৬.২.২ গোত্রীয় প্রধানদের সাথে আলোচনার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি ও সতর্কতা
আরবের গোত্রীয় শাসনকাঠামো ও 'আল-মালা' (Al-Mala') পরিষদের রাজনৈতিক প্রভাব
প্রাক-ইসলামি আরবের সমাজব্যবস্থা ছিল সম্পূর্ণভাবে গোত্রীয় আনুগত্য এবং বংশীয় আভিজাত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। সেখানে কোনো কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থা বা প্রাতিষ্ঠানিক রাষ্ট্রকাঠামো ছিল না। প্রতিটি গোত্র তাদের নিজস্ব সার্বভৌমত্ব বজায় রাখত এবং তাদের নীতি-নির্ধারণী সিদ্ধান্তগুলো গৃহীত হতো গোত্রীয় প্রধানদের সমন্বয়ে গঠিত 'আল-মালা' (الملأ) বা 'আল-মজলিস' (المجلس) নামক পরিষদের মাধ্যমে। [1] এই পরিষদগুলোতে গোত্রের প্রবীণ, প্রভাবশালী এবং যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী ব্যক্তিরা একত্রিত হয়ে যুদ্ধ, সন্ধি, বাণিজ্য এবং সামাজিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। দক্ষিণ আরবের মাইনীয় (Minaean) সভ্যতায় শাসনকার্যের সুবিধার্থে 'মিযওয়াদ' (مزود) নামক বিশেষ সভার অস্তিত্ব থাকলেও হিজাজ তথা উত্তর আরবের গোত্রীয় রাজনীতিতে 'আল-মালা' বা 'দারুন নদওয়া'র মতো মজলিসই ছিল মূল চালিকাশক্তি। [2] রাসুলুল্লাহ সা. যখন ইসলাম প্রচার শুরু করেন এবং পরবর্তীতে মদিনায় একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন, তখন তাকে এই গোত্রীয় প্রধানদের সাথে অত্যন্ত জটিল ও সংবেদনশীল রাজনৈতিক আলোচনায় লিপ্ত হতে হয়েছিল। তৎকালীন আরবের ভূ-রাজনীতিতে (Geopolitics) কোনো একক গোত্রের সাথে চুক্তি বা আলোচনা কেবল একটি দ্বিপাক্ষিক বিষয় ছিল না, বরং তা সমগ্র উপদ্বীপের ক্ষমতার ভারসাম্যকে প্রভাবিত করত। এই প্রেক্ষাপটে, রাসুলুল্লাহ সা. গোত্রীয় প্রধানদের সাথে আলোচনার ক্ষেত্রে এক অনন্য কড়াকড়ি ও চরম সতর্কতা অবলম্বন করেছিলেন, যা আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় 'কৌশলগত কূটনীতি' (Strategic Diplomacy) এবং 'আদর্শিক আপসহীনতা' (Ideological Uncompromisingness) হিসেবে অভিহিত করা যায়। [3] তৎকালীন আরবের গোত্রীয় প্রধানরা প্রায়শই নিজেদের সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তির দম্ভে অন্ধ থাকত। তারা যেকোনো চুক্তিতে নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য ও বৈষয়িক স্বার্থ নিশ্চিত করতে চাইত। রাসুলুল্লাহ সা. তাদের এই মনস্তত্ত্বকে গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। তিনি জানতেন যে, আদর্শিক ভিত্তি ছাড়া কেবল রাজনৈতিক স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা চুক্তি দীর্ঘস্থায়ী হয় না। তাই তিনি গোত্রীয় প্রধানদের সাথে আলোচনার টেবিলে বসার সময় একদিকে যেমন চরম ধৈর্য ও কূটনৈতিক শিষ্টাচার প্রদর্শন করতেন, অন্যদিকে ইসলামের মৌলিক আদর্শ ও রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে বিন্দুমাত্র ছাড় দিতেন না। [4] বনু আমির ইবনে সা'সা'আহ-এর সাথে আলোচনা: শর্তযুক্ত আনুগত্যের প্রত্যাখ্যান
