৭.১.১ সাহাবিদের দাওয়াহ মিশনকে কি আসলেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলা যায়?
প্রাচ্যবিদদের রাজনৈতিক তত্ত্ব ও সাহাবিদের দাওয়াহ মিশন: একটি তাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ
ইসলামের প্রাথমিক যুগের সম্প্রসারণ এবং সাহাবায়ে কেরামের দাওয়াহ মিশনকে আধুনিক পশ্চিমা প্রাচ্যবিদ (Orientalists) এবং ধর্মনিরপেক্ষ ঐতিহাসিকগণ প্রায়শই একটি ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আন্দোলন হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করেছেন। উইলিয়াম মন্টগোমারি ওয়াট কিংবা কার্ল বেকারের মতো গবেষকগণ দাবি করেন যে, সপ্তম শতকের আরবের অর্থনৈতিক সংকট, উর্বর ভূমির সন্ধান এবং রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের আকাঙ্ক্ষাই ছিল সাহাবিদের অভিযানের মূল চালিকাশক্তি। এই ঐতিহাসিক বস্তুবাদী (Historical Materialism) ও অর্থনৈতিক নির্ধারণবাদী (Economic Determinism) দৃষ্টিভঙ্গি সাহাবিদের আধ্যাত্মিক ও আদর্শিক প্রেরণাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে। তারা মনে করেন, ধর্মীয় স্লোগানটি ছিল কেবলই একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার, যার মাধ্যমে আরবের যাযাবর উপজাতিদের একটি সুসংহত রাজনৈতিক শক্তির অধীনে ঐক্যবদ্ধ করা হয়েছিল।
তবে এই রাজনৈতিক তত্ত্বটি ইসলামের ইতিহাসের মৌলিক উৎস এবং সীরাত শাস্ত্রের বৈজ্ঞানিক ভিত্তির সামনে টিকতে পারে না। সীরাত ও সাধারণ ইতিহাসের মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে; সীরাত কেবল জনশ্রুতি বা রাজনৈতিক বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে রচিত হয়নি, বরং এর প্রতিটি ঘটনা কঠোর হাদিসতত্ত্ব ও বর্ণনাসূত্রের (Isnad) কষ্টিপাথরে যাচাই করা হয়েছে। এই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি সম্পর্কে সীরাত গবেষকগণ অত্যন্ত স্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করেছেন। যেমনটি বর্ণিত হয়েছে:
অনুবাদ:
"সীরাত সাধারণ ইতিহাস থেকে পৃথক এই কারণে যে, এর বিষয়বস্তু এমন বর্ণনাসূত্র (ইসনাত) ছাড়া প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না যার মাধ্যমে হাদিস গ্রহণযোগ্য হয়। অতএব, এর ঘটনাবলি প্রমাণ করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করা ওয়াজিব; বিশেষত রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ঘটনার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে।" [1] সাহাবিদের দাওয়াহ মিশনকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলার অর্থ হলো তাদের চরম আত্মত্যাগ ও বিশ্বাসের গভীরতাকে অস্বীকার করা। মক্কার তপ্ত বালুতে বিলাল রা. বা ইয়াসির রা.-এর পরিবারের ওপর যে অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল, তা কোনো রাজনৈতিক ক্ষমতা বা বৈষয়িক লাভের আশায় ছিল না। ইসলামের প্রাথমিক যুগের এই আত্মত্যাগ প্রমাণ করে যে, তাদের চালিকাশক্তি ছিল সম্পূর্ণ পারলৌকিক ও তাওহীদকেন্দ্রিক। এই দাওয়াহর মূল লক্ষ্য ছিল মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ও আত্মিক মুক্তি, কোনো পার্থিব সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা নয় [2] ।
ঐতিহাসিক ইবনে খালদুন তাঁর 'মুকাদ্দিমা' গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, আরবের যাযাবর জাতি কেবল রাজনৈতিক বা গোত্রীয় সংহতির (আসাবিয়্যাহ) মাধ্যমে এত বড় সাম্রাজ্য জয় করতে পারত না, যদি না তাদের পেছনে একটি অতিপ্রাকৃতিক ও ঐশী আদর্শিক শক্তি কাজ করত। সুতরাং, সাহাবিদের দাওয়াহ মিশনকে নিছক 'বাস্তববাদী রাজনীতি' (Realpolitik) বা ভূ-রাজনৈতিক সম্প্রসারণবাদ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা ঐতিহাসিক সত্যের চরম অপলাপ মাত্র [3] ।
