ইসলামি ইতিহাসের গবেষণার ক্ষেত্রে উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে পাশ্চাত্য প্রাচ্যতত্ত্ববিদদের (Orientalists) উত্থান একটি আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসে। বিশেষ করে, সীরাত এবং হাদিসের ঐতিহাসিকতা ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে যে সংশয়বাদী বা রিভিশনিস্ট (Revisionist) দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়েছে, তার মূলে রয়েছেন ইগনাজ গোল্ডজিহার এবং জোসেফ শাখট। এই তাত্ত্বিক ধারার মূল লক্ষ্য ছিল প্রথাগত ইসলামি ঐতিহ্যের (Traditional Islamic Tradition) ওপর ভিত্তি করে নির্মিত সীরাত ও হাদিসের ইতিহাসকে একটি ভিন্নতর ঐতিহাসিক ও সমালোচনামূলক কাঠামোর মাধ্যমে পুনর্গঠন করা। রিভিশনিস্টদের মতে, নবি সা.-এর সমসাময়িক ঘটনাবলি এবং তাঁর নির্দেশিত হাদিসসমূহ সরাসরি তাঁর যুগ থেকে সংরক্ষিত হয়ে আসেনি, বরং পরবর্তী রাজনৈতিক ও আইনি বির্তকগুলোর প্রতিফলন হিসেবে এগুলো তৈরি হয়েছে।
এই তাত্ত্বিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হলো 'ডেটিং' বা কালানুক্রমিক বিন্যাস। রিভিশনিস্টরা দাবি করেন যে, হাদিসের সনদ (Isnad) এবং মতন (Matn) বা বিষয়বস্তু মূলত পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে (বিশেষ করে উমাইয়া ও আব্বাসীয় আমলে) রাজনৈতিক ও আইনি বৈধতা অর্জনের উদ্দেশ্যে উদ্ভাবিত হয়েছে। তারা মনে করেন, সীরাতের অনেক ঘটনা এবং হাদিসের অনেক বর্ণনা নবি সা.-এর জীবনকাল থেকে কয়েক প্রজন্ম পরে রচিত হয়েছে, যা ঐতিহাসিক সত্যতার চেয়ে তৎকালীন সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে বেশি প্রতিনিধিত্ব করে।
ইগনাজ গোল্ডজিহার: হাদিসের সমাজতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক নির্মাণবাদ
ইগনাজ গোল্ডজিহার (Ignaz Goldziher) ছিলেন রিভিশনিস্ট ধারার অন্যতম পথিকৃৎ। তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ Muhammedanische Studien-এ তিনি হাদিসের ঐতিহাসিকতা নিয়ে এক বৈপ্লবিক ও বিতর্কিত তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। গোল্ডজিহারের মূল যুক্তি ছিল এই যে, হাদিসসমূহ মূলত নবি সা.-এর প্রকৃত বাণী নয়, বরং এগুলো ইসলামের প্রাথমিক ও পরবর্তী যুগের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ধর্মতাত্ত্বিক দলগুলোর (Sectarian and Theological groups) মধ্যকার দ্বন্দ্ব ও মতপার্থক্যের ফসল। তাঁর মতে, উমাইয়া ও আব্বাসীয় আমলের বিভিন্ন গোষ্ঠী তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক ও আইনি অবস্থানকে বৈধতা দেওয়ার জন্য নবি সা.-এর নামে বিভিন্ন বর্ণনা বা হাদিস উদ্ভাবন করেছিল।
গোল্ডজিহারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হাদিসের ভাষা ও শৈলীতে একটি কৃত্রিমতা লক্ষ্য করা যায়, যা নবি সা.-এর যুগের সহজ ও সাবলীল ভাষার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি মনে করতেন, হাদিসের অনেক বর্ণনায় এক ধরণের ভাষাগত অলঙ্করণ বা কৃত্রিমতা বিদ্যমান, যা মূলত পরবর্তীকালের তাত্ত্বিকদের দ্বারা নির্মিত। এই প্রসঙ্গে তিনি ভাষাগত শৈলীর একটি বিশেষ দিক নির্দেশ করেন:
