খণ্ড 75
ফন্ট:100%
থিম:

১৩.১ জোসেফ শ্যাখট (Joseph Schacht) এবং এন.জে. কুলসন (N.J. Coulson)-এর 'লিগ্যাল ইভোলিউশন' (Legal Evolution) থিওরির অ্যাকাডেমিক সমালোচনা

ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে পাশ্চাত্য আইনতত্ত্ব ও ইতিহাসচর্চায় একটি প্রভাবশালী ধারা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে 'লিগ্যাল ইভোলিউশন' বা আইনি বিবর্তনবাদ। জোসেফ শ্যাখট (Joseph Schacht) এবং এন.জে. কুলসন (N.J. Coulson)-এর মতো প্রখ্যাত প্রাচ্যবিদ ও আইনতাত্ত্বিকগণ এই তত্ত্বের অন্যতম প্রধান প্রবক্তা। তাঁদের মূল প্রতিপাদ্য ছিল এই যে, আইন কোনো স্থির বা ঐশ্বরিক সত্তা নয়, বরং এটি একটি গতিশীল সামাজিক প্রক্রিয়া যা সময়ের বিবর্তনে এবং সামাজিক পরিবর্তনের সাথে সাথে পরিবর্তিত ও বিকশিত হয়। তাঁদের মতে, ইসলামি আইন বা শরীয়াহ কোনো আকাশ থেকে অবতীর্ণ অলৌকিক বিধান নয়, বরং এটি তৎকালীন আরবের সামাজিক, রাজনৈতিক ও প্রথাগত রীতির একটি বিবর্তিত রূপ মাত্র। তবে এই তত্ত্বটি যখন ইসলামের মৌলিকতা ও ঐশ্বরিক উৎসের মুখোমুখি হয়, তখন এটি গভীর তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক সংকটের সম্মুখীন হয়।

শ্যাখট ও কুলসনের এই বিবর্তনবাদী দৃষ্টিভঙ্গি মূলত পশ্চিমা সমাজতাত্ত্বিক ও বস্তুবাদী দর্শনের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত। তাঁরা আইনকে একটি 'সামাজিক পণ্য' (Social Product) হিসেবে বিবেচনা করেছেন। তাঁদের তত্ত্বে আইনের বিবর্তনকে একটি রৈখিক ও ক্রমোন্নতিমূলক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখানো হয়েছে, যেখানে আদিম গোত্রীয় প্রথা থেকে শুরু করে একটি সুসংগঠিত রাষ্ট্রীয় আইন ব্যবস্থার দিকে যাত্রা সম্পন্ন হয়। কিন্তু এই তাত্ত্বিক কাঠামোটি যখন ইসলামি আইনের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়, তখন এটি ইসলামের 'তাওহীদ' বা একত্ববাদের মূল ভিত্তি এবং 'তাশরী' বা বিধান প্রণয়নের ঐশ্বরিক কর্তৃত্বকে অস্বীকার করার একটি হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে।

লিগ্যাল ইভোলিউশন বা আইনি বিবর্তনবাদের তাত্ত্বিক কাঠামো ও পশ্চিমা প্রেক্ষিত

পাশ্চাত্য আইনতাত্ত্বিকদের মতে, আইন মূলত সামাজিক পরিস্থিতির ফসল এবং সামাজিক পরিবর্তনের সাথে সাথে এটি একটি পরিবর্তনশীল উপাদান হিসেবে কাজ করে। পশ্চিমা চিন্তাধারার একটি মৌলিক স্বতঃসিদ্ধ হলো এই যে, আইন হলো সামাজিক বিবর্তনের একটি বহিঃপ্রকাশ যা জনমতের প্রতিফলন ঘটায়। [1] । এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, আইন কোনো পূর্বনির্ধারিত কাঠামো নয়, বরং এটি সমাজের প্রয়োজন ও বিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে নিজেকে পুনর্গঠিত করে।