মক্কী যুগের দাওয়াহ ও রাজনৈতিক আপসের প্রত্যাখ্যান: ক্ষমতার মোহ বনাম আদর্শিক অবিচলতা
যদি সাহাবিদের এবং স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সা.-এর দাওয়াহ মিশনের মূল লক্ষ্য রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনই হতো, তবে মক্কী যুগেই তার সহজ সমাধান সম্ভব ছিল। কুরাইশ নেতৃবৃন্দ যখন দেখল যে ইসলামের দাওয়াহ তাদের ঐতিহ্যগত ও অর্থনৈতিক কাঠামোর জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে, তখন তারা রাসুলুল্লাহ সা.-এর কাছে সরাসরি রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রস্তাব পেশ করেছিল। কুরাইশদের পক্ষ থেকে উতবাহ ইবনে রাবিয়াহ প্রস্তাব দিয়েছিল যে, মুহাম্মাদ (সা.) যদি চান তবে তাকে মক্কার বাদশাহ বানিয়ে দেওয়া হবে, আরবের সমস্ত সম্পদ তার পায়ে লুটিয়ে দেওয়া হবে, তবুও তিনি যেন এই দাওয়াহ বন্ধ করেন।
কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আন্দোলনের নেতা হলে এই সুবর্ণ সুযোগ লুফে নিতেন এবং প্রথমে রাজনৈতিক ক্ষমতা কুক্ষিগত করে পরে নিজের আদর্শ বাস্তবায়নের পথ খুঁজতেন। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সা. এবং তাঁর অনুসারী সাহাবায়ে কেরাম এই প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন। সীরাত ইবনে হিশামে এই ঐতিহাসিক প্রত্যাখ্যানের বিবরণ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে সংরক্ষিত রয়েছে, যেখানে রাসুলুল্লাহ সা. তাঁর চাচা আবু তালিবকে বলেছিলেন যে, তারা যদি তাঁর ডান হাতে সূর্য এবং বাম হাতে চাঁদ এনে দেয়, তবুও তিনি এই মিশন থেকে এক চুলও বিচ্যুত হবেন না [4] । এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, ইসলামের দাওয়াহর লক্ষ্য কোনো রাজনৈতিক আপস বা ক্ষমতার অংশীদারত্ব ছিল না, বরং তা ছিল এক আল্লাহর সার্বভৌমত্ব (Sovereignty of Allah) প্রতিষ্ঠার এক আপসহীন সংগ্রাম।
মক্কী যুগের দাওয়াহর পদ্ধতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেখানে কোনো সামরিক প্রস্তুতি বা রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অস্তিত্ব ছিল না। সাহাবিদের চরিত্র গঠন, নৈতিক পরিশুদ্ধি এবং তাওহীদের প্রতি অবিচল বিশ্বাস স্থাপনই ছিল এই যুগের মূল ভিত্তি। এই দাওয়াহর মূল গুণাবলি সম্পর্কে আধুনিক গবেষকগণ লিখেছেন:
অনুবাদ:
"এবং এই (দাওয়াহর) অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গুণাবলি হলো: জ্ঞান, পরিকল্পনা, ধারাবাহিকতা, নম্রতা, হিকমত ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে দাওয়াহ প্রদান, সহনশীলতা, দায়িত্ববোধ, এবং ধৈর্য ও অবিচলতা।" [5] এই গুণাবলি কোনো রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলকারী দলের চরিত্র হতে পারে না। একটি রাজনৈতিক দল সাধারণত ক্ষমতা অর্জনের জন্য সাময়িক জোট গঠন, আদর্শিক শিথিলতা এবং সুবিধাবাদী নীতি গ্রহণ করে। কিন্তু সাহাবায়ে কেরাম মক্কার তেরোটি বছর চরম সামাজিক ও অর্থনৈতিক বয়কট (শি'বে আবু তালিবের বন্দিদশা) সহ্য করেও তাঁদের আদর্শিক অবস্থান থেকে বিন্দুমাত্র সরে আসেননি [6] । অতএব, মক্কী যুগের এই দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ প্রমাণ করে যে, তাঁদের দাওয়াহ মিশন ছিল সম্পূর্ণ আধ্যাত্মিক ও ঐশী নির্দেশনার অধীন, কোনো পার্থিব রাজনৈতিক এজেন্ডার অংশ নয়।