التشدق في الكلام [1] অর্থাৎ, কথা বলার ক্ষেত্রে এক ধরণের কৃত্রিমতা বা অতি-শৈল্পিকতা (Affectation in speech), যা মূলত হাদিসের মতন বা বিষয়বস্তুর বিকাশের একটি লক্ষণ হিসেবে তিনি চিহ্নিত করেছেন। তাঁর মতে, এই ধরণের ভাষাগত বৈশিষ্ট্য প্রমাণ করে যে, হাদিসগুলো সরাসরি নবি সা.-এর মুখনিঃসৃত বাণী নয়, বরং এগুলো পরবর্তীকালের পণ্ডিত ও রাজনৈতিক নেতাদের দ্বারা প্রবর্তিত একটি কাঠামো।গোল্ডজিহারের এই সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি হাদিসের 'ডেটিং' বা কালক্রম নির্ধারণে এক বিশাল শূন্যতা তৈরি করার চেষ্টা করে। তিনি দাবি করেন যে, হাদিসের সনদ বা পরম্পরা (Isnad) মূলত একটি 'আইনি বৈধতা প্রদানকারী যন্ত্র' (Legal legitimizing tool) হিসেবে কাজ করেছে। যখন কোনো আইনি মতবাদ বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়োজন হতো, তখন সেই মতবাদকে একটি শক্তিশালী সনদের মাধ্যমে নবি সা.-এর দিকে সম্বন্ধযুক্ত করা হতো। ফলে, হাদিসের ঐতিহাসিক সত্যতা এবং এর সামাজিক কার্যকারিতার মধ্যে একটি বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়। গোল্ডজিহারের এই তত্ত্বটি হাদিস শাস্ত্রের (Science of Hadith) যে কঠোর ও সূক্ষ্ম পদ্ধতিগত কাঠামো রয়েছে, তাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে একটি মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক কাঠামোয় স্থাপন করার চেষ্টা করেছে।
জোসেফ শাখট: ইসনাদের পশ্চাৎমুখী বিকাশ ও আইনি বিবর্তন
ইগনাজ গোল্ডজিহারের তাত্ত্বিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে জোসেফ শাখট (Joseph Schacht) তাঁর গবেষণার মাধ্যমে রিভিশনিস্ট মতবাদকে আরও সুসংহত ও আক্রমণাত্মক রূপ দান করেন। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ The Origins of Muhammadan Jurisprudence-এ তিনি হাদিসের 'ডেটিং' নিয়ে এক অত্যন্ত জটিল ও বিতর্কিত তত্ত্ব প্রদান করেন, যা 'ব্যাকগ্রোথ অফ ইসনাদ' (Backgrowth of Isnad) নামে পরিচিত। শাখটের মূল দাবি ছিল, হাদিসের সনদ বা পরম্পরা মূলত একটি কৃত্রিম প্রক্রিয়া, যা আইনি মতবাদগুলোকে (Legal opinions) নবি সা.-এর দিকে সম্বন্ধযুক্ত করার জন্য কালানুক্রমিকভাবে পেছনের দিকে সাজানো হয়েছে।
শাখটের মতে, ইসলামের প্রাথমিক যুগে 'সুন্নাহ' বলতে মূলত স্থানীয় প্রথা বা সাহাবায়ে কেরামের (রা.) আমল ও সিদ্ধান্তকে বোঝাত। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে যখন ইসলামি আইনশাস্ত্র (Fiqh) একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে শুরু করে, তখন এই স্থানীয় প্রথা বা সাহাবায়ে কেরামের (রা.) সিদ্ধান্তগুলোকে আরও উচ্চতর ও অকাট্য ভিত্তি প্রদানের জন্য সেগুলোকে নবি সা.-এর হাদিস হিসেবে উপস্থাপন করার প্রবণতা দেখা দেয়। অর্থাৎ, একটি মতবাদ প্রথমে কোনো একজন সাহাবি বা তাবেয়ীর মাধ্যমে প্রচলিত ছিল, এবং পরবর্তীতে সেই মতবাদটিকে আরও শক্তিশালী করতে তার সনদকে পেছনের দিকে সরিয়ে নবি সা.-এর দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায়
