১২.২.১ ওয়ার্কার অন্ধত্ব এবং বয়োবৃদ্ধ অবস্থা বনাম কুরআন নাযিলের সুদীর্ঘ ২৩ বছরের ঐতিহাসিক অসামঞ্জস্যতা
ঐতিহাসিক ও তাত্ত্বিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে যখন ওরিয়েন্টালিস্ট বা প্রাচ্যবিদদের সংশয়বাদ ও ইসলামের মৌলিক সত্যের সংঘাত ঘটে, তখন একটি অত্যন্ত জটিল ও সংবেদনশীল বিষয় সামনে আসে। ওরিয়েন্টালিস্ট গবেষক ওয়ার্কার (Walker) এবং তাঁর অনুসারী কিছু সংশয়বাদীরা রাসুলুল্লাহ সা.-এর জীবনের শেষ পর্যায়ের শারীরিক অবস্থা—বিশেষ করে তাঁর বার্ধক্য এবং দৃষ্টিশক্তির সম্ভাব্য অবক্ষয় বা অন্ধত্বের বিষয়টিকে কেন্দ্র করে কুরআন নাযিলের ২৩ বছরের দীর্ঘ সময়কাল নিয়ে একটি কৃত্রিম অসামঞ্জস্যতা বা 'Historical Inconsistency' তৈরির চেষ্টা করেছেন। তাঁদের মূল দাবি হলো, যদি একজন নবি বার্ধক্যের কারণে শারীরিক ও মানসিক সীমাবদ্ধতার সম্মুখীন হন, তবে কীভাবে দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে, অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে এবং জটিল আইনি ও সামাজিক বিধানসহ কুরআনের অবতীর্ণ হওয়া ও তা সংরক্ষণ করা সম্ভব হলো? এই বিতর্কটি মূলত রাসুলুল্লাহ সা.-এর মানবিয় সত্তা (Humanity) এবং তাঁর নবুওয়াতের ঐশ্বরিক কার্যাবলীর (Prophethood) মধ্যকার সম্পর্কের একটি ভুল ও ত্রুটিপূর্ণ বিশ্লেষণ।
ওহীর স্বরূপ ও অবতীর্ণ হওয়ার প্রক্রিয়া: একটি তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ
ওরিয়েন্টালিস্টদের এই সংশয়বাদ নিরসনে সর্বপ্রথম ওহী বা ঐশ্বরিক বাণী অবতীর্ণ হওয়ার প্রক্রিয়াটি গভীরভাবে অনুধাবন করা প্রয়োজন। কুরআন কেবল একটি সাধারণ গ্রন্থ নয়, বরং এটি একটি জীবন্ত প্রক্রিয়া যা বিভিন্ন স্তরে অবতীর্ণ হয়েছে। ওরিয়েন্টালিস্টরা মনে করেন, ওহী হলো একটি নিরবচ্ছিন্ন জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রবাহ যা কেবল মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু ইসলামের তাত্ত্বিক কাঠামো অনুযায়ী, ওহীর অবতীর্ণ হওয়া একটি অতিপ্রাকৃতিক (Metaphysical) ঘটনা। কুরআন কীভাবে লওহে মাহফুজ থেকে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়েছে, সে বিষয়ে আলেমদের সুনির্দিষ্ট মতামত রয়েছে।
ঐতিহাসিক ও তাত্ত্বিক দলিল অনুযায়ী, ওহীর অবতরণ প্রক্রিয়াটি মূলত তিনটি স্তরে বিভক্ত। প্রথমত, লওহে মাহফুজ থেকে নিম্নতম আসমানে (Sama' ad-Dunya) এর অবতরণ। এই বিষয়ে ইমামগণ বলেন:
أحدها: وهو الأصح والأشهر: أنه نزل إلى السماء الدنيا ليلة القدر [1] । অর্থাৎ, লাইলাতুল কদরে সমগ্র কুরআন নিম্নতম আসমানে অবতীর্ণ হয়েছে। দ্বিতীয়ত, এই আসমানি গ্রন্থটি রাসুলুল্লাহ সা.-এর ওপর দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে খণ্ড খণ্ডভাবে অবতীর্ণ হয়েছে। তৃতীয়ত, ওহীর এই প্রক্রিয়াটি রাসুলুল্লাহ সা.-এর শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে না, বরং এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত একটি সময়রেখা।
ওয়ার্কারের যুক্তিতে একটি বড় ত্রুটি হলো, তিনি ওহীকে একটি সাধারণ 'Information Transfer' বা তথ্য আদান-প্রদান হিসেবে দেখছেন, যেখানে প্রাপকের শারীরিক সক্ষমতা অপরিহার্য। কিন্তু ওহী হলো 'Divine Intervention' বা ঐশ্বরিক হস্তক্ষেপ। রাসুলুল্লাহ সা.-এর শারীরিক বার্ধক্য বা দৃষ্টিশক্তির সীমাবদ্ধতা তাঁর আধ্যাত্মিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক গ্রহণ ক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারেনি। বরং, তাঁর এই শারীরিক সীমাবদ্ধতা ও simultaneously কুরআনের অবতীর্ণ হওয়াটি একটি বড় অলৌকিকতা (Miracle) হিসেবে প্রমাণিত হয়। কুরআন নাযিলের উদ্দেশ্য ছিল মানুষের হেদায়েত এবং সঠিক পথের নির্দেশনা প্রদান:
إن القرآن الكريم نزل لهداية البشر، وإرشادهم إلى الطريق المستقيم في العقائد والأحكام ومكارم الأخلاق [2] । এই হেদায়েতের প্রক্রিয়াটি রাসুলুল্লাহ সা.-এর শারীরিক অবস্থার চেয়েও তাঁর আধ্যাত্মিক ও ঐশ্বরিক সংযোগের ওপর অধিকতর নির্ভরশীল ছিল।
সময়কাল সংক্রান্ত তাত্ত্বিক বিতর্ক: ২০ বনাম ২৩ বছর ও ঐতিহাসিক বাস্তবতা
ওরিয়েন্টালিস্টরা প্রায়ই কুরআনের অবতীর্ণ হওয়ার সময়কাল নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করেন। তাঁরা দাবি করেন যে, ২৩ বছরের দীর্ঘ সময়কালটি একটি কৃত্রিম নির্মাণ। তাঁরা রাসুলুল্লাহ সা.-এর জীবনের শেষ দিকের বার্ধক্যকে ব্যবহার করে এই সময়কালকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চান। তবে ঐতিহাসিক ও শাস্ত্রীয় দলিলের নিবিড় বিশ্লেষণে দেখা যায়, কুরআন নাযিলের সময়কাল নিয়ে প্রাচীনকালে কিছু ভিন্নমত থাকলেও, ২৩ বছরের সময়কালটিই সর্বসম্মত ও প্রমাণিত।
তফসীরবিদ ও ইতিহাসবিদদের মধ্যে এই সময়কাল নিয়ে সামান্য মতভেদ থাকলেও তা ওরিয়েন্টালিস্টদের উত্থাপিত 'অসামঞ্জস্যতা'র প্রমাণ দেয় না। উদাহরণস্বরূপ, প্রখ্যাত মুকাতিল বিন সুলাইমান (রহ.)-এর মতে, কুরআনের অবতীর্ণ হওয়ার সময়কাল ছিল ২০ বছর। তিনি তাঁর তাফসীরে উল্লেখ করেছেন:
يذهب مقاتل الى ان مدة نزول القرآن على رسول الله صلى الله عليه وسلم كانت عشرين عاما [3] । যদিও মুকাতিল (রহ.)-এর এই মতটি একটি সংখ্যালঘু মত, তবুও এটি প্রমাণ করে যে, সময়ের ব্যবধান নিয়ে তাত্ত্বিক আলোচনা ছিল, কিন্তু তা কোনোভাবেই ওহীর সত্যতা বা রাসুলুল্লাহ সা.-এর শারীরিক অবস্থার সাথে সাংঘর্ষিক ছিল না। অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ ও ঐতিহাসিকগণ ২৩ বছরের সময়কালকেই গ্রহণ করেছেন, যা রাসুলুল্লাহ সা.-এর নবুওয়াতের শুরু থেকে তাঁর ওফাত পর্যন্ত সময়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এই দীর্ঘ ২৩ বছরের সময়কালটি কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং এটি ছিল একটি সুশৃঙ্খল 'Social Engineering' এবং 'Nation Building'-এর প্রক্রিয়া। রাজনৈতিক বিজ্ঞানের ভাষায় বলতে গেলে, এটি ছিল একটি 'Gradual Legislation' বা ক্রমান্বয় আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া। যদি কুরআন একবারে নাযিল হতো, তবে তৎকালীন আরবের বিশৃঙ্খল সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামো তা গ্রহণ করতে পারত না। বার্ধক্য বা শারীরিক সীমাবদ্ধতা এখানে কোনো বাধা ছিল না, বরং এই দীর্ঘ সময়টি ছিল একটি রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সময়। রাসুলুল্লাহ সা.-এর শারীরিক অবস্থা ও ওহীর অবতীর্ণ হওয়ার মধ্যবর্তী যে সামঞ্জস্যতা ও বৈপরীত্য ওরিয়েন্টালিস্টরা দেখছেন, তা মূলত ইসলামের 'Tadrij' বা পর্যায়ক্রমিক পদ্ধতি বোঝার অক্ষমতার ফল।