রাসুলুল্লাহ সা.-এর এই আদর্শিক কড়াকড়ির অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত হলো মক্কী যুগে বনু আমির ইবনে সা'সা'আহ (بنو عامر بن صعصعة) গোত্রের সাথে তাঁর আলোচনা। নবুয়তের দশম বর্ষে যখন রাসুলুল্লাহ সা. বিভিন্ন আরোহী গোত্রের নিকট ইসলামের দাওয়াত পেশ করছিলেন এবং মক্কার বাইরে একটি নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধান করছিলেন, তখন তিনি বনু আমির ইবনে সা'সা'আহ গোত্রের মুখোমুখি হন। গোত্রের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা বায়হারাহ ইবনে ফরাস (بيحرة بن فراس) রাসুলুল্লাহ সা.-এর নবুয়তের দাবি এবং তাঁর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা দেখে অত্যন্ত প্রভাবিত হয়। সে বুঝতে পেরেছিল যে, এই ব্যক্তির নেতৃত্ব সমগ্র আরব উপদ্বীপে এক অভূতপূর্ব বিপ্লব ঘটাতে সক্ষম। [5] তবে বায়হারাহ এই সুযোগটিকে একটি রাজনৈতিক দরকষাকষি বা 'রিয়েলপলিটিক' (Realpolitik) হিসেবে গ্রহণ করতে চেয়েছিল। সে রাসুলুল্লাহ সা.-এর সামনে একটি শর্ত আরোপ করে বলে: "আমরা যদি আপনার হাতে বায়'আত গ্রহণ করি এবং আল্লাহ আপনাকে আপনার বিরোধীদের ওপর বিজয়ী করেন, তবে আপনার পরে কি রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব আমাদের হাতে থাকবে?" রাসুলুল্লাহ সা. এই চরম সংকটের মুহূর্তেও, যখন তাঁর একটি শক্তিশালী সামরিক মিত্রের অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল, কোনো প্রকার রাজনৈতিক সুবিধাবাদের আশ্রয় নেননি। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে এবং দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে উত্তর দিলেন:
অর্থাৎ, "নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের বিষয়টি সম্পূর্ণ আল্লাহর এখতিয়ারে; তিনি যাকে ইচ্ছা তা দান করবেন।" [6] রাসুলুল্লাহ সা.-এর এই উত্তর ছিল তাঁর আদর্শিক কড়াকড়ির এক অনুপম নিদর্শন। তিনি ক্ষমতার লোভ দেখিয়ে বা কোনো প্রকার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে বনু আমির গোত্রের সমর্থন আদায় করতে পারতেন, কিন্তু তিনি তা করেননি। কারণ ইসলামের political philosophy বা রাজনৈতিক দর্শন কোনো বংশীয় বা গোত্রীয় উত্তরাধিকারের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়, বরং তা সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব (Divine Sovereignty) এবং যোগ্যতার ওপর নির্ভরশীল। [7] রাসুলুল্লাহ সা.-এর এই আপসহীন মনোভাবের কারণে বায়হারাহ ইবনে ফরাস ক্ষুব্ধ হয়ে চুক্তি প্রত্যাখ্যান করে এবং বলে যে, তারা নিজেদের বুক পেতে আরবের তীরের মুখোমুখি হবে অথচ বিজয়ের পর নেতৃত্ব চলে যাবে অন্য কারও হাতে—এমন চুক্তি তারা করতে পারে না। [8] এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, রাসুলুল্লাহ সা. গোত্রীয় প্রধানদের সাথে আলোচনায় কতটা সতর্ক ছিলেন। তিনি সাময়িক সামরিক সুবিধার জন্য ইসলামের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মূলনীতিকে বিকিয়ে দিতে প্রস্তুত ছিলেন না। এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি পরবর্তীকালের ইসলামি চিন্তাবিদদের জন্য একটি চিরন্তন শিক্ষা যে, আদর্শিক বিশুদ্ধতা রক্ষা করা সাময়িক রাজনৈতিক বা সামরিক বিজয়ের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। [9] হওয়াজিন প্রতিনিধিদলের সাথে আলোচনা ও মনস্তাত্ত্বিক কূটনীতি
