৮.১ এই ঘটনাগুলোর আধ্যাত্মিক শিক্ষা (Spiritual Lessons)
রাসুলুল্লাহ সা.-এর নবুয়তপ্রাপ্তি, হেরা গুহার নির্জনতা, ওহী অবতীর্ণ হওয়ার প্রাথমিক শিহরণ এবং ইসলামের প্রাথমিক গোপন দাওয়াতের ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ কেবল রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিবর্তনের ইতিহাস নয়; বরং তা মানব ইতিহাসের সবচেয়ে গভীর আধ্যাত্মিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিপ্লবের মহত্তম দলিল। এই ঘটনাগুলোর পরতে পরতে লুকিয়ে রয়েছে এমন সব আধ্যাত্মিক শিক্ষা, যা মানবাত্মাকে পার্থিবতার পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত করে ঐশী আলোর অভিমুখে পরিচালিত করে। সীরাতের এই প্রাথমিক অধ্যায়টি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কীভাবে আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় রাসুল সা.-কে এক সুদীর্ঘ আধ্যাত্মিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রস্তুত করেছিলেন এবং তাঁর মাধ্যমে কিয়ামত পর্যন্ত আগত মানবজাতির জন্য আত্মশুদ্ধি ও ঐশী সংযোগের এক শাশ্বত পথরেখা অঙ্কন করে দিয়েছিলেন।
হেরা গুহার নির্জনতা ও ঐশী সংযোগের আধ্যাত্মিক রূপান্তর
নবুয়তপূর্ব সময়ে রাসুলুল্লাহ সা.-এর মক্কার কোলাহলময় সমাজ থেকে দূরে হেরা গুহার নির্জনতায় আত্মনিয়োগ করার ঘটনাটি আধ্যাত্মিক সাধনার ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক। আধুনিক মনস্তত্ত্বে যাকে 'কগনিটিভ রিস্ট্রাকচারিং' বা 'মাইন্ডফুলনেস' বলা হয়, ইসলামের পরিভাষায় তা হলো 'খালওয়াহ' বা নির্জনতা এবং 'তাফাক্কুর' বা মহাবিশ্বের সৃষ্টিরহস্য নিয়ে গভীর চিন্তা। মক্কার পৌত্তলিকতা, নৈতিক অবক্ষয় এবং সামাজিক অবিচারের দমবন্ধকর পরিবেশ থেকে সাময়িক মুক্তি লাভ করে স্রষ্টার সান্নিধ্য অনুসন্ধানের এই ব্যাকুলতা ছিল মূলত ওহীর গুরুভার বহনের পূর্বপ্রস্তুতি। এই নির্জনতা কেবল শারীরিক বিচ্ছিন্নতা ছিল না, বরং তা ছিল অন্তরের গভীরতম প্রকোষ্ঠকে জাগতিক আবিলতা থেকে মুক্ত করে ঐশী আলো গ্রহণের উপযোগী করার এক আধ্যাত্মিক প্রক্রিয়া।
হেরা গুহার এই নির্জনতা ও ইবাদতের স্বরূপ সম্পর্কে উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত হাদিসে অত্যন্ত চমৎকার বিবরণ পাওয়া যায়। সহীহ বুখারীতে উল্লেখ রয়েছে:
অনুবাদ:
"অতঃপর তাঁর কাছে নির্জনতা প্রিয় করে দেওয়া হলো। তিনি হেরা গুহায় নির্জনতা অবলম্বন করতেন এবং সেখানে নিজ পরিবারের কাছে ফিরে আসার পূর্বে নির্দিষ্ট সংখ্যক রাত ইবাদতে (তাহান্নুছ) নিমগ্ন থাকতেন এবং এর জন্য পাথেয় সাথে নিয়ে যেতেন।" [1] । এই 'তাহান্নুছ' বা আধ্যাত্মিক সাধনা প্রমাণ করে যে, মহান কোনো ঐশী দায়িত্ব অর্পণের পূর্বে আত্মিক পরিশুদ্ধি এবং জাগতিক কোলাহল থেকে বিচ্ছিন্নতা অপরিহার্য।
আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে হেরা গুহার এই নির্জনতা আমাদের শিক্ষা দেয় যে, যখন কোনো সমাজ বা রাষ্ট্র নৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে পড়ে, তখন একজন বিশ্বাসীর প্রথম দায়িত্ব হলো নিজের ঈমান ও আমলকে রক্ষা করার জন্য সাময়িকভাবে হলেও মানসিক ও আধ্যাত্মিক দূরত্ব বজায় রাখা। আধুনিক যুগের বস্তুবাদী ও প্রযুক্তি-নির্ভর কোলাহলের মাঝেও একজন মুমিনের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত থাকা উচিত, যা কেবলই তার এবং তার স্রষ্টার মধ্যকার একান্ত সংযোগের জন্য নিবেদিত। এই আধ্যাত্মিক বিচ্ছিন্নতাই মানুষকে ভেতর থেকে শক্তিশালী করে তোলে, যার ফলে সে পরবর্তীতে সমাজে ফিরে এসে সংস্কারকের ভূমিকা পালন করতে পারে [2] ।
তদুপরি, জিবরাঈল আলাইহিস সালামের প্রথম আগমনের সময় রাসুলুল্লাহ সা.-কে জড়িয়ে ধরে যে তীব্র আলিঙ্গন বা চাপ দেওয়া হয়েছিল, তার পেছনেও গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক রহস্য নিহিত ছিল। এটি ছিল মানবিয় সীমাবদ্ধতার সাথে ফেরেশতাকুল তথা অতিপ্রাকৃতিক জগতের এক অভূতপূর্ব মিলন। এই চাপের মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ সা.-এর নফস বা আত্মাকে পার্থিব জগতের সীমানা ছাড়িয়ে ওহীর অতিপ্রাকৃতিক জগতকে ধারণ করার উপযোগী করে তোলা হয়েছিল। এটি আমাদের শিক্ষা দেয় যে, আধ্যাত্মিক উত্তরণ বা আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের পথটি কুসুমাস্তীর্ণ নয়; বরং তা তীব্র সাধনা, আত্মত্যাগ এবং সাময়িক কষ্টের মধ্য দিয়েই অর্জিত হয় [3] ।
রাসুলুল্লাহ সা.-এর ব্যক্তিত্বের চুম্বকত্ব ও আধ্যাত্মিক প্রভাব
ইসলামের প্রাথমিক প্রসারের পেছনে রাসুলুল্লাহ সা.-এর অনন্য, নিষ্কলুষ এবং অতিপ্রাকৃতিক ব্যক্তিত্বের এক বিশাল ভূমিকা ছিল। আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় রাসুল সা.-কে এমন এক আধ্যাত্মিক চুম্বকত্ব ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব দিয়ে সৃষ্টি করেছিলেন, যার সংস্পর্শে আসা মাত্রই যেকোনো সত্যপিয়াসী হৃদয় সত্যের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠত। তাঁর এই ব্যক্তিত্ব কোনো কৃত্রিম বা অর্জিত বিষয় ছিল না, বরং তা ছিল সরাসরি রাব্বুল আলামীনের বিশেষ তত্ত্বাবধানে গড়ে ওঠা এক জীবন্ত মুজিজা। আধুনিক নেতৃত্ব বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে 'ক্যারিশম্যাটিক লিডারশিপ' বলা হয়, রাসুলুল্লাহ সা.-এর ক্ষেত্রে তা ছিল ঐশী আলোয় সিক্ত এক আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব।
রাসুলুল্লাহ সা.-এর এই অনন্য ব্যক্তিত্বের গঠন ও তার প্রভাব সম্পর্কে ঐতিহাসিক ও সীরাত গবেষকগণ বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। কিতাব অনলাইনে বর্ণিত হয়েছে:
অনুবাদ:
"রাসুলুল্লাহ সা.-এর ব্যক্তিত্বই ছিল ইসলামের প্রথম চালিকাশক্তি। তাঁর ব্যক্তিত্বের মধ্যে অন্যদের আকর্ষণ ও প্রভাবিত করার এক অনন্য ক্ষমতা ছিল। কেননা আল্লাহ তাআলা তাঁকে নিজের বিশেষ তত্ত্বাবধানে গড়ে তুলেছিলেন এবং তাঁকে মানবজাতির মধ্যে পূর্ণতম মানুষ হিসেবে সৃষ্টি করেছিলেন।" [4] । এই ঐশী লালন-পালনই তাঁর চরিত্রকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল যে, ঘোর শত্রুরাও তাঁকে 'আল-আমীন' (বিশ্বস্ত) এবং 'আস-সাদিক' (সত্যবাদী) বলে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হতো।
রাসুলুল্লাহ সা.-এর ব্যক্তিত্বের এই আধ্যাত্মিক প্রভাবের কারণেই প্রথম যুগের সাহাবিগণ, যেমন আবু বকর সিদ্দিক রা., খাদিজা রা. এবং আলি রা. কোনো প্রকার দ্বিধা বা অলৌকিক নিদর্শনের দাবি ছাড়াই ইসলামের দাওয়াত গ্রহণ করেছিলেন। তাঁদের এই তাৎক্ষণিক সাড়ার পেছনে কাজ করেছিল রাসুলুল্লাহ সা.-এর দীর্ঘ ৪০ বছরের নিষ্কলঙ্ক জীবনের প্রতি গভীর আস্থা এবং তাঁর পবিত্র অবয়ব থেকে নিঃসৃত আধ্যাত্মিক জ্যোতি। সীরাতের এই অধ্যায়টি আমাদের শিক্ষা দেয় যে, দাওয়াহ বা দ্বীনের প্রচারের ক্ষেত্রে বাচনভঙ্গি বা তাত্ত্বিক জ্ঞানের চেয়ে প্রচারকের ব্যক্তিগত চরিত্র, সততা এবং আধ্যাত্মিক গভীরতা অনেক বেশি কার্যকর। একজন দাঈর চরিত্রই হবে তার দাওয়াতের সবচেয়ে বড় প্রমাণ [5] ।
তদুপরি, রাসুলুল্লাহ সা.-এর এই আধ্যাত্মিক চুম্বকত্ব কেবল তাঁর সমসাময়িকদের জন্যই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং কিয়ামত পর্যন্ত আগত প্রতিটি মুমিনের হৃদয়ে তাঁর প্রতি যে গভীর ভালোবাসা ও আকর্ষণ সৃষ্টি হয়, তাও এই ঐশী পরিকল্পনারই অংশ। তাঁর সীরাত অধ্যয়নের মাধ্যমে মুমিনের হৃদয়ে যে ঈমানী উদ্দীপনা ও আধ্যাত্মিক জাগরণ ঘটে, তা মূলত তাঁর সেই চিরন্তন আধ্যাত্মিক প্রভাবেরই বহিঃপ্রকাশ। সীরাতের এই শিক্ষা আমাদের নিজেদের চরিত্রকে রাসুলুল্লাহ সা.-এর চরিত্রের ছাঁচে গড়ে তোলার তাগিদ দেয়, যাতে আমাদের মাধ্যমেও সমাজে সত্য ও সুন্দরের আলো ছড়িয়ে পড়তে পারে [6] ।
সীরাত অধ্যয়নের আধ্যাত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আবশ্যকতা
সীরাতুন্নবি সা. কেবল একটি ঐতিহাসিক বিবরণী বা অতীতের কোনো মহানায়কের জীবনচরিত নয়; বরং তা হলো মানবজাতির হেদায়েত ও আধ্যাত্মিক মুক্তির এক জীবন্ত ও গতিশীল পথরেখা। সীরাত অধ্যয়ন করা একজন মুমিনের জন্য একই সাথে আধ্যাত্মিক তৃষ্ণা নিবারণের মাধ্যম এবং বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষ সাধনের চাবিকাঠি। সাধারণ মানবিয় ইতিহাসের সাথে সীরাতের মৌলিক পার্থক্য এখানেই যে, সাধারণ ইতিহাস মানুষকে কেবল অতীতের তথ্য সরবরাহ করে, আর সীরাত মানুষের বর্তমানকে সংশোধন করে তার ভবিষ্যৎকে ঐশী আলোয় আলোকিত করার পথ দেখায়।