মাদানী রাষ্ট্রব্যবস্থা ও ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা: দাওয়াহ ও কূটনীতির মেলবন্ধন
মদিনায় হিজরতের পর ইসলামের দাওয়াহ মিশন একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে এবং একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম হয়। ধর্মনিরপেক্ষ ঐতিহাসিকগণ প্রায়শই মদিনার এই রূপান্তরকে একটি 'ধর্মীয় আন্দোলন থেকে রাজনৈতিক রাষ্ট্রে রূপান্তর' হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। কিন্তু গভীর রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, মদিনার রাষ্ট্রব্যবস্থা কোনো চিরাচরিত রাজনৈতিক ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ ছিল না, বরং তা ছিল দাওয়াহর পথকে নিষ্কণ্টক করার এবং মানুষের মৌলিক অধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করার একটি মাধ্যম (Instrumental Value)।
মদিনা সনদের (Constitution of Medina) মাধ্যমে যে রাষ্ট্রীয় কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছিল, তার মূল লক্ষ্য ছিল একটি বহু-ধর্মীয় ও বহু-সাংস্কৃতিক সমাজে শান্তি ও সাম্য প্রতিষ্ঠা করা। সেখানে ইহুদি, পৌত্তলিক এবং মুসলিমদের সমান নাগরিক অধিকার প্রদান করা হয়েছিল। এটি কোনো একনায়কতান্ত্রিক রাজনৈতিক আধিপত্য ছিল না, বরং তা ছিল 'যৌথ নিরাপত্তা' (Collective Security) এবং 'নাগরিক অধিকার'-এর এক অনন্য দলিল। রাসুলুল্লাহ সা. এবং সাহাবায়ে কেরাম রাষ্ট্রক্ষমতাকে ভোগ-বিলাসের মাধ্যম হিসেবে নেননি। মদিনার রাষ্ট্রপ্রধান হয়েও রাসুলুল্লাহ সা. এবং তাঁর সাহাবিগণ যে চরম দারিদ্র্য ও সাদাসিধে জীবনযাপন করতেন, তা সমকালীন রোমান বা পারস্য সম্রাটদের বিলাসবহুল রাজনৈতিক জীবনের সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল [7] ।
হুদায়বিয়ার সন্ধির (Treaty of Hudaybiyyah) ঘটনাটি বিশ্লেষণ করলে দাওয়াহ ও রাজনীতির এই সম্পর্কটি আরও স্পষ্ট হয়। বাহ্যিক দৃষ্টিতে এই চুক্তিটি মুসলিমদের জন্য রাজনৈতিকভাবে অপমানজনক মনে হয়েছিল, যার কারণে উমর রা.-এর মতো বীর সাহাবিও সাময়িকভাবে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। চুক্তির শর্তানুযায়ী, মক্কা থেকে কোনো মুসলিম মদিনায় আশ্রয় নিলে তাকে ফেরত দিতে হতো, কিন্তু মদিনা থেকে কেউ মক্কায় ফিরে গেলে তাকে ফেরত দেওয়া হতো না। রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি ছিল একটি চরম পরাজয়। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সা. এই চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন কারণ এর মাধ্যমে মক্কার কুরাইশদের সাথে যুদ্ধাবস্থার অবসান ঘটে এবং দাওয়াহর জন্য একটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি হয়। এর ফলে পরবর্তী দুই বছরে এত বিপুলসংখ্যক মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে, যা পূর্ববর্তী ১৯ বছরেও সম্ভব হয়নি। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, সাহাবিদের কাছে রাজনৈতিক বিজয় বা তাৎক্ষণিক ভূ-রাজনৈতিক সুবিধা অর্জনের চেয়ে দাওয়াহর প্রসার ও মানুষের হেদায়েত লাভই ছিল প্রধান অগ্রাধিকার [8] ।
পারস্য ও রোম অভিযান: সাম্রাজ্যবাদ বনাম মানবমুক্তির মহত্তম ইশতেহার
