আধুনিক যুদ্ধবিদ্যার একটি অপরিহার্য ও সংবেদনশীল স্তম্ভ হলো 'রুলস অফ এনগেজমেন্ট' (Rules of Engagement - ROE) বা যুদ্ধের নিয়মনীতি। আন্তর্জাতিক মানবিক আইন (International Humanitarian Law) এবং ইসলামি শরীয়াহ—উভয় ক্ষেত্রেই যুদ্ধের সময় কার বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ করা যাবে এবং কার বিরুদ্ধে তা নিষিদ্ধ, এই 'পার্থক্যকরণ নীতি' (Principle of Distinction) অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচিত। যুদ্ধের ময়দানে একজন 'কমব্যাট্যান্ট' (Combatant) বা যোদ্ধা এবং একজন 'সিভিলিয়ান' (Civilian) বা অসামরিক নাগরিকের মধ্যে যে সুনির্দিষ্ট সীমারেখা বিদ্যমান, তা লঙ্ঘন করা কেবল নৈতিক অবক্ষয় নয়, বরং এটি একটি গুরুতর যুদ্ধাপরাধ। ইসলামের ইতিহাসে নবি সা. কর্তৃক প্রবর্তিত এই নীতিটি তৎকালীন আরবের বিশৃঙ্খল ও গোষ্ঠীগত যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিল, যেখানে যুদ্ধের লক্ষ্য কেবল বিজয় ছিল না, বরং ন্যায়বিচার ও মানবিকতা রক্ষা করাও ছিল অপরিহার্য।
যোদ্ধা ও গেরিলা কৌশলের বিবর্তন ও শনাক্তকরণ সমস্যা
যুদ্ধের ইতিহাসে যোদ্ধাদের (Combatants) সংজ্ঞা এবং তাদের শনাক্তকরণ সর্বদা একটি জটিল ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। প্রাক-ইসলামি আরবিয় যুদ্ধকৌশল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেখানে যোদ্ধারা প্রায়শই সুসংগঠিত বাহিনীর পরিবর্তে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উপদল বা 'হিজব' (حزب) হিসেবে বিভক্ত হয়ে যুদ্ধ করত। এই ক্ষুদ্র দলগুলো অনেক সময় 'গেরিলা যুদ্ধ' (Guerrilla Warfare) বা حرب العصابات পদ্ধতি অবলম্বন করত, যেখানে তারা প্রাকৃতিক দুর্গম স্থান যেমন—পাহাড়, জঙ্গল বা জলাভূমিতে আত্মগোপন করে শত্রুর ওপর আকস্মিক আক্রমণ চালাত।
كما يعبر عنها بلفظة "تشوع"7. وقد يتبع المحاربون طريقة حرب العصابات، وذلك بأن ينقسم الجيش إلى أحزاب وفلول مستقلة تنتشر في أماكن متباعدة، وتقاتل بمفردها أو تتعاون فيما بينها عند الحاجة
[1]
এই ধরনের অসংগঠিত বা বিচ্ছিন্ন যুদ্ধপদ্ধতি যুদ্ধের ময়দানে 'কমব্যাট্যান্ট' এবং 'সিভিলিয়ান'-এর মধ্যে পার্থক্য করাকে অত্যন্ত কঠিন করে তোলে। যখন যোদ্ধারা কোনো নির্দিষ্ট ইউনিফর্ম বা সুনির্দিষ্ট সামরিক কাঠামো ছাড়াই ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে, তখন সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। ঐতিহাসিক তথ্যানুসারে, এই যোদ্ধারা নিজেদের রক্ষার জন্য প্রাকৃতিক দুর্গমতাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করত এবং প্রয়োজনের সময় একে অপরের সাথে সহযোগিতা করত [2] । এই কৌশলগত অস্পষ্টতা যুদ্ধের সময় ব্যাপক প্রাণহানির কারণ হতে পারত, যা পরবর্তীতে ইসলামি যুদ্ধের নীতিমালার মাধ্যমে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়।
মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে, এই ধরনের 'হিজব' বা উপদলীয় যুদ্ধ পদ্ধতি যুদ্ধের ময়দানে একটি অনিশ্চয়তা তৈরি করত। যোদ্ধারা যখন বিচ্ছিন্নভাবে আক্রমণ করত, তখন শত্রু পক্ষ প্রায়শই বুঝতে পারত না যে আক্রমণকারী কোনো সুসংগঠিত সৈন্যদল নাকি সাধারণ কোনো গোষ্ঠী। এই অস্পষ্টতা যুদ্ধের সময় 'রুলস অফ এনগেজমেন্ট'-এর প্রয়োগকে বাধাগ্রস্ত করত। প্রাক-ইসলামি যুগে এই ধরনের যুদ্ধপদ্ধতি মূলত আত্মরক্ষা বা পরাজয় এড়ানোর একটি কৌশল ছিল, যা অনেক সময় অসামরিক জনপদকেও যুদ্ধের বলয়ে টেনে আনত [3] ।
প্রতিরক্ষামূলক কাঠামো ও যুদ্ধক্ষেত্রের সীমানা নির্ধারণ
যুদ্ধের ময়দানে সিভিলিয়ান এবং কমব্যাট্যান্টের মধ্যে পার্থক্য করার জন্য ভৌগোলিক ও কাঠামোগত সীমানা নির্ধারণ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রাক-ইসলামি আরবে শহর বা জনপদ রক্ষার জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা 'হাজাজাত' (حجزت) বা প্রতিবন্ধক ব্যবহার করা হতো। এই প্রতিবন্ধকগুলো কেবল সামরিক উদ্দেশ্যে নয়, বরং জনপদকে আক্রমণাত্মক শক্তি থেকে রক্ষা করার জন্য একটি 'সেফ জোন' বা নিরাপদ বলয় হিসেবে কাজ করত।
ويقال للحواجز التي يضعها المحاربون في شوارع المدينة أو في الطرق أو التي يقيمونها في ساحات المعارك لإعاقة حركات العدو: "حجزت"، أي: "حاجزة"
[4]
এই ধরনের প্রতিবন্ধক বা 'খন্দক' (خندق) বা পরিখা খনন করার মাধ্যমে যুদ্ধের এলাকা এবং সিভিলিয়ান বসবাসের এলাকাকে পৃথক করা হতো। যখন কোনো শহর বা জনপদকে দুর্ভেদ্য দুর্গ (حصون) বা প্রাচীর (جدر) দ্বারা বেষ্টিত করা হতো, তখন সেই প্রাচীরের অভ্যন্তরে অবস্থানকারী জনগোষ্ঠীকে সাধারণত অসামরিক বা সুরক্ষিত হিসেবে গণ্য করা হতো। এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো যোদ্ধাদের জন্য একটি নির্দিষ্ট 'কমব্যাট জোন' তৈরি করত, যেখানে তারা তীর বা অন্যান্য অস্ত্র দিয়ে আক্রমণ চালাতে পারত [5] ।
ভূ-রাজনৈতিকভাবে, এই দুর্গ ও প্রাচীরগুলো কেবল সামরিক প্রতিরক্ষা ছিল না, বরং এগুলো ছিল সিভিলিয়ানদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। দুর্গের ভেতরে পানির আধার (آبار) এবং খাদ্য মজুত করার ব্যবস্থা (مخازن) থাকায়, যুদ্ধের সময়ও জনপদটি একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ও সুরক্ষিত ইউনিট হিসেবে টিকে থাকত [6] । এই কাঠামোগত বিভাজনটি আধুনিক 'রুলস অফ এনগেজমেন্ট'-এর সেই ধারণার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ, যেখানে সামরিক লক্ষ্যবস্তু (Military Objective) এবং বেসামরিক বস্তুর (Civilian Object) মধ্যে একটি স্পষ্ট পার্থক্য বজায় রাখা হয়। যুদ্ধের সময় এই সীমানা লঙ্ঘন করা বা জনপদকে লক্ষ্যবস্তু করা একটি চরম অন্যায় হিসেবে বিবেচিত হতো।
পরিচয় ও সুরক্ষা: বংশীয় পরিচয় বনাম নাগরিকত্ব
যুদ্ধের নিয়মনীতি বা ROE-এর একটি অন্যতম প্রধান দিক হলো 'শনাক্তকরণ'। একজন ব্যক্তি যুদ্ধের সময় কমব্যাট্যান্ট নাকি সিভিলিয়ান, তা তার পরিচয়ের ওপর নির্ভর করে। প্রাক-ইসলামি আরবে এই পরিচয় বা 'জাতীয়তা'র ধারণাটি ছিল মূলত বংশীয় বা গোত্রীয় (Lineage/Tribal affiliation)। একজন ব্যক্তির বংশ বা গোত্রই ছিল তার প্রধান সুরক্ষা কবচ, যা আধুনিক সময়ের 'নাগরিকত্ব' (Citizenship) বা 'আইনি সুরক্ষা'-র সমতুল্য।
فالانتماء إلى عشيرة أو قبيلة أو حلف، هو حماية للمرء، وجنسية في عرف هذا اليوم؛ ولهذا صار إخلاص الأعرابي لقبيلته أمرا لازما له محتما عليه
[7]
এই বংশীয় পরিচয় বা 'নাসাব' (نسب) একজন ব্যক্তিকে যুদ্ধের ময়দানে একটি বিশেষ আইনি ও সামাজিক মর্যাদা প্রদান করত। যদি কেউ কোনো নির্দিষ্ট গোত্রের অন্তর্ভুক্ত হতো, তবে তার বিরুদ্ধে আক্রমণ করা মানে ছিল পুরো গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা। এই সামাজিক কাঠামোটি যুদ্ধের সময় একটি প্রকারের 'অনিচ্ছাকৃত সুরক্ষা' প্রদান করত, কারণ আক্রমণকারী জানত যে একজন ব্যক্তিকে আক্রমণ করলে তার পেছনে একটি শক্তিশালী গোষ্ঠী বা 'জাতীয়তা' দাঁড়িয়ে আছে [8] ।
তবে এই ব্যবস্থায় একটি বড় সীমাবদ্ধতা ছিল। শহরের বাসিন্দাদের (Hadar) ক্ষেত্রে এই বংশীয় সুরক্ষা কিছুটা শিথিল ছিল এবং তারা মূলত সরকারি বা গোত্রীয় শাসনের ওপর নির্ভর করত [9] । যুদ্ধের সময় এই পরিচয়ের অস্পষ্টতা অনেক সময় সিভিলিয়ানদের বিপন্ন করে তুলত। ইসলামি বিপ্লব এই গোত্রীয় ও বংশীয় পরিচয়ের সংকীর্ণতাকে অতিক্রম করে একটি সার্বজনীন ও ঐশ্বরিক আইনি কাঠামো প্রদান করে। নবি সা. প্রবর্তিত ব্যবস্থায় সুরক্ষা কেবল বংশের ওপর নির্ভর করত না, বরং ব্যক্তির 'অবস্থা' বা 'মর্যাদা'র (Status) ওপর নির্ভর করত। অর্থাৎ, একজন ব্যক্তি যোদ্ধা না হলে তার সুরক্ষা কেবল তার গোত্রের ওপর নয়, বরং সরাসরি মহান আল্লাহর প্রদত্ত আইনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
উপসংহারমূলক বিশ্লেষণ: সিভিলিয়ান ও কমব্যাট্যান্টের পার্থক্যকরণ
পরিশেষে বলা যায়, যুদ্ধের ময়দানে সিভিলিয়ান এবং কমব্যাট্যান্টের মধ্যে পার্থক্যকরণ কেবল একটি সামরিক কৌশল নয়, বরং এটি একটি উচ্চতর নৈতিক ও আইনি বাধ্যবাধকতা। প্রাক-ইসলামি আরবের যুদ্ধপদ্ধতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, সেখানে যোদ্ধাদের অসংগঠিত প্রকৃতি (حزب/احزب) এবং ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকসমূহের (حجزت/خندق) ব্যবহার যুদ্ধের সীমানা নির্ধারণে একটি প্রাথমিক ভূমিকা পালন করত। তবে সেই সময়ে সুরক্ষার ভিত্তি ছিল মূলত বংশীয় বা গোত্রীয় পরিচয়, যা অনেকটা আধুনিক 'নাগরিকত্ব'-এর মতো কাজ করত [10] ।
ইসলামি শরীয়াহ এই প্রাক-ইসলামি কাঠামোগুলোকে গ্রহণ করলেও সেগুলোকে একটি সুনির্দিষ্ট ও অকাট্য আইনি রূপ দান করে। যেখানে প্রাক-ইসলামি যুগে যুদ্ধের সময় সিভিলিয়ানদের সুরক্ষা ছিল মূলত তাদের গোত্রীয় শক্তির ওপর নির্ভরশীল, সেখানে নবি সা. কর্তৃক প্রবর্তিত রুলস অফ এনগেজমেন্টে সিভিলিয়ানদের সুরক্ষা ছিল একটি ঐশ্বরিক ও শর্তহীন অধিকার। যুদ্ধের সময় যোদ্ধাদের (Combatants) সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা এবং অসামরিক নাগরিকদের (Civilians) থেকে তাদের পৃথক করা ছিল যুদ্ধের অন্যতম প্রধান শর্ত। এই পার্থক্যকরণ নীতিটিই নিশ্চিত করে যে, যুদ্ধ কেবল রাজনৈতিক বা সামরিক লক্ষ্য অর্জনের মাধ্যম নয়, বরং এটি ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধের একটি পরীক্ষা।