৭.৩.৩ অন্য ইহুদি গোত্রদের (বনু নাদির ও কুরায়জা) নির্লিপ্ততা: ইহুদি কোয়ালিশনে (Jewish Coalition) ফাটল
মদিনার ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইহুদি গোত্রগুলোর অবস্থান ছিল অত্যন্ত জটিল ও বহুমুখী। যদিও বাহ্যিকভাবে একটি 'ইহুদি কোয়ালিশন' বা ইহুদি জোটের অস্তিত্ব কল্পনা করা সম্ভব ছিল, কিন্তু ঐতিহাসিক ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, এই জোটটি কোনো সুসংহত রাজনৈতিক বা সামরিক একক ছিল না। বরং বনু নাদির, বনু কুরায়জা এবং বনু কাইনুক্বা—এই তিনটি প্রধান গোত্র তাদের নিজস্ব গোত্রীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক অবস্থান এবং কৌশলগত নিরাপত্তার ওপর ভিত্তি করে বিচ্ছিন্নভাবে সক্রিয় ছিল। মদিনার সামাজিক ও রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় এই গোত্রগুলোর মধ্যে যে 'নির্লিপ্ততা' (Indifference) পরিলক্ষিত হয়, তা মূলত তাদের অভ্যন্তরীণ বিভাজন এবং একটি ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক নেতৃত্ব বা 'কমান্ড স্ট্রাকচার'-এর অনুপস্থিতিরই বহিঃপ্রকাশ। এই নিবন্ধে আমরা বিশ্লেষণ করব কীভাবে এই গোত্রগুলোর কৌশলগত নির্লিপ্ততা এবং পারস্পরিক স্বার্থের সংঘাত মদিনার ইহুদি কোয়ালিশনে একটি অপূরণীয় ফাটল সৃষ্টি করেছিল।
মদিনার সামাজিক কাঠামো ও ইহুদি কোয়ালিশনের কাঠামোগত দুর্বলতা
মদিনার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য প্রবর্তিত 'মদিনার সনদ' বা 'وثيقة المدينة' (Medina Charter) ইহুদি গোত্রগুলোর মধ্যকার সম্পর্কের একটি আইনি ও কৌশলগত কাঠামো প্রদান করেছিল। তবে এই সনদের নিরাপত্তা সংক্রান্ত ধারাগুলো (Security Dimension) বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, এটি কোনো ঐক্যবদ্ধ সামরিক জোট গঠনের পরিবর্তে বরং প্রতিটি গোষ্ঠীর স্বতন্ত্র ও স্বয়ংসম্পূর্ণ অস্তিত্বকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। সনদের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সামরিক ও আর্থিক দায়বদ্ধতার বিভাজন। যখনই কোনো সামরিক সংঘাতের সম্ভাবনা তৈরি হতো, তখন প্রতিটি গোষ্ঠীকে তাদের নিজস্ব সম্পদ ও জনবল ব্যবহার করে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হতো।
মদিনার সনদের নিরাপত্তা সংক্রান্ত এই নীতিটি ইহুদি কোয়ালিশনের জন্য একটি কাঠামোগত দুর্বলতা হিসেবে কাজ করেছিল। সনদে উল্লেখ ছিল যে, কোনো সামরিক অভিযানে অংশগ্রহণ করলে প্রতিটি পক্ষকে তাদের নিজস্ব ব্যয়ভার বহন করতে হবে।
فإذا ضم الجيش معسكرين، واحد للمسلمين وآخر لليهود، كان على كل معسكر أن يتكفل بنفقاته، فيبتاع الأسلحة ويطعم الجند من ماله الخاص. أما أن ينفق المسلمون على اليهود... [1] এই নীতিটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, ইহুদি গোত্রগুলোর মধ্যে কোনো 'সেন্ট্রাল ফাণ্ড' বা কেন্দ্রীয় তহবিল ছিল না যা দিয়ে একটি বৃহৎ ও ঐক্যবদ্ধ বাহিনী গঠন করা সম্ভব হতো। ফলে বনু নাদির বা বনু কুরায়জা যখন কোনো সংকটের সম্মুখীন হতো, তখন অন্য গোত্রগুলো তাদের সামরিক সহায়তা প্রদানের পরিবর্তে নিজেদের অর্থনৈতিক ও সামরিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই বেশি আগ্রহী ছিল। এই 'আর্থিক স্বায়ত্তশাসন' (Financial Autonomy) রাজনৈতিকভাবে তাদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিল। ফলে একটি সম্মিলিত ইহুদি প্রতিরোধ গড়ে তোলার পরিবর্তে তারা কেবল একটি 'ত্রিমাত্রিক স্বার্থগোষ্ঠী' হিসেবে টিকে ছিল, যা যেকোনো বড় ভূ-রাজনৈতিক চাপে ভেঙে পড়ার জন্য যথেষ্ট ছিল [2] ।