تقدم الحديث [2] বা হাদিসের কালানুক্রমিক অগ্রগমন বা অগ্রাধিকারের বিষয়টি একটি বিভ্রান্তিকর কাঠামো তৈরি করে, যা মূলত আইনি বৈধতা নিশ্চিত করার একটি কৌশল মাত্র।শাখটের এই বিশ্লেষণটি হাদিস শাস্ত্রের 'ইলমুল রিজাল' (Science of Men) বা বর্ণনাকারীদের জীবনী সংক্রান্ত জ্ঞানকে চ্যালেঞ্জ করে। তিনি মনে করতেন, সনদের ধারাবাহিকতা দেখে হাদিসের সত্যতা বিচার করা অসম্ভব, কারণ সনদগুলো নিজেই একটি কৃত্রিম নির্মাণ। তাঁর মতে, হাদিসের মতন বা বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, অনেক হাদিস মূলত পরবর্তীকালের আইনি বিতর্কের প্রতিফলন। তিনি দাবি করেন যে, হাদিসের ঐতিহাসিকতা এবং এর আইনি প্রয়োগের মধ্যে একটি গভীর বিচ্ছিন্নতা রয়েছে। শাখটের এই তত্ত্বটি সীরাত ও হাদিসের ডেটিং-এর ক্ষেত্রে একটি চরম সংশয়বাদ তৈরি করে, যেখানে ঐতিহাসিক সত্যতার চেয়ে আইনি বিবর্তনের প্রক্রিয়াটিই প্রধান হয়ে ওঠে।
জ্ঞানতাত্ত্বিক সংকট ও পদ্ধতিগত বিশ্লেষণ: রিভিশনিস্ট তত্ত্বের সীমাবদ্ধতা
গোল্ডজিহার এবং শাখটের এই রিভিশনিস্ট তত্ত্বগুলো ইসলামি ইতিহাসের গবেষণায় একটি গভীর জ্ঞানতাত্ত্বিক (Epistemological) সংকট তৈরি করেছিল। তাদের পদ্ধতিগত মূল ভিত্তি ছিল 'ঐতিহাসিক-সমালোচনামূলক পদ্ধতি' (Historical-Critical Method), যা মূলত বাইবেলের সমালোচনামূলক গবেষণার আদলে তৈরি। তারা মনে করেছিলেন যে, ইসলামি ঐতিহ্যকেও একইভাবে কেবল বাহ্যিক ঐতিহাসিক তথ্যের ভিত্তিতে বিচার করতে হবে এবং এর অভ্যন্তরীণ যৌক্তিকতা বা ধর্মীয় গুরুত্বকে উপেক্ষা করতে হবে।
তবে, এই রিভিশনিস্টদের তত্ত্বের একটি বড় দুর্বলতা হলো তারা হাদিস শাস্ত্রের (Science of Hadith) অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিগুলোকে সম্পূর্ণভাবে অবজ্ঞা করেছেন। হাদিস বিশারদগণ কেবল সনদের ওপর নির্ভর করেননি, বরং তারা 'মতন' বা বিষয়বস্তুর সাথে সনদের সামঞ্জস্যতা, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, এবং বর্ণনাকারীদের নির্ভরযোগ্যতা ও স্মৃতিশক্তির ওপর ভিত্তি করে একটি অত্যন্ত জটিল ও শক্তিশালী যাচাইকরণ প্রক্রিয়া গড়ে তুলেছিলেন। রিভিশনিস্টরা এই অভ্যন্তরীণ যাচাইকরণ প্রক্রিয়াকে কেবল একটি 'রাজনৈতিক কৌশল' হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, কিন্তু তারা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন যে কীভাবে হাজার হাজার বর্ণনাকারীর এই বিশাল নেটওয়ার্কটি কেবল রাজনৈতিক স্বার্থে এত নিখুঁতভাবে সাজানো সম্ভব ছিল।
