খণ্ড 74
ফন্ট:100%
থিম:

২.৩.১ রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষায় নাগরিকদের কালেকটিভ রেসপন্সিবিলিটি (Collective Responsibility) এবং কনস্ক্রিপশন (Conscription) নীতি

একটি নবগঠিত রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, ভূ-রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এবং বাহ্যিক আগ্রাসন প্রতিহত করার ক্ষেত্রে নাগরিকদের সমষ্টিগত দায়িত্ববোধ বা কালেকটিভ রেসপন্সিবিলিটি (Collective Responsibility) এবং বাধ্যতামূলক সামরিক অবদান বা কনস্ক্রিপশন (Conscription) নীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। মদিনা রাষ্ট্রের পত্তনের পর, রাসুলুল্লাহ সা. যে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, তা কেবল পেশাদার কোনো বাহিনীর ওপর নির্ভরশীল ছিল না; বরং তা ছিল সমগ্র নাগরিক সমাজের এক সমন্বিত ও স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরক্ষামূলক অংশগ্রহণ। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে 'টোটাল ডিফেন্স' (Total Defense) বা 'সর্বাত্মক প্রতিরক্ষা' বলা হয়, মদিনার ইসলামি রাষ্ট্রে তার এক প্রায়োগিক রূপ দেখা যায়। এই ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের প্রতিটি সক্ষম নাগরিককে প্রতিরক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হতো, যেখানে ঈমানী দায়বদ্ধতা এবং রাষ্ট্রীয় আনুগত্যের এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছিল।

ইসলামি প্রতিরক্ষা দর্শনের মূল ভিত্তি ছিল এই যে, সত্য ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা এবং অন্যায়ের প্রতিরোধে সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে অবদান রাখতে হবে। মক্কার তেরো বছরের নির্যাতন এবং মদিনার প্রাথমিক যুগের নানামুখী সামরিক ও অর্থনৈতিক অবরোধের প্রেক্ষাপটে সাহাবিগণের মধ্যে যে মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত প্রস্তুতি গড়ে উঠেছিল, তা-ই পরবর্তীকালে মদিনা রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষানীতি নির্ধারণে প্রধান ভূমিকা পালন করে। এই প্রতিরক্ষানীতি কেবল তাত্ত্বিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ছিল বাস্তবমুখী এবং কঠোর শৃঙ্খলা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।

১. সমষ্টিগত দায়িত্ববোধ (Collective Responsibility) এবং ইসলামি প্রতিরক্ষা দর্শনের তাত্ত্বিক ভিত্তি

মদিনা রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষায় নাগরিকদের সমষ্টিগত দায়িত্ববোধ বা কালেকটিভ রেসপন্সিবিলিটি কেবল একটি আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল না, বরং তা ছিল ঈমানী চেতনার গভীরতম বহিঃপ্রকাশ। মক্কার চরম প্রতিকূল পরিবেশে যখন মুসলিম উম্মাহর অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছিল, তখন থেকেই সাহাবিগণের মধ্যে এই সমষ্টিগত দায়িত্ববোধের বীজ রোপিত হয়। তারা বুঝতে পেরেছিলেন যে, এই মহান দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই এবং এর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। সীরাতগ্রন্থের বিবরণে এই মনস্তাত্ত্বিক অবস্থাকে অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে:

«فكان الصحابة يشعرون شعورا تاما ما على كواهل البشر من المسؤولية الفخمة الضخمة، وأن هذه المسؤولية لا يمكن عنها الحياد والإنحراف بحال، فالعواقب التي تترتب على الفرار عن تحملها أشد وخامة وأكبر ضررا عما هم فيه من الإضطهاد»

অর্থাৎ, "সাহাবিগণ তাঁদের কাঁধে অর্পিত মানব ইতিহাসের এই বিশাল ও গুরুদায়িত্ব সম্পর্কে পূর্ণ সচেতন ছিলেন। তাঁরা জানতেন যে, কোনো অবস্থাতেই এই দায়িত্ব এড়ানো বা এ থেকে বিচ্যুত হওয়া সম্ভব নয়। কারণ, এই দায়িত্বভার বহন করা থেকে পালিয়ে যাওয়ার পরিণতি হবে তাঁদের বর্তমান নিপীড়নের চেয়েও অনেক বেশি ভয়াবহ ও ক্ষতিকর" [1] । এই ঐতিহাসিক সত্যটি প্রমাণ করে যে, প্রাথমিক যুগের মুসলিম সমাজ নিজেদের একটি একক দেহ হিসেবে বিবেচনা করত, যেখানে একজনের নিরাপত্তা ও অস্তিত্ব অন্য সবার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল।

আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, একটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা তখনই সুসংহত হয় যখন তার নাগরিকরা ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রীয় ও সমষ্টিগত নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেয়। মদিনা সনদের মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ সা. এই সমষ্টিগত দায়িত্ববোধকে একটি আইনি রূপ দিয়েছিলেন। সনদের ধারা অনুযায়ী, মদিনার ওপর কোনো বহিরাগত আক্রমণ হলে তা প্রতিহত করা সকল নাগরিকের—চাই তারা মুসলিম হোক বা অমুসলিম—যৌথ দায়িত্ব হিসেবে ঘোষিত হয়েছিল। এই যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা বা 'কালেকটিভ সিকিউরিটি' (Collective Security) মদিনাকে একটি অভেদ্য দুর্গে পরিণত করেছিল। সাহাবিগণের এই দায়িত্ববোধ কেবল যুদ্ধের ময়দানেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধেও তারা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতেন [2]

এই সমষ্টিগত দায়িত্ববোধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সামাজিক সংহতি। যখনই কোনো সংকট দেখা দিত, সমগ্র সমাজ একযোগে তার মোকাবিলা করত। এই ব্যবস্থার ফলে রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যয় যেমন হ্রাস পেয়েছিল, তেমনি নাগরিকদের মধ্যে দেশপ্রেম ও ত্যাগের মানসিকতা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল। সাহাবিগণ বিশ্বাস করতেন যে, রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষায় অংশগ্রহণ করা কেবল পার্থিব কোনো দায়িত্ব নয়, বরং এটি পরকালীন মুক্তির অন্যতম মাধ্যম। ফলে, আধুনিক রাষ্ট্রগুলোর মতো মদিনা রাষ্ট্রে নাগরিকদের জোরপূর্বক সেনাবাহিনীতে নিয়োগ করার প্রয়োজন হতো না; বরং ঈমানী তাগিদেই তারা নিজেদের উৎসর্গ করতে সদা প্রস্তুত থাকতেন।

২. অভ্যন্তরীণ মনস্তাত্ত্বিক কনস্ক্রিপশন (Internal Conscription) এবং ঈমানী দায়বদ্ধতা

আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় 'কনস্ক্রিপশন' (Conscription) বলতে সাধারণত আইনগত বাধ্যবাধকতার মাধ্যমে নাগরিকদের সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগকে বোঝানো হয়। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সা.-এর যুগে এই কনস্ক্রিপশন বা সৈন্যদলভুক্তি কোনো বাহ্যিক বলপ্রয়োগ বা আইনি শাস্তির ভয়ে কার্যকর হতো না; বরং তা পরিচালিত হতো এক গভীর অভ্যন্তরীণ মনস্তাত্ত্বিক ও ঈমানী তাড়না দ্বারা। পরকালের জবাবদিহিতা এবং আল্লাহর প্রতি অবিচল বিশ্বাসই ছিল এই মনস্তাত্ত্বিক কনস্ক্রিপশনের মূল চালিকাশক্তি। সীরাত গবেষকগণ উল্লেখ করেছেন যে, পরকালের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাসই সাহাবিগণের এই দায়িত্ববোধকে সুদৃঢ় করেছিল:

«وهو مما كان يقوي هذا الشعور- الشعور بالمسؤولية- فقد كانوا على يقين جازم من أنهم يقومون لرب العالمين، يحاسبون بأعمالهم دقها وجلها، صغيرها وكبيرها»

অর্থাৎ, "আর পরকালের প্রতি বিশ্বাসই এই দায়িত্ববোধকে আরও শক্তিশালী করেছিল। কারণ তাঁরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে, তাঁরা রাব্বুল আলামীনের সামনে দাঁড়াবেন এবং তাঁদের ছোট-বড়, সূক্ষ্ম ও স্থূল প্রতিটি কাজের হিসাব নেওয়া হবে" [3] । এই পরকালীন জবাবদিহিতার চেতনা সাহাবিগণকে যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতেও পিছু হটতে বাধা দিত। পার্থিব জীবনের ক্ষণস্থায়ী কষ্ট ও ত্যাগকে তাঁরা চিরস্থায়ী জান্নাতের সুখের তুলনায় অতি তুচ্ছ মনে করতেন।

