৬.২ রোমান-আকসুমাইট জোট (Roman-Axumite Alliance): ইয়েমেনে আবিসিনীয় আগ্রাসন ও প্রক্সি ওয়ারের চূড়ান্ত রূপ
ষষ্ঠ শতাব্দীর প্রথমার্ধে আরবের দক্ষিণ প্রান্তে ইয়েমেনের ভূখণ্ডটি কেবল একটি আঞ্চলিক শক্তি কেন্দ্র ছিল না, বরং তা ছিল তৎকালীন বিশ্বের দুই পরাশক্তি—বাইজেন্টাইন (পূর্ব রোমান) সাম্রাজ্য এবং সাসানীয় পারস্য সাম্রাজ্যের ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রধান রণক্ষেত্র। এই প্রতিযোগিতার এক চূড়ান্ত রূপ ছিল রোমান-আকসুমাইট জোট, যার মাধ্যমে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য সরাসরি যুদ্ধে না নেমে আকসুমাইট (আবিসিনীয়) রাজ্যের মাধ্যমে ইয়েমেনে তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। এটি ছিল ইতিহাসের এক ধ্রুপদী 'প্রক্সি ওয়ার' বা পরোক্ষ যুদ্ধের উদাহরণ, যেখানে ধর্মীয় সংহতিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সাম্রাজ্যবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে চরিতার্থ করা হয়েছিল।
বাইজেন্টাইন-সাসানীয় দ্বৈরথ ও ইয়েমেনের কৌশলগত গুরুত্ব
তৎকালীন বিশ্বরাজনীতির মানচিত্রে বাইজেন্টাইন এবং সাসানীয় সাম্রাজ্যের মধ্যকার দ্বন্দ্ব ছিল দীর্ঘস্থায়ী এবং বহুমুখী। এই দ্বন্দ্বে কেবল সীমান্ত রক্ষা নয়, বরং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথের নিয়ন্ত্রণ ছিল প্রধান লক্ষ্য। বিশেষ করে ভারত ও পূর্ব এশিয়ার সাথে বাণিজ্যের জন্য ব্যবহৃত লোহিত সাগর এবং ভারত মহাসাগরের প্রবেশদ্বার 'বাব-আল-মান্দেব' প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ইয়েমেনের হাতে ছিল। পারস্যরা যখন স্থলপথের বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করে রোমানদের অর্থনৈতিকভাবে চাপে রাখার চেষ্টা করছিল, তখন বাইজেন্টাইন সম্রাটরা লোহিত সাগরের জলপথকে বিকল্প হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেন।
ইয়েমেনের হিময়ারি রাজবংশের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং সেখানে ইহুদি ধর্মের প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়া রোমানদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। রোমানদের দৃষ্টিতে ইয়েমেন ছিল একটি কৌশলগত 'চোক পয়েন্ট' (Choke Point), যার নিয়ন্ত্রণ থাকলে পারস্যের প্রভাব সীমিত করা সম্ভব এবং খ্রিষ্টান বিশ্বের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হবে। এই ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতাকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রোমানরা সরাসরি সামরিক অভিযান চালানোর পরিবর্তে একটি আঞ্চলিক মিত্রের মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জনে আগ্রহী ছিল, যাতে যুদ্ধের ঝুঁকি এবং ব্যয় হ্রাস পায় [1] ।
এই প্রেক্ষাপটে আকসুমাইট সাম্রাজ্য (বর্তমান ইথিওপিয়া ও এরিয়া) রোমানদের জন্য আদর্শ মিত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়। আকসুমাইটরা খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেছিল এবং তাদের সাথে বাইজেন্টাইনদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন ছিল অত্যন্ত গভীর। রোমান সম্রাট জাস্টিনিয়ান এবং তার পূর্বসূরিরা আকসুমাইট রাজাদের উৎসাহিত করেন যেন তারা লোহিত সাগরের পূর্ব তটে তাদের প্রভাব বিস্তার করে এবং ইয়েমেনের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রোমান স্বার্থের অনুকূলে নিয়ে আসে। এই জোটটি কেবল ধর্মীয় সংহতির বহিঃপ্রকাশ ছিল না, বরং এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত 'কলেক্টিভ সিকিউরিটি' (Collective Security) ব্যবস্থা, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল দক্ষিণ আরবে পারস্যপন্থী শক্তির বিনাশ ঘটানো [2] ।
ধুনুওয়াস ও নাজরান গণহত্যা: আগ্রাসনের ধর্মীয় বৈধতা
রোমান-আকসুমাইট জোটের সামরিক পদক্ষেপের জন্য একটি শক্তিশালী 'কাসাস বেল্লি' (Casus Belli) বা যুদ্ধের কারণ প্রয়োজন ছিল। ইয়েমেনের তৎকালীন শাসক ধুনুওয়াস (Dhu Nuwas) ইহুদি ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার পর খ্রিষ্টানদের প্রতি চরম দমন-পীড়ন শুরু করেন। বিশেষ করে নাজরান শহরের খ্রিষ্টানদের ওপর তার চালানো নৃশংস হত্যাকাণ্ড এবং গণহত্যা তৎকালীন খ্রিষ্টান বিশ্বে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করে। ধুনুওয়াসের এই পদক্ষেপ রোমান এবং আকসুমাইটদের জন্য একটি নৈতিক ও ধর্মীয় সুযোগ তৈরি করে দেয়, যার মাধ্যমে তারা ইয়েমেনে সামরিক হস্তক্ষেপকে 'ধর্ম রক্ষা'র নামে বৈধতা প্রদান করে।
উপরোক্ত ইবারতটি নির্দেশ করে যে, নাজরানের খ্রিষ্টানদের ওপর ধুনুওয়াসের নির্মমতা আকসুমাইট রাজাকে ইয়েমেনে হস্তক্ষেপ করার সরাসরি আহ্বান জানাতে বাধ্য করেছিল [3] । এই গণহত্যাকে কেন্দ্র করে বাইজেন্টাইন সম্রাট এবং আকসুমাইট রাজা একটি গোপন চুক্তিতে উপনীত হন, যেখানে খ্রিষ্টানদের রক্ষা করার আড়ালে ইয়েমেনের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ আকসুমাইটদের হাতে হস্তান্তরের পরিকল্পনা করা হয়। এটি ছিল প্রক্সি যুদ্ধের একটি চূড়ান্ত কৌশল, যেখানে মানবিক বিপর্যয়কে সাম্রাজ্যবাদী প্রসারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
মনস্তাত্ত্বিকভাবে, এই ঘটনাটি আকসুমাইট সৈন্যদের মধ্যে একটি ধর্মীয় উদ্দীপনা তৈরি করে। তারা নিজেদের কেবল বিজেতা হিসেবে নয়, বরং 'মুক্তিকর্তা' হিসেবে উপস্থাপন করে। অন্যদিকে, রোমানরা পর্দার আড়াল থেকে এই অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সাপোর্ট এবং কূটনৈতিক সমর্থন প্রদান করে। ধুনুওয়াসের ইহুদি শাসন এবং তার কঠোরতা ইয়েমেনের অভ্যন্তরে বিভিন্ন গোত্রীয় অসন্তোষ তৈরি করেছিল, যা আকসুমাইটদের জন্য প্রবেশের পথ সহজ করে দেয়। ফলে, একটি বহিঃশক্তির আগ্রাসন স্থানীয় জনগণের কাছে খ্রিষ্টানদের মুক্তির লড়াই হিসেবে প্রদর্শিত হয় [4] ।
আবিসিনীয় সামরিক অভিযান ও হিময়ারি শাসনের পতন
আকসুমাইট রাজা কালেব (Kaleb) একটি বিশাল নৌবাহিনী এবং পদাতিক সৈন্যদল নিয়ে লোহিত সাগর পাড়ি দিয়ে ইয়েমেনে আক্রমণ করেন। এই সামরিক অভিযানটি ছিল তৎকালীন সময়ের অন্যতম বৃহৎ উভচর অপারেশন (Amphibious Operation)। রোমানদের কৌশলগত পরামর্শ এবং নৌ-সহযোগিতার ফলে আকসুমাইটরা খুব দ্রুত ইয়েমেনের উপকূলীয় অঞ্চলগুলো দখল করে নেয়। তাদের লক্ষ্য ছিল কেবল নাজরানের খ্রিষ্টানদের উদ্ধার করা নয়, বরং পুরো হিময়ারি রাজবংশের ক্ষমতা নির্মূল করে সেখানে একটি প্রক্সি শাসন প্রতিষ্ঠা করা।
ধুনুওয়াসের বাহিনী এবং আকসুমাইটদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়। হিময়ারিদের সামরিক শক্তি যথেষ্ট হওয়া সত্ত্বেও, আকসুমাইটদের উন্নত রণকৌশল এবং রোমানদের সরবরাহকৃত গোয়েন্দা তথ্যের সামনে তারা পরাজিত হয়। ধুনুওয়াস শেষ পর্যন্ত পরাজিত ও নিহত হন, যার ফলে ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের ইহুদি-হিময়ারি শাসনের অবসান ঘটে। এই বিজয় কেবল একটি সামরিক জয় ছিল না, বরং এটি ছিল দক্ষিণ আরবে ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তনের এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত [5] ।
বিজয় পরবর্তী সময়ে আকসুমাইটরা ইয়েমেনে একটি সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠা করে। তারা সেখানে তাদের নিজস্ব গভর্নর এবং সেনাপতি নিয়োগ করে, যারা সরাসরি আকসুমাইট রাজার প্রতি অনুগত ছিল, কিন্তু পরোক্ষভাবে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের স্বার্থ রক্ষা করত। এই ব্যবস্থাটি ছিল একটি 'স্যাটেলাইট স্টেট' (Satellite State) এর আদলে, যেখানে স্থানীয় প্রশাসন পরিচালিত হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসত আবিসিনিয়া এবং কনস্টান্টিনোপল থেকে। ইয়েমেনের এই নতুন রাজনৈতিক বিন্যাস লোহিত সাগরের বাণিজ্য পথকে রোমানদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয় এবং পারস্যের প্রভাবকে সাময়িকভাবে দক্ষিণ আরব থেকে বিতাড়িত করে [6] ।
প্রক্সি ওয়ারের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব
রোমান-আকসুমাইট জোটের মাধ্যমে ইয়েমেনে যে শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা ছিল প্রক্সি ওয়ারের একটি চূড়ান্ত রূপ। এখানে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য সরাসরি কোনো সৈন্য প্রেরণ করেনি, ফলে তারা যুদ্ধের ঝুঁকি থেকে মুক্ত ছিল, কিন্তু ইয়েমেনের ওপর তাদের পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই কৌশলের মাধ্যমে রোমানরা পারস্যের সাথে তাদের দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্বে একটি নতুন কৌশলগত সুবিধা লাভ করে। দক্ষিণ আরবের এই নিয়ন্ত্রণ তাদের জন্য একটি 'বাফার জোন' (Buffer Zone) হিসেবে কাজ করেছিল, যা পারস্যের দক্ষিণমুখী প্রসারণকে বাধা প্রদান করে।
তবে এই আগ্রাসনের ফলে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোতে গভীর ফাটল ধরে। স্থানীয় আরবরা তাদের নিজস্ব শাসন হারিয়ে বিদেশি আবিসিনীয়দের অধীনে চলে আসায় তাদের মধ্যে তীব্র জাতীয়তাবাদী ক্ষোভ জন্ম নেয়। খ্রিষ্টধর্মের প্রসারের চেষ্টা করা হলেও, তা স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে ব্যর্থ হয়। ফলে, আকসুমাইট শাসন কেবল সামরিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে এবং স্থানীয় জনগণের সমর্থন হারায়। এই রাজনৈতিক অস্থিরতা পরবর্তীতে ইয়েমেনে আরও বড় ধরনের অভ্যুত্থানের পথ প্রশস্ত করে [7] ।
সামগ্রিকভাবে, রোমান-আকসুমাইট জোট প্রমাণ করে যে, প্রাচীন যুগেও ধর্ম এবং কূটনীতিকে কীভাবে সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থে ব্যবহার করা হতো। ইয়েমেনের এই প্রক্সি যুদ্ধ কেবল দুটি রাজ্যের লড়াই ছিল না, বরং এটি ছিল বিশ্ববাণিজ্য এবং আধিপত্যের এক জটিল খেলা। এই আগ্রাসনের ফলে দক্ষিণ আরবে যে রাজনৈতিক শূন্যতা এবং অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তা পরবর্তী সময়ে ইয়েমেনের ইতিহাসে এক নতুন এবং আরও বিতর্কিত অধ্যায়ের সূচনা করে, যেখানে সামরিক নেতৃত্বের পরিবর্তন এবং স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা তীব্র হয়ে ওঠে [8] ।