এই কাঠামোগত দুর্বলতা কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং মনস্তাত্ত্বিকও ছিল। যেহেতু প্রতিটি গোত্র তাদের নিজস্ব সম্পদ ও জনবল দিয়ে নিজেদের রক্ষা করার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল, তাই একটি গোত্র যখন অন্য গোত্রের বিপদে 'নির্লিপ্ত' থাকতো, তখন তা আইনিভাবে কোনো লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হতো না। এই আইনি ফাঁকটিই ইহুদি কোয়ালিশনের মধ্যকার ফাটলকে আরও চওড়া করে তোলে।
ধর্মীয় প্রভাব ও গোত্রীয় আনুগত্যের দ্বান্দ্বিকতা
মদিনার ইহুদি গোত্রগুলোর রাজনৈতিক প্রভাবের একটি বড় উৎস ছিল তাদের ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্ব ও জ্ঞান। মদিনার অউস ও খাযরাজ গোত্রগুলো মূলত পৌত্তলিক ছিল, কিন্তু ইহুদিদের সাথে দীর্ঘস্থায়ী সংস্পর্শ এবং তাদের ধর্মীয় আলোচনার ফলে অউস ও খাযরাজদের মধ্যে এক প্রকার মনস্তাত্ত্বিক ও ধর্মীয় পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল। ইহুদিরা প্রায়শই তাদের ধর্মীয় গ্রন্থ ও নবির আগমনের ভবিষ্যদ্বাণীর মাধ্যমে অউস ও খাযরাজদের ওপর এক ধরণের আধিপত্য বিস্তার করার চেষ্টা করতো।
ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, ইহুদিরা অউস ও খাযরাজদের পৌত্তলিকতার জন্য উপহাস করতো এবং তাদের একটি নতুন নবি বা ধর্মীয় সংস্কারকের আগমনের অপেক্ষায় থাকার কথা বলে প্রভাবিত করার চেষ্টা করতো।
وأن اليهود كانوا قد هيَّئوا الناس لفكرة الديانة السماوية؛ فقد كانوا أهل كتاب. وكان الأوس والخزرج وثنيين، لكن الاتصال المستمر جعل الفريقين يعرفان أديان بعضهما. وقد كان اليهود يفاخرون الأوس والخزرج بدينهم وكتابهم ويعيرونهم بوثنيتهم، ويهددونهم بقرب ظهور نبي جديد يحطم الأصنام... [3] এই ধর্মীয় প্রভাবের একটি দ্বিমুখী প্রভাব ছিল। একদিকে এটি ইহুদিদের মদিনার রাজনীতিতে একটি 'সফট পাওয়ার' (Soft Power) প্রদান করেছিল, অন্যদিকে এটি তাদের গোত্রীয় আনুগত্যের ক্ষেত্রে একটি বড় সংকট তৈরি করেছিল। ইহুদি গোত্রগুলো যখন অউস ও খাযরাজদের ওপর এই ধর্মীয় প্রভাব বিস্তার করতে চাইতো, তখন তারা মূলত তাদের রাজনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখার কৌশল হিসেবে এটি ব্যবহার করতো। কিন্তু এই প্রভাব ছিল মূলত 'ট্রানজ্যাকশনাল' বা লেনদেনভিত্তিক। যখনই ইসলামের উত্থান ঘটে এবং নবি সা. এর মাধ্যমে সেই ধর্মীয় ভবিষ্যদ্বাণীর বাস্তব প্রতিফলন ঘটে, তখনই ইহুদিদের এই মনস্তাত্ত্বিক আধিপত্য ধসে পড়ে।
বনু নাদির ও বনু কুরায়জার মতো গোত্রগুলো যখন মদিনার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নিজেদের অবস্থান পুনর্নির্ধারণ করতে চাইছিল, তখন তারা বুঝতে পেরেছিল যে তাদের ধর্মীয় প্রভাব এখন আর অউস ও খাযরাজদের ওপর কার্যকর নয়। এই উপলব্ধি তাদের মধ্যে এক ধরণের অস্তিত্ববাদী সংকট (Existential Crisis) তৈরি করে। তারা বুঝতে পারে যে, তাদের পূর্বের কৌশলগত সুবিধাগুলো এখন আর কাজ করছে না। এই পরিস্থিতির কারণে তারা একে অপরের প্রতি সহযোগিতার পরিবর্তে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য একটি বিচ্ছিন্ন ও নির্লিপ্ত অবস্থান গ্রহণ করে, যা শেষ পর্যন্ত তাদের সম্মিলিত শক্তিকে নিঃশেষ করে দেয় [4] ।
বনু নাদির ও বনু কুরায়জার কৌশলগত নির্লিপ্ততা ও রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা
বনু নাদির ও বনু কুরায়জার রাজনৈতিক আচরণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, তারা মদিনার সংকটে একটি 'কৌশলগত নির্লিপ্ততা' (Strategic Indifference) অবলম্বন করেছিল। এই নির্লিপ্ততা কোনো আকস্মিক সিদ্ধান্ত ছিল না, বরং এটি ছিল তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার একটি সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা। বনু নাদির ছিল মদিনার অন্যতম সম্পদশালী ও প্রভাবশালী গোত্র, যাদের অর্থনৈতিক ভিত্তি ছিল অত্যন্ত মজবুত। অন্যদিকে বনু কুরায়জা ছিল মদিনার দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত একটি শক্তিশালী সামরিক ও কৌশলগত অবস্থানে থাকা গোত্র।
যখনই মদিনার নিরাপত্তা বা ইহুদি কোয়ালিশনের স্বার্থে কোনো বড় পদক্ষেপের প্রয়োজন হতো, বনু নাদির বা বনু কুরায়জা তাদের নিজেদের স্বার্থের ঊর্ধ্বে গিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হতো। তাদের এই নির্লিপ্ততার মূল কারণ ছিল 'রিস্ক অ্যাভ্যারশন' বা ঝুঁকি এড়ানোর প্রবণতা। তারা বুঝতে পেরেছিল যে, যদি তারা একটি ঐক্যবদ্ধ ইহুদি জোট গঠন করে নবি সা. এর বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়, তবে তার পরিণাম হতে পারে ভয়াবহ। কিন্তু আবার যদি তারা সরাসরি কোনো পদক্ষেপ না নেয়, তবে তারা মদিনার নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় নিজেদের গুরুত্ব হারিয়ে ফেলবে।
এই দ্বিধা ও রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা তাদের মধ্যে একটি গভীর ফাটল তৈরি করে। বনু নাদির যখন তাদের রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করার চেষ্টা করছিল, তখন বনু কুরায়জা তাদের সেই প্রচেষ্টায় কোনো সক্রিয় সমর্থন বা সক্রিয় বিরোধিতা—কোনোটিই করেনি। এই 'নিউট্রালিটি' বা নিরপেক্ষতার অবস্থান আসলে একটি রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি করেছিল, যা মদিনার নতুন নেতৃত্বকে (ইসলামি রাষ্ট্র) তাদের কৌশলগত সুবিধা নিতে সাহায্য করেছিল।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, এই গোত্রগুলোর এই বিচ্ছিন্নতা ও নির্লিপ্ততা শেষ পর্যন্ত তাদের অস্তিত্বের সংকটকে আরও ত্বরান্বিত করেছিল। ইহুদিদের এই অভ্যন্তরীণ বিভাজন এবং কোয়ালিশনের অভাবই তাদের পতনকে অনিবার্য করে তুলেছিল।
ভূ-রাজনৈতিক ফলাফল: কোয়ালিশনের পতন ও খায়বারের প্রেক্ষাপট
ইহুদি কোয়ালিশনের এই ভাঙন এবং গোত্রগুলোর মধ্যকার কৌশলগত নির্লিপ্ততা মদিনার ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রকে চিরতরে বদলে দেয়। মদিনার ইহুদি গোত্রগুলোর এই অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা এবং ঐক্যহীনতা শেষ পর্যন্ত তাদের আরবের মূল ভূখণ্ড থেকে বিতাড়িত হওয়ার পথ প্রশস্ত করে। এই পতনের চূড়ান্ত পর্যায়টি ছিল খায়বারের ঘটনা, যা ইহুদিদের আরবের রাজনৈতিক ও সামরিক আধিপত্যের অবসান ঘটায়।
কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী, ইহুদিদের এই পতন ছিল তাদের অভ্যন্তরীণ বিচ্যুতি ও ঐক্যের অভাবেরই ফল।
ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, খায়বারের পরাজয় কেবল একটি সামরিক পরাজয় ছিল না, বরং এটি ছিল আরবের উপদ্বীপে ইহুদিদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক Hegemony বা আধিপত্যের অবসান। মিত্রে বা কোয়ালিশন হিসেবে কাজ করতে না পারার কারণে তারা বিচ্ছিন্নভাবে আক্রমণ ও প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছিল।
আধুনিক ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে, মদিনার ইহুদি গোত্রগুলোর এই ব্যর্থতা ছিল একটি 'কৌশলগত ভুল' (Strategic Error)। তারা একটি আধুনিক রাষ্ট্রীয় কাঠামোর পরিবর্তে প্রাচীন গোত্রীয় কাঠামোতে আটকে ছিল, যা একটি ক্রমবর্ধমান শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তির (ইসলামি রাষ্ট্র) মোকাবিলা করতে সক্ষম ছিল না। এমনকি পরবর্তীকালে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রী মোশে দাইয়ানও খায়বারের পরাজয়কে একটি ঐতিহাসিক শিক্ষা হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যা ইহুদিদের আরবের উপদ্বীপে তাদের অস্তিত্বের সমাপ্তি ঘটিয়েছিল।
পরিশেষে বলা যায়, বনু নাদির ও বনু কুরায়জার নির্লিপ্ততা এবং তাদের মধ্যকার রাজনৈতিক ও কৌশলগত বিভাজনই ছিল সেই মূল কারণ, যার ফলে মদিনার ইহুদি কোয়ালিশনটি একটি শক্তিশালী জোট হিসেবে গড়ে উঠতে ব্যর্থ হয় এবং শেষ পর্যন্ত তাদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায়।