এই মনস্তাত্ত্বিক গঠনে পবিত্র কুরআনের অবতীর্ণ আয়াতসমূহ এক জাদুকরী ভূমিকা পালন করেছিল। মক্কী ও মাদানী জীবনের কঠিনতম মুহূর্তগুলোতে যখনই মুসলিম সমাজ চরম সংকটের মুখোমুখি হতো, তখনই কুরআনের আয়াতসমূহ তাঁদের ধৈর্য, সহনশীলতা এবং বীরত্বের সাথে পরিস্থিতি মোকাবিলার নির্দেশ দিত। যেমন সূরা আল-আনকাবূতের শুরুতে ইরশাদ হয়েছে:

«أَحَسِبَ النَّاسُ أَنْ يُتْرَكُوا أَنْ يَقُولُوا آمَنَّا وَهُمْ لا يُفْتَنُونَ. وَلَقَدْ فَتَنَّا الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ فَلَيَعْلَمَنَّ اللَّهُ الَّذِينَ صَدَقُوا وَلَيَعْلَمَنَّ الْكاذِبِينَ»

অর্থাৎ, "মানুষ কি মনে করে যে, 'আমরা ঈমান এনেছি' এ কথা বললেই তাদের পরীক্ষা না করে ছেড়ে দেওয়া হবে? অথচ আমি তাদের পূর্ববর্তীদেরও পরীক্ষা করেছি। আল্লাহ অবশ্যই প্রকাশ করে দেবেন কারা সত্যবাদী এবং কারা মিথ্যাবাদী" [4] । এই ঐশী বাণীসমূহ সাহাবিগণের মন থেকে মৃত্যুর ভয় দূর করে দিয়েছিল এবং তাঁদেরকে এক একজন অকুতোভয় সৈনিকে পরিণত করেছিল।

আরবি ভাষায় একটি শব্দ ব্যবহৃত হয় 'আল-আসবী' বা 'আল-আসলাবী' (العصلبي), যার অর্থ অত্যন্ত দৃঢ়, শক্ত ও অবিচল ব্যক্তি। প্রতিরক্ষার পরিভাষায়, এই মনস্তাত্ত্বিক দৃঢ়তা সাহাবিগণকে এমন এক স্তরে নিয়ে গিয়েছিল যেখানে তাঁরা যেকোনো সামরিক সংকটে ইস্পাতকঠিন প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে যেতেন। রাসুলুল্লাহ সা. সাহাবিগণের এই মনস্তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণ এমনভাবে সম্পন্ন করেছিলেন যে, রাষ্ট্রের প্রয়োজনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়া তাঁদের মজ্জাগত অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। এটিই ছিল ইসলামের 'স্বেচ্ছামূলক কনস্ক্রিপশন' বা 'ভলান্টারি কনস্ক্রিপশন' (Voluntary Conscription) নীতি, যা পৃথিবীর ইতিহাসে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে।

৩. ভূ-রাজনৈতিক সংকট ও সামগ্রিক সংহতি: শি'ব আবি তালিবে অবরুদ্ধতার শিক্ষা

মদিনা রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষানীতি এবং নাগরিকদের সমষ্টিগত দায়িত্ববোধের বাস্তব প্রশিক্ষণ কেবল মদিনাতেই শুরু হয়নি, বরং এর সূচনা হয়েছিল মক্কার কঠিন দিনগুলোতে। বিশেষ করে, নবুয়তের সপ্তম বর্ষে কুরাইশদের দ্বারা বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিব গোত্রের ওপর আরোপিত তিন বছর মেয়াদী সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবরোধ—যা 'শি'ব আবি তালিবে অবরুদ্ধতা' (حصار الشعب) নামে পরিচিত—মুসলিমদের সমষ্টিগত প্রতিরোধ ও সহনশীলতার এক ঐতিহাসিক মাইলফলক। এই অবরোধের সময় কেবল মুসলিমরাই নন, বরং রাসুলুল্লাহ সা.-এর প্রতি গোত্রীয় আনুগত্যের কারণে বনু হাশিমের অমুসলিম সদস্যরাও এই অবর্ণনীয় কষ্ট সহ্য করেছিলেন [5]

