৪.১.১ দূরবর্তী গোত্রগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অসম্পূর্ণ অ্যানালাইসিস
আরবের দূরবর্তী গোত্রসমূহের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কাঠামো ও সামন্ততান্ত্রিক চরিত্র
প্রাক-ইসলামি আরবের দূরবর্তী গোত্রসমূহের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবন কেবল যাযাবর সংস্কৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং সেখানে একটি সুনির্দিষ্ট সামন্ততান্ত্রিক (Feudalistic) ও আধা-রাষ্ট্রীয় শাসনকাঠামো বিদ্যমান ছিল। আরবের দূরবর্তী অঞ্চলগুলোতে বসবাসকারী প্রভাবশালী গোত্রপতিরা নিজেদের গোত্রের নামে বিশাল ভূসম্পত্তি বা ইقطاعيات (fiefdoms) নিয়ন্ত্রণ করতেন। এই ভূস্বামীরা নিজেদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত জমি অন্য দুর্বল বা নির্ভরশীল গোত্রগুলোর নিকট ইজারা দিতেন। বিনিময়ে তারা করদ গোত্রগুলোর কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের শারীরিক শ্রম, সামরিক আনুগত্য এবং নির্দিষ্ট মেয়াদে খাজনা আদায় করতেন। এই ব্যবস্থাটি দূরবর্তী গোত্রগুলোর মধ্যে এক প্রকারের অভ্যন্তরীণ উপনিবেশবাদ এবং সামন্ততান্ত্রিক দাসত্বের জন্ম দিয়েছিল, যা সমকালীন পরাশক্তিগুলোর রাজনৈতিক বিশ্লেষণে প্রায়শই উপেক্ষিত থেকেছে।
ঐতিহাসিক দলিল ও প্রাক-ইসলামি শিলালিপি থেকে জানা যায় যে, এই সামন্ততান্ত্রিক ভূস্বামীরা নিজেদের সুরক্ষিত দুর্গ ও প্রাসাদে বসবাস করতেন। তাদের নিজস্ব বাহিনী ও প্রহরী দল ছিল, যা তাদের এক একটি স্বাধীন ‘রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে রাষ্ট্র’ (حكومة في داخل حكومة) হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। এই অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কাঠামোটি এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, তা অনেক সময় তৎকালীন আঞ্চলিক পরাশক্তি যেমন ইয়েমেনের হিময়ারী শাসক বা আবিসিনিয়ার (হাবশা) গভর্নরদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকেও প্রভাবিত করত। এই সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার বিবরণ দিতে গিয়ে ঐতিহাসিক সূত্রে বর্ণিত হয়েছে:
অর্থাৎ, "জাহেলী যুগের শিলালিপি ও নথিপত্র থেকে জানা যায় যে, গোত্রপতিরা তাদের গোত্রের নামে বিশাল ভূসম্পত্তির মালিক হতেন, যা তারা পরিচালনা করতেন। অনেক সময় এই জমি তাদের নিজস্ব প্রয়োজনের চেয়ে বেশি হতো, ফলে তারা তা অন্য ভূমিহীন বা অভাবী গোত্রগুলোর কাছে ইজারা দিত। বিনিময়ে ইজারাগ্রহীতা গোত্রটি জমির মালিক গোত্রকে বিভিন্ন সেবা প্রদান করত এবং চুক্তিতে নির্ধারিত সময়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ পণ্য বা অর্থ পরিশোধ করতে বাধ্য থাকত।" [1] ।
এই সামন্ততান্ত্রিক শোষণের ফলে আরবের দূরবর্তী গোত্রগুলোর অভ্যন্তরে একটি তীব্র শ্রেণীভেদ এবং ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল। একদিকে ছিল ধনাঢ্য ও প্রভাবশালী শাসক শ্রেণী, আর অন্যদিকে ছিল ভূমিহীন ও অধিকারবঞ্চিত সাধারণ গোত্রীয় জনগণ। সমকালীন মক্কার কুরাইশ নেতৃত্ব কিংবা পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্যের নীতিনির্ধারকেরা আরবের এই অভ্যন্তরীণ সামাজিক ফাটল ও রাজনৈতিক অসন্তোষের গভীরতা অনুধাবন করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছিল। তারা মনে করেছিল যে, কেবল গোত্রপতিদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখলেই সমগ্র গোত্রের আনুগত্য নিশ্চিত করা সম্ভব। কিন্তু এই ধারণাটি ছিল তাদের রাজনৈতিক বিশ্লেষণের একটি মস্ত বড় ভুল। [2] ।
