১১.২ নন-কমব্যাট্যান্টদের এথিক্যাল বাউন্ডারি (Ethical Boundaries of Non-combatants)
ইসলামি যুদ্ধনীতির ইতিহাসে নন-কমব্যাট্যান্ট বা অ-যোদ্ধাদের সুরক্ষা এবং তাদের প্রতি নৈতিক আচরণ কেবল একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত ছিল না, বরং এটি ছিল একটি খোদায়ী ও নৈতিক মানদণ্ড। প্রাক-ইসলামি আরবে যুদ্ধের প্রকৃতি ছিল মূলত প্রতিশোধমূলক এবং ধ্বংসাত্মক, যেখানে বিজয়ী পক্ষ পরাজিত পক্ষের নারী, শিশু এবং বৃদ্ধদের প্রতি চরম নৃশংসতা প্রদর্শন করত। তবে রাসুল সা. এর আগমনে যুদ্ধের এই আদিম ও পাশবিক সংজ্ঞার আমূল পরিবর্তন ঘটে। তিনি যুদ্ধকে কেবল একটি সামরিক সংঘাত হিসেবে নয়, বরং একটি নৈতিক পরীক্ষার ক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন, যেখানে শত্রুর প্রতি আচরণের মাধ্যমেই ইসলামের প্রকৃত স্বরূপ প্রকাশিত হয়।
নন-কমব্যাট্যান্টদের এথিক্যাল বাউন্ডারি বা নৈতিক সীমারেখা নির্ধারণের মূল উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধের ভয়াবহতাকে সীমিত করা এবং মানবতাকে রক্ষা করা। আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনের 'জেনেভা কনভেনশন' বা 'আইটিএল' (International Humanitarian Law)-এর অনেক আগেই ইসলামি শরিয়াহ যুদ্ধের ময়দানে অ-যোদ্ধাদের জন্য একটি অভেদ্য সুরক্ষা বলয় তৈরি করে দিয়েছিল। এই সুরক্ষা বলয়টি কেবল ধর্মীয় অনুশাসনের ওপর ভিত্তি করে ছিল না, বরং এটি ছিল এক উচ্চতর মানবিক দর্শনের বহিঃপ্রকাশ, যা যুদ্ধের চরম উত্তেজনার মুহূর্তেও ন্যায়বিচার এবং করুণাকে অগ্রাধিকার দেয়।
রাসুল সা. এর যুদ্ধনীতিতে অ-যোদ্ধাদের সংজ্ঞা ছিল অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট। যারা সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে না, যারা অস্ত্র ধারণ করে না এবং যারা যুদ্ধের রণকৌশলে কোনো ভূমিকা রাখে না, তারা সকলেই এই নৈতিক সুরক্ষার আওতাভুক্ত। এই নীতিটি কেবল মুসলিমদের জন্য বাধ্যতামূলক ছিল না, বরং এটি ছিল একটি বৈশ্বিক মানবিক ঘোষণা, যা যুদ্ধের ময়দানেও মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করে। এই অধ্যায়ে আমরা অ-যোদ্ধাদের প্রতি ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গির তাত্ত্বিক ভিত্তি, মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব এবং ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব বিশ্লেষণ করব।
শান্তির মূলনীতি এবং যুদ্ধের ব্যতিক্রমিকতা
ইসলামি ভূ-রাজনীতিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো শান্তি (Sullam)। যুদ্ধের ধারণাটি এখানে কোনো স্থায়ী লক্ষ্য বা স্বাভাবিক অবস্থা নয়, বরং এটি একটি চরম ব্যতিক্রমিক পরিস্থিতি। যখন কোনো জাতি বা গোষ্ঠী অন্যায়ভাবে আক্রমণ করে অথবা চুক্তির চরম লঙ্ঘন করে, কেবল তখনই যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হয়। এই মৌলিক দর্শনের কারণেই অ-যোদ্ধাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সহজ হয়েছে, কারণ ইসলামের দৃষ্টিতে যুদ্ধের উদ্দেশ্য ধ্বংস করা নয়, বরং শান্তি ও ন্যায়বিচার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।
فإن كان الأصل في العلاقة مع غير المسلمين هو: السلم، فمقتضى ذلك أنه هو القاعدة العامة، والحرب أمر استثنائي خارق للقاعدة، والناس في الأصل مسالمون تنشأ بينهم [1] উপরোক্ত ইবারতটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, ইসলামি আইনশাস্ত্রে অ-মুসলিমদের সাথে সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো শান্তি। যুদ্ধকে এখানে 'খারেক লিল কায়েদা' বা নিয়মের ব্যতিক্রম হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এই দৃষ্টিভঙ্গিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ যখন যুদ্ধকে একটি ব্যতিক্রম হিসেবে দেখা হয়, তখন যুদ্ধের ময়দানে অ-যোদ্ধাদের হত্যা বা নির্যাতন করাটা কেবল অপরাধ নয়, বরং তা ইসলামের মূল দর্শনের পরিপন্থী হয়ে দাঁড়ায়। এই নীতিটি যুদ্ধের ভয়াবহতাকে সংকুচিত করে এবং অ-যোদ্ধাদের জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করে, যা আধুনিক 'কলেক্টিভ সিকিউরিটি' (Collective Security) ধারণার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
রাসুল সা. এর এই দৃষ্টিভঙ্গি তৎকালীন আরবের গোত্রীয় যুদ্ধের সংঘাতময় পরিবেশের সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল। আরবে যুদ্ধ মানেই ছিল প্রতিপক্ষের সবকিছু ধ্বংস করা, কিন্তু রাসুল সা. যুদ্ধকে একটি নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়ায় রূপান্তর করেন। তিনি শিখিয়েছেন যে, যুদ্ধ কেবল সেই ব্যক্তির সাথে হবে যে অস্ত্র হাতে নিয়েছে, আর যে অস্ত্র ত্যাগ করেছে বা যে কখনোই অস্ত্র ধারণ করেনি, তার প্রতি করুণা প্রদর্শন করাই হলো প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য। এই নৈতিক সীমারেখাটি যুদ্ধের ময়দানে এক নতুন মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের সূচনা করে, যেখানে শত্রুপক্ষও মুসলিমদের এই অনন্য মানবিক আচরণ দেখে অভিভূত হয়ে পড়ত।
সুতরাং, অ-যোদ্ধাদের সুরক্ষা কেবল একটি আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল না, বরং এটি ছিল শান্তির প্রতি ইসলামের অটল অঙ্গীকারের প্রতিফলন। যখন যুদ্ধকে একটি অপ্রীতিকর প্রয়োজনