খণ্ড 97
ফন্ট:100%
থিম:

১১.৫৬ ইবনে ইসহাকের গ্রন্থে উল্লেখিত প্রি-ইসলামিক আরবিয় মূর্তিপূজার (Idolatry) অ্যানথ্রোপলজিক্যাল ডিকনস্ট্রাকশন

প্রাক-ইসলামি আরবের ধর্মীয় ও সামাজিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করতে গেলে ইবনে ইসহাক ও পরবর্তীকালের ঐতিহাসিকদের বর্ণনা থেকে একটি অত্যন্ত জটিল ও বহুমুখী মূর্তিপূজার চিত্র ফুটে ওঠে। এই মূর্তিপূজা কেবল কিছু জড় বস্তুর উপাসনা ছিল না, বরং এটি ছিল তৎকালীন আরবের গোত্রীয় সংহতি, মনস্তাত্ত্বিক নিরাপত্তাহীনতা এবং প্রাচীন ধর্মীয় অবশিষ্টাংশের এক সংমিশ্রণ। নৃতাত্ত্বিক (Anthropological) দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বোঝা যায়, আরবের এই মূর্তিপূজা বা 'জাহেলিয়াত' কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না, বরং এটি ছিল দীর্ঘকালীন বিবর্তন ও বিচ্যুতি।

ফিতরাত ও তাওহীদ থেকে বিচ্যুতি: একটি অস্তিত্বতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

ইসলামি তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিকদের মতে, মানুষের সহজাত প্রকৃতি বা 'ফিতরাত' ছিল একত্ববাদের (Tawhid) অনুসারী। কিন্তু প্রাক-ইসলামি যুগে এই সহজাত প্রকৃতি এক চরম অবক্ষয়ের সম্মুখীন হয়েছিল। ঐতিহাসিকদের বর্ণনা অনুযায়ী, নূহ (আ.)-এর পরবর্তী সময়ে মানুষের মধ্যে তাওহীদ থেকে বিচ্যুতি ঘটতে শুরু করে এবং ধীরে ধীরে মূর্তিপূজা একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। এই বিচ্যুতি কেবল ধর্মীয় ছিল না, বরং এটি ছিল মানুষের অস্তিত্বতাত্ত্বিক ও নৈতিক কাঠামোর একটি বড় ধরনের বিপর্যয়।

ঐতিহাসিক তথ্যানুসারে, প্রাক-ইসলামি আরবের মানুষের বিশ্বাস ও আচার-আচরণে যে ব্যাপক বিপর্যয় দেখা দিয়েছিল, তা ছিল অত্যন্ত গভীর। এই বিষয়ে বলা হয়েছে:

لا شك أن الفطرة قد بلغت مبلغًا كبيرًا من الفساد والانحراف قبل الإسلام، وضل الناس عن التوحيد ضلالًا بعيدًا، وسادت أمور الجاهلية ...
[1]

এই বিচ্যুতিটি কেবল আরবের অভ্যন্তরে সীমাবদ্ধ ছিল না। তৎকালীন বিশ্বব্যবস্থায় আরবের সাথে অন্যান্য অঞ্চলের ধর্মীয় মিথস্ক্রিয়া বিদ্যমান ছিল। যেমন, সাবা ও ব্যাবিলনের মতো অঞ্চলে সূর্য ও নক্ষত্র উপাসনা প্রচলিত ছিল, আবার পারস্যের নিকটবর্তী অঞ্চলে মজুসি বা অগ্নি উপাসনার প্রভাব লক্ষ্য করা যেত। এই বৈচিত্র্যময় ধর্মীয় প্রেক্ষাপট আরবের মূর্তিপূজাকে আরও জটিল ও বহুস্তরবিশিষ্ট করে তুলেছিল। প্রাক-ইসলামি আরবের এই আধ্যাত্মিক শূন্যতা ও বিভ্রান্তি মূলত মানুষের আদিম প্রবৃত্তি ও প্রাচীন ধর্মের অবশিষ্টাংশের এক অসংলগ্ন মিশ্রণ ছিল [2]

মূর্তিপূজার শ্রেণিবিন্যাস ও গোত্রীয় প্রতীকীবাদ

প্রাক-ইসলামি আরবের মূর্তিপূজাকে কেবল একটি একক ধারণা হিসেবে দেখা ভুল হবে। নৃতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, মূর্তিপূজা ছিল মূলত গোত্রীয় পরিচয়ের একটি শক্তিশালী প্রতীক। প্রতিটি প্রধান গোত্র তাদের নিজস্ব দেব-দেবী বা মূর্তির মাধ্যমে তাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক আধিপত্য জাহির করত। মূর্তিপূজা এখানে কেবল উপাসনার মাধ্যম ছিল না, বরং এটি ছিল গোত্রীয় সংহতি (Tribal Cohesion) রক্ষার একটি কৌশল।