শারীরিক সীমাবদ্ধতা বনাম ঐশ্বরিক জ্ঞানতত্ত্ব: একটি মনস্তাত্ত্বিক ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ
ওয়ার্কারের যুক্তির মূলে রয়েছে একটি মনস্তাত্ত্বিক ভ্রান্তি—তিনি মনে করেন, বার্ধক্য বা অন্ধত্ব একজন মানুষের জ্ঞান আহরণ ও বিতরণের ক্ষমতাকে সংকুচিত করে। কিন্তু ইসলামের প্রেক্ষাপটে রাসুলুল্লাহ সা.-এর জীবনটি হলো 'Humanity' এবং 'Divinity'-এর এক অনন্য সমন্বয়। রাসুলুল্লাহ সা.- একজন মানুষ হিসেবে বার্ধক্যের শিকার হয়েছিলেন, যা তাঁর মানবিয় সত্তার প্রমাণ। কিন্তু তাঁর মাধ্যমে যে ওহী অবতীর্ণ হচ্ছিল, তা ছিল সম্পূর্ণ ঐশ্বরিক। এই দুইয়ের মধ্যে কোনো বৈপরীত্য নেই, বরং এটিই ইসলামের মূল শিক্ষা যে, আল্লাহ তাঁর মনোনীত বান্দাদের মাধ্যমে তাঁর বাণী পৃথিবীতে প্রেরণ করেন, তাঁদের শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে।
মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, রাসুলুল্লাহ সা.-এর বার্ধক্য ও শারীরিক দুর্বলতা তাঁর আধ্যাত্মিক দৃঢ়তা ও মানসিক স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারেনি। বরং, ওহীর ভার বহন করার সময় তাঁর যে শারীরিক ও মানসিক অবস্থা তৈরি হতো, তা ছিল অত্যন্ত গভীর ও অলৌকিক। ওরিয়েন্টালিস্টরা যখন অন্ধত্বের কথা বলেন, তখন তাঁরা ভুলে যান যে, কুরআন কেবল শ্রবণের বা দর্শনের বিষয় নয়, এটি ছিল হৃদয়ের ও অন্তরাত্মার বিষয়। কুরআন নাযিলের সময় রাসুলুল্লাহ সা.- যে জ্ঞানতাত্ত্বিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষ প্রদর্শন করেছেন, তা তাঁর শারীরিক অবস্থার চেয়ে তাঁর আধ্যাত্মিক সংযোগের ওপর অধিকতর নির্ভরশীল ছিল।
ভূ-রাজনৈতিক ও সমাজতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটে, এই ২৩ বছরের সময়কালটি ছিল আরবের রাজনৈতিক মানচিত্র পরিবর্তনের একটি সুনিপুণ কৌশল। কুরআন নাযিলের মাধ্যমে যে আইনি কাঠামো (Legal Framework) এবং সামাজিক নিরাপত্তা (Collective Security) প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা অত্যন্ত ধীরগতিতে এবং সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হয়েছিল। এই প্রক্রিয়ায় রাসুলুল্লাহ সা.-এর শারীরিক অবস্থা কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেনি, বরং তাঁর বার্ধক্য ও শারীরিক অবস্থা তাঁর সাহাবায়ে কেরামদের (রা.) দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে আরও বেশি সক্রিয় করে তুলেছিল। কুরআনের সংরক্ষণ ও প্রচারের ক্ষেত্রে সাহাবায়ে কেরামদের (রা.) ভূমিকা ছিল অপরিসীম, যা ওহীর এই দীর্ঘ সময়কালকে একটি সুসংহত ও অবিভাজ্য প্রক্রিয়ায় পরিণত করেছিল।
পরিশেষে বলা প্রয়োজন যে, ওরিয়েন্টালিস্টদের এই সংশয়বাদ মূলত একটি 'Logical Fallacy' বা যুক্তির ত্রুটি। তাঁরা রাসুলুল্লাহ সা.-এর মানবিয় সীমাবদ্ধতাকে তাঁর ঐশ্বরিক কার্যাবলীর সাথে গুলিয়ে ফেলেছেন। কুরআনের অবতীর্ণ হওয়ার দীর্ঘ ২৩ বছর এবং রাসুলুল্লাহ সা.-এর বার্ধক্যের মধ্যকার যে কালানুক্রমিক সম্পর্ক, তা কোনো অসামঞ্জস্যতা নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত ঐশ্বরিক পরিকল্পনা যা মানবজাতির হেদায়েতের জন্য নির্ধারিত ছিল।