জাহেলী নেতৃত্ব ও ‘আল-মিরবা’ (المرباع) প্রথা: ক্ষমতার মনস্তাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তি
প্রাক-ইসলামি আরবের দূরবর্তী গোত্রগুলোর রাজনৈতিক ক্ষমতা ও নেতৃত্বের স্থায়িত্ব মূলত দুটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল: প্রথমটি হলো মনস্তাত্ত্বিক আভিজাত্য এবং দ্বিতীয়টি হলো অর্থনৈতিক একচেটিয়া আধিপত্য। এই অর্থনৈতিক আধিপত্যের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার ছিল ‘আল-মিরবা’ (المرباع) প্রথা। এই প্রথা অনুযায়ী, কোনো গোত্রীয় যুদ্ধ বা লুণ্ঠন অভিযানের পর অর্জিত গনিমতের বা যুদ্ধলব্ধ সম্পদের এক-চতুর্থাংশ (২৫%) সরাসরি গোত্রপতির পকেটে যেত। এই বিশাল অর্থনৈতিক সুবিধা গোত্রপতিদের কেবল আর্থিকভাবেই শক্তিশালী করত না, বরং তাদের সামাজিক মর্যাদা ও রাজনৈতিক কর্তৃত্বকে একচ্ছত্র করে তুলত।
এই ‘মিরবা’ প্রথাটি আরবের গোত্রীয় রাজনীতিতে আভিজাত্য ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতো। তৎকালীন কবি ও নেতারা এই অধিকার লাভ করাকে চরম গৌরব ও অহংকারের বিষয় মনে করতেন। যেমন তামীম গোত্রের নেতা জিবরিকান ইবন বদর আল-তামীমী রাসুলুল্লাহ সা.-এর দরবারে এসে গর্বভরে নিজের গোত্রের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করতে গিয়ে এই প্রথার উল্লেখ করেছিলেন। এই শোষক শ্রেণীকে আরবের ইতিহাসে ‘জু আল-আকাল’ (ذوو الآكال) বা ‘ভোগদখলকারী শ্রেণী’ বলা হতো। এদের অনেকেই পারস্যের সম্রাট কিসরার কাছ থেকে করদ রাজ্য ও জায়গীর লাভ করেছিলেন। ঐতিহাসিক গ্রন্থে এই প্রথার বিবরণ এভাবে এসেছে:
অর্থাৎ, "গোত্রপতির অধিকারসমূহের মধ্যে অন্যতম ছিল 'মিরবা' বা যুদ্ধলব্ধ গনিমতের এক-চতুর্থাংশ গ্রহণ করার অধিকার। এই মিরবা গ্রহণ করা আরবদের নিকট আভিজাত্য, প্রতিপত্তি ও নেতৃত্বের অন্যতম প্রধান লক্ষণ ছিল। তাই যার এই অধিকার থাকত, সে এটি নিয়ে গর্ব করত এবং তার পরিবারও একে নেতৃত্ব ও সম্মানের প্রতীক মনে করত।" [3] ।
ইসলামের আবির্ভাবের পর এই অর্থনৈতিক শোষণের ভিত্তিটি ভেঙে দেওয়া হয়। আদি ইবনে হাতিম রা., যিনি ইসলাম গ্রহণের পূর্বে তাঁর গোত্রের কাছ থেকে এই ‘মিরবা’ বা এক-চতুর্থাংশ কর আদায় করতেন, তাঁকে উদ্দেশ্য করে রাসুলুল্লাহ সা. বলেছিলেন যে, এই প্রথাটি ধর্মীয় ও নৈতিকভাবে সম্পূর্ণ অবৈধ। ঐতিহাসিক সূত্রে বর্ণিত হয়েছে:
অর্থাৎ, "তুমি তোমার গোত্রের কাছ থেকে এক-চতুর্থাংশ (মিরবা) গ্রহণ করে থাকো, অথচ তোমার দ্বীন বা ধর্মে এটি তোমার জন্য বৈধ নয়।" [4] । এই অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ সা. দূরবর্তী গোত্রগুলোর সাধারণ জনগণের মন জয় করেছিলেন, যা কুরাইশ বা অন্য কোনো সমকালীন শক্তি কল্পনাও করতে পারেনি।
রাসুলুল্লাহ সা. ও আবু বকর রা.-এর কূটনৈতিক মিশন: বনু আমির ও দূরবর্তী গোত্রসমূহের সাথে আলোচনা
মক্কী জীবনের শেষভাগে যখন কুরাইশদের নির্যাতন চরম সীমায় পৌঁছায়, তখন রাসুলুল্লাহ সা. আরবের দূরবর্তী গোত্রগুলোর সাথে যোগাযোগ স্থাপন এবং তাদের রাজনৈতিক আশ্রয় ও সামরিক সমর্থনের (Nusrah) জন্য কূটনৈতিক মিশন শুরু করেন। এই মিশনগুলো কোনো আকস্মিক বা অপরিকল্পিত উদ্যোগ ছিল না, বরং তা ছিল অত্যন্ত সুক্ষ্ম ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ এবং গোত্রীয় রাজনীতির গভীর জ্ঞানভিত্তিক। এই কূটনৈতিক তৎপরতায় রাসুলুল্লাহ সা.-এর প্রধান সহযোগী ছিলেন হযরত আবু বকর রা., যিনি ছিলেন আরবের বংশলতিকা (Genealogy) এবং গোত্রীয় রাজনীতির সবচেয়ে বড় বিশেষজ্ঞ।
বনু আমির ইবনে সা’সা’ গোত্রের সাথে পরিচালিত আলোচনাটি ছিল এই কূটনৈতিক দূরদর্শিতার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। বনু আমির ছিল আরবের অন্যতম শক্তিশালী ও যুদ্ধবাজ গোত্র। রাসুলুল্লাহ সা. এবং হযরত আবু বকর রা. তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কাঠামো, তাদের সামরিক শক্তি এবং তাদের ভৌগোলিক অবস্থানের কৌশলগত গুরুত্ব অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করেছিলেন। তারা জানতেন যে, বনু আমিরের নেতৃত্ব কেবল একটি ধর্মীয় আদর্শ খুঁজছিল না, বরং তারা এর পেছনে একটি রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও ক্ষমতার অংশীদারিত্বের সমীকরণ মেলাচ্ছিল। ঐতিহাসিক গ্রন্থে এই আলোচনার প্রেক্ষাপট এভাবে বর্ণিত হয়েছে:
অর্থাৎ, "দ্বিতীয়ত: বনু আমিরের সাথে আলোচনা: রাসুলুল্লাহ সা. বনু আমিরের সাথে আলোচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যা ছিল গভীর অধ্যয়ন ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার ওপর ভিত্তি করে। রাসুলুল্লাহ সা. এবং তাঁর সঙ্গী আবু বকর রা. ছিলেন..." [5] ।
এই আলোচনার সময় বনু আমিরের নেতা বুহাইরা ইবনে ফিরাস রাসুলুল্লাহ সা.-এর নিকট প্রস্তাব করেছিলেন যে, যদি তারা তাঁকে সাহায্য করে এবং তিনি তাঁর বিরোধীদের ওপর বিজয়ী হন, তবে তাঁর পর ক্ষমতার নেতৃত্ব বনু আমিরের হাতে থাকবে কি না। রাসুলুল্লাহ সা. অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে এই রাজনৈতিক দরকষাকষি প্রত্যাখ্যান করে বলেন যে, ক্ষমতা কেবল আল্লাহর হাতে, তিনি যাকে ইচ্ছা তা দান করেন। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, রাসুলুল্লাহ সা. দূরবর্তী গোত্রগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং তাদের নেতৃত্বের মনস্তত্ত্ব কতটা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছিলেন। তিনি কোনো সাময়িক রাজনৈতিক সুবিধার জন্য ইসলামের মৌলিক আদর্শের সাথে আপস করেননি। [6] ।
দূরবর্তী গোত্রগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও ক্ষমতার ভারসাম্য মূল্যায়নে সমকালীন শক্তির অসম্পূর্ণ বিশ্লেষণ
প্রাক-ইসলামি আরবের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি কুরাইশ এবং তাদের মিত্ররা দূরবর্তী গোত্রগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং ক্ষমতার ভারসাম্য (Balance of Power) মূল্যায়নে এক বিরাট অসম্পূর্ণতা ও অদূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছিল। কুরাইশদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল মূলত মক্কা-কেন্দ্রিক এবং তাদের বাণিজ্যিক রুটগুলোর নিরাপত্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তারা মনে করত যে, আরবের দূরবর্তী গোত্রগুলো কেবলই কিছু যাযাবর ও বিশৃঙ্খল গোষ্ঠী, যাদের কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক এজেন্ডা বা আদর্শিক ভিত্তি নেই। তারা এই গোত্রগুলোর অভ্যন্তরীণ সামাজিক অসন্তোষ, অর্থনৈতিক শোষণ এবং নেতৃত্বের কোন্দলগুলোকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছিল।
বিশেষ করে ইয়াসরিব (মদিনা) এবং তার আশেপাশের গোত্রগুলোর (আউস ও খাযরাজ) মধ্যকার দীর্ঘদিনের বুয়াসের যুদ্ধ এবং এর ফলে সৃষ্ট রাজনৈতিক শূন্যতা কুরাইশরা সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করতে পারেনি। তারা বুঝতে পারেনি যে, এই গোত্রগুলো এমন একজন নেতার সন্ধান করছিল যিনি তাদের অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো প্রদান করতে পারেন। কুরাইশদের এই অসম্পূর্ণ বিশ্লেষণের বিপরীতে, রাসুলুল্লাহ সা. এই গোত্রগুলোর মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক সংকটকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করেছিলেন। সমকালীন রাজনৈতিক বিশ্লেষণে কুরাইশদের এই ব্যর্থতা সম্পর্কে ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন:
অর্থাৎ, "আধুনিক অর্থে কূটনীতি বা রাজনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন—যা ইয়াসরিব ও অন্যান্য শক্তির মধ্যে গড়ে ওঠার কথা ছিল—তা তৎকালীন আরবে পরিচিত ছিল না। মূলত রাষ্ট্রীয় সভ্যতার বিকাশের পরেই কেবল এই ধরনের কূটনৈতিক বিশ্লেষণ সম্ভব হয়েছিল।" [7] ।
কুরাইশরা যখন দূরবর্তী গোত্রগুলোকে কেবল অর্থের বিনিময়ে ভাড়াটে সৈন্য হিসেবে ব্যবহার করার নীতিতে বিশ্বাসী ছিল, তখন রাসুলুল্লাহ সা. তাদের সামনে একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ও রাজনৈতিক নিরাপত্তার বিকল্প মডেল উপস্থাপন করেছিলেন। কুরাইশদের এই অসম্পূর্ণ ও স্থূল রাজনৈতিক বিশ্লেষণের কারণেই তারা মদিনায় ইসলামের রাজনৈতিক ভিত্তি স্থাপন এবং দূরবর্তী গোত্রগুলোর সাথে মদিনার জোট গঠনকে সময়মতো প্রতিরোধ করতে পারেনি। [8] ।
ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থার উত্থান এবং জাহেলী রাজনৈতিক কাঠামোর আমূল সংস্কার
মদিনায় ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর, রাসুলুল্লাহ সা. আরবের দূরবর্তী গোত্রগুলোর সেই প্রাচীন, শোষণমূলক ও সামন্ততান্ত্রিক রাজনৈতিক কাঠামোকে আমূল সংস্কার করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। জাহেলী যুগের যে ভূস্বামীরা সাধারণ মানুষের ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে ‘রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে রাষ্ট্র’ কায়েম করেছিল, ইসলামি আইন ও প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে তাদের সেই অবৈধ ক্ষমতা খর্ব করা হয়। ইসলাম ভূমি মালিকানা এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের বণ্টনে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসে।
ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থায় প্রাচীন ‘মিরবা’ (এক-চতুর্থাংশ কর) প্রথা বিলুপ্ত করে তার স্থলে ‘খুমুস’ (এক-পঞ্চমাংশ বা ২০%) এবং যাকাত ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়। এই খুমুস কোনো গোত্রপতির ব্যক্তিগত ভোগবিলাসের জন্য নয়, বরং তা সরাসরি রাষ্ট্রীয় কোষাগার বা বায়তুল মালে জমা হতো এবং তা সমাজকল্যাণ, দরিদ্র বিমোচন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষায় ব্যয় করা হতো। এছাড়া, ভূমি সংস্কারের ক্ষেত্রে ইসলাম তিন ধরনের ভূমি ব্যবস্থার প্রবর্তন করে: ইকতাত তাবলীিক (মালিকানা প্রদান), ইকতাত ইরফাক (ব্যবহারের অধিকার প্রদান) এবং ইকতাত মওয়াত (অনাবাদী জমি আবাদের মাধ্যমে মালিকানা লাভ)। এই সংস্কারগুলোর বিবরণ দিতে গিয়ে ফিকহ ও ইতিহাসের কিতাবসমূহে উল্লেখ করা হয়েছে:
অর্থাৎ, "ইসলামে ভূমি বণ্টনের (ইকতা) ক্ষেত্রে ফকীহগণের সুনির্দিষ্ট মতামত রয়েছে, যা মূলত তিন ভাগে বিভক্ত: ইকতাত তাবলীিক (মালিকানা স্বত্ব প্রদান), ইকতাত ইরফাক (সুবিধা বা ব্যবহারের অধিকার প্রদান) এবং ইকতাত মওয়াত (মৃত বা অনাবাদী জমি জীবিতকরণের মাধ্যমে মালিকানা লাভ)।" [9] ।
এই ভূমি সংস্কারের ফলে আরবের দূরবর্তী গোত্রগুলোর সাধারণ কৃষিজীবী ও নিম্নশ্রেণীর মানুষ সামন্তপ্রভুদের দাসত্ব থেকে মুক্তি লাভ করে সরাসরি রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে মর্যাদা পায়। এটি ছিল জাহেলী আরবের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত। এই সংস্কারের মাধ্যমে ইসলামি রাষ্ট্র কেবল একটি ধর্মীয় আন্দোলন হিসেবে নয়, বরং একটি অত্যন্ত আধুনিক, ন্যায়ভিত্তিক এবং কল্যাণকামী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আরবের বুকে আত্মপ্রকাশ করে। [10] ।