মক্কা বিজয়ের পর সংঘটিত হুনাইনের যুদ্ধে (Battle of Hunayn) মুসলিম বাহিনী বিপুল পরিমাণ যুদ্ধলব্ধ সম্পদ (গনীমত) এবং যুদ্ধবন্দী লাভ করে। যুদ্ধের পর যখন হওয়াজিন (هوازن) গোত্রের একটি প্রতিনিধিদল ইসলাম গ্রহণ করে রাসুলুল্লাহ সা.-এর দরবারে উপস্থিত হয়, তখন তারা তাদের পূর্বের সমস্ত সম্পদ এবং বন্দী নারীদের ফেরত দেওয়ার জন্য বিনীত অনুরোধ জানায়। এই প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন যুহাইর ইবনে সুরদ (زهير بن صرد)। রাসুলুল্লাহ সা. তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া সত্ত্বেও সরাসরি কোনো একতরফা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেননি, কারণ এই যুদ্ধলব্ধ সম্পদের ওপর সাধারণ মুজাহিদদের আইনি অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। [10] রাসুলুল্লাহ সা. হওয়াজিন প্রতিনিধিদলের সাথে আলোচনায় অত্যন্ত সতর্ক ও মনস্তাত্ত্বিক কূটনৈতিক কৌশল অবলম্বন করেন। তিনি তাদের বলেন:
অর্থাৎ, "তোমরা আমার সাথে যাদের দেখছ (অর্থাৎ মুসলিম সৈন্যদল), তাদের বিষয়টি বিবেচনা করো। আর আমার নিকট সবচেয়ে প্রিয় কথা হলো সত্য কথা। অতএব, তোমরা দুটি বিষয়ের যেকোনো একটি বেছে নাও: হয় তোমাদের বন্দী নারীদের ফেরত নাও, অথবা তোমাদের ধন-সম্পদ ফেরত নাও।" [11] [12] রাসুলুল্লাহ সা.-এর এই প্রস্তাব ছিল অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ। তিনি একদিকে যেমন হওয়াজিন গোত্রের সম্মান ও আত্মমর্যাদা রক্ষা করতে চেয়েছিলেন, অন্যদিকে মুসলিম সেনাবাহিনীর সাধারণ সদস্যদের অধিকার ও তাদের ত্যাগের মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন।
হওয়াজিন প্রতিনিধিদল যখন তাদের নারীদের (পরিবার) ফেরত নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, তখন রাসুলুল্লাহ সা. সরাসরি নিজের পক্ষ থেকে তাদের মুক্তি দেননি। বরং তিনি জোহরের নামাযের পর সাধারণ মুসলিমদের সামনে এই বিষয়টি উত্থাপন করেন এবং তাদের সম্মতি আদায় করেন। [13] এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, রাসুলুল্লাহ সা. গোত্রীয় প্রধানদের সাথে আলোচনায় কেবল নিজের একক কর্তৃত্ব প্রয়োগ করতেন না, বরং তিনি 'সম্মতিভিত্তিক শাসন' (Governance by Consensus) এবং 'যৌথ নিরাপত্তা' (Collective Security)-এর নীতি অনুসরণ করতেন। তিনি কোনো গোত্রীয় প্রধানকে এমন কোনো প্রতিশ্রুতি দিতেন না যা রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে বিশৃঙ্খলা বা সাধারণ নাগরিকদের অধিকার হরণের কারণ হতে পারে। এই সতর্ক কূটনৈতিক প্রক্রিয়া হওয়াজিন গোত্রকে কেবল সন্তুষ্টই করেনি, বরং ইসলামের প্রতি তাদের আনুগত্যকে চিরতরে সুদৃঢ় করেছিল। [14] গোত্রীয় জোট গঠন ও কৌশলগত চুক্তিসমূহ: বনু দামরাহ ও বনু মুদলিযের দৃষ্টান্ত
মদিনায় ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর রাসুলুল্লাহ সা. পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন পৌত্তলিক ও ইহুদী গোত্রের সাথে একাধিক অনাগ্রাসন ও পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি (Non-Aggression and Mutual Defense Pacts) স্বাক্ষর করেন। এর মধ্যে বনু দামরাহ (بنو ضمرة) এবং বনু মুদলিয (بنو مدلج) গোত্রের সাথে সম্পাদিত চুক্তিগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই চুক্তিগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল মক্কার কুরাইশদের ভূ-রাজনৈতিকভাবে অবরুদ্ধ করা এবং মদিনার নিরাপত্তা বলয়কে সুদৃঢ় করা। [15] তবে এই চুক্তিগুলো সম্পাদনের সময় রাসুলুল্লাহ সা. অত্যন্ত কঠোর শর্তাবলী আরোপ করতেন, যাতে কোনো গোত্রই মুসলিমদের বিরুদ্ধে কোনো ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হতে না পারে।