এই অবরোধের সময় কুরাইশরা একটি চুক্তিপত্র বা 'সহীফা' (الصحيفة) লিখে কাবার দেয়ালে ঝুলিয়ে দিয়েছিল, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল রাসুলুল্লাহ সা. এবং তাঁর অনুসারীদের সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ধ্বংস করে দেওয়া। কিন্তু বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিবের সদস্যরা এই ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবরোধের মুখে যে অভূতপূর্ব সংহতি প্রদর্শন করেছিলেন, তা ছিল কালেকটিভ রেসপন্সিবিলিটির এক চরম দৃষ্টান্ত। তাঁরা গাছের পাতা ও চামড়া খেয়ে জীবন ধারণ করেছেন, তবুও রাসুলুল্লাহ সা.-কে কুরাইশদের হাতে তুলে দেননি [6] । এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, একটি আদর্শিক লক্ষ্য অর্জনে এবং সমষ্টিগত অস্তিত্ব রক্ষায় চরম ত্যাগ স্বীকারের মানসিকতা কীভাবে একটি জাতিকে অপরাজেয় করে তোলে।

আধুনিক সামরিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, শি'ব আবি তালিবের এই অবরোধ ছিল একটি 'অর্থনৈতিক যুদ্ধ' (Economic Warfare) এবং 'মনস্তাত্ত্বিক অবরোধ' (Psychological Siege)। এই সংকটের সফল মোকাবিলা সাহাবিগণের মধ্যে এমন এক প্রতিরক্ষামূলক সহনশীলতা (Defensive Resilience) তৈরি করেছিল, যা পরবর্তীকালে মদিনা রাষ্ট্রের ওপর আরোপিত যেকোনো অবরোধ—যেমন খন্দকের যুদ্ধ বা আহযাবের অবরোধ—মোকাবিলায় অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করেছিল। এই অবরোধের শিক্ষা ছিল স্পষ্ট: রাষ্ট্রের বা আদর্শের অস্তিত্ব যখন হুমকির মুখে পড়ে, তখন অভ্যন্তরীণ সকল মতপার্থক্য ভুলে গিয়ে একক সত্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে হবে। এই সমষ্টিগত সংহতিই ছিল মদিনা রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষার মূল চালিকাশক্তি।

৪. কৌশলগত প্রতিরক্ষা ও সামরিক সংহতি: 'হুমাতিুল আদবার' (حماة الأدبار) ও রিয়ার-গার্ড সিকিউরিটি

মদিনা রাষ্ট্রের সামরিক কৌশলে প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট ছিল। যুদ্ধক্ষেত্রে এবং যুদ্ধের বাইরে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য রাসুলুল্লাহ সা. এক অত্যন্ত সুশৃঙ্খল প্রতিরক্ষামূলক কাঠামো গড়ে তুলেছিলেন। এই কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা হলো 'হুমাতিুল আদবার' (حماة الأدبار)। আরবি অভিধান ও সামরিক পরিভাষায় এর অর্থ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ:

«حماة الأدبار: الذين يحمون أعقاب الناس»

অর্থাৎ, "হুমাতিুল আদবার হলো তারা, যারা মানুষের পশ্চাৎভাগ বা পৃষ্ঠদেশ রক্ষা করে" [7] । আধুনিক সামরিক বিজ্ঞানের ভাষায় একে 'রিয়ার-গার্ড সিকিউরিটি' (Rear-guard Security) বা 'পশ্চাৎভাগ প্রতিরক্ষা' বলা হয়। যেকোনো সামরিক অভিযানে বা রাষ্ট্রীয় সংকটে সম্মুখভাগের সৈন্যদের পাশাপাশি পশ্চাৎভাগ এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষা করা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

রাসুলুল্লাহ সা. যখনই কোনো সামরিক অভিযানে বের হতেন, তখন মদিনার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের সুরক্ষার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট বাহিনীকে দায়িত্ব দিয়ে যেতেন। এটি ছিল কালেকটিভ রেসপন্সিবিলিটির একটি চমৎকার উদাহরণ, যেখানে সম্মুখ সমরে অংশ নিতে না পারা নাগরিকরাও রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন। উদাহরণস্বরূপ, উহুদের যুদ্ধে রাসুলুল্লাহ সা. আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের রা.-এর নেতৃত্বে পঞ্চাশজন তীরন্দাজের একটি দলকে পাহাড়ের গিরিপথে মোতায়েন করেছিলেন, যাদের মূল দায়িত্বই ছিল মুসলিম বাহিনীর পশ্চাৎভাগ রক্ষা করা বা 'হুমাতিুল আদবার'-এর ভূমিকা পালন করা।

এই কৌশলগত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ফলে মদিনা রাষ্ট্র কখনোই আকস্মিক কোনো আক্রমণের শিকার হয়ে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়নি। এমনকি মদিনার অভ্যন্তরে বসবাসকারী মুনাফিক ও ইহুদিদের ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করার জন্যও একটি সার্বক্ষণিক নজরদারি ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনী সক্রিয় থাকত। প্রতিটি নাগরিক নিজেকে রাষ্ট্রের একজন প্রহরী মনে করতেন। রাসুলুল্লাহ সা. বলতেন, "যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় এক রাত পাহারা দিল, তা হাজার রাতের ইবাদতের চেয়েও উত্তম।" এই আধ্যাত্মিক অনুপ্রেরণা নাগরিকদের প্রতিরক্ষামূলক দায়িত্ব পালনকে একটি পবিত্র ইবাদতে পরিণত করেছিল, যা আধুনিক যেকোনো পেশাদার সেনাবাহিনীর চেয়েও অনেক বেশি কার্যকর ও বিশ্বস্ত প্রতিরক্ষাবলয় তৈরি করেছিল।

৫. রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও ভবিষ্যৎ বিজয়ের ভূ-রাজনৈতিক রূপরেখা (Geopolitical Vision)

মদিনা রাষ্ট্রের নাগরিকদের সমষ্টিগত দায়িত্ববোধ এবং প্রতিরক্ষায় স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের পেছনে আরেকটি বড় অনুঘটক ছিল রাসুলুল্লাহ সা. কর্তৃক প্রদত্ত ভবিষ্যৎ বিজয়ের ভূ-রাজনৈতিক রূপরেখা বা 'জিওপলিটিক্যাল ভিশন' (Geopolitical Vision)। চরম নির্যাতন ও সংকটের মুহূর্তেও রাসুলুল্লাহ সা. সাহাবিগণকে কেবল ধৈর্যের উপদেশই দেননি, বরং তাঁদের সামনে এক উজ্জ্বল ও বিজয়ী ভবিষ্যতের চিত্র তুলে ধরেছিলেন। এই ভবিষ্যৎ বাণীসমূহ সাহাবিগণের মনস্তাত্ত্বিক মনোবলকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল যে, তাঁরা সাময়িক পরাজয় বা কষ্টকে চূড়ান্ত পরাজয় মনে করতেন না। সীরাতগ্রন্থে উল্লেখ আছে:

«بل إن الدعوة الإسلامية تهدف- منذ أول يومها- إلى القضاء على الجاهلية الجهلاء ونظامها الغاشم، وأن من أهدافها الأساسية بسط النفوذ على الأرض والسيطرة على الموقف السياسي في العالم، لتقود الأمة الإنسانية والجمعية البشرية إلى مرضاة الله»

অর্থাৎ, "ইসলামি দাওয়াতের লক্ষ্য প্রথম দিন থেকেই ছিল জাহেলিয়াত ও তার অত্যাচারী ব্যবস্থার অবসান ঘটানো। এর অন্যতম মূল লক্ষ্য ছিল পৃথিবীতে প্রভাব বিস্তার করা এবং বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা, যাতে মানবজাতিকে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করা যায়" [8] । এই বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি সাহাবিগণের মধ্যে এক বিশাল রাজনৈতিক ও সামরিক সচেতনতা তৈরি করেছিল।

চরম সংকটের দিনগুলোতে যখন সাহাবি খব্বাব ইবনুল আরত রা. কুরাইশদের নির্যাতনের তীব্রতায় রাসুলুল্লাহ সা.-এর কাছে এসে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করেছিলেন, তখন রাসুলুল্লাহ সা. অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে ভবিষ্যৎ বিজয়ের যে রূপরেখা ঘোষণা করেছিলেন, তা ছিল নিম্নরূপ:

«وليتمن الله هذا الأمر حتى يسير الراكب من صنعاء إلى حضر موت ما يخاف إلا الله والذئب على غنمه ولكنكم تستعجلون»