সীরাতের এই অনন্য আধ্যাত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রভাব সম্পর্কে আধুনিক গবেষকগণ অত্যন্ত সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেছেন। আল-উকা নামক গবেষণা পোর্টালে সীরাতের এই প্রভাবকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে:
অনুবাদ:
"নিশ্চয়ই সীরাত গ্রন্থসমূহের নিজস্ব একটি আধ্যাত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রভাব রয়েছে; সামগ্রিক মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি সাধারণ মানব ইতিহাসের প্রভাবের চেয়ে অনেক বেশি সুনির্দিষ্ট ও গভীর।" [7] । অর্থাৎ, সীরাত মানুষের চিন্তাজগতকে যেমন নাড়া দেয়, তেমনি তার আত্মাকে করে তোলে পরিশুদ্ধ ও প্রশান্ত।
বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে সীরাত অধ্যয়ন আমাদের শেখায় কীভাবে প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও ধৈর্য, প্রজ্ঞা এবং কৌশলগত দূরদর্শিতার মাধ্যমে সত্যের বাণীকে টিকিয়ে রাখতে হয়। রাসুলুল্লাহ সা.-এর মক্কী জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল গভীর কৌশলগত পরিকল্পনা এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুলের এক অপূর্ব সমন্বয়। এটি আমাদের শেখায় যে, আধ্যাত্মিকতা মানে কর্মবিমুখতা নয়, বরং আল্লাহর দেওয়া উপায়-উপকরণকে সর্বোচ্চ মাত্রায় ব্যবহার করে ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর নির্ভর করা। এই বুদ্ধিবৃত্তিক ভারসাম্যই ইসলামকে একটি বাস্তবসম্মত ও বৈশ্বিক দ্বীন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে [8] ।
আধ্যাত্মিক দিক থেকে সীরাত অধ্যয়ন মুমিনের অন্তরে রাসুলুল্লাহ সা.-এর প্রতি ভালোবাসাকে গভীরতর করে। আর এই ভালোবাসাই হলো ঈমানের মূল ভিত্তি। যখন একজন মুমিন জানতে পারে যে, রাসুলুল্লাহ সা. কীভাবে উম্মতের হেদায়েতের জন্য নিজের রক্ত ঝরিয়েছেন, কীভাবে তায়েফের ময়দানে পাথর খেয়েও ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন, তখন তার অন্তরে রাসুলুল্লাহ সা.-এর প্রতি আনুগত্যের এক নতুন জোয়ার সৃষ্টি হয়। এই আনুগত্যই মানুষকে আল্লাহর ভালোবাসার যোগ্য করে তোলে। তাই সীরাত অধ্যয়ন কেবল একটি জ্ঞানগত চর্চা নয়, বরং এটি একটি ইবাদত এবং আত্মিক উন্নতির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার [9] ।
ঐশী নির্দেশনা ও অনুসরণের আধ্যাত্মিক আবশ্যকতা
ইসলামি জীবনদর্শনের মূল ভিত্তি হলো আল্লাহর তাওহীদ এবং রাসুলুল্লাহ সা.-এর রেসালাতের প্রতি অবিচল বিশ্বাস ও তাঁর নিঃশর্ত অনুসরণ। রাসুলুল্লাহ সা.-এর সীরাত বা জীবনপদ্ধতি কেবল একটি ঐতিহাসিক আদর্শ নয়, বরং তা আল্লাহর পক্ষ থেকে মনোনীত একমাত্র জীবনপথ। আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে কেবল একটি কিতাব দিয়েই ছেড়ে দেননি, বরং সেই কিতাবের বাস্তব প্রয়োগ দেখানোর জন্য একজন জীবন্ত আদর্শ হিসেবে রাসুলুল্লাহ সা.-কে প্রেরণ করেছেন। তাই রাসুলুল্লাহ সা.-এর অনুসরণ করা কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়, বরং তা ঈমানের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য এক আধ্যাত্মিক আবশ্যকতা।