রাসুলুল্লাহ সা.-এর এই সতর্ক নীতির সাথে যদি আমরা পরবর্তীকালের বিভিন্ন ঐতিহাসিক জোটের তুলনা করি, তবে তাঁর দূরদর্শিতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। উদাহরণস্বরূপ, ত্রয়োদশ শতাব্দীতে মঙ্গোল (তাতার) সাম্রাজ্যের উত্থানের সময় আর্মেনিয়ার রাজা হেথুম (Hethum) মঙ্গোল খাকান মংকো খানের সাথে একটি জোটে আবদ্ধ হয়েছিলেন। কিন্তু সেই জোটটি ছিল সম্পূর্ণ দাসত্ব ও অধীনতামূলক (Vassalage), যেখানে আর্মেনিয়া তার নিজস্ব sovereignty বা সার্বভৌমত্ব হারিয়েছিল। [16] মংকো খান আর্মেনিয়ার রাজাকে বাহ্যিক সম্মান প্রদর্শন করলেও চুক্তির সমস্ত শর্ত ছিল মঙ্গোলদের অনুকূলে। বিপরীতে, রাসুলুল্লাহ সা. যখন কোনো দুর্বল বা শক্তিশালী গোত্রের সাথে চুক্তি করতেন, তখন তিনি কখনোই তাদের দাসত্ব চাপিয়ে দিতেন না, আবার নিজের সার্বভৌমত্বকেও ক্ষুণ্ন হতে দিতেন না।
বনু দামরাহ গোত্রের সাথে সম্পাদিত চুক্তিতে স্পষ্ট উল্লেখ ছিল যে, তারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে কোনো শত্রুকে সাহায্য করবে না এবং মুসলিমরাও তাদের যেকোনো বিপদে সাহায্য করবে। [17] রাসুলুল্লাহ সা. এই চুক্তিগুলোর প্রতিটি ধারা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন। তিনি কোনো গোত্রীয় প্রধানের মৌখিক আশ্বাসে সন্তুষ্ট হতেন না, বরং লিখিত দলিলের মাধ্যমে তাদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতেন। এই কড়াকড়ি ও সতর্কতার কারণেই মদিনার প্রাথমিক দিনগুলোতে কুরাইশরা শত চেষ্টা করেও মদিনার চারপাশের গোত্রগুলোকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছিল। এটি ছিল রাসুলুল্লাহ সা.-এর এক অসামান্য ভূ-রাজনৈতিক বিজয়। [18] বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র মোকাবেলা: দুমাতুল জান্দাল ও তাবুক অভিযানের ভূ-রাজনীতি
ইসলামি রাষ্ট্রের সীমানা যখন উত্তর দিকে প্রসারিত হতে শুরু করে, তখন রোমান (বাইজান্টাইন) সাম্রাজ্য এবং তাদের মিত্র আরব গোত্রগুলো মদিনার জন্য এক বিরাট হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়। বিশেষ করে দুমাতুল জান্দাল (Dumat al-Jandal) এবং তাবুক (Tabuk) অঞ্চলের গোত্রগুলো রোমানদের উস্কানিতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে সামরিক জোট গঠনের চেষ্টা করছিল। রাসুলুল্লাহ সা. এই বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র মোকাবেলায় অত্যন্ত কঠোর ও সতর্ক কূটনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করেন। তিনি কেবল সামরিক অভিযানই পরিচালনা করেননি, বরং সেই অঞ্চলের গোত্রীয় প্রধানদের সাথে অত্যন্ত কঠোর শর্তে চুক্তি স্বাক্ষর করেন। [19] ঐতিহাসিকভাবে দেখা গেছে যে, সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো সর্বদা স্থানীয় গোত্রীয় ব্যবস্থাকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে। আধুনিক যুগেও যেমন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকরা আফগানিস্তানে গোত্রীয় প্রধানদের অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে শক্তিশালী করেছিল যাতে তারা কেন্দ্রীয় ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। [20] রোমান সাম্রাজ্যও উত্তর আরবের গোত্রগুলোকে একইভাবে ব্যবহার করার চেষ্টা করছিল। রাসুলুল্লাহ সা. এই সাম্রাজ্যবাদী কূটকৌশলকে নস্যাৎ করার জন্য দুমাতুল জান্দালের শাসক আকাইদির ইবনে আব্দুল মালিক (أكيدر بن عبد الملك)-এর সাথে অত্যন্ত কঠোর চুক্তি করেন। তিনি তাকে বন্দী করার পর তার জীবন রক্ষা করেন এই শর্তে যে, সে মদিনার কেন্দ্রীয় কর্তৃত্বের অধীনে কর (জিযয়া) প্রদান করবে এবং কোনো বিদেশী শক্তির সাথে হাত মেলাবে না। [21] তাবুক অভিযানের সময় রাসুলুল্লাহ সা. আইলাহ (Ailah)-এর শাসক ইউহান্না ইবনে রুবাহ (يحنة بن رؤبة) এবং জর্বা ও আযরুহ-এর অধিবাসীদের সাথেও অনুরূপ চুক্তি করেন। এই চুক্তিগুলোতে স্পষ্ট করা হয়েছিল যে, মদিনার সার্বভৌমত্ব অমান্য করার যেকোনো প্রচেষ্টাকে কঠোরভাবে দমন করা হবে। রাসুলুল্লাহ সা.-এর এই কঠোর অবস্থান উত্তর আরবের গোত্রীয় প্রধানদের মনে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ভীতির সঞ্চার করেছিল, যার ফলে তারা রোমানদের প্ররোচনায় পা দেওয়া থেকে বিরত থাকে। এই সতর্ক ভূ-রাজনৈতিক পদক্ষেপের মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ সা. মদিনার উত্তর সীমান্তকে সম্পূর্ণ নিরাপদ করতে সক্ষম হন। [22] গোত্রীয় কূটনীতিতে আপসহীন আদর্শিক অবস্থান: একটি ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক পর্যালোচনা
রাসুলুল্লাহ সা.-এর গোত্রীয় কূটনীতির সামগ্রিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, তাঁর কড়াকড়ি ও সতর্কতা কেবল কোনো সাময়িক সামরিক কৌশল ছিল না, বরং তা ছিল একটি সুদূরপ্রসারী আদর্শিক দর্শনের অংশ। তিনি আরবের প্রচলিত গোত্রীয় আভিজাত্য ও বংশীয় অহংকারকে চূর্ণ করে একটি সমতাভিত্তিক ও আইনানুগ সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। গোত্রীয় প্রধানরা যখনই তাদের পূর্বতন জাহেলী সুযোগ-সুবিধা বা বিশেষ অধিকার দাবি করত, রাসুলুল্লাহ সা. তখনই তা কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করতেন। [23] তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে, ইসলামি রাষ্ট্রে আইনের দৃষ্টিতে সকলেই সমান এবং কোনো গোত্রীয় প্রধান বা নেতার জন্য বিশেষ কোনো আইনি ছাড় নেই। এই নীতিটি তৎকালীন আরবের সামাজিক প্রেক্ষাপটে ছিল অত্যন্ত বিপ্লবী। কারণ আরবের প্রাক-ইসলামি যুগে গোত্রীয় প্রধানরা আইনের ঊর্ধ্বে অবস্থান করত এবং তাদের যেকোনো অপরাধের জন্য গোত্রীয় শক্তি তাদের রক্ষা করত। রাসুলুল্লাহ সা. এই কুপ্রথাকে চিরতরে বিলুপ্ত করেন এবং চুক্তি সম্পাদনের ক্ষেত্রে প্রতিটি গোত্রকে তাদের কৃতকর্মের জন্য ব্যক্তিগত ও যৌথভাবে দায়ী করার নিয়ম চালু করেন। [24] ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, রাসুলুল্লাহ সা.-এর এই কূটনৈতিক কড়াকড়ি ও সতর্কতা মদিনার নবজাত রাষ্ট্রকে অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা ও বাহ্যিক আগ্রাসন থেকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। তিনি যদি গোত্রীয় প্রধানদের অন্যায্য দাবি ও শর্তের সামনে নতি স্বীকার করতেন, তবে ইসলামি রাষ্ট্রটি একটি আদর্শিক রাষ্ট্রের পরিবর্তে সাধারণ একটি আরব গোত্রীয় জোটে পরিণত হতো। তাঁর এই আপসহীন ও সতর্ক নীতিই ইসলামের রাজনৈতিক আদর্শকে তার নিজস্ব গতিতে বিকশিত হতে সাহায্য করেছিল এবং একটি বিশ্বজনীন সভ্যতার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল। [25]