল এই ভারসাম্যের সর্বোত্তম বাস্তব রূপ। তাঁরা যেমন রাতের গভীরে আল্লাহর দরবারে ক্রন্দন করতেন, তেমনি দিনের বেলায় তাঁরা ছিলেন ন্যায়পরায়ণ শাসক, দক্ষ ব্যবসায়ী, বীর মুজাহিদ এবং সমাজের অতন্দ্র প্রহরী। তাঁরা দুনিয়াকে হাতের মুঠোয় রেখেছিলেন, কিন্তু অন্তরে স্থান দেননি। ফলে দুনিয়ার কোনো সম্পদ বা ক্ষমতা তাঁদেরকে আল্লাহর স্মরণ ও পরকালের প্রস্তুতি থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি [10] । এই ভারসাম্যপূর্ণ জীবনদর্শনই মানবজাতিকে ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন মুক্তির একমাত্র নিশ্চয়তা প্রদান করে। জীবনের এই নশ্বরতাকে গভীরভাবে উপলব্ধি করে পরকালের অনন্ত যাত্রার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করাই মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় বুদ্ধিমত্তা ও সার্থকতা।