অর্থাৎ, "আল্লাহ অবশ্যই এই দ্বীনকে পূর্ণতা দান করবেন, এমনকি একজন আরোহী সানআ থেকে হাজরামাউত পর্যন্ত ভ্রমণ করবে অথচ আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ভয় পাবে না এবং তার মেষপালের জন্য নেকড়ের ভয়ও থাকবে না। কিন্তু তোমরা তাড়াহুড়ো করছ" [9] । এই ভবিষ্যৎ বাণী কেবল একটি আধ্যাত্মিক সান্ত্বনা ছিল না, বরং এটি ছিল একটি সুনির্দিষ্ট ভূ-রাজনৈতিক লক্ষ্য (Geopolitical Goal), যা অর্জনের জন্য সাহাবিগণ নিজেদের জীবন ও সম্পদ উৎসর্গ করতে দ্বিধাবোধ করেননি।

এই ভূ-রাজনৈতিক রূপরেখা সাহাবিগণের মধ্যে এই বিশ্বাস দৃঢ় করেছিল যে, রোম ও পারস্যের মতো তৎকালীন পরাশক্তিগুলোর পতন অনিবার্য এবং মুসলিম উম্মাহই হবে পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নেতৃত্বদানকারী শক্তি। এই বিশ্বাসের ফলেই মদিনার ক্ষুদ্র রাষ্ট্রটি অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে আরবের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বমঞ্চে এক অপরাজেয় শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছিল। নাগরিকদের সমষ্টিগত দায়িত্ববোধ, অভ্যন্তরীণ মনস্তাত্ত্বিক কনস্ক্রিপশন এবং রাসুলুল্লাহ সা.-এর দূরদর্শী সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব—এই তিনের সমন্বয়েই গড়ে উঠেছিল ইসলামের ইতিহাসের প্রথম ও সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা।

মদিনা রাষ্ট্রের এই প্রতিরক্ষানীতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, তা ছিল অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত এবং যুগোপযোগী। রাসুলুল্লাহ সা. নাগরিকদের মধ্যে যে সমষ্টিগত দায়িত্ববোধের বিকাশ ঘটিয়েছিলেন, তা আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের 'টোটাল ন্যাশনাল ডিফেন্স' (Total National Defense) ধারণার সাথে হুবহু মিলে যায়। বাহ্যিক কোনো বলপ্রয়োগ ছাড়াই কেবল আদর্শিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রেরণার মাধ্যমে একটি সমগ্র জাতিকে প্রতিরক্ষাবাহিনীতে রূপান্তর করার এই কৌশল পৃথিবীর সামরিক ইতিহাসে এক অতুলনীয় বিস্ময়। এই প্রতিরক্ষানীতির সফল বাস্তবায়নের ফলেই মদিনা রাষ্ট্র তার সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে এক বিশ্বজনীন খেলাফতের ভিত্তি স্থাপন করতে পেরেছিল, যা মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করে।

""
২.৩.১ রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষায় নাগরিকদের কালেকটিভ রেসপন্সিবিলিটি (Collective Responsibility) এবং কনস্ক্রিপশন (Conscription) নীতি
আমাদের নবী সা. সীরাত বিশ্বকোষ
ha-mims.world
এ আর্টিকেলের কুইজ(5টি প্রশ্ন)

২.৩.১ রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষায় নাগরিকদের কালেকটিভ রেসপন্সিবিলিটি (Collective Responsibility) এবং কনস্ক্রিপশন (Conscription) নীতি কুইজ

1 / 5

মদিনা রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষায় নাগরিকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণকে আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় কী বলা হয়?

এই আর্টিকেলটি কেমন লাগলো?

এই গবেষণাকে সহায়তা করুন

সীরাত বিশ্বকোষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আপনার সামান্য সহায়তা এই গবেষণাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

bKash / Nagad01XXXXXXXXXX(Send Money)
☕ Ko-fi দিয়ে সহায়তা

রেফারেন্স: "সীরাত বিশ্বকোষ" লিখুন

🌟 Ha-mim's World-এর একটি গবেষণা ও জ্ঞান-প্রযুক্তি প্রকল্প

কমিউনিটি রিফ্লেকশন

এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি কী শিখলেন বা আপনার অনুভূতি কী, তা সবার সাথে শেয়ার করুন।

আপনার রিফ্লেকশন শেয়ার করতে দয়া করে লগইন করুন।

লোড হচ্ছে...