এই অনুসরণের গুরুত্ব এবং এর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সীরাত গবেষকগণ উল্লেখ করেছেন যে, রাসুলুল্লাহ সা.-এর জীবনই হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একমাত্র রাজপথ। আল-উকা পোর্টালে বলা হয়েছে:
অনুবাদ:
"কারণ তাঁর (রাসুলুল্লাহ সা.) সীরাত হলো তিনি যে পথ চলেছেন তার এক নিখুঁত নকশা বা মানচিত্র, আর আল্লাহ তাআলা আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন তাঁর হেদায়েত ও আদর্শ অনুসরণ করার জন্য।" [10] । এই অনুসরণ ছাড়া আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা অসম্ভব, কারণ আল্লাহ নিজেই কুরআনে ঘোষণা করেছেন যে, রাসুলুল্লাহ সা.-এর আনুগত্যই মূলত আল্লাহর আনুগত্য।
আধ্যাত্মিক পরিভাষায় এই অনুসরণকে বলা হয় 'ইত্তিবা'। ইত্তিবা কেবল বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানের অনুকরণের নাম নয়, বরং তা হলো রাসুলুল্লাহ সা.-এর মনস্তত্ত্ব, তাঁর চিন্তা, তাঁর দয়া, তাঁর ক্ষমাশীলতা এবং তাঁর আল্লাহর প্রতি গভীর ভীতি ও ভালোবাসাকে নিজের অন্তরে ধারণ করা। যখন একজন মুমিন রাসুলুল্লাহ সা.-এর সুন্নাহকে নিজের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে—ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে—বাস্তবায়ন করে, তখন তার জীবন থেকে সমস্ত প্রকার মানসিক অস্থিরতা ও অস্তিত্ববাদী সংকট দূর হয়ে যায়। সুন্নাহর অনুসরণ মানুষের অন্তরে এক স্বর্গীয় প্রশান্তি বা 'সাকিনাহ' এনে দেয় [11] ।
তদুপরি, এই অনুসরণের আধ্যাত্মিক আবশ্যকতা আমাদের শিক্ষা দেয় যে, মানুষের তৈরি কোনো মতবাদ বা দর্শন মানবাত্মার প্রকৃত মুক্তি দিতে পারে না। মানুষের বুদ্ধি ও চিন্তা সীমাবদ্ধ, কিন্তু ওহীর জ্ঞান অসীম ও শাশ্বত। রাসুলুল্লাহ সা.-এর সীরাত হলো সেই ওহীর বাস্তব রূপ। তাই আধুনিক যুগের নানা বিভ্রান্তি ও মতাদর্শিক ঝড়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একজন মুমিনের একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়স্থল হলো রাসুলুল্লাহ সা.-এর সুন্নাহ ও তাঁর প্রদর্শিত পথ। এই অনুসরণের মাধ্যমেই উম্মাহ তার হারানো গৌরব ও আধ্যাত্মিক শক্তি ফিরে পেতে পারে [12] ।
ঐশী সুরক্ষার মনস্তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা
রাসুলুল্লাহ সা.-এর প্রাথমিক দাওয়াতের সময়কাল থেকে শুরু করে তাঁর জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত প্রতিটি পদক্ষেপে আল্লাহর বিশেষ ঐশী সুরক্ষা বা 'হিফয ইলাহী'র স্পষ্ট নিদর্শন পরিলক্ষিত হয়। মক্কার কুরাইশদের চরম শত্রুতা, হত্যার ষড়যন্ত্র এবং সামাজিক বয়কটের মতো কঠিন পরিস্থিতিতেও রাসুলুল্লাহ সা. এবং তাঁর মুষ্টিমেয় অনুসারীদের টিকে থাকা কোনো সাধারণ জাগতিক সমীকরণে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। এই ঐশী সুরক্ষা কেবল রাসুলুল্লাহ সা.-এর জীবন রক্ষাই করেনি, বরং তা সাহাবিদের অন্তরে এক অভূতপূর্ব মনস্তাত্ত্বিক দৃঢ়তা এবং আল্লাহর প্রতি অবিচল তাওয়াক্কুল বা বিশ্বাসের জন্ম দিয়েছিল।
ঐশী সুরক্ষার এই মনস্তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক প্রভাবের সবচেয়ে বড় উদাহরণ পাওয়া যায় হিজরতের সময় সওর গুহার ঐতিহাসিক ঘটনায়। যখন শত্রুরা গুহার মুখে এসে দাঁড়িয়েছিল এবং আবু বকর সিদ্দিক রা. অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন, তখন রাসুলুল্লাহ সা. যে অটল বিশ্বাস ও প্রশান্তি প্রদর্শন করেছিলেন, তা কুরআনে চিরন্তনভাবে সংরক্ষিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
অনুবাদ:
"যখন তিনি তাঁর সঙ্গীকে বলছিলেন, 'তুমি বিষণ্ণ হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।' অতঃপর আল্লাহ তাঁর ওপর নিজের পক্ষ থেকে প্রশান্তি অবতীর্ণ করলেন।" [13] । এই 'আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন' (ইন্নাল্লাহা মা'আনা)—এই বিশ্বাসই হলো ইসলামের আধ্যাত্মিক শক্তির মূল উৎস।
এই ঘটনাটি আমাদের শিক্ষা দেয় যে, যখন কোনো মানুষ আল্লাহর দ্বীনের জন্য নিজের জীবন ও সম্পদ উৎসর্গ করে, তখন বাহ্যিক সমস্ত উপায়-উপকরণ ব্যর্থ হলেও আল্লাহর অদৃশ্য সাহায্য ও সুরক্ষা তার পাশে এসে দাঁড়ায়। একেই ইসলামের পরিভাষায় বলা হয় 'মাঈয়্যাত ইলাহী' বা আল্লাহর বিশেষ সান্নিধ্য। এই সান্নিধ্যের অনুভূতি মানুষের মন থেকে সমস্ত প্রকার ভয়, হতাশা ও দুর্বলতাকে দূর করে দেয়। আধুনিক মনস্তত্ত্বে যাকে 'রেজিলিয়েন্স' বা প্রতিকূলতা কাটিয়ে ওঠার ক্ষমতা বলা হয়, ইসলামের তাওয়াক্কুল তত্ত্ব তার চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী ও কার্যকর [14] ।
ঐশী সুরক্ষার এই শিক্ষা আমাদের আরও শেখায় যে, সত্যের পথ কখনো মসৃণ হয় না। পরীক্ষা, কষ্ট এবং বাধা আসবেই; কিন্তু যদি নিয়ত খাঁটি থাকে এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখা যায়, তবে চূড়ান্ত বিজয় সত্যেরই হবে। মক্কার দুর্বল ও নির্যাতিত মুসলমানগণ এই ঐশী সুরক্ষার ওপর ভরসা করেই তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় বড় শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করতে পেরেছিলেন এবং পরবর্তীতে এক বিশ্বজয়ী সভ্যতার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। তাই সীরাতের এই আধ্যাত্মিক শিক্ষা আজকেও প্রতিটি মুমিনের জন্য এক মহান পাথেয়, যা তাকে যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতেও ঈমানের ওপর অবিচল থাকার প্রেরণা জোগায় [15] ।