ইসলামি রাষ্ট্রদর্শনে নাগরিকের অধিকার (Rights) ও কর্তব্যের (Duties) পারস্পরিক ভারসাম্য কেবল একটি রাজনৈতিক সমঝোতা নয়, বরং এটি একটি ঐশী বিধান এবং সামষ্টিক অস্তিত্বের মূল ভিত্তি। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে যাকে 'সিভিক রেসপন্সিবিলিটি' বা নাগরিক দায়িত্বশীলতা বলা হয়, ইসলাম তার চেয়েও গভীর ও আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে একে সংজ্ঞায়িত করেছে। ইসলামে একজন নাগরিকের অধিকার ও কর্তব্য একে অপরের পরিপূরক; যেখানে একজনের অধিকার অন্যজনের কর্তব্যে পরিণত হয়। এই দ্বিমুখী সম্পর্কের ভারসাম্যপূর্ণ বিন্যাসই একটি আদর্শ কল্যাণরাষ্ট্রের জন্ম দেয়। মহানবি সা. মদিনায় যে রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তার মূল ভিত্তিই ছিল নাগরিক অধিকার ও কর্তব্যের এই অনন্য ভারসাম্য, যা সমকালীন ভূ-রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থায় এক অভূতপূর্ব বিপ্লব ঘটিয়েছিল।
১. ইসলামি দর্শনে নাগরিক দায়িত্ব ও অধিকারের তাত্ত্বিক ভিত্তি
ইসলামি রাষ্ট্রচিন্তায় নাগরিক দায়িত্ব ও অধিকারের ধারণাটি কোনো কৃত্রিম সামাজিক চুক্তি (Social Contract) থেকে উদ্ভূত নয়, বরং এটি তাওহীদি দর্শনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। পশ্চিমা উদারনৈতিক দর্শনে যেখানে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদকে (Individualism) চরম গুরুত্ব দিয়ে অধিকারের দাবিকে বড় করে দেখা হয়, এবং সমাজতান্ত্রিক দর্শনে যেখানে রাষ্ট্রকে সর্বেসর্বা করে নাগরিকের ব্যক্তিস্বাধীনতাকে খর্ব করা হয়, সেখানে ইসলাম এক মধ্যপন্থা বা 'ওয়াসাতিয়্যাহ' (الوسطية) নীতি অবলম্বন করে। ইসলামে মানুষের অধিকার ও কর্তব্যকে এমনভাবে বিন্যস্ত করা হয়েছে যাতে ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব তৈরি না হয়। এই ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে ইসলামি চিন্তাবিদগণ সর্বদা সচেষ্ট থেকেছেন। বিশিষ্ট ইসলামি গবেষক শেখ উমর আল-আশকার এই ভারসাম্যহীনতার সংকট ও ইসলামি সমাধানের গুরুত্ব তুলে ধরে উল্লেখ করেছেন যে, অধিকার ও কর্তব্যের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা অত্যন্ত জটিল একটি প্রক্রিয়া, যা অনেক সময় সাধারণ মানুষের চিন্তাকে বিভ্রান্ত করে। তিনি লিখেছেন:
«قضية التوازن والمواءمة بين الحقوق والواجبات: هي قضية احتار العاملون في الإسلام في كيفية المواءمة بين هذه الحقوق والواجبات...»
অর্থাৎ, "অধিকার ও কর্তব্যের মধ্যে ভারসাম্য ও সামঞ্জস্য বিধানের বিষয়টি এমন একটি বিষয়, যা ইসলামের কর্মীদের জন্য অনেক সময় বিভ্রান্তি বা জটিলতার সৃষ্টি করে যে কীভাবে এই দুইয়ের মধ্যে নিখুঁত সমন্বয় সাধন করা যায়..." [1] । এই জটিলতা নিরসনে ইসলাম নাগরিকের প্রতিটি অধিকারের বিপরীতে একটি সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব নির্ধারণ করে দিয়েছে, যা সমাজকে বিশৃঙ্খলা থেকে রক্ষা করে।
ইসলামি আইনশাস্ত্রে নাগরিকের এই পারস্পরিক সম্পর্ককে কেবল আইনি কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি, বরং একে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক দায়বদ্ধতার সাথে যুক্ত করা হয়েছে। ড. ওয়াহবাহ আল-জুহায়লি তাঁর বিখ্যাত 'আল-ফিকহুল ইসলামি ওয়া আদিল্লাতুহু' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, সাধারণ ভারসাম্য ও ন্যায়বিচারের নীতিকে একত্রিত করা নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য অপরিহার্য। তিনি লিখেছেন:
«الدمج بين مبدأ التوازن العام ومبدأ العدالة: إن التوازن بين الحقوق والواجبات عند تطبيق العدل أمر ضروري لتحقيق المساواة بين الخصوم وتحقيق القدرة على...»
অর্থাৎ, "সাধারণ ভারসাম্য এবং ন্যায়বিচারের নীতির মধ্যে সমন্বয় সাধন: ন্যায়বিচার প্রয়োগের ক্ষেত্রে অধিকার ও কর্তব্যের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি, যাতে পক্ষসমূহের মধ্যে সমতা নিশ্চিত করা যায় এবং সামষ্টিক সক্ষমতা অর্জন করা সম্ভব হয়..." [2] । এই তাত্ত্বিক ভিত্তিটি প্রমাণ করে যে, ইসলামে নাগরিক দায়িত্ব বা সিভিক রেসপন্সিবিলিটি কেবল একটি আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, বরং এটি সামাজিক সমতা ও ঐশী ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রধান হাতিয়ার।
মানুষের সামাজিক অস্তিত্বের অপরিহার্যতার ওপর ভিত্তি করেই এই অধিকার ও কর্তব্যের বিন্যাস ঘটে। মানুষ একা বাস করতে পারে না; তাকে একটি সমাজের অংশ হতে হয়। আর এই সামাজিকতার কারণেই তার ওপর কিছু দায়িত্ব অর্পিত হয় এবং সে কিছু অধিকার লাভ করে। 'মাসউলিইয়াতুদ দাওলাহ ফিল ইকতাসাদিল ইসলামি' গ্রন্থে এই সামাজিক বাস্তবতার ওপর আলোকপাত করে বলা হয়েছে:
«وأما علاقات الإنسان بالإنسان، التي تحددها الحقوق والامتيازات والواجبات، فهي بطبيعتها تتوقف على وجود الإنسان ضمن الجماعة»
অর্থাৎ, "মানুষের সাথে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক, যা বিভিন্ন অধিকার, সুযোগ-সুবিধা এবং কর্তব্য দ্বারা নির্ধারিত হয়, তা স্বভাবগতভাবেই মানুষের সমষ্টিগত বা সমাজবদ্ধ অস্তিত্বের ওপর নির্ভর করে..." [3] । সুতরাং, ইসলামি দর্শনে নাগরিক দায়িত্বশীলতা হলো সমাজবদ্ধ জীবনের এক অনিবার্য দাবি, যা ছাড়া কোনো রাষ্ট্র বা সমাজ টিকে থাকতে পারে না।
২. মদিনা রাষ্ট্র ও সিভিক রেসপন্সিবিলিটি: একটি ঐতিহাসিক ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ
রাসুলুল্লাহ সা. মদিনায় হিজরত করার পর যে ঐতিহাসিক 'মদিনার সনদ' (دستور المدينة) প্রণয়ন করেছিলেন, তা ছিল পৃথিবীর ইতিহাসের প্রথম লিখিত সংবিধান এবং নাগরিক দায়িত্ব ও অধিকারের ভারসাম্যের এক জীবন্ত দলিল। এই সনদের মাধ্যমে মদিনার বহুত্ববাদী সমাজে বসবাসকারী মুসলিম, ইহুদি এবং অন্যান্য গোত্রের নাগরিক অধিকার যেমন নিশ্চিত করা হয়েছিল, তেমনি রাষ্ট্রের প্রতি তাদের নাগরিক দায়িত্বও সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছিল। মদিনা রাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক নিরাপত্তা এবং অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য এই সিভিক রেসপন্সিবিলিটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সনদের প্রতিটি ধারায় অধিকারের পাশাপাশি কর্তব্যের ওপর সমান জোর দেওয়া হয়েছিল, যা তৎকালীন আরবের গোত্রতান্ত্রিক নৈরাজ্য দূর করে একটি সুসংগঠিত রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিল [4] ।
মদিনা সনদে নাগরিক দায়িত্বের একটি বড় দিক ছিল পারস্পরিক সহযোগিতা এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সনদের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি ছিল যে, কোনো নাগরিক বা গোত্র যদি আক্রান্ত হয়, তবে অন্য সকল নাগরিক তাদের পাশে দাঁড়াবে। এটি ছিল আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের 'কালেক্টিভ সিকিউরিটি' বা যৌথ নিরাপত্তার আদি রূপ। তবে এই অধিকার ভোগ করার পূর্বশর্ত ছিল রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য এবং অভ্যন্তরীণ শান্তি বজায় রাখার নাগরিক কর্তব্য পালন করা। ড. ওয়াহবাহ আল-জুহায়লি এই ধরনের সামাজিক চুক্তির আইনি ও নৈতিক ভিত্তি আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছেন যে, অধিকার ও কর্তব্যের এই ভারসাম্যই সমাজে প্রকৃত সমতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে, যা মদিনা রাষ্ট্রে পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত হয়েছিল [5] ।