উদাহরণস্বরূপ, বকর বিন ওয়ায়িল ও রবীআ গোত্রের একটি নির্দিষ্ট মূর্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যা তাদের গোত্রীয় পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। এই মূর্তিটি ছিল 'আল-মুহাররাক' (المحرق)। এর ঐতিহাসিক ও সামাজিক গুরুত্ব অত্যন্ত ব্যাপক ছিল:

المحرق وكان المحرق "محرق" صنمًا لبكر بن وائل وبقية ربيعة في موضع سلمان. وأما سدنته، فكانوا أولاد الأسود العجلي.
[3]

এই মূর্তির রক্ষণাবেক্ষণ বা সেবার জন্য নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠী বা 'সদনা' (Caretakers) নিযুক্ত ছিল, যা মূর্তিপূজাকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো প্রদান করেছিল। এর মাধ্যমে বোঝা যায় যে, মূর্তিপূজা কেবল ব্যক্তিগত বিশ্বাস ছিল না, বরং এটি ছিল একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। মূর্তির সেবা করার মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা বংশের সামাজিক মর্যাদা ও ক্ষমতা বৃদ্ধি পেত। এই ধরনের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ মূর্তিপূজাকে আরবের সামাজিক কাঠামোর একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করেছিল।

পৌরাণিক উপাখ্যান ও মূর্তিপূজার মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি: ইসাফ ও নাঈলার দৃষ্টান্ত

মূর্তিপূজার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মনস্তাত্ত্বিক দিক হলো পৌরাণিক কাহিনী বা মিথ (Myth) তৈরির মাধ্যমে দেবত্ব আরোপ করা। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, কোনো বিশেষ ঘটনা বা মানুষের কর্মকাণ্ডকে অতিপ্রাকৃত রূপ দিয়ে মূর্তিতে রূপান্তরিত করা হয়েছে। এর ফলে মানুষের মনে ভীতি ও শ্রদ্ধার এক মিশ্র অনুভূতি তৈরি হয়, যা মূর্তিপূজাকে দীর্ঘস্থায়ী করে।

এর অন্যতম প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো 'ইসাফ ও নাঈলা' (إساف ونائلة)-এর কাহিনী। ঐতিহাসিকদের বর্ণনা অনুযায়ী, এরা দুজন মানুষ ছিলেন যারা কাবার নিকটবর্তী কোনো স্থানে অত্যন্ত জঘন্য কাজ বা পাপ সংঘটিত করেছিলেন। সেই পাপের শাস্তি হিসেবে তাদের পাথর বা মূর্তিতে রূপান্তরিত করা হয়েছিল যাতে মানুষ তা দেখে শিক্ষা গ্রহণ করে। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে এই শিক্ষা গ্রহণের পরিবর্তে মানুষ তাদের মূর্তিকে উপাসনা করতে শুরু করে। এই ঘটনাটি মূর্তিপূজার একটি মনস্তাত্ত্বিক বিবর্তনকে নির্দেশ করে:

وللأخباريين قصص في إساف ونائلة، وهما في زعم بعضهم إنسانان عملا عملًا قبيحًا في الكعبة، فمسخا حجرين، ووضعا عند الكعبة ليتعظ الناس بهما. فلما طال مكثهما، وعبدت الأصنام، عبدا معها.
[4]

নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি 'Myth-making process'। একটি নৈতিক শিক্ষা প্রদানের উদ্দেশ্যে তৈরি করা প্রতীক কীভাবে সময়ের সাথে সাথে একটি উপাস্য বস্তুতে পরিণত হয়, তা এই ঘটনার মাধ্যমে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়। এটি প্রমাণ করে যে, প্রাক-ইসলামি আরবের মূর্তিপূজা কেবল অন্ধবিশ্বাস ছিল না, বরং এটি ছিল মানুষের অবচেতন মনের ভয়, অনুশোচনা এবং পৌরাণিক গল্পের এক জটিল সমন্বয়।

গোত্রীয় শ্রেষ্ঠত্ব ও মূর্তিপূজার রাজনৈতিক ডিকনস্ট্রাকশন

প্রাক-ইসলামি আরবের মূর্তিপূজা এবং গোত্রীয় বংশলতিকা (Genealogy) একে অপরের পরিপূরক ছিল। কাহতানি ও আদনানি গোত্রীয় দ্বন্দ্বের প্রেক্ষাপটে দেখা যায় যে, ধর্মীয় ও ভাষাগত শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করার জন্য মূর্তিপূজা ও বংশীয় ঐতিহ্যের অপব্যবহার করা হতো। মূর্তিপূজা এবং গোত্রীয় অহংকার (Asabiyyah) ছিল তৎকালীন আরবের রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি।

