৬.৩ ইসলামি রাষ্ট্রে জিম্মি ও অমুসলিমদের নিরাপত্তা ও দায়বদ্ধতা
ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থার সার্বভৌমত্ব ও ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো অমুসলিম নাগরিকদের অধিকার, নিরাপত্তা এবং তাদের রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার সুষম বণ্টন। ইসলামি আইনশাস্ত্রে (Figh) এই অমুসলিম নাগরিকদের 'জিম্মি' (أهل الذمة) বা চুক্তিবদ্ধ নাগরিক হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় একে একটি সামাজিক চুক্তি (Social Contract) এবং বহুত্ববাদী নাগরিকত্ব (Pluralistic Citizenship) হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। রাসুলুল্লাহ সা. মদিনা সনদের মাধ্যমে যে বহু-ধর্মীয় ও বহু-জাতিভিত্তিক রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, তা পরবর্তীকালে ইসলামি খিলাফতের অধীনে একটি সুসংগঠিত আইনি ও প্রশাসনিক কাঠামোতে রূপ লাভ করে। এই ব্যবস্থায় অমুসলিমদের ধর্মীয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকার যেমন সুরক্ষিত করা হয়েছে, তেমনি রাষ্ট্রের প্রতি তাদের আনুগত্য ও দায়বদ্ধতার সীমানাও সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে।
ইসলামি রাষ্ট্রে অমুসলিমদের এই অবস্থান কোনো সাময়িক রাজনৈতিক কৌশল বা সুবিধাবাদী নীতি ছিল না, বরং এটি ছিল স্থায়ী শরয়ী আইনের অংশ। এই ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য ছিল একটি সামষ্টিক নিরাপত্তা (Collective Security) নিশ্চিত করা, যেখানে প্রতিটি নাগরিক তার নিজস্ব ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংস্কৃতি অক্ষুণ্ণ রেখে রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত থাকবে। এই অধ্যায়ে আমরা ইসলামি রাষ্ট্রে জিম্মি ও অমুসলিমদের নিরাপত্তা, তাদের আইনি অধিকার, বিচারিক স্বায়ত্তশাসন এবং রাষ্ট্রের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতার নানাবিধ দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
১. জিম্মি (اهل الذمة) ধারণার তাত্ত্বিক ও আইনি ভিত্তি
ইসলামি আইনশাস্ত্রে 'জিম্মাহ' (الذمة) শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো অঙ্গীকার, নিরাপত্তা, দায়িত্ব বা চুক্তি। পারিভাষিক অর্থে, যেসব অমুসলিম নাগরিক ইসলামি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব স্বীকার করে জিজিয়া কর প্রদানের বিনিময়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করে এবং রাষ্ট্র যাদের জীবন, সম্পদ ও ধর্মীয় স্বাধীনতার পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, তাদের 'আহলুজ জিম্মাহ' বা জিম্মি বলা হয়। এই চুক্তিটি কোনো সাময়িক যুদ্ধবিরতি নয়, বরং এটি একটি চিরস্থায়ী নাগরিকত্ব চুক্তি। ক্লাসিক্যাল ইসলামি আইনগ্রন্থ
কিতাবুল মুওয়ালাত ওয়াল মুয়াদাত ফিশ শারীয়াতিল ইসলামিয়্যাহ
-এ জিম্মিদের পরিচয় দিতে গিয়ে বলা হয়েছে:
অর্থাৎ, "আহলুজ জিম্মাহ হলেন খ্রিস্টান, ইহুদি এবং অন্যান্যদের মধ্য থেকে চুক্তিবদ্ধ ব্যক্তিবর্গ, যারা ইসলামি রাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন।" [1] । এই সংজ্ঞা থেকে স্পষ্ট হয় যে, ইসলামি রাষ্ট্রে অমুসলিমদের অবস্থান কোনো অবৈধ বা অনধিকারপ্রবেশকারীর মতো নয়, বরং তারা চুক্তির মাধ্যমে বৈধ নাগরিকত্বের অধিকারী।
তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে, জিম্মি ব্যবস্থাটি ইসলামি রাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত। ইসলামি রাষ্ট্র যখন কোনো অঞ্চল জয় করত বা চুক্তির মাধ্যমে নিজের অধীনে আনত, তখন সেখানকার অমুসলিম অধিবাসীদের জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করার কোনো সুযোগ ছিল না। কারণ কুরআনের অমোঘ ঘোষণা হলো, "দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই।" ফলে, তাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত করার একমাত্র আইনি পথ ছিল এই জিম্মি চুক্তি। এই চুক্তির মাধ্যমে তারা রাষ্ট্রের অংশীদারীত্ব লাভ করত এবং তাদের জান-মালের নিরাপত্তার দায়িত্ব সরাসরি রাষ্ট্রের ওপর ন্যস্ত হতো।
ইসলামি আইনবিদদের মতে, জিম্মি চুক্তি সম্পাদিত হওয়ার পর তা ভঙ্গ করার অধিকার রাষ্ট্রের নেই, যতক্ষণ না জিম্মিরা নিজেরা কোনো চরম রাষ্ট্রদ্রোহিতামূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়। এটি এমন এক দ্বিপাক্ষিক চুক্তি, যা অমুসলিমদের জন্য একাধারে ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং অন্যদিকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার গ্যারান্টি প্রদান করে। আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে একে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের অধিকার সুরক্ষার প্রথম ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
২. অমুসলিম নাগরিকদের জীবন, সম্পদ ও ইজ্জতের নিরাপত্তা
ইসলামি রাষ্ট্রে অমুসলিম নাগরিকদের জীবন (ضمان النفس), সম্পদ (ضمان المال) এবং ইজ্জত বা সম্মানের (ضمان العرض) নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের জন্য একটি অলঙ্ঘনীয় ধর্মীয় ও আইনি কর্তব্য। এই নিরাপত্তা কেবল মৌখিক ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এর পেছনে ছিল কঠোর আইনি নিষেধাজ্ঞা ও শাস্তির বিধান। বিখ্যাত হাম্বলি ফিকহ গ্রন্থ
আল-মুদনি ফি শারহিল মুকনি
-এ এ বিষয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে:
অর্থাৎ, "ইমাম বা রাষ্ট্রপ্রধান অমুসলিমদের জন্য মুসলিমদের অনুরূপ জীবন, সম্পদ ও ইজ্জতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাধ্য থাকবেন।" [2] । এই আইনি মূলনীতিটি প্রমাণ করে যে, নাগরিক অধিকারের ক্ষেত্রে মুসলিম ও অমুসলিমদের মধ্যে কোনো মৌলিক বৈষম্য করা হয়নি।
রাসুলুল্লাহ সা. নিজে জিম্মি নাগরিকদের ওপর যেকোনো ধরনের জুলুম বা তাদের অধিকার হরণের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। তিনি ঘোষণা করেছেন যে, কিয়ামতের দিন তিনি নিজেই মজলুম অমুসলিমের পক্ষে মামলা দায়ের করবেন। এই কঠোরতার কারণে ইসলামি খিলাফতের ইতিহাসে অমুসলিমদের জান-মালের নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে রক্ষা করা হতো। কোনো মুসলিম যদি কোনো জিম্মিকে অন্যায়ভাবে হত্যা করত, তবে ইসলামি শরিয়তের বিধান অনুযায়ী তার ওপর কিসাস (রক্তের বদলে রক্ত) জারি করা হতো। অর্থাৎ, অমুসলিমকে হত্যার অপরাধে মুসলিম হত্যাকারীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতো।
সম্পদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও জিম্মিদের অধিকার ছিল প্রশ্নাতীত। তাদের ব্যক্তিগত মালিকানাধীন জমি, ঘরবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা বা জোরপূর্বক দখল করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। এমনকি তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী যেসব জিনিস মুসলিমদের জন্য হারাম (যেমন শূকর বা মদ), সেগুলোও যদি কোনো মুসলিম নষ্ট করত, তবে তাকে সেই অমুসলিমের ক্ষতিপূরণ দিতে হতো। কারণ অমুসলিমদের নিজস্ব ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কৃতিতে সেগুলোর অর্থনৈতিক মূল্য ছিল এবং রাষ্ট্র তাদের সেই অধিকারের স্বীকৃতি দিয়েছিল।
৩. বিচারিক স্বায়ত্তশাসন ও ধর্মীয় স্বাধীনতা