মদিনা রাষ্ট্রের এই নাগরিক মডেলটি কেবল মুসলমানদের জন্য সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং অমুসলিম নাগরিকদের (বিশেষত ইহুদিদের) ধর্মীয় স্বাধীনতা ও জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে তাদেরও রাষ্ট্রের মূলধারার নাগরিক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এর বিনিময়ে তাদের দায়িত্ব ছিল রাষ্ট্রের আইন মেনে চলা এবং মদিনার অভ্যন্তরীণ শান্তি বিঘ্নিত না করা। এই ঐতিহাসিক চুক্তিটি প্রমাণ করে যে, ইসলামে নাগরিক দায়িত্বশীলতা কোনো সংকীর্ণ ধর্মীয় গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়, বরং এটি একটি সার্বজনীন মানবিক ও রাজনৈতিক দর্শন। 'মাসউলিইয়াতুদ দাওলাহ ফিল ইকতাসাদিল ইসলামি' গ্রন্থের ভাষ্য অনুযায়ী, মদিনা রাষ্ট্রে নাগরিকের এই পারস্পরিক অধিকার ও কর্তব্যের ভারসাম্যই ছিল রাষ্ট্রটির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থায়িত্বের মূল চাবিকাঠি [6] ।
৩. ইসলামি আইনশাস্ত্রে পারস্পরিকতার নীতি (The Principle of Reciprocity)
ইসলামি আইনশাস্ত্রে (Fiqh) অধিকার ও কর্তব্যের ভারসাম্যকে 'পারস্পরিকতা' বা 'তাকাফু' (التكافؤ) এবং 'তাওয়াযুন' (التوازن) নীতির মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ফিকহের পরিভাষায়, কোনো ব্যক্তি যদি সমাজ বা রাষ্ট্র থেকে কোনো অধিকার বা সুবিধা ভোগ করতে চায়, তবে তাকে অবশ্যই তার বিপরীতে নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালন করতে হবে। এই নীতিটি কেবল রাজনৈতিক ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়, বরং পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সমানভাবে কার্যকর। উদাহরণস্বরূপ, ইসলামি পারিবারিক আইনে স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক অধিকার ও কর্তব্যকে এই ভারসাম্যের আলোকেই নির্ধারণ করা হয়েছে। ড. ওয়াহবাহ আল-জুহায়লি তাঁর গ্রন্থে এই পারস্পরিকতার নীতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লিখেছেন:
«عرفنا أن الزواج كغيره من العقود ينشئ بين العاقدين الزوجين حقوقاً وواجبات متبادلة، عملاً بمبدأ التوازن والتكافؤ وتساوي أطراف...»
অর্থাৎ, "আমরা জেনেছি যে, বিবাহ অন্যান্য চুক্তির মতোই চুক্তি সম্পাদনকারী স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পারস্পরিক অধিকার ও কর্তব্য সৃষ্টি করে, যা মূলত ভারসাম্য, সমতা এবং পক্ষসমূহের পারস্পরিক সমতার নীতির ওপর ভিত্তি করে কার্যকর হয়..." [7] । পারিবারিক জীবনের এই ক্ষুদ্রতম একক থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের বৃহত্তম একক পর্যন্ত সর্বত্রই এই পারস্পরিকতার নীতি কার্যকর।
ইসলামি বিচারব্যবস্থায় এই পারস্পরিকতার নীতিটি অত্যন্ত কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হয়। বিচারকের সামনে বাদী ও বিবাদী উভয়েরই সমান অধিকার থাকে এবং তাদের দায়িত্বও থাকে সমান। আইনের শাসন (Rule of Law) প্রতিষ্ঠার জন্য এই ভারসাম্য রক্ষা করা অপরিহার্য। আল-জুহায়লি আরও উল্লেখ করেছেন যে, বিচারিক প্রক্রিয়ায় অধিকার ও কর্তব্যের ভারসাম্য বজায় না রাখলে সমাজে জুলুম ও বৈষম্যের সৃষ্টি হয়, যা ইসলামি শরীআতের মূল উদ্দেশ্যের (Maqasid al-Shariah) পরিপন্থী [8] ।