রাসুলুল্লাহ সা.-এর ওফাতের পর প্রথম খলিফা আবু বকর রা. এবং দ্বিতীয় খলিফা উমর রা.-এর শাসনামলে পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যে সামরিক অভিযান পরিচালিত হয়েছিল, তাকে অনেক আধুনিক ঐতিহাসিক 'আরব সাম্রাজ্যবাদ' (Arab Imperialism) হিসেবে আখ্যায়িত করার চেষ্টা করেন। তাদের দাবি, এই অভিযানগুলোর উদ্দেশ্য ছিল নতুন ভূমি জয় এবং কর আদায় করা। কিন্তু তৎকালীন ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং সাহাবিদের যুদ্ধকালীন আচরণ ও ঘোষণা এই দাবিকে সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রমাণ করে।
ইসলামের যুদ্ধনীতি (Just War Theory) সমকালীন বিশ্বের যেকোনো যুদ্ধনীতির চেয়ে উন্নত ও মানবিক ছিল। সাহাবায়ে কেরাম যখন কোনো অঞ্চলে অভিযানে যেতেন, তখন তারা প্রতিপক্ষকে তিনটি বিকল্প প্রস্তাব দিতেন: প্রথমত, ইসলাম গ্রহণ করা (যার মাধ্যমে তারা মুসলিমদের সমান অধিকার ও মর্যাদা লাভ করত); দ্বিতীয়ত, জিজিয়া বা কর প্রদান করে নিজস্ব ধর্মীয় স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বজায় রাখা; এবং তৃতীয়ত, যদি তারা প্রথম দুটি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে যুদ্ধ বেছে নেয়, তবেই কেবল যুদ্ধ করা। কোনো সাম্রাজ্যবাদী শক্তি কখনো বিজিত জাতিকে নিজেদের সমান রাজনৈতিক ও সামাজিক মর্যাদা দেওয়ার প্রস্তাব দেয় না, যা ইসলাম দিয়েছিল।
পারস্যের সেনাপতি রুস্তমের দরবারে প্রেরিত সাহাবি রিবঈ ইবনে আমির রা.-এর ঐতিহাসিক বক্তব্যটি সাহাবিদের দাওয়াহ মিশনের মূল দর্শনকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলে। রুস্তম যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, "তোমাদের আসার উদ্দেশ্য কী?" তখন রিবঈ ইবনে আমির রা. কোনো রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক লোভের কথা বলেননি, বরং বলেছিলেন:
অনুবাদ:
"আল্লাহ আমাদের প্রেরণ করেছেন যাতে আমরা যাকে ইচ্ছা মানুষের দাসত্ব থেকে বের করে আল্লাহর ইবাদতের দিকে নিয়ে আসতে পারি, দুনিয়ার সংকীর্ণতা থেকে এর প্রশস্ততার দিকে এবং অন্যান্য ধর্মের জুলুম থেকে ইসলামের ন্যায়বিচারের দিকে নিয়ে যেতে পারি।" [9] এই বক্তব্যটি কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডা বা সাম্রাজ্যবাদী লিপ্সার বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং এটি ছিল মানবমুক্তির এক মহত্তম ইশতেহার (Manifesto of Human Liberation)। সাহাবিদের লক্ষ্য ছিল মানুষের ওপর মানুষের তৈরি করা রাজনৈতিক ও ধর্মীয় শোষণের অবসান ঘটানো, যাতে সাধারণ মানুষ কোনো ভয়ভীতি ছাড়া স্বাধীনভাবে তাদের স্রষ্টাকে চিনে নিতে পারে। পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্যের সাধারণ জনগণ তাদের নিজস্ব শাসকদের অত্যাচার থেকে মুক্তি পেতে মুসলিম বাহিনীকে স্বাগত জানিয়েছিল, যা প্রমাণ করে যে সাহাবিদের এই মিশন সাম্রাজ্যবাদী দখলদারিত্ব ছিল না, বরং তা ছিল একটি মুক্তি মিশন [10] ।
তাছাড়া, বিজিত অঞ্চলের সম্পদ সাহাবায়ে কেরাম মদিনায় নিজেদের ব্যক্তিগত ভোগ-বিলাসের জন্য নিয়ে আসেননি। খলিফা উমর রা. যখন জেরুজালেম বিজয় করেন, তখন তাঁর পরনে ছিল তালি দেওয়া সাধারণ পোশাক এবং তিনি তাঁর গোলামের সাথে উটের পিঠে চড়ার পালাবদল করছিলেন। এই দৃশ্য দেখে রোমান ঐতিহাসিকগণও বিস্মিত হয়েছিলেন। যদি এই মিশন রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হতো, তবে বিজিত রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের বিপুল স্বর্ণভাণ্ডার সাহাবিদের জীবনযাত্রায় জাঁকজমক নিয়ে আসত। কিন্তু তারা পূর্বের মতোই কৃচ্ছ্রসাধন ও ইবাদতকেন্দ্রিক জীবনযাপন অব্যাহত রেখেছিলেন, যা প্রমাণ করে যে তাঁদের দাওয়াহ মিশন ছিল সম্পূর্ণ নিষ্কাম, ঐশী এবং মানবকল্যাণে নিবেদিত [11] ।