ইসলামি রাষ্ট্রের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য ছিল অমুসলিমদের জন্য বিচারিক স্বায়ত্তশাসন (Judicial Autonomy) প্রদান করা। এর অর্থ হলো, অমুসলিম নাগরিকরা তাদের পারিবারিক, সামাজিক এবং ধর্মীয় বিরোধগুলো নিজেদের ধর্মীয় আইন ও আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করার পূর্ণ স্বাধীনতা পেত। রাষ্ট্র তাদের ওপর জোরপূর্বক ইসলামি শরিয়তের পারিবারিক বা দেওয়ানি আইন চাপিয়ে দিত না। ইমাম আবু জাফর আত-তাহাবি রহ. প্রণীত বিখ্যাত হাদিস ও আইনগ্রন্থ
শারহু মাআনিল আসার
-এ অমুসলিমদের বিচারিক ব্যবস্থার ঐতিহাসিক ও আইনি ভিত্তি আলোচনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে:
অর্থাৎ, "এই পাঠ্যটি ইসলামে আহলুজ জিম্মাহর মধ্যে বিচারিক ফয়সালার বিষয়টি আলোচনা করে, যা রাসুলুল্লাহ সা.-এর হাদিসের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। যেখানে রাসুলুল্লাহ সা. তাঁর কাছে বিচারপ্রার্থী হওয়া দুই ইহুদির ক্ষেত্রে (তাদের নিজস্ব তাওরাতের বিধান অনুযায়ী) রজম বা পাথর নিক্ষেপের রায় দিয়েছিলেন।" [3] ।
এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, অমুসলিমরা যদি নিজেদের মধ্যে কোনো বিরোধের ক্ষেত্রে ইসলামি আদালতের শরণাপন্ন হতে না চাইত, তবে তারা স্বাধীন ছিল। কিন্তু তারা যদি স্বেচ্ছায় রাসুলুল্লাহ সা. বা ইসলামি বিচারকের কাছে বিচারপ্রার্থী হতো, তবে বিচারক তাদের নিজস্ব ধর্মীয় গ্রন্থের বিধান বা ইসলামি আইনের সাধারণ নীতি অনুযায়ী ফয়সালা করতেন। এই বিচারিক স্বায়ত্তশাসন অমুসলিমদের ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে অত্যন্ত সহায়ক ছিল।
ধর্মীয় স্বাধীনতার ক্ষেত্রে জিম্মিরা তাদের নিজস্ব উপাসনা পদ্ধতি, উৎসব এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান স্বাধীনভাবে পালন করতে পারত। তাদের গির্জা, সিনাগগ বা অন্যান্য উপাসনালয়গুলো রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার অধীনে থাকত। ইসলামি আইনবিদদের মতে, অমুসলিমদের উপাসনালয় ধ্বংস করা বা সেগুলোকে মসজিদে রূপান্তরিত করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিল। এই বিচারিক ও ধর্মীয় স্বাধীনতা মধ্যযুগীয় ইউরোপ বা অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অত্যন্ত প্রগতিশীল এবং মানবিক ছিল, যেখানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রায়শই জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করা হতো অথবা দেশত্যাগে বাধ্য করা হতো।
৪. অমুসলিম নাগরিকদের দায়বদ্ধতা ও আকিদাহগত স্বাতন্ত্র্য
ইসলামি রাষ্ট্রে অমুসলিমদের যেমন ব্যাপক অধিকার ও নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছিল, তেমনি রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে তাদের কিছু সুনির্দিষ্ট দায়বদ্ধতা ও কর্তব্যও ছিল। এই দায়বদ্ধতাগুলো মূলত রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং অর্থনৈতিক অবদানের সাথে সম্পর্কিত ছিল। অমুসলিমদের এই দায়বদ্ধতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাদের আকিদাহ (Aqidah) বা বিশ্বাসের স্বাতন্ত্র্যকে সম্পূর্ণ সম্মান জানানো হতো। যেহেতু তাদের আকিদাহ মুসলিমদের মতো নয়, তাই তাদের ওপর ইসলামি ইবাদত বা ধর্মীয় দায়িত্বসমূহ (যেমন যাকাত বা জিহাদে অংশগ্রহণ) চাপিয়ে দেওয়া হয়নি। এর পরিবর্তে তাদের জন্য 'জিজিয়া' (الجزية) নামক একটি কর নির্ধারণ করা হয়েছিল।
