বস্তুনিষ্ঠ বা সর্বজনীন নৈতিকতা (Objective Morality)-র সংজ্ঞা ও বিশ্বজনীন নৈতিকতার সংকট
মানবচিন্তার ইতিহাসে বস্তুনিষ্ঠ বা সর্বজনীন নৈতিকতা (Objective Morality) একটি অত্যন্ত মৌলিক ও গভীর দার্শনিক অনুসন্ধানের বিষয়। অবজেক্টিভ মোরালিটি বা বস্তুনিষ্ঠ নৈতিকতা বলতে বোঝায় এমন কিছু নৈতিক মূল্যবোধ ও বিধানের অস্তিত্ব, যা মানুষের ব্যক্তিগত রুচি, সামাজিক রীতিনীতি, কিংবা কালানুক্রমিক পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করে না; বরং তা স্বাধীন, পরম ও সর্বজনীনভাবে সত্য। অর্থাৎ, কোনো কার্য—যেমন নিপীড়িতকে হত্যা করা বা চরম মিথ্যাচার—ব্যক্তি বা সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি নির্বিশেষে স্বতঃসিদ্ধভাবেই অন্যায়। মানবজাতির বিবেক অনবরত এই পরম নৈতিক সত্যতার সাক্ষ্য দেয়। কিন্তু যখনই এই সার্বিক নৈতিকতার কোনো 'অধিবিদ্যক ভিত্তি' (Metaphysical Foundation) অনুসন্ধান করা হয়, তখনই নাস্তিক্যবাদী বা সেকুলার বস্তুবাদের দার্শনিক সীমাবদ্ধতা প্রকট হয়ে ওঠে। স্রষ্টা বা পরম অস্তিত্বের ধারণা ব্যতিরেকে কেবল মানবিয় বুদ্ধি বা সামাজিক চুক্তির ওপর ভিত্তি করে কীভাবে একটি সর্বজনীন ও বাধ্যবাধকতা সৃষ্টিকারী নৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব, তা আধুনিক বস্তুবাদের অন্যতম প্রধান অনুত্তরিত প্রশ্ন।
নাস্তিক্যবাদী বা সেকুলার বস্তুবাদী দর্শনে নৈতিকতাকে কেবল সাবজেক্টিভ (Subjective) বা ব্যক্তি-আপেক্ষিক হিসেবে ব্যাখ্যা করার প্রবণতা দেখা যায়। যদি বিশ্বব্রহ্মাণ্ড কেবল জড়পদার্থ, শক্তি ও দুর্ঘটনাবশত ঘটা রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফল হয়, তবে সেখানে 'ভালো' বা 'মন্দ'-র কোনো অস্তিত্ববান মানদণ্ড (Objective Benchmark) থাকতে পারে না। দার্শনিক দৃষ্টিতে, স্রষ্টাহীন বস্তুবাদী জগতে কোনো কাজ কেবল 'কার্যকর' বা 'অকার্যকর' হতে পারে, কিন্তু বস্তুনিষ্ঠভাবে 'পাপ' বা 'পুণ্য' হতে পারে না। কোনো সমাজ যদি দাসপ্রথা বা দুর্বলদের ওপর নির্যাতনকে তাদের সামাজিক চুক্তির অন্তর্ভুক্ত করে নেয়, তবে সেকুলার আপেক্ষিকতাবাদের (Moral Relativism) কাঠামোতে সেই সমাজকে বস্তুত চূড়ান্ত অন্যায়কারী বলা অসম্ভব হয়ে পড়ে, কারণ সেখানে কোনো নিরপেক্ষ বা ঊর্ধ্বজাগতিক পরম স্কেল (Transcendent Standard) অনুপস্থিত। এর ফলে নৈতিকতা কেবল এক প্রকার ব্যক্তিগত রুচি বা ফ্যাশনে পরিণত হয়—যেমন কেউ আইসক্রিমের স্বাদ পছন্দ করে আর কেউ করে না।
ইসলামি আকীদা ও দর্শনে নৈতিকতার এই সংকটকে অত্যন্ত সুসংহতভাবে সমাধান করা হয়েছে। ইসলামি দর্শনে বিশ্বজনীন নৈতিকতা কোনো আপেক্ষিক সামাজিক চুক্তি বা মানব মস্তিষ্কের কৃত্রিম উদ্ভাবন নয়; বরং তা পরম স্রষ্টা মহান আল্লাহর সত্তাগত পবিত্রতা, প্রজ্ঞা ও আদেশের ওপর প্রতিষ্ঠিত। ইসলামি ভাবধারায় অবজেক্টিভ মোরালিটি হলো সেই বাস্তবতা, যা বিশ্বজগতের সৃষ্টির উদ্দেশ্য এবং মানুষের আদি স্বভাব বা 'ফিতরাত'-এর সাথে সংহতিপূর্ণ। পরম প্রজ্ঞাময় স্রষ্টার অস্তিত্বকে স্বীকার না করলে কোনো নৈতিক বিধান মানুষের ওপর বাধ্যবাধকতা (Moral Obligation) হিসেবে আরোপ করা যায় না। কারণ, কেবল শক্তি বা সংখ্যাগরিষ্ঠের মত কখনো আত্মিক ও নৈতিক বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করতে পারে না। অতএব, সর্বজনীন নৈতিকতাকে বস্তুনিষ্ঠ হতে হলে তার উৎসকে হতে হবে জাগতিক ও মানবিয় সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে অবস্থানকারী এক পরম সত্তা।
খোদাভীতি ও ঐশী প্রত্যাদেশ ব্যতীত সর্বজনীন নৈতিকতার যৌক্তিক অসারতা
ঐশী প্রত্যাদেশ ও খোদাভীতি বা আখেরাতের জবাবদিহিতা ব্যতীত সেকুলার দর্শনে নৈতিকতার ভিত্তি গড়ার যে প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে—যেমন কান্টের ডিওন্টোলজি (Kantian Deontology) কিংবা বেনথাম ও মিলের উপযোগবাদ (Utilitarianism)—তা স্বসং his ত জটিলতায় আক্রান্ত। উপযোগবাদে বহুসংখ্যক মানুষের সর্বাধিক সুখকে নৈতিকতার মাপকাঠি করা হয়েছে। কিন্তু পরম কোনো বিচারক বা আখেরাতের বিশ্বাস ছাড়া, 'অন্যের সুখের জন্য নিজের স্বার্থ বিসর্জন দেওয়া' কিংবা 'নিজের জীবন উৎসর্গ করা'-র মতো সর্বোচ্চ প্রবৃত্তিগুলোর কোনো যৌক্তিক উত্তর বস্তুবাদের কাছে নেই। যখন নিজের ব্যক্তিস্বার্থ এবং সমাজের বৃহত্তর স্বার্থ মুখোমুখি দাঁড়ায়, তখন একজন নাস্তিক কেন নিজের পার্থিব আনন্দ ত্যাগ করে সমাজের জন্য কষ্ট স্বীকার করবে? এই প্রশ্নের যৌক্তিক সদুত্তর একমাত্র খোদাকেন্দ্রিক নৈতিক দর্শনেই বিদ্যমান, যেখানে পার্থিব ত্যাগের বস্তুনিষ্ঠ পরকালীন প্রতিদান নিশ্চিত করা হয়েছে।
ইসলামি কালামশাস্ত্রবিদ ও উসূলবিদগণ 'হুসন ও কুবুহ' (حسن وقبح - কাজের অন্তর্নিহিত ভালো ও মন্দত্ব) বিষয়ে গভীর আলোচনা করেছেন। উলামায়ে কেরাম স্পষ্ট করেছেন যে, যদিও মানুষের বুদ্ধি বা ফিতরাত ক্ষেত্রবিশেষে কোনো জিনিসের সৌন্দর্য বা কুশ্রীতা আংশিক অনুধাবন করতে পারে, কিন্তু সেই অনুধাবনকে চূড়ান্ত সর্বজনীন আইনি ও নৈতিক বাধ্যবাধকতায় রূপান্তর করার একক অধিকার কেবল বিশ্বস্রষ্টার শরীয়তের। আল-কুরআনের সার্বিক নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি বর্ণনা করতে গিয়ে প্রখ্যাত মুফাসসির ও চিন্তাবিদ সৈয়দ কুতুব রহ. তাঁর বিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, ইসলামি নৈতিকতার মূল উৎস কোনো জাগতিক প্রথা বা পার্থিব স্বার্থ নয়, বরং তা আসমানী নির্দেশনার সাথে সংযুক্ত। তিনি লিখেন:
«إن أخلاقية الإسلام لا تستمد ولا تعتمد على اعتبارات أرضية من العرف أو المصلحة أو غيرها، إنما تستمد من السماء وتعتمد على السماء، تستمد من هتاف السماء للأرض لكي تتطلع إلى الأفق، وتستمد من صفات الله المطلقة ليحققها البشر في حدود الطاقة، كي يحققوا إنسانيتهم العليا.»অর্থাৎ, "ইসলামের নৈতিকতা পৃথিবীর কোনো রীতিনীতি, পার্থিব স্বার্থ বা লোকাচারের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং তা আসমান থেকে উৎসারিত এবং আসমানের ওপরই নির্ভর করে। এটি পৃথিবীর প্রতি আসমানের সেই আহ্বান, যা মানুষকে ঊর্ধ্ব জগতের দিকে দৃষ্টিপাত করতে শেখায় এবং আল্লাহর পরম গুণাবলীর আলোকেই মানবজাতি তাদের সাধ্যানুযায়ী উচ্চতর মানবতা অর্জন করে।" [1] (সীরাতে নববীয়্যা বিনাল الآثار والمؤلفات, পৃষ্ঠা: ৪১-৪২)। এই বক্তব্য প্রমাণ করে যে, নৈতিকতাকে যখন জাগতিক স্বার্থের (مصلحة) শিকল থেকে মুক্ত করে ঐশী উৎস থেকে গ্রহণ করা হয়, তখনই তা বস্তুনিষ্ঠ ও অপরিবর্তনীয় রূপ ধারণ করে।
এছাড়া, বিশিষ্ট হাফেজ ও ফকীহ ইবনে রজব আল-হানবালী রহ. তাঁর ‘লাতায়েফুল মাআরিফ’ গ্রন্থে মহানবি সা.-এর চরিত্রের আকর ও নৈতিকতার দৈব উৎস ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আলোচনা করেছেন যে, আল্লাহর রাসুল সা. যেসব অনন্য নৈতিক গুণাবলীতে ভূষিত ছিলেন, তা কোনো মানবিয় অনুশীলনের ফসল ছিল না, বরং তা ছিল খোদাত্ত ও দৈবভাবে নির্ধারিত এক সর্বজনীন মানদণ্ড [2] । ইবনে রজব রহ. আরও জোর দিয়ে বলেন যে, মহানবি সা. নবুওয়াত লাভের পূর্বেই যে সুমহান চরিত্রের অধিকারী ছিলেন, তা-ও ছিল ঐশী রক্ষণাবেক্ষণের অংশ, যা পরবর্তীতে ওহীর মাধ্যমে পূর্ণতা পায়। যদি নৈতিকতা কেবল মানবিয় বুদ্ধির ফসল হতো, তবে সমাজভেদে বুদ্ধির তারতম্যের কারণে নৈতিকতার মূলভিত্তি চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যেত। সুতরাং, সর্বজনীন অবজেক্টিভ মোরালিটির একমাত্র যৌক্তিক নোঙ্গর (Anchor) হলেন পরম খোদা এবং তাঁর সুনির্দিষ্ট প্রত্যাদেশ।
নবুওয়াত, ফিতরাত এবং নৈতিক পূর্ণতার দৈব ভিত্তি
ইসলামি দর্শনে স্রষ্টা কেবল একটি দূরবর্তী অস্তিত্ব নন যিনি সৃষ্টি করে ক্ষান্ত হয়েছেন; বরং তিনি মানুষকে পরম নৈতিক অনুভূতির বীজ দিয়ে সৃষ্টি করেছেন যাকে 'ফিতরাত' (স্বভাবজাত দৈব প্রবণতা) বলা হয়। এই ফিতরাত মানুষকে মৌলিক ভালো ও মন্দের প্রতি সংবেদনশীল করে তোলে। তবে মানবিয় বুদ্ধির সীমাবদ্ধতা, পরিবেশগত পঙ্কিলতা ও ব্যক্তিস্বার্থের প্রভাবে এই ফিতরাত যেন কলুষিত হতে না পারে, সেজন্য পরম করুণাময় আল্লাহ যুগে যুগে নবি ও রসূলদের প্রেরণ করেছেন। নবুওয়াতের অন্যতম প্রধানতম উদ্দেশ্য হলো মানুষের ফিতরাতের সুপ্ত নৈতিকতাবোধকে জাগ্রত করা এবং তার সার্বিক ও বস্তনিষ্ঠ রূপরেখা প্রদান করা। মানবজাতির ইতিহাসে সর্বজনীন অবজেক্টিভ মোরালিটির সর্বশ্রেষ্ঠ ও পূর্ণাঙ্গ বাস্তব প্রতিচ্ছবি হলেন আখিরী নবি হযরত মুহাম্মাদ সা.।
নৈতিকতার সংজ্ঞা ও মানবিয় আত্মার ব্যাপ্তিতে 'খুলুক' (خُلق) শব্দের সুগভীর অর্থ নিহিত রয়েছে। হাদিস ও লুগাতের বিশারদগণ 'খুলুক'-এর সংজ্ঞায় উল্লেখ করেছেন যে, এটি মানুষের বাহ্যিক আকৃতির বিপরীতে তার অভ্যন্তরীণ আত্মিক সুরতের নাম। ঐতিহ্যবাহী সনদে বর্ণিত রয়েছে:
«هي جمع خلق، والخلق بضم اللام وسكونها: الدين، والطبع، والسجية... وحقيقته أنه لصورة الإنسان الباطنة، وهي نفسه وأوصافها ومعانيها المختصة بها، بمنزلة الخلق لصورته الظاهرة وأوصافها ومعانيها المختصة.»অর্থাৎ, "খুলুক হলো মানুষের অভ্যন্তরীণ রূপ, যা তার আত্মিক বৈশিষ্ট্য ও অভ্যাসের সাথে সম্পর্কিত; যেভাবে 'খালক' (خَلق) মানুষের বাহ্যিক রূপ ও বৈশিষ্ট্যকে বোঝায়।" [3] । রাসুলুল্লাহ সা.-এর এই অভ্যন্তরীণ আত্মিক চরিত্র ও দৈব নৈতিকতার চরম পূর্ণতা প্রকাশ পেয়েছিল তাঁর নবুওয়াতের মহান মিশনে। এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ সা. নিজেই তাঁর প্রেরণের মৌলিক উদ্দেশ্য ব্যক্ত করে এরশাদ করেছেন:
«إنَّما بُعِثْتُ لِأُتَمِّمَ مَكارِمَ الأَخْلاقِ»অর্থাৎ, "আমি তো কেবল সুমহান উত্তম চরিত্রসমূহকে পূর্ণতা দান করার জন্যই প্রেরিত হয়েছি।" [4] । এই হাদিসটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, নৈতিকতার কিছু প্রাথমিক স্ফুলিঙ্গ মানব সমাজে পূর্বেও বিদ্যমান ছিল, কিন্তু সেগুলোকে দৈব সত্যের কাঠামোর আওতায় এনে সার্বজনীন, বস্তুনিষ্ঠ এবং পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়া ছিল মুহাম্মাদ সা.-এর নবুওয়াতের অন্যতম মূল দায়িত্ব।
যদি সেকুলার পণ্ডিতাভিমানীদের দাবি অনুযায়ী নৈতিকতা কেবল মানবমস্তিষ্কের বিবর্তনীয় সামাজিক প্রথা হতো, তবে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ নৈতিক মানদণ্ড হিসেবে মুহাম্মাদ সা.-এর চরিত্রের এই বৈশ্বিক সর্বজনীনতা বজায় থাকা অসম্ভব হতো। সীরাত গবেষকগণ উল্লেখ করেন যে, রাসুলুল্লাহ সা. যে পরিবেশ ও সংস্কৃতিতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, তৎকালীন আরবের অজ্ঞতা (জাহিলিয়াত) ও চরম নিষ্ঠুরতার মাঝে থেকে তাঁর পক্ষে এই স্তরের সার্বিক ও নিরপেক্ষ নৈতিকতা প্রদর্শন করা মানবিয় কোনো নিয়মে ব্যাখ্যা করা যায় না। সীরাত গ্রন্থে এসেছে, উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদিজা রা. নবুওয়াতের প্রথম ক্ষণে আল্লাহর রাসুল সা.-কে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে তাঁর যে চিরন্তন নৈতিক গুণাবলীর সাক্ষ্য দিয়েছিলেন, তা ছিল দৈব নৈতিকতার এক অনন্য দলিল:
«والله لا يخزيك الله أبداً، إنك لتصل الرحم، وتقري الضيف، وتحمل الكل، وتكسب المعدوم، وتعين على نوائب الحق»অর্থাৎ, "আল্লাহর কসম! আল্লাহ আপনাকে কখনো অপদস্থ করবেন না। নিশ্চয়ই আপনি আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখেন, মেহমানের মেহমানদারী করেন, নিঃস্বদের বোঝা বহন করেন, উপার্জনহীনকে উপার্জনের ব্যবস্থা করে দেন এবং সত্যের ওপর আসা বিপদে মানুষকে সাহায্য করেন।" [5] । নবুওয়াতের পূর্বেই এই বিশ্বজনীন বস্তুনিষ্ঠ মূল্যবোধের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, তাঁর নৈতিকতার ভিত্তি ছিল সরাসরি স্রষ্টাপ্রদত্ত ফিতরাত ও দৈব প্রজ্ঞা।
কুরআন ও নববী চরিত্রের বস্তুনিষ্ঠ নৈতিকতার ঐতিহাসিক বাস্তবায়ন: একটি ভূ-রাজনৈতিক ও দর্শনের বিশ্লেষণ
ঐতিহাসিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে অবজেক্টিভ মোরালিটির সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা ঘটে চরম বৈরিতা ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বে। পার্থিব রাজনৈতিক দর্শনগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, ম্যাকিয়াভেলি থেকে শুরু করে আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান পর্যন্ত প্রতিটি তত্ত্বই ক্ষমতা জয় ও শত্রুকে দমনের ক্ষেত্রে নৈতিকতাকে আপেক্ষিক বা গৌণ বলে মনে করে। কিন্তু ইসলামি শরীয়তে এবং রাসুল সা.-এর ভূ-রাজনৈতিক নীতিতে নৈতিকতা কখনোই কৌশলগত আপেক্ষিক বিষয় ছিল না, বরং তা ছিল স্রষ্টার নির্দেশিত এক অপরিবর্তনীয় বস্তনিষ্ঠ বাধ্যবাধকতা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা রাসুল সা.-কে যে পরম নৈতিক আদেশ প্রদান করেছিলেন, তা সর্বজনীন ক্ষমা ও সুমহান আচরণের এক চরম পরাকাষ্ঠা উপস্থাপন করে। আল্লাহ এরশাদ করেন:
«خُذِ الْعَفْوَ وَأْمُرْ بِالْعُرْفِ وَأَعْرِضْ عَنِ الْجَاهِلِينَ»অর্থাৎ, "আপনি ক্ষমার নীতি অবলম্বন করুন, সৎকাজের নির্দেশ দিন এবং অজ্ঞদের এড়িয়ে চলুন।" [6] । প্রখ্যাত মুফাসসির আল্লামা তাফসিরবিদ আল-তাহির ইবনে আশুর রহ. তাঁর 'আত-তাহরীর ওয়াত-তানবির' তাফসীরে এই আয়াতের গভীর ভাষাতাত্ত্বিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, আয়াতে ব্যবহৃত 'খুজ' (خُذِ - গ্রহণ করুন) শব্দটি এক অনন্য অলঙ্কার শাস্ত্রীয় প্রয়োগ, যার অর্থ হলো—ক্ষমাপ্রদর্শনকে আপনার স্থায়ী চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে পরিণত করুন এবং সকল পরিস্থিতিতে একে আঁকড়ে ধরে রাখুন [7] । ইবনে আশুর রহ. দেখিয়েছেন যে, কাফের ও মুশরিকদের অব্যাহত নির্যাতন, অসভ্যতা ও নিষ্ঠুরতার মুখোমুখি হয়েও আল-কুরআন রাসুল সা.-কে প্রতিশোধের পরিবর্তে 'আম ও সংজ্ঞাহীন ক্ষমা' (العفو) বেছে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে, যা সাধারণ মানবিয় ক্ষোভ ও মানসিক বৃত্তের একেবারেই বিপরীত।
সীরাতের ঐতিহাসিক ঘটনাবলী থেকে এর উজ্জ্বল উদাহরণ পাওয়া যায়। চরম শত্রু, যারা রাসুল সা.-কে দীর্ঘ বছর যাবত নির্যাতন করেছে, প্রাণনাশের চেষ্টা চালিয়েছে—যেমন সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া—তাঁর সাথে রাসুল সা.-এর আচরণ ইতিহাসকে তাজ্জব করে দেয়। হুনাইনের যুদ্ধের পর রাসুলুল্লাহ সা. সাফওয়ানকে সম্পূর্ণ উপত্যকা ভরা উট ও গবাদিপশু দান করেছিলেন। সাফওয়ান পরম বিস্ময়ে বলে উঠেছিলেন:
«أشهد ما طابت بهذا إلا نفس نبي»অর্থাৎ, "আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, কোনো নবির আত্মিক উদারতা ব্যতীত এত বিপুল দান আর কারো পক্ষে সম্ভব নয়।" [8] । বস্তুবাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে ক্ষমতার শীর্ষে অবস্থানকারী একজন বিজয়ী নেতার চরম শত্রুকে এভাবে অকাতরে দান করা এবং পরম ক্ষমা প্রদর্শন করা সম্পূর্ণ 'অযৌক্তিক' ও স্বার্থবিরোধী। কিন্তু যেহেতু রাসুল সা.-এর নৈতিক মূল্যবোধের উৎস ছিলেন স্বয়ং পরম স্রষ্টা, তাই জাগতিক লাভ-ক্ষতি বা প্রতিশোধের প্রবৃত্তি সেখানে স্থান পায়নি।
ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে প্রাচ্যবিদদের (Orientalists) সেই সমস্ত অবাস্তব দাবিও চূর্ণ হয়ে যায়, যেখানে তারা দাবি করার চেষ্টা করে যে মুহাম্মাদ সা.-এর হেরা গুহায় ধ্যান কিংবা নৈতিক শিক্ষা ছিল কোনো ব্যক্তিগত পার্থিব আকাঙ্ক্ষা বা রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনের মাধ্যম। ঐতিহাসিক সত্য নিশ্চিত করে যে, যদি তাঁর উদ্দেশ্য রাজনৈতিক সাম্রাজ্য বা পার্থিব ভোগ হতো, তবে কুরাইশরা যখন তাঁকে আরব বিশ্বের রাজত্ব, সম্পদ ও সুন্দরী নারীর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তিনি তা গ্রহণ করতেন। তদুপরি, স্বীয় সন্তান ও সহচরদের চরম ক্ষুধার্ত রেখে, আহলে সুফফাদের অনাহারী রেখে নিজে দারিদ্র্যের চরম সীমায় দিনাতিপাত করার কোনো যৌক্তিক কারণ বস্তুবাদের কাছে নেই [9] । রাসুলুল্লাহ সা. হযরত ফাতেমা রা.-কে কোনো সেবিকা না দিয়ে সাহাবাদের কষ্টের প্রতি সহানুভূতি জানিয়ে জিকিরের তালিম দিয়েছিলেন, যা এ কথাই সাব্যস্ত করে যে, তাঁর নৈতিকতা কোনো জাগতিক সুযোগ-সুবিধার ওপর দাঁড়ানো ছিল না।
অতএব, ভূ-রাজনৈতিক ও দার্শনিক উভয় বিচারেই এটি সুস্পষ্ট যে, পরম স্রষ্টার অস্তিত্ব ও ওহীর প্রচ্ছায়া ব্যতীত সার্বজনীন ও বস্তুনিষ্ঠ নৈতিকতার (Objective Morality) কোনো যৌক্তিক, অটুট ও সর্বজনীন ভিত্তি হতে পারে না। বস্তুবাদের শূন্যগর্ভ আপেক্ষিকতাবাদ মানুষকে চরম নিহিলিজম বা নৈতিক নৈরাজ্যের দিকে ঠেলে দেয়, যেখানে ভালো ও মন্দের ভেদাভেদ কেবল সংখ্যাগুরু মানুষের ক্ষণস্থায়ী খামখেয়ালির ওপর নির্ভর করে। পক্ষান্তরে, ইসলামের খোদাকেন্দ্রিক তৌহিদ ভিত্তিক নৈতিক দর্শন মানবজাতিকে এমন এক পরম, সর্বজনীন ও অপরিবর্তনীয় নৈতিক ভিত্তি প্রদান করে, যা ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের সকল সীমানা অতিক্রম করে চিরন্তন সত্য হিসেবে ভাস্বর হয়ে থাকে।