ইউরোপীয় রাজনৈতিক ও আইনি বিবর্তনের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেখানে আইন ও রাষ্ট্রব্যবস্থার বিকাশ একটি অত্যন্ত জটিল ও ব্যতিক্রমী প্রক্রিয়া ছিল। ইউরোপীয় সমাজসমূহ গোত্রীয় স্তর থেকে বেরিয়ে এসে একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক কাঠামোর দিকে অগ্রসর হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো উচ্চতর রাজনৈতিক কর্তৃত্বের সরাসরি সাহায্য ছাড়াই বিবর্তিত হতে সক্ষম হয়েছিল। [2] । এই বিবর্তন প্রক্রিয়ায় গির্জা এবং সম্রাটদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব, এবং সামাজিক শ্রেণির উত্থান-পতন আইনের বিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। [3]

শ্যাখট ও কুলসন তাঁদের তত্ত্বে এই ইউরোপীয় মডেলটিকে একটি সার্বজনীন মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করার চেষ্টা করেছেন। তাঁরা মনে করেন, যে কোনো আইনি ব্যবস্থা—তা ইসলামি হোক বা অন্য কোনো—অবশ্যই সামাজিক ও রাজনৈতিক বিবর্তনের ধারায় একটি নির্দিষ্ট পর্যায় থেকে অন্য পর্যায়ে স্থানান্তরিত হয়। তাঁদের মতে, ইসলামি আইনও আরবের প্রাক-ইসলামি প্রথা (Urfs) এবং তৎকালীন ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির একটি বিবর্তিত রূপ। কিন্তু এই বিশ্লেষণটি অত্যন্ত সংকীর্ণ, কারণ এটি আইনের 'ঐশ্বরিক উৎস' (Divine Source) এবং 'সামাজিক বিবর্তন' (Social Evolution)-এর মধ্যকার মৌলিক পার্থক্যটি অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছে।

বিবর্তনবাদের ভ্রান্ত ধারণা ও ঐতিহাসিক অসংগতি

শ্যাখট ও কুলসনের বিবর্তনবাদী তত্ত্বের একটি প্রধান দুর্বলতা হলো এর রৈখিক ও প্রগতিশীল (Linear and Progressive) ধারণা। তাঁরা ধরে নিয়েছেন যে, বিবর্তন সবসময় একটি ঊর্ধ্বমুখী বা উন্নতির দিকে পরিচালিত হয়। কিন্তু ঐতিহাসিক ও বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা এই ধারণার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। বিবর্তন সবসময় ঊর্ধ্বমুখী বা ইতিবাচক হয় না; বরং এটি অনেক সময় অবনতিমূলক বা পশ্চাৎপদমুখীও হতে পারে। [4] । অর্থাৎ, একটি উন্নত আইনি ব্যবস্থা থেকে সমাজ পুনরায় আদিম বা বিশৃঙ্খল অবস্থায় ফিরে যেতে পারে।

বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আইনকে কেবল সামাজিক পরিবর্তনের ফল হিসেবে দেখা একটি বড় তাত্ত্বিক বিচ্যুতি। শ্যাখট ও কুলসন যখন ইসলামি আইনকে সামাজিক বিবর্তনের একটি ধাপ হিসেবে বর্ণনা করেন, তখন তাঁরা মূলত একটি 'বস্তুবাদী বিবর্তনবাদ' (Materialist Evolutionism) প্রয়োগ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু ইসলামের ক্ষেত্রে আইন কেবল সামাজিক পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়া নয়, বরং এটি সামাজিক পরিবর্তন ঘটানোর একটি চালিকাশক্তি (Driving Force)। ইসলামি আইন সমাজকে একটি নির্দিষ্ট নৈতিক ও আধ্যাত্মিক কাঠামোর দিকে পরিচালিত করে, যা সামাজিক বিবর্তনের ওপর নির্ভর করে না, বরং বিবর্তনকে নিয়ন্ত্রণ করে।

তাত্ত্বিকভাবে, বিবর্তনবাদীরা দাবি করেন যে আইন সামাজিক রীতির বিবর্তিত রূপ। কিন্তু তাঁরা এই বিষয়টি এড়িয়ে যান যে, অনেক ক্ষেত্রে আইন সামাজিক রীতির পরিবর্তন ঘটায়, রীতির অনুগামী হয় না। ইসলামি শরীয়াহর ক্ষেত্রে এই বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট। শরীয়াহর বিধানসমূহ অনেক ক্ষেত্রে তৎকালীন আরবের প্রচলিত প্রথা বা সামাজিক রীতির সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল এবং তা সমাজকে একটি নতুন ও উন্নততর কাঠামোতে রূপান্তর করেছিল। [5] । সুতরাং, আইনকে কেবল সামাজিক বিবর্তনের 'ফলাফল' হিসেবে দেখা ঐতিহাসিক ও তাত্ত্বিক উভয় দিক থেকেই একটি ভুল সিদ্ধান্ত।

প্রাকৃতিক আইন (Natural Law) বনাম ঐশ্বরিক বিধান (Divine Legislation)

শ্যাখট ও কুলসনের বিবর্তনবাদী চিন্তাধারার মূলে রয়েছে পশ্চিমা 'প্রাকৃতিক আইন' (Natural Law) এবং 'সামাজিক চুক্তি' (Social Contract) সংক্রান্ত ধারণা। পশ্চিমা দর্শনে 'প্রাকৃতিক আইন' বলতে এমন এক ন্যায়বিচারকে বোঝানো হয় যা মানুষের বিবেক ও যুক্তির ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত এবং যা জাতি, বর্ণ বা ধর্মের ঊর্ধ্বে। এই ধারণাটি মূলত মানুষের অধিকার এবং সামাজিক সমতার ওপর গুরুত্বারোপ করে। [6] । তবে এই প্রাকৃতিক আইনের ধারণাটি প্রায়শই ব্যক্তিগত মালিকানা বৃদ্ধি, যুদ্ধ এবং সামাজিক শ্রেণির স্বার্থ রক্ষার প্রেক্ষাপটে বিবর্তিত হয়েছে।

প্রাকৃতিক আইনের এই বিবর্তন প্রক্রিয়াটি মূলত মানুষের তৈরি একটি ধারণা, যা সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য উদ্ভাবিত হয়েছে। পশ্চিমা তাত্ত্বিকদের মতে, মানুষ একটি 'প্রাকৃতিক অবস্থা' (State of Nature) থেকে বেরিয়ে এসে সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে আইন ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে। [7] । কিন্তু ইসলামি আইনের প্রেক্ষাপটে এই ধারণাটি সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক। ইসলামি আইন কোনো সামাজিক চুক্তি বা মানুষের যুক্তিনির্ভর বিবর্তিত ধারণা নয়, বরং এটি 'তাশরী' বা মহান স্রষ্টার পক্ষ থেকে নির্ধারিত বিধান।

এখানেই শ্যাখট ও কুলসনের তাত্ত্বিক বিচ্যুতিটি প্রকট হয়ে ওঠে। তাঁরা ইসলামি আইনকে একটি 'বিবর্তিত সামাজিক আইন' হিসেবে দেখার মাধ্যমে এর ঐশ্বরিক ও অকাট্য (Infallible) বৈশিষ্ট্যটিকে অস্বীকার করার চেষ্টা করেন। যেখানে প্রাকৃতিক আইন মানুষের পরিবর্তনশীল বিবেক ও সামাজিক প্রয়োজনের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে ইসলামি আইন হলো চিরন্তন ও অপরিবর্তনীয় ঐশ্বরিক বিধান, যা মানুষের সামাজিক বিবর্তনকে অনুসরণ করে না, বরং মানুষের জীবনযাত্রাকে ঐশ্বরিক নির্দেশনার আলোকে বিন্যস্ত করে।

তাত্ত্বিক ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিবর্তনবাদের সীমাবদ্ধতা

শ্যাখট ও কুলসনের বিবর্তনবাদ মূলত ইউরোপীয় ইতিহাসের একটি বিশেষ প্রেক্ষাপটকে বিশ্বজনীন সত্য হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা। ইউরোপীয় রাজনৈতিক বিবর্তন ছিল অত্যন্ত স্বতন্ত্র এবং এটি অনেক ক্ষেত্রে গোত্রীয় ব্যবস্থা থেকে সরাসরি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর দিকে অগ্রসর হয়েছিল, যেখানে রাজনৈতিক কর্তৃত্বের শীর্ষবিন্দু থেকে আইন প্রণয়ন করা হতো না। [8] । এই বিশেষ ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতাকে যখন ইসলামি বা প্রাচ্যের আইনি ব্যবস্থার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন তা একটি বুদ্ধিবৃত্তিক সাম্রাজ্যবাদ হিসেবে প্রতীয়মান হয়।

