খণ্ড 1
ফন্ট:100%
থিম:

৮.১.২ ইগনাজ গোল্ডজিহার এবং জোসেফ শাখত: ইসলামি বর্ণনাবিদ্যার ওপর সংশয়বাদ (Skepticism) ও তার জবাব

ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর ইউরোপীয় প্রাচ্যতত্ত্বের (Orientalism) ইতিহাসে ইসলামি হাদিস ও সীরাত শাস্ত্রের প্রতি এক চরম সংশয়বাদী দৃষ্টিভঙ্গির সূচনা হয়। এই বুদ্ধিবৃত্তিক সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন হাঙ্গেরীয় পণ্ডিত ইগনাজ গোল্ডজিহার (Ignaz Goldziher) এবং পরবর্তীতে ব্রিটিশ গবেষক জোসেফ শাখত (Joseph Schacht)। তাঁদের মূল লক্ষ্য ছিল ইসলামি ঐতিহ্যের নির্ভরযোগ্যতাকে চ্যালেঞ্জ করা এবং হাদিস শাস্ত্রের সামগ্রিক কাঠামোকে একটি 'পরবর্তী যুগের উদ্ভাবন' হিসেবে প্রমাণ করা। তাঁদের এই দৃষ্টিভঙ্গি কেবল ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্ক ছিল না, বরং এটি ছিল একটি রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রক্ষেপণ, যার উদ্দেশ্য ছিল ইসলামের প্রাথমিক যুগের তথ্যের উৎসগুলোকে অবিশ্বস্ত হিসেবে চিহ্নিত করা [1]

ইগনাজ গোল্ডজিহারের প্রক্ষেপণ তত্ত্ব (Projection Theory) এবং ঐতিহাসিক সংশয়বাদ

ইগনাজ গোল্ডজিহার তাঁর যুগান্তকারী অথচ বিতর্কিত গ্রন্থ 'Muhammedanische Studien'-এ দাবি করেন যে, আমরা বর্তমানে যে হাদিসগুলো দেখি, তার অধিকাংশই রাসুল সা. এর প্রকৃত বাণী নয়। তাঁর মতে, ইসলামের প্রথম দুই শতাব্দীতে যে রাজনৈতিক সংঘাত, খিলাফত কেন্দ্রিক দ্বন্দ্ব এবং ধর্মতাত্ত্বিক মতপার্থক্য তৈরি হয়েছিল, সেই সময়ের মানুষ নিজেদের রাজনৈতিক ও আইনি দাবিগুলোকে বৈধতা দেওয়ার জন্য রাসুল সা. এর নামে কথা তৈরি করেছিল। গোল্ডজিহারের এই তত্ত্বকে আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় 'Legitimacy Construction' বা বৈধতা তৈরির প্রক্রিয়া বলা যেতে পারে। তিনি মনে করতেন, হাদিসগুলো মূলত তৎকালীন সমাজের সামাজিক ও রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার একটি প্রতিফলন বা 'প্রক্ষেপণ' (Projection) মাত্র [2]

গোল্ডজিহারের মতে, হাদিসের সনদ বা সূত্রগুলো ছিল কৃত্রিম। তিনি যুক্তি দেন যে, যখনই কোনো নতুন আইনি সমস্যা দেখা দিত, তখন তৎকালীন ফুকাহারা বা আইনবিদরা সেই সমস্যার সমাধান করার জন্য রাসুল সা. এর একটি কাল্পনিক বাণী তৈরি করতেন এবং তাকে প্রাচীন কোনো সাহাবির সাথে সংযুক্ত করে দিতেন। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তারা তাদের ব্যক্তিগত মতামতকে ঐশ্বরিক বা নববী কর্তৃত্ব প্রদান করতেন। গোল্ডজিহারের এই সংশয়বাদের মূল ভিত্তি ছিল এই ধারণা যে, প্রাথমিক যুগে কোনো লিখিত হাদিস সংকলন ছিল না এবং স্মৃতিনির্ভর বর্ণনার মাধ্যমে এত বিশাল তথ্যভাণ্ডার নির্ভুলভাবে সংরক্ষণ করা অসম্ভব [3]

তবে গোল্ডজিহারের এই তত্ত্বের একটি গুরুতর দুর্বলতা ছিল তাঁর তথ্যের সীমাবদ্ধতা। তিনি মূলত হাদিসের টেক্সট বা 'মতন'-এর ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন, কিন্তু হাদিস শাস্ত্রের অত্যন্ত জটিল ও সূক্ষ্ম 'ইলম আল-রিজাল' (বর্ণনাকারীদের জীবনী বিজ্ঞান) এবং 'জারহতাদিল' (ত্রুটি ও শুদ্ধি যাচাই) পদ্ধতিটিকে উপেক্ষা করেছিলেন। তিনি মনে করেছিলেন যে, বর্ণনাকারীদের সততা যাচাই করার পদ্ধতিটি নিজেই একটি পরবর্তী যুগের উদ্ভাবন, যা মূলত জাল হাদিসগুলোকে বৈধ করার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। ফলে তাঁর বিশ্লেষণটি ছিল একপাক্ষিক এবং গবেষণাধর্মী হওয়ার পরিবর্তে ছিল অনুমাননির্ভর [4]

জোসেফ শাখতের 'ইসনাদ গ্রোথ' এবং কমন লিঙ্ক তত্ত্ব

জোসেফ শাখত গোল্ডজিহারের সংশয়বাদকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যান এবং একে একটি পদ্ধতিগত রূপ দান করেন। তাঁর প্রধান দাবি ছিল 'ইসনাদ গ্রোথ' (Isnad Growth) বা সনদের ক্রমবৃদ্ধি। শাখতের মতে, প্রাথমিক যুগের আইনি সিদ্ধান্তগুলো ছিল বেনামী বা 'মুরসাল' (সূত্রহীন)। সময়ের সাথে সাথে যখন এই সিদ্ধান্তগুলোর গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে প্রয়োজন হলো, তখন সেগুলোর সাথে কৃত্রিমভাবে সাহাবিদের নাম যুক্ত করা হলো এবং শেষ পর্যন্ত তা রাসুল সা. পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া হলো। অর্থাৎ, সনদগুলো উপর থেকে নিচে নয়, বরং নিচ থেকে উপরের দিকে (Backwards) বৃদ্ধি পেয়েছে [5]

শাখত তাঁর গবেষণায় 'কমন লিঙ্ক' (Common Link) নামক একটি তত্ত্ব প্রবর্তন করেন। তিনি দাবি করেন যে, যদি একাধিক সূত্রে একই হাদিস বর্ণিত হয় এবং সেই সূত্রগুলোর একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে (একই বর্ণনাকারীর কাছে) এসে মিলিত হয়, তবে সেই ব্যক্তিটিই মূলত হাদিসটির প্রকৃত উদ্ভাবক, রাসুল সা. নন। তাঁর এই পদ্ধতিটি ছিল মূলত একটি টেক্সটুয়াল অ্যানালাইসিস, যার মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন যে, হাদিসগুলো মূলত স্থানীয় আইনি প্রথা বা 'উরফ'-এর সংকলন, যা পরবর্তীতে নববী রূপ দেওয়া হয়েছে। এটি ছিল ইসলামের প্রাথমিক যুগের ভূ-রাজনৈতিক ও আইনি বিবর্তনের একটি সংশয়বাদী ব্যাখ্যা [6]

শাখতের এই তত্ত্বের প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী, কারণ তিনি সরাসরি ইসলামের আইনি কাঠামোর (Sharia) ভিত্তিকেই চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। তিনি মনে করতেন, হাদিস শাস্ত্রের মাধ্যমে যে আইনি স্থিতিশীলতা তৈরি করা হয়েছে, তা ছিল একটি রাজনৈতিক কৌশল। তবে শাখত এই সত্যটি উপেক্ষা করেছিলেন যে, অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চলের (যেমন মদিনা, কুফা, বসরা) বর্ণনাকারীদের মধ্যে আশ্চর্যজনক সামঞ্জস্য দেখা যায়, যা কোনো একক ব্যক্তির উদ্ভাবন হলে সম্ভব হতো না। তাঁর তত্ত্বটি কেবল কিছু বিচ্ছিন্ন উদাহরণের ওপর ভিত্তি করে তৈরি ছিল, যা সামগ্রিক হাদিস সাহিত্যের বিশালতা ও বৈচিত্র্যের সামনে দাঁড়ায় না [7]

সংশয়বাদের বিপরীতে প্রামাণিক জবাব এবং ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ

গোল্ডজিহার এবং শাখতের এই সংশয়বাদের বিরুদ্ধে মুসলিম স্কলার এবং আধুনিক গবেষকরা অত্যন্ত শক্তিশালী ও তথ্যনির্ভর জবাব প্রদান করেছেন। প্রথমত, তাঁদের এই দাবি যে প্রাথমিক যুগে কোনো লিখিত রেকর্ড ছিল না, তা ঐতিহাসিকভাবে ভুল। সীরাত এবং হাদিসের প্রাথমিক সংকলনগুলো, যেমন 'সোহুফ' (Suhuf), খুব শুরুর দিকেই লেখা হয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ, 'আর-রওদ আল-আনূফ'-এর মতো গ্রন্থে আমরা দেখতে পাই অত্যন্ত বিস্তারিত বর্ণনা, যা কেবল স্মৃতিনির্ভর হতে পারে না। যেমন রাসুল সা. এর শেষ অসুস্থতার বর্ণনা:

قَالَ ابْنُ إسْحَاقَ: حَدّثَنِي يَعْقُوبُ بْنُ عُتْبَة، عَنْ مُحَمّدِ بْنِ مُسْلِمٍ الزّهْرِيّ، عَنْ عُبَيْدِ اللهِ بْنِ عَبْدِ اللهِ بْنِ عُتْبَة، عَنْ عَائِشَةَ زَوْجَ النّبِيّ صلى الله عليه وسلم، قَالَتْ: فَخَرَجَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم يَمْشِي بَيْنَ رَجُلَيْنِ مِنْ أَهْلِهِ...