জিজিয়া কোনো শাস্তিমূলক কর ছিল না, বরং এটি ছিল সামরিক পরিষেবা থেকে অব্যাহতির বিনিময়ে এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা লাভের জন্য একটি বার্ষিক কর। মুসলিমদের জন্য যেখানে জান-মাল দিয়ে জিহাদে অংশগ্রহণ করা এবং যাকাত প্রদান করা বাধ্যতামূলক ছিল, সেখানে অমুসলিমদের এই কঠিন সামরিক দায়িত্ব থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল। জিজিয়ার পরিমাণও ছিল অত্যন্ত যৌক্তিক এবং তা কেবল সক্ষম, উপার্জনক্ষম পুরুষদের ওপর ধার্য করা হতো। নারী, শিশু, বৃদ্ধ, সন্ন্যাসী এবং শারীরিক বা মানসিকভাবে অক্ষম ব্যক্তিরা এই কর থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিলেন।
অর্থনৈতিক দায়বদ্ধতার পাশাপাশি অমুসলিমদের আরেকটি প্রধান দায়িত্ব ছিল রাষ্ট্রের আইন ও সামাজিক শৃঙ্খলার প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করা। তারা ইসলামি রাষ্ট্রের জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে পারে বা মুসলিমদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানতে পারে এমন কোনো কাজ প্রকাশ্যে করতে পারত না। উদাহরণস্বরূপ, মুসলিম প্রধান এলাকায় প্রকাশ্যে শূকর বা মদের ব্যবসা করা, কিংবা ইসলামের বিরুদ্ধে কুৎসা রটানো নিষিদ্ধ ছিল। এই সীমাবদ্ধতাগুলো ছিল মূলত সামাজিক সম্প্রীতি ও রাষ্ট্রীয় সংহতি বজায় রাখার জন্য একটি প্রয়োজনীয় আইনি কাঠামো।
৫. সামাজিক শৃঙ্খলা ও শুরুত-এ-উমরিয়া (الشروط العمرية)
ইসলামি খিলাফতের বিস্তৃতির সাথে সাথে অমুসলিমদের সাথে সামাজিক ও প্রশাসনিক সম্পর্ক সুসংগঠিত করার জন্য বিভিন্ন চুক্তি ও নীতিমালা প্রণীত হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত এবং ঐতিহাসিকভাবে প্রভাবশালী দলিল হলো "শুরুত-এ-উমরিয়া" (الشروط العمرية) বা উমরের শর্তাবলী। দ্বিতীয় খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এর শাসনামলে সিরিয়া ও ফিলিস্তিনের খ্রিস্টানদের সাথে সম্পাদিত এই চুক্তিটি পরবর্তীকালে ইসলামি আইনশাস্ত্রে জিম্মিদের সামাজিক মর্যাদার একটি অন্যতম আইনি ভিত্তি হিসেবে গৃহীত হয়। ইমাম ইবনুল কাইয়িম রহ. তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ
আহকামু আহলিয জিম্মাহ
-এ এই শর্তাবলীর গুরুত্ব ও সামাজিক তাৎপর্য আলোচনা করেছেন:
অর্থাৎ, "যেহেতু এটি ইসলামের সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত, তাই আহলুজ জিম্মাহর জন্য এমন একটি পোশাক বা বাহ্যিক প্রতীক থাকা আবশ্যক, যার মাধ্যমে তাদের চেনা যায়; যাতে করে তাদের ক্ষেত্রে সালাম আদান-প্রদানের সুন্নাহটি সঠিকভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব হয়।" [4] ।
আধুনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই পোশাকের ভিন্নতা বা সামাজিক পার্থক্যের শর্তগুলোকে বৈষম্যমূলক মনে হতে পারে, কিন্তু তৎকালীন সপ্তম শতাব্দীর ভূ-রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে এটি ছিল অত্যন্ত বাস্তবসম্মত। সেই যুগে বিভিন্ন জাতি ও ধর্মের মানুষকে তাদের পোশাকের মাধ্যমে চেনা যেত, যা সামাজিক যোগাযোগ এবং আইনি অধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। উদাহরণস্বরূপ, একজন মুসলিমকে চেনা গেলে তার ওপর ইসলামি আইন প্রয়োগ করা সহজ হতো, আর একজন অমুসলিমকে চেনা গেলে তাকে সামরিক দায়িত্ব বা যাকাত আদায়ের মতো বাধ্যবাধকতা থেকে সহজেই অব্যাহতি দেওয়া যেত।
শুরুত-এ-উমরিয়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল মুসলিম ও অমুসলিমদের মধ্যে একটি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করা, যেখানে উভয় পক্ষই তাদের নিজস্ব পরিচয় ও মর্যাদা বজায় রেখে বসবাস করতে পারে। এই চুক্তির মাধ্যমে অমুসলিমরা রাষ্ট্রদ্রোহিতা বা গুপ্তচরবৃত্তির মতো কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার অঙ্গীকার করেছিল, আর রাষ্ট্র তাদের পূর্ণ ধর্মীয় ও সামাজিক স্বায়ত্তশাসনের নিশ্চয়তা দিয়েছিল। এটি ছিল মূলত একটি সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষার চুক্তি, যা খিলাফতের বিশাল সাম্রাজ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে দীর্ঘকাল কার্যকর ছিল।