বিবর্তনবাদী তাত্ত্বিকরা প্রায়শই Plato-র বর্ণিত রাজনৈতিক চক্রের (Monarchy $\rightarrow$ Aristocracy $\rightarrow$ Democracy $\rightarrow$ Dictatorship) মতো পরিবর্তনশীল মডেলের মাধ্যমে আইন ও শাসনের বিবর্তন ব্যাখ্যা করতে চান। [9] । কিন্তু এই চক্রাকার বা রৈখিক বিবর্তনবাদটি একটি অত্যন্ত বস্তুনিষ্ঠ ও জাগতিক দৃষ্টিভঙ্গি। এটি আইনের সেই আধ্যাত্মিক ও নৈতিক দিকটি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে, যা ইসলামি আইনের প্রাণকেন্দ্র। ইসলামি আইন কেবল রাজনৈতিক বা সামাজিক স্থিতিশীলতার হাতিয়ার নয়, বরং এটি মানুষের পরকালীন মুক্তির পথপ্রদর্শক।

পরিশেষে, জোসেফ শ্যাখট এবং এন.জে. কুলসনের 'লিগ্যাল ইভোলিউশন' তত্ত্বটি মূলত একটি পশ্চিমা কেন্দ্রিক ও বস্তুবাদী কাঠামো, যা ইসলামের মৌলিক ও ঐশ্বরিক স্বরূপকে অনুধাবন করতে ব্যর্থ। তাঁদের তত্ত্বটি আইনের বিবর্তনকে কেবল সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের একটি উপজাত (By-product) হিসেবে দেখে, যেখানে ইসলামি আইন হলো পরিবর্তনের মূল কারিগর। ইতিহাসের পাতায় বিবর্তনবাদীরা যে রৈখিক অগ্রগতির কথা বলেন, তা অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের দিকেও ধাবিত হতে পারে, যা তাঁদের তত্ত্বের অসারতাকে আরও প্রকট করে তোলে। [10] । সুতরাং, ইসলামি আইনের প্রকৃত স্বরূপ অনুধাবন করতে হলে বিবর্তনবাদী এই সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির ঊর্ধ্বে উঠে এর ঐশ্বরিক ও তাত্ত্বিক ভিত্তি বিশ্লেষণ করা অপরিহার্য।

""
১৩.১ জোসেফ শ্যাখট (Joseph Schacht) এবং এন.জে. কুলসন (N.J. Coulson)-এর 'লিগ্যাল ইভোলিউশন' (Legal Evolution) থিওরির অ্যাকাডেমিক সমালোচনা
আমাদের নবী সা. সীরাত বিশ্বকোষ
ha-mims.world
এ আর্টিকেলের কুইজ(5টি প্রশ্ন)

১৩.১ জোসেফ শ্যাখট এবং এন.জে. কুলসনের 'লিগ্যাল ইভোলিউশন' থিওরির অ্যাকাডেমিক সমালোচনা কুইজ

1 / 5

জোসেফ শ্যাখট এবং কুলসনের তত্ত্বের মূল প্রতিপাদ্য কী?

এই আর্টিকেলটি কেমন লাগলো?

এই গবেষণাকে সহায়তা করুন

সীরাত বিশ্বকোষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আপনার সামান্য সহায়তা এই গবেষণাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

bKash / Nagad01XXXXXXXXXX(Send Money)
☕ Ko-fi দিয়ে সহায়তা

রেফারেন্স: "সীরাত বিশ্বকোষ" লিখুন

🌟 Ha-mim's World-এর একটি গবেষণা ও জ্ঞান-প্রযুক্তি প্রকল্প

কমিউনিটি রিফ্লেকশন

এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি কী শিখলেন বা আপনার অনুভূতি কী, তা সবার সাথে শেয়ার করুন।

আপনার রিফ্লেকশন শেয়ার করতে দয়া করে লগইন করুন।

লোড হচ্ছে...