[8] । এই ধরনের বিস্তারিত বর্ণনা, যেখানে নির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম (যেমন ফজল বিন আব্বাস রা. এবং আলি রা.) এবং শারীরিক অবস্থার নিখুঁত বিবরণ রয়েছে, তা প্রমাণ করে যে এই তথ্যগুলো অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সংরক্ষিত হয়েছিল, যা গোল্ডজিহারের 'প্রক্ষেপণ তত্ত্ব'কে খণ্ডন করে।

দ্বিতীয়ত, 'ইলম আল-রিজাল' বা বর্ণনাকারীদের যাচাইকরণ পদ্ধতিটি ছিল পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে কঠোর ঐতিহাসিক যাচাইকরণ পদ্ধতি। প্রতিটি বর্ণনাকারীর সততা, স্মৃতিশক্তি এবং চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করা হতো। শাখতের 'কমন লিঙ্ক' তত্ত্বটি এখানে ব্যর্থ হয়, কারণ অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, কমন লিঙ্কের আগে থাকা বর্ণনাকারীদের মধ্যেও তথ্যের চরম সামঞ্জস্য রয়েছে। আধুনিক গবেষক মুহাম্মাদ মুস্তফা আজামী প্রমাণ করেছেন যে, হাদিসের লিখিত রূপ এবং মৌখিক রূপের মধ্যে কোনো বিরোধ ছিল না, বরং তারা একে অপরের পরিপূরক ছিল। গোল্ডজিহারের দাবি করা 'রাজনৈতিক প্রক্ষেপণ' কেবল কিছু দুর্বল হাদিসের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে, কিন্তু সহীহ হাদিসগুলোর ক্ষেত্রে তা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য [9]

তৃতীয়ত, সীরাতের বিস্তারিত বিবরণগুলো, যেমন রাসুল সা. এর বিবাহ সংক্রান্ত তথ্যসমূহ, গোল্ডজিহারের তত্ত্বের বিপরীতে শক্তিশালী প্রমাণ হিসেবে কাজ করে। যেমন জয়নব বিনতে জাহাশ রা. এর বিবাহের বিবরণ:

وَتَزَوّجَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم زَيْنَبَ بنت جحش بْنِ رِئَابٍ الْأَسْدِيَةَ. زَوّجَهُ إيّاهَا أَخُوهَا أَبُو أَحْمَدَ بْنِ جَحْشٍ، وَأَصْدَقَهَا رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم أربع مائة دِرْهَمٍ...

[10] । এই বিবরণগুলোতে যে সামাজিক ও পারিবারিক জটিলতা এবং নির্দিষ্ট অঙ্কের মোহরানার উল্লেখ রয়েছে, তা কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য পরবর্তী যুগে তৈরি করা সম্ভব নয়। এই তথ্যের সূক্ষ্মতা এবং ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে যে, ইসলামি বর্ণনাবিদ্যা কেবল বিশ্বাসের ওপর নয়, বরং কঠোর প্রামাণিকতার ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। ফলে গোল্ডজিহার এবং শাখতের সংশয়বাদ কেবল একটি নির্দিষ্ট পশ্চিমা ওরিয়েন্টালিস্ট ফ্রেমওয়ার্কের অংশ ছিল, যা ইসলামের অভ্যন্তরীণ জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামোর গভীরতা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিল [11]

""
৮.১.২ ইগনাজ গোল্ডজিহার এবং জোসেফ শাখত: ইসলামি বর্ণনাবিদ্যার ওপর সংশয়বাদ (Skepticism) ও তার জবাব
আমাদের নবী সা. সীরাত বিশ্বকোষ
ha-mims.world
এ আর্টিকেলের কুইজ(5টি প্রশ্ন)

৮.১.২ ইগনাজ গোল্ডজিহার এবং জোসেফ শাখত: ইসলামি বর্ণনাবিদ্যার ওপর সংশয়বাদ (Skepticism) ও তার জবাব কুইজ

1 / 5

ইগনাজ গোল্ডজিহার তাঁর 'প্রক্ষেপণ তত্ত্ব'-এ হাদিসগুলোকে কীসের প্রতিফলন হিসেবে দাবি করেছেন?

এই আর্টিকেলটি কেমন লাগলো?

এই গবেষণাকে সহায়তা করুন

সীরাত বিশ্বকোষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আপনার সামান্য সহায়তা এই গবেষণাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

bKash / Nagad01XXXXXXXXXX(Send Money)
☕ Ko-fi দিয়ে সহায়তা

রেফারেন্স: "সীরাত বিশ্বকোষ" লিখুন

🌟 Ha-mim's World-এর একটি গবেষণা ও জ্ঞান-প্রযুক্তি প্রকল্প

কমিউনিটি রিফ্লেকশন

এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি কী শিখলেন বা আপনার অনুভূতি কী, তা সবার সাথে শেয়ার করুন।

আপনার রিফ্লেকশন শেয়ার করতে দয়া করে লগইন করুন।

লোড হচ্ছে...