এই পারস্পরিকতার নীতিটি নাগরিককে কেবল অধিকারের দাবিদার হিসেবে গড়ে তোলে না, বরং তাকে একজন দায়িত্বশীল সমাজ সংস্কারক হিসেবে গড়ে তোলে। ইসলামে 'আমর বিল মা'রুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার' (সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) কেবল একটি ধর্মীয় বিধান নয়, বরং এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক দায়িত্ব (Civic Duty)। সমাজের প্রতিটি নাগরিক যদি এই দায়িত্ব পালন করে, তবে সমাজ থেকে অপরাধ ও অনৈতিকতা দূর হতে বাধ্য। শেখ উমর আল-আশকার তাঁর আলোচনায় দেখিয়েছেন যে, যখন নাগরিকরা তাদের এই নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব ভুলে কেবল নিজেদের অধিকার আদায়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তখনই সমাজে বিশৃঙ্খলা ও অবক্ষয় দেখা দেয় [9] ।
৪. সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সিভিক রেসপন্সিবিলিটি: সম্পদ বণ্টন ও জনকল্যাণ
ইসলামি অর্থনীতিতে নাগরিক দায়িত্বশীলতা বা সিভিক রেসপন্সিবিলিটির প্রকাশ ঘটে সম্পদ বণ্টন, যাকাত ব্যবস্থা এবং জনকল্যাণমূলক কাজের মাধ্যমে। ইসলামে ধনীদের সম্পদে দরিদ্রদের অধিকার সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। এটি ধনীদের দয়া নয়, বরং দরিদ্রদের আইনি অধিকার এবং ধনীদের জন্য একটি রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় কর্তব্য। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ইসলাম সমাজে অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখে এবং শ্রেণী বৈষম্য দূর করে। আধুনিক পরিভাষায় একে 'সোশ্যাল ডেমোক্রেসি' বা সামাজিক গণতন্ত্র বলা যেতে পারে, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক চাহিদা পূরণের গ্যারান্টি রাষ্ট্র ও সমাজ যৌথভাবে প্রদান করে। 'আল-কিয়ামুল ইসলামিয়্যাহ ওয়া নিহায়াতুত তারিখ' নামক গবেষণা প্রবন্ধে ইসলামি সামাজিক ব্যবস্থার এই অনন্য দিকটি তুলে ধরে বলা হয়েছে:
«ومن أساسيات الديمقراطية الاجتماعية في الإسلام المساواة في الحقوق بين الرجل والمرأة، والحق في الحصول على عمل وظروف عمل ملائمة وعادلة، والحق في أجور عادلة...»
অর্থাৎ, "ইসলামে সামাজিক গণতন্ত্রের অন্যতম মৌলিক ভিত্তি হলো নারী ও পুরুষের অধিকারের সমতা, উপযুক্ত ও ন্যায়সঙ্গত কর্মসংস্থান লাভের অধিকার এবং ন্যায্য মজুরি পাওয়ার অধিকার..." [10] । এই অধিকারগুলো নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের যেমন দায়িত্ব, তেমনি নিয়োগকর্তা ও সাধারণ নাগরিকদেরও কর্তব্য।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নাগরিক দায়িত্বের আরেকটি বড় দিক হলো কর বা রাজস্ব প্রদান এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় রোধ করা। ইসলামে কর ফাঁকি দেওয়া বা রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাৎ করাকে অত্যন্ত বড় অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। নাগরিকের দায়িত্ব হলো সততার সাথে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে তার প্রদেয় অংশ প্রদান করা, যাতে রাষ্ট্র জনকল্যাণমূলক কাজ পরিচালনা করতে পারে। 'মাসউলিইয়াতুদ দাওলাহ ফিল ইকতাসাদিল ইসলামি' গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইসলামি অর্থনীতিতে রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল কর আদায় করা নয়, বরং সেই করের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা এবং নাগরিকদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা প্রদান করা। নাগরিক ও রাষ্ট্রের এই পারস্পরিক সহযোগিতাই একটি স্বনির্ভর ও স্থিতিশীল অর্থনীতি গড়ে তোলে [11] ।
এছাড়াও, পরিবেশ সংরক্ষণ, জনস্বাস্থ্য রক্ষা এবং সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়নে নাগরিকের সক্রিয় অংশগ্রহণকে ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলাকে ঈমানের একটি শাখা হিসেবে ঘোষণা করে মহানবি সা. নাগরিক দায়িত্বশীলতার এক অনন্য উদাহরণ পেশ করেছেন। ড. ওয়াহবাহ আল-জুহায়লি তাঁর আইনশাস্ত্রীয় বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে, জনকল্যাণমূলক কাজে অংশগ্রহণ করা এবং সমাজের ক্ষতিসাধন থেকে বিরত থাকা প্রতিটি নাগরিকের ওপর শরীআতগতভাবে আবশ্যক [12] ।
৫. আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও ইসলামি সিভিক রেসপন্সিবিলিটির তুলনামূলক মূল্যায়ন
আধুনিক পশ্চিমা রাষ্ট্রব্যবস্থায় নাগরিকত্বের (Citizenship) ধারণাটি মূলত অধিকার-কেন্দ্রিক (Rights-centric)। সেখানে নাগরিকরা রাষ্ট্রের কাছে তাদের অধিকারের দাবি আদায়ে যতটা সোচ্চার, নিজেদের দায়িত্ব পালনে ততটা সচেতন নয়। এর ফলে সমাজে এক ধরনের ব্যক্তিকেন্দ্রিক ভোগবাদী মানসিকতার জন্ম হয়, যা সামাজিক সংহতিকে দুর্বল করে তোলে। অন্যদিকে, সমাজতান্ত্রিক বা কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রব্যবস্থায় নাগরিকের ওপর কর্তব্যের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে তার মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতাকে হরণ করা হয়। ইসলাম এই দুই চরমপন্থার বিপরীতে এক ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান পেশ করে, যেখানে অধিকার ও কর্তব্য একে অপরের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। শেখ উমর আল-আশকার তাঁর তাত্ত্বিক আলোচনায় এই তুলনামূলক পার্থক্যের দিকে ইঙ্গিত করে দেখিয়েছেন যে, পশ্চিমা ও অন্যান্য মানব রচিত মতবাদগুলো অধিকার ও কর্তব্যের এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে, যা কেবল ইসলামই সফলভাবে করতে পেরেছে [13] 。
ইসলামি সিভিক রেসপন্সিবিলিটির একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো এর নৈতিক ও পরকালীন জবাবদিহিতা। আধুনিক রাষ্ট্রে একজন নাগরিক কেবল আইনের ভয়ে বা শাস্তির এড়াতে দায়িত্ব পালন করে। কিন্তু ইসলামে একজন নাগরিক বিশ্বাস করে যে, তার প্রতিটি কাজের জন্য তাকে আল্লাহর দরবারে জবাবদিহি করতে হবে। মহানবি সা.-এর বিখ্যাত হাদিস—"তোমাদের প্রত্যেকেই রাখাল (দায়িত্বশীল) এবং প্রত্যেকেই তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে"—নাগরিক দায়িত্বশীলতার এই পরকালীন মাত্রাকে স্পষ্ট করে তোলে। ড. ওয়াহবাহ আল-জুহায়লি এই নৈতিক জবাবদিহিতাকে ইসলামি আইন ও নাগরিক শৃঙ্খলার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ আইনব্যবস্থায় অনুপস্থিত [14] 。
ফ্রান্সিস ফুকুয়ামার 'ইতিহাসের সমাপ্তি' (The End of History) তত্ত্বের বিপরীতে ইসলামি মূল্যবোধের শ্রেষ্ঠত্ব আলোচনা করতে গিয়ে গবেষকগণ দেখিয়েছেন যে, পশ্চিমা লিবারেল ডেমোক্রেসি মানুষের আধ্যাত্মিক ও সামাজিক চাহিদার ভারসাম্য বজায় রাখতে পারেনি। কিন্তু ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা মানুষের ইহলৌকিক অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি তার আধ্যাত্মিক ও সামাজিক দায়িত্ববোধকে জাগ্রত করে এক চিরন্তন ও সার্বজনীন সমাধান প্রদান করে। 'আল-কিয়ামুল ইসলামিয়্যাহ ওয়া নিহায়াতুত তারিখ' গবেষণাপত্রে এই বিষয়টি অত্যন্ত জোরালোভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যে, ইসলামি মূল্যবোধই মানবজাতিকে একটি শোষণমুক্ত, ভারসাম্যপূর্ণ ও শান্তিপূর্ণ বিশ্বব্যবস্থা উপহার দিতে পারে [15] । এই ভারসাম্যপূর্ণ নাগরিক মডেলটিই ছিল মদিনা রাষ্ট্রের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি, যা কিয়ামত পর্যন্ত মানবজাতির জন্য একটি অনুকরণীয় আদর্শ হয়ে থাকবে।