তৎকালীন আরবে কাহতানি ও আদনানি গোত্রগুলোর মধ্যে যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল, তা কেবল রাজনৈতিক ছিল না, বরং তা ধর্মীয় ও ভাষাগত শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের লড়াইয়েও রূপ নিয়েছিল। অনেক ক্ষেত্রে গোত্রীয় শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য কৃত্রিমভাবে ধর্মীয় ইতিহাস বা বংশলতিকা তৈরি করা হতো। আল-মুফাসাল গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই গোত্রীয় সংঘাতের কারণে অনেক ক্ষেত্রে বংশলতিকা ও ধর্মীয় ইতিহাসকে বিকৃত করা হয়েছিল:

وفي هذا الصراع القحطاني العدناني العنيف شرع في تدوين الأنساب وتثبيتها في القراطيس والكتب. فكان لهذا الصراع ولوضع القبائل وتكتلاتها في هذا الوقت أثر خطير في تثبيت أنساب القبائل وتسجيلها...
[5]

এই রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা মূর্তিপূজাকে আরও শক্তিশালী করেছিল। মূর্তিপূজা ছিল গোত্রীয় পরিচয়ের একটি বাহ্যিক বহিঃপ্রকাশ। যখন কোনো গোত্র তাদের বংশীয় শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করত, তখন তাদের মূর্তিপূজার রীতি ও দেব-দেবীও সেই শ্রেষ্ঠত্বের অংশ হিসেবে বিবেচিত হতো। এমনকি ভাষা ও বাচনভঙ্গির শ্রেষ্ঠত্ব নিয়েও যে বিতর্ক ছিল, তার মূলে ছিল এই গোত্রীয় আধিপত্য বিস্তারের আকাঙ্ক্ষা। কুরাইশদের ভাষাগত শ্রেষ্ঠত্ব বা তাদের মক্কার আধিপত্য কেবল ধর্মীয় কারণে ছিল না, বরং এটি ছিল তৎকালীন আরবের ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হওয়ার একটি কৌশল।

প্রাক-ইসলামি আরবের এই মূর্তিপূজার জটিল ও বহুমুখী স্তরবিন্যাস বিশ্লেষণ করলে প্রতীয়মান হয় যে, এটি কেবল একটি ধর্মীয় বিচ্যুতি ছিল না, বরং এটি ছিল তৎকালীন আরবের সামাজিক, রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক অস্থিরতার এক বহিঃপ্রকাশ। মূর্তিপূজা এখানে একদিকে যেমন গোত্রীয় সংহতির প্রতীক হিসেবে কাজ করত, অন্যদিকে এটি ছিল মানুষের আদিম ভয় ও পৌরাণিক বিশ্বাসের এক জটিল জাল। এই অন্ধকারাচ্ছন্ন ও বিভক্ত সমাজব্যবস্থাকে একীভূত করার জন্য এবং তাওহীদের আলো ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য ইসলামের আবির্ভাব ছিল এক ঐতিহাসিক ও বৈপ্লবিক মোড়।

""
১১.৫৬ ইবনে ইসহাকের গ্রন্থে উল্লেখিত প্রি-ইসলামিক আরবিয় মূর্তিপূজার (Idolatry) অ্যানথ্রোপলজিক্যাল ডিকনস্ট্রাকশন
আমাদের নবী সা. সীরাত বিশ্বকোষ
ha-mims.world
এ আর্টিকেলের কুইজ(5টি প্রশ্ন)

১১.৫৬ ইবনে ইসহাকের গ্রন্থে উল্লেখিত প্রি-ইসলামিক আরবিয় মূর্তিপূজার (Idolatry) অ্যানথ্রোপলজিক্যাল ডিকনস্ট্রাকশন কুইজ

1 / 5

মানুষের সহজাত প্রকৃতি বা 'ফিতরাত' প্রারম্ভে কোন মতবাদের অনুসারী ছিল?

এই আর্টিকেলটি কেমন লাগলো?

এই গবেষণাকে সহায়তা করুন

সীরাত বিশ্বকোষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আপনার সামান্য সহায়তা এই গবেষণাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

bKash / Nagad01XXXXXXXXXX(Send Money)
☕ Ko-fi দিয়ে সহায়তা

রেফারেন্স: "সীরাত বিশ্বকোষ" লিখুন

🌟 Ha-mim's World-এর একটি গবেষণা ও জ্ঞান-প্রযুক্তি প্রকল্প

কমিউনিটি রিফ্লেকশন

এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি কী শিখলেন বা আপনার অনুভূতি কী, তা সবার সাথে শেয়ার করুন।

আপনার রিফ্লেকশন শেয়ার করতে দয়া করে লগইন করুন।

লোড হচ্ছে...