১.১.২ ইসলামি দাওয়াহর সুরক্ষার নিরাপত্তা ঝুঁকি (Security Risks of Dawah in Hostile Territory)
১. ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও শত্রুভাবাপন্ন ভূখণ্ডে দাওয়াহর নিরাপত্তা সংকট
মদিনায় প্রথম ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর, রাসুলুল্লাহ সা. এর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল এই নবজাত রাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং একই সাথে উপদ্বীপের সর্বত্র ইসলামি দাওয়াহর বাণী পৌঁছে দেওয়া। তৎকালীন আরবের রাজনৈতিক বিন্যাস ছিল গোত্রীয় আধিপত্য এবং পারস্পরিক চুক্তির ওপর নির্ভরশীল। এই বৈরী পরিবেশে কোনো কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থা ছিল না, যার ফলে মদিনা রাষ্ট্রের সীমানার বাইরে যেকোনো মুসলিম বা দাওয়াহ প্রতিনিধি দলের নিরাপত্তা ছিল চরম হুমকির মুখে। মদিনার চারপাশের পৌত্তলিক গোত্রগুলো এবং মক্কার কুরাইশরা ইসলামি দাওয়াহর এই বিস্তারকে তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্যের জন্য এক বিরাট হুমকি হিসেবে বিবেচনা করত। ফলে, শত্রুভাবাপন্ন ভূখণ্ডে (Hostile Territory) প্রেরিত দাওয়াহ প্রতিনিধি দলগুলো প্রতিনিয়ত এক চরম নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে থাকত, যেখানে সামান্য অসতর্কতা বা গোত্রীয় বিশ্বাসঘাতকতা ডেকে আনতে পারত ভয়াবহ বিপর্যয়।
তৎকালীন আরবের ভূ-রাজনীতিতে আদর্শিক প্রচার বা দাওয়াহ কেবল একটি ধর্মীয় কর্মকাণ্ড ছিল না, বরং তা ছিল বিদ্যমান সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ। মদিনার ইসলামি রাষ্ট্র যখন তার আদর্শিক সীমানা সম্প্রসারণের চেষ্টা করছিল, তখন পার্শ্ববর্তী গোত্রগুলো এটিকে তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হিসেবে গণ্য করে। এই প্রেক্ষাপটে, দাওয়াহর সুরক্ষার জন্য কেবল তাত্ত্বিক প্রচার যথেষ্ট ছিল না, বরং এর পেছনে একটি শক্তিশালী সামরিক ও কৌশলগত নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল। ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মদিনা রাষ্ট্রের প্রাথমিক দিনগুলোতে দাওয়াহ এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ছিল একে অপরের পরিপূরক। রাষ্ট্রীয় শক্তি ছাড়া দাওয়াহর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেমন অসম্ভব ছিল, তেমনি দাওয়াহর বিস্তার ছাড়া রাষ্ট্রের আদর্শিক ভিত্তি মজবুত করাও সম্ভব ছিল না [1] ।
শত্রুভাবাপন্ন অঞ্চলে দাওয়াহর এই নিরাপত্তা সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছিল আরবের ঐতিহ্যগত 'জিওয়ার' (গোত্রীয় আশ্রয় বা নিরাপত্তা চুক্তি) ব্যবস্থার ভঙ্গুরতা। কোনো মুসলিম যখন মদিনার বাইরে দাওয়াহর উদ্দেশ্যে যেতেন, তখন তাকে কোনো অমুসলিম গোত্রপতির আশ্রয়ে যেতে হতো। কিন্তু কুরাইশদের রাজনৈতিক চাপ এবং অর্থনৈতিক প্রলোভনের মুখে এই গোত্রীয় আশ্রয়গুলো প্রায়শই ভেঙে পড়ত। ফলে, দাওয়াহর কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিরা এক চরম মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিক ঝুঁকির মধ্যে থাকতেন। এই নিরাপত্তা ঝুঁকি কেবল বাহ্যিক শত্রুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং মদিনার অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা মুনাফিক এবং ইহুদি গোত্রগুলোর গোপন ষড়যন্ত্রও এই ঝুঁকিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল, যা দাওয়াহর প্রতিটি পদক্ষেপকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে [2] ।
এই ভূ-রাজনৈতিক জটিলতার মধ্যে ইসলামি দাওয়াহর ধারাবাহিকতা রক্ষা করা ছিল এক অনন্য কৌশলগত পরীক্ষা। রাসুলুল্লাহ সা. অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে এই নিরাপত্তা ঝুঁকিগুলো মূল্যায়ন করতেন এবং প্রতিটি দাওয়াহ অভিযানের পূর্বে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও স্থানীয় গোত্রগুলোর রাজনৈতিক অবস্থান পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করতেন। এই নিরাপত্তা ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য ছিল শত্রুর অতর্কিত আক্রমণ থেকে দাওয়াহর বাহকদের রক্ষা করা এবং একই সাথে ইসলামি রাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার বার্তা আরবের সর্বত্র পৌঁছে দেওয়া, যাতে কোনো গোত্র সহজেই মুসলিমদের ওপর আক্রমণ করার সাহস না পায় [3] ।
২. গোপনীয়তা রক্ষা বনাম প্রকাশ্য দাওয়াহ: কৌশলগত রূপান্তর ও নিরাপত্তা ঝুঁকি
মক্কি জীবনের প্রাথমিক পর্যায়ে ইসলামি দাওয়াহর মূল ভিত্তি ছিল গোপনীয়তা রক্ষা বা 'التنظيم السري' (গোপন সাংগঠনিক কাঠামো)। মক্কার কুরাইশদের চরম শত্রুতা এবং শারীরিক নির্যাতনের হাত থেকে নবদীক্ষিত মুসলিমদের রক্ষা করার জন্য এই কৌশল ছিল অত্যন্ত কার্যকর। কিন্তু মদিনায় হিজরতের পর এবং একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর, দাওয়াহর এই কৌশলগত রূপান্তর ঘটে। গোপনীয়তার স্তর থেকে দাওয়াহ তখন রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় প্রকাশ্য রূপ ধারণ করে। এই রূপান্তরটি তাত্ত্বিকভাবে অত্যন্ত গৌরবময় হলেও, ব্যবহারিক ক্ষেত্রে এটি এক নতুন ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করে। প্রকাশ্য দাওয়াহর কারণে মুসলিমদের সংখ্যা ও অবস্থান শত্রুদের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যা তাদের আসিম্যাট্রিক ওয়ারফেয়ার (Asymmetric Warfare) বা গেরিলা আক্রমণের সহজ লক্ষ্যে পরিণত করে [4] ।
মক্কার গোপন দাওয়াহর যুগে যেখানে কেবল ব্যক্তিকেন্দ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই ছিল প্রধান লক্ষ্য, মদিনার প্রকাশ্য দাওয়াহর যুগে তা সমষ্টিগত ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার বিষয়ে পরিণত হয়। এই কৌশলগত রূপান্তরের বিষয়ে ঐতিহাসিকগণ উল্লেখ করেছেন যে, একটি আদর্শিক আন্দোলন যখন গোপনীয়তার খোলস ছেড়ে রাষ্ট্রীয় রূপ ধারণ করে, তখন তার শত্রুদের আক্রমণের ধরনও পরিবর্তিত হয়। কুরাইশরা এবং তাদের মিত্ররা বুঝতে পেরেছিল যে, ইসলামকে যদি মদিনার ভেতরেই অবরুদ্ধ করে রাখা না যায়, তবে তা অচিরেই সমগ্র আরব উপদ্বীপে ছড়িয়ে পড়বে। এই কারণে, তারা মদিনার বাইরে প্রেরিত প্রতিটি দাওয়াহ প্রতিনিধি দলকে ধ্বংস করার জন্য সামরিক ও রাজনৈতিক কৌশল গ্রহণ করে। এই প্রকাশ্য সংঘাতের যুগে দাওয়াহর সুরক্ষার জন্য সামরিক শক্তির ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে পড়ে [5] ।
উপরোক্ত ইবারতটি স্পষ্ট করে যে, ইসলামি আন্দোলনের ইতিহাসে গোপনীয়তা থেকে প্রকাশ্যতায় উত্তরণ একটি স্বাভাবিক ও সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া, তবে এই উত্তরণের প্রতিটি ধাপে নিরাপত্তা ঝুঁকি ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পায় [6] । মদিনা রাষ্ট্রে যখন প্রকাশ্য দাওয়াহ শুরু হয়, তখন শত্রুরা মুসলিমদের এই উন্মুক্ততার সুযোগ নিয়ে তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালানোর পরিকল্পনা করতে থাকে। বিশেষ করে, দূরবর্তী গোত্রগুলোতে যখন শিক্ষক বা প্রচারক পাঠানো হতো, তখন তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ত, কারণ মদিনার সামরিক বাহিনীর পক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে সেই দূরবর্তী অঞ্চলে গিয়ে সহায়তা প্রদান করা সম্ভব ছিল না।
এই কৌশলগত রূপান্তরের ফলে রাসুলুল্লাহ সা. দাওয়াহর সুরক্ষায় এক দ্বিমুখী নীতি গ্রহণ করেন। একদিকে তিনি শান্তিপূর্ণ উপায়ে ইসলামের বাণী প্রচারের জন্য প্রতিনিধি দল পাঠাতেন, অন্যদিকে এই প্রতিনিধি দলগুলোর সুরক্ষার জন্য এবং শত্রুর মনে ভয় সঞ্চারের জন্য ছোট ছোট সামরিক অভিযান বা 'সারিয়্যাহ' প্রেরণ করতেন। এই সামরিক উপস্থিতি শত্রুদের এই বার্তা দিত যে, মুসলিমদের ওপর যেকোনো আঘাতের পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। এভাবে, প্রকাশ্য দাওয়াহর যুগে সামরিক শক্তি ও কূটনৈতিক তৎপরতার এক অপূর্ব সমন্বয়ের মাধ্যমে দাওয়াহর নিরাপত্তা ঝুঁকি হ্রাস করার চেষ্টা করা হয় [7] ।
৩. গোত্রীয় বিশ্বাসঘাতকতা (غدر) এবং দাওয়াহ প্রতিনিধিদের নিরাপত্তা বলয়
আরব উপদ্বীপের গোত্রীয় রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি ছিল 'غدر' বা বিশ্বাসঘাতকতা। তৎকালীন আরবের অনেক গোত্রই বাহ্যিকভাবে মদিনা রাষ্ট্রের সাথে শান্তি চুক্তি বা ইসলাম গ্রহণের ভান করত, কিন্তু গোপনে তারা কুরাইশ বা অন্যান্য শক্তিশালী পৌত্তলিক গোত্রের সাথে আঁতাত বজায় রাখত। এই দ্বিমুখী নীতি বা কপটতা দাওয়াহ প্রতিনিধিদের জন্য এক মরণফাঁদ তৈরি করেছিল। অনেক সময় বৈরী গোত্রগুলো মদিনায় এসে রাসুলুল্লাহ সা. এর কাছে আবেদন করত যে, তাদের গোত্রে ইসলাম শিক্ষা দেওয়ার জন্য যেন শিক্ষক বা কারী পাঠানো হয়। কিন্তু এই আবেদনের পেছনে প্রায়শই লুকিয়ে থাকত গভীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতার নীল নকশা [8] ।
এই ধরনের বিশ্বাসঘাতকতার ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, শত্রুরা সরাসরি মদিনা আক্রমণ করার সাহস না পেয়ে, দাওয়াহর বাহকদের ফাঁদে ফেলে হত্যা করার কৌশল অবলম্বন করত। এটি ছিল এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ, যার উদ্দেশ্য ছিল মুসলিমদের মনোবল ভেঙে দেওয়া এবং মদিনার বাইরে ইসলামি দাওয়াহর বিস্তারকে চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া। এই ধরনের পরিস্থিতিতে দাওয়াহ প্রতিনিধিদের জন্য কোনো কার্যকর নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা ছিল অত্যন্ত দুরুহ কাজ। কারণ, আরবের ঐতিহ্যবাহী 'আমান' (নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি) যখন কোনো গোত্র নিজেই লঙ্ঘন করত, তখন কেবল নৈতিক বা সামাজিক চাপ দিয়ে তাদের প্রতিহত করা সম্ভব ছিল না [9] ।
ঐতিহাসিক সীরাত গ্রন্থগুলোতে এই ধরনের বিশ্বাসঘাতকতার ভয়াবহতা বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। যখন কোনো প্রতিনিধি দল মদিনা থেকে রওনা হতো, তখন তাদের যাত্রাপথ এবং গন্তব্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য স্থানীয় মিত্র গোত্রগুলোর ওপর নির্ভর করতে হতো। কিন্তু আরবের পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক সমীকরণে আজ যে মিত্র, কাল সে শত্রুতে পরিণত হতে পারত। এই অস্থিরতা দাওয়াহর নিরাপত্তা ঝুঁকিকে চরম পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল। রাসুলুল্লাহ সা. এই ঝুঁকিগুলো সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন ছিলেন এবং তিনি দাওয়াহ প্রতিনিধিদের সর্বদা সতর্ক থাকার এবং যাত্রাপথে সর্বোচ্চ গোপনীয়তা অবলম্বন করার নির্দেশ দিতেন [10] ।
গোত্রীয় বিশ্বাসঘাতকতার এই ঝুঁকিগুলো কেবল শারীরিক নিরাপত্তার ক্ষতি করেনি, বরং তা মদিনা রাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এক বিরাট সংকট তৈরি করেছিল। কোনো গোত্র যখন বিশ্বাসঘাতকতা করত, তখন মদিনা রাষ্ট্রকে তার সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদা রক্ষার জন্য কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নিতে হতো। অন্যথায়, আরবের অন্যান্য গোত্রগুলো মুসলিমদের দুর্বল ভেবে আরও বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠার আশঙ্কা থাকত। ফলে, দাওয়াহর সুরক্ষার এই নিরাপত্তা ঝুঁকিগুলো প্রায়শই মদিনা রাষ্ট্রকে অনিবার্য সামরিক সংঘাতের দিকে ঠেলে দিত, যা ছিল দাওয়াহর পথকে সুরক্ষিত করার একমাত্র উপায় [11] ।
৪. অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা নজরদারি ও প্রতি-গোয়েন্দা ব্যবস্থার অপরিহার্যতা
শত্রুভাবাপন্ন ভূখণ্ডে দাওয়াহর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কেবল বাহ্যিক সামরিক প্রস্তুতিই যথেষ্ট ছিল না, বরং মদিনা রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে একটি শক্তিশালী গোয়েন্দা ও প্রতি-গোয়েন্দা (Counter-Intelligence) ব্যবস্থা গড়ে তোলা অপরিহার্য ছিল। মদিনার অভ্যন্তরে বসবাসকারী মুনাফিকরা, যাদের নেতৃত্বে ছিল আবদুল্লাহ ইবনে উবাই, সর্বদা মুসলিমদের দুর্বলতাগুলো শত্রুদের কাছে পাচার করার চেষ্টায় লিপ্ত থাকত। এই অভ্যন্তরীণ শত্রুরা দাওয়াহর যেকোনো অভিযানের পরিকল্পনা, প্রতিনিধিদের যাত্রাপথ এবং তাদের সংখ্যা সংক্রান্ত অত্যন্ত সংবেদনশীল তথ্য কুরাইশ ও তাদের মিত্রদের কাছে সরবরাহ করত, যা দাওয়াহর নিরাপত্তা ঝুঁকিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল [12] ।
এই অভ্যন্তরীণ হুমকি মোকাবেলার জন্য রাসুলুল্লাহ সা. একটি অত্যন্ত দক্ষ নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক (جهاز الأمن) গড়ে তুলেছিলেন। এই ব্যবস্থার মূল কাজ ছিল মদিনার অভ্যন্তরে শত্রুর গুপ্তচরদের চিহ্নিত করা এবং মুনাফিকদের সন্দেহজনক কার্যক্রমের ওপর কড়া নজরদারি রাখা। সীরাত গবেষকগণ উল্লেখ করেছেন যে, একটি আদর্শিক রাষ্ট্রের টিকে থাকা এবং তার দাওয়াহর ধারাবাহিকতা রক্ষা করার জন্য এই ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা জরুরি ছিল:
এই ইবারতটি প্রমাণ করে যে, ইসলামি দাওয়াহর সুরক্ষায় একটি শক্তিশালী নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা ছিল অপরিসীম [13] । এই গোয়েন্দা ব্যবস্থার মাধ্যমেই রাসুলুল্লাহ সা. অনেক সময় শত্রুর অতর্কিত আক্রমণের পরিকল্পনা পূর্বেই নস্যাৎ করে দিতে সক্ষম হতেন।
প্রতি-গোয়েন্দা ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল মুসলিমদের নিজেদের সারির ঐক্য ও শৃঙ্খলা রক্ষা করা। মদিনার সমাজে কোনো ধরনের ফাটল বা অসতর্কতা যাতে শত্রুরা ব্যবহার করতে না পারে, সে জন্য কঠোর সামাজিক ও রাজনৈতিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা হতো। উদাহরণস্বরূপ, যখন কোনো মুসলিমের বিরুদ্ধে শত্রুপক্ষের সাথে গোপন যোগাযোগের সন্দেহ দেখা দিত, তখন রাষ্ট্র অত্যন্ত কঠোর ও দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করত। এই কঠোরতা কেবল শাস্তি প্রদানের জন্য ছিল না, বরং তা ছিল সমগ্র মুসলিম সমাজকে এই বার্তা দেওয়ার জন্য যে, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও দাওয়াহর স্বার্থের সাথে কোনো ধরনের আপস করা হবে না [14] ।
এই গোয়েন্দা নজরদারির ফলেই মদিনা রাষ্ট্র তার চারপাশের বৈরী পরিবেশেও নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পেরেছিল। দাওয়াহর উদ্দেশ্যে প্রেরিত প্রতিনিধি দলগুলোর যাত্রাপথ নির্ধারণে এই গোয়েন্দা তথ্যের ব্যবহার ছিল অত্যন্ত নিখুঁত। কোন পথটি নিরাপদ, কোন গোত্রটি বর্তমানে মদিনার প্রতি সহানুভূতিশীল এবং কোথায় শত্রুর ফাঁদ পাতা রয়েছে—এই সমস্ত তথ্য পূর্বেই সংগ্রহ করা হতো। এই প্রতি-গোয়েন্দা ব্যবস্থার কার্যকারিতাই ছিল শত্রুভাবাপন্ন ভূখণ্ডে দাওয়াহর সুরক্ষার অন্যতম প্রধান চাবিকাঠি [15] ।
৫. দাওয়াহর সুরক্ষায় সামরিক প্রতিরোধ ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের মিথস্ক্রিয়া
ইসলামি দাওয়াহর ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত অবস্থান হলো যে, দাওয়াহ কেবল একটি তাত্ত্বিক আহ্বান নয়, বরং তা মানুষের মুক্তির এক বৈপ্লবিক আন্দোলন। এই আন্দোলনকে যখন কোনো কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠী বা জালিম শক্তি বলপ্রয়োগের মাধ্যমে বন্ধ করতে চায়, তখন তার সুরক্ষায় সামরিক শক্তির ব্যবহার অনিবার্য হয়ে পড়ে। মদিনা রাষ্ট্রে এই নীতির বাস্তবায়ন ঘটেছিল অত্যন্ত স্পষ্টভাবে। রাসুলুল্লাহ সা. দেখিয়েছেন যে, দাওয়াহর স্বাধীনতা (Freedom of Belief) রক্ষা করার জন্য রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং সামরিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা কতটা জরুরি। সামরিক শক্তি ছাড়া দাওয়াহর বাণী প্রচার করা হলে তা শত্রুদের সহজ শিকারে পরিণত হতো এবং আরবের বুকে ইসলামের আলো চিরতরে নিভে যাওয়ার আশঙ্কা থাকত [16] ।
এই সামরিক প্রতিরোধের মূল দর্শন ছিল 'القوة للحفاظ على المبدأ' অর্থাৎ আদর্শ রক্ষার জন্য শক্তির ব্যবহার। মদিনা রাষ্ট্র যখনই বুঝতে পারত যে, কোনো গোত্র বা শক্তি দাওয়াহর পথকে অবরুদ্ধ করছে বা মুসলিম প্রচারকদের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে, তখনই সেখানে সামরিক অভিযান প্রেরণ করা হতো। এটি কেবল প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা ছিল না, বরং এটি ছিল একটি দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত প্রতিরোধ (Strategic Deterrence)। এই প্রতিরোধের উদ্দেশ্য ছিল আরবের বুকে এমন একটি নিরাপত্তা পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে যেকোনো ব্যক্তি বা গোত্র কোনো ধরনের ভয়ভীতি ছাড়া স্বাধীনভাবে ইসলাম গ্রহণ করতে পারে এবং প্রচার করতে পারে [17] ।
ঐতিহাসিক দলিলগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, রাসুলুল্লাহ সা. এর নেতৃত্বে পরিচালিত সারিয়্যাহ বা ছোট ছোট সামরিক অভিযানগুলোর একটি বড় অংশই ছিল দাওয়াহর পথকে নিরাপদ করার জন্য। যখনই কোনো অঞ্চলে দাওয়াহর বাণী পৌঁছানোর ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করা হতো, তখনই সামরিক শক্তির মাধ্যমে সেই বাধাকে অপসারণ করা হতো। এই সামরিক ও আদর্শিক মিথস্ক্রিয়া সম্পর্কে সীরাত গ্রন্থে বলা হয়েছে যে, রাষ্ট্রীয় শক্তি ছাড়া আদর্শের প্রচার কেবল একটি দুর্বল ও অরক্ষিত তত্ত্বে পরিণত হয়, যা যেকোনো সময় শত্রুর আঘাতে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যেতে পারে [18] ।
ইসলামি দাওয়াহর সুরক্ষার এই নিরাপত্তা ঝুঁকিগুলো কেবল সামরিক উপায়ে সমাধান করা হয়নি, বরং এর সাথে যুক্ত ছিল গভীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও কূটনৈতিক দূরদর্শিতা। রাসুলুল্লাহ সা. সামরিক শক্তিকে সর্বদা দাওয়াহর সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করেছেন, কখনো তা দাওয়াহর বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি। শক্তির এই পরিমিত ও কৌশলগত ব্যবহারই মদিনা রাষ্ট্রকে আরবের বুকে এক অপরাজেয় শক্তিতে পরিণত করেছিল এবং শত্রুভাবাপন্ন ভূখণ্ডেও দাওয়াহর সুরক্ষাকে নিশ্চিত করেছিল, যা পরবর্তীকালে ইসলামের বিশ্বব্যাপী বিজয়ের পথকে উন্মুক্ত করে দেয় [19] ।