তাছাড়া, গোল্ডজিহার ও শাখটের তত্ত্বটি একটি বড় ধরনের পদ্ধতিগত ত্রুটি প্রদর্শন করে। তারা ধরে নিয়েছেন যে, যদি কোনো হাদিস রাজনৈতিক বা আইনি প্রয়োজনে উদ্ভাবিত হয়, তবে তা অবশ্যই নবি সা.-এর সমসাময়িক নয়। কিন্তু তারা এই বিষয়টি বিশ্লেষণ করতে ভুলে গেছেন যে, একটি সত্য ঘটনা বা নবি সা.-এর প্রকৃত বাণীও পরবর্তীকালে রাজনৈতিক বা আইনি বিতর্কের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। অর্থাৎ, কোনো হাদিস রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হওয়া মানেই এই নয় যে, সেই হাদিসটি মিথ্যা বা নবি সা.-এর নয়। রিভিশনিস্টদের এই অসংগতিপূর্ণ সিদ্ধান্তটি ঐতিহাসিক সত্যতা এবং ঐতিহাসিক ব্যবহারের মধ্যে পার্থক্য করতে ব্যর্থ হয়েছে।
ভূ-রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রভাব ও উত্তরাধিকার
গোল্ডজিহার এবং শাখটের এই রিভিশনিস্ট তত্ত্বগুলো কেবল একাডেমিক আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি বিশ্বব্যাপী প্রাচ্যতত্ত্বের (Orientalism) একটি প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। বিংশ শতাব্দীতে পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইসলামের ইতিহাস ও আইনশাস্ত্র পড়ানোর ক্ষেত্রে এই তত্ত্বগুলো একটি প্রভাবশালী কাঠামো হিসেবে কাজ করেছে। এর ফলে, পশ্চিমা একাডেমিক মহলে ইসলামের উৎসসমূহ সম্পর্কে একটি সংশয়বাদী ও নেতিবাচক ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা অনেক ক্ষেত্রে ইসলামের ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ করে দিয়েছে।
এই তত্ত্বগুলোর বুদ্ধিবৃত্তিক প্রভাব এতটাই গভীর যে, এটি আধুনিক মুসলিম চিন্তাবিদদের মধ্যেও একটি প্রতিক্রিয় তৈরি করেছে। একদিকে যেমন পশ্চিমা একাডেমিক মহলে এই রিভিশনিস্ট তত্ত্বগুলো প্রভাবশালী, অন্যদিকে মুসলিম পণ্ডিতগণ এই তত্ত্বগুলোর পদ্ধতিগত ত্রুটি ও ঐতিহাসিক অসংগতিগুলো তুলে ধরে একটি শক্তিশালী অ্যাকাডেমিক খণ্ডন (Academic Refutation) প্রদান করেছেন। গোল্ডজিহার ও শাখটের এই তত্ত্বগুলো মূলত ইসলামের ইতিহাসের একটি 'বিচ্ছিন্নতাবাদী' (Disjunctive) দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে, যেখানে ঐতিহ্য এবং ইতিহাসকে একে অপরের পরিপন্থী হিসেবে দেখানো হয়।
পরিশেষে বলা যায়, গোল্ডজিহার এবং শাখটের রিভিশনিস্ট তত্ত্বগুলো সীরাত ও হাদিসের ডেটিং নিয়ে যে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে, তা ইসলামের ইতিহাসের গবেষণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে চিহ্নিত। যদিও তাদের তত্ত্বগুলো অত্যন্ত সুসংগঠিত এবং পদ্ধতিগতভাবে আক্রমণাত্মক, তবুও তাদের ঐতিহাসিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতাগুলো অনস্বীকার্য। তারা হাদিসের ঐতিহাসিকতাকে কেবল রাজনৈতিক ও আইনি বিবর্তনের একটি উপজাত (By-product) হিসেবে দেখতে চেয়েছেন, কিন্তু তারা হাদিস শাস্ত্রের সেই বিশাল ও বৈজ্ঞানিক কাঠামোর গভীরতা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন যা হাজার বছর ধরে এই ঐতিহ্যের সত্যতা ও বিশুদ্ধতা রক্ষা করে চলেছে।