৬. উপাসনালয় নির্মাণ ও সংস্কার সংক্রান্ত আইনি বিতর্ক
ইসলামি রাষ্ট্রে অমুসলিমদের নতুন উপাসনালয় (গির্জা, সিনাগগ ইত্যাদি) নির্মাণ এবং পুরাতন উপাসনালয় সংস্কারের বিষয়টি ইসলামি আইনশাস্ত্রের একটি অত্যন্ত জটিল ও বিতর্কিত অধ্যায়। এই বিষয়ে বিভিন্ন ফিকহি মাযহাবের মধ্যে সূক্ষ্ম মতপার্থক্য রয়েছে, যা মূলত বিজিত অঞ্চলের প্রকৃতি (চুক্তির মাধ্যমে নাকি যুদ্ধের মাধ্যমে বিজিত) এবং ভূমির মালিকানার ওপর নির্ভর করত। ইমাম ইবনুল কাইয়িম রহ. তাঁর
আহকামু আহলিয জিম্মাহ
গ্রন্থে এই আইনি বিতর্কের একটি চমৎকার চিত্র তুলে ধরেছেন:
অর্থাৎ, "আবু আব্দুল্লাহকে (ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল) জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: আহলুজ জিম্মাহ যদি তাদের নিজস্ব মালিকানাধীন ভূমিতে গির্জা বা উপাসনালয় নির্মাণ করতে চায়, তবে তাদের বাধা দেওয়ার পক্ষে দলিল কী? অথচ তারা জিজিয়া প্রদান করছে এবং আমরা তাদের ওপর জুলুম ও কষ্ট দিতে নিষিদ্ধ হয়েছি?" [5] ।
এই প্রশ্নের উত্তরে এবং সামগ্রিক ফিকহি আলোচনায় আইনবিদগণ ভূমিকে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করেছেন:
মুসলিমদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত শহর (যেমন বাগদাদ, কুফা, বসরা):
এসব শহরে নতুন কোনো অমুসলিম উপাসনালয় নির্মাণ করা সর্বসম্মতভাবে নিষিদ্ধ ছিল, কারণ এগুলো বিশুদ্ধ ইসলামি ভূমি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
চুক্তির মাধ্যমে বিজিত অঞ্চল (صلحاً):
যেসব অঞ্চল চুক্তির মাধ্যমে ইসলামি রাষ্ট্রের অধীনে এসেছিল, সেখানকার উপাসনালয়গুলোর ভাগ্য চুক্তির শর্তানুযায়ী নির্ধারিত হতো। যদি চুক্তিতে নতুন উপাসনালয় নির্মাণের অনুমতি দেওয়া থাকত, তবে তারা তা করতে পারত।
যুদ্ধের মাধ্যমে বিজিত অঞ্চল (عنوةً):
এই অঞ্চলের ক্ষেত্রে সাধারণ নিয়ম ছিল যে, নতুন কোনো উপাসনালয় নির্মাণ করা যাবে না, তবে বিদ্যমান উপাসনালয়গুলো ভেঙে ফেলা হবে না এবং সেগুলো সংস্কার করার অনুমতি দেওয়া হবে।
এই আইনি কড়াকড়িগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল ইসলামি রাষ্ট্রের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচিতি রক্ষা করা এবং একই সাথে অমুসলিমদের মৌলিক ধর্মীয় অধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা। রাষ্ট্র নিশ্চিত করত যে, কোনো অমুসলিমের বৈধ উপাসনালয় যেন অন্যায়ভাবে ধ্বংস করা না হয়, আবার একই সাথে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের সীমানার মধ্যে নতুন কোনো ধর্মীয় প্রচারণার কেন্দ্র গড়ে না ওঠে যা সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে।
ইসলামি রাষ্ট্রে জিম্মি ও অমুসলিমদের নিরাপত্তা ও দায়বদ্ধতার এই সামগ্রিক আইনি ও সামাজিক কাঠামোটি ছিল অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ। এটি একদিকে যেমন অমুসলিমদের একটি মর্যাদাপূর্ণ ও নিরাপদ জীবনযাপনের নিশ্চয়তা দিয়েছিল, অন্যদিকে তেমনি রাষ্ট্রের প্রতি তাদের আনুগত্য ও দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র গঠনে সহায়তা করেছিল। রাসুলুল্লাহ সা. এবং খুলাফায়ে রাশেদীনের এই মহান ঐতিহ্য পরবর্তী শতাব্দীর ইসলামি সাম্রাজ্যগুলোতে ধর্মীয় সহনশীলতা ও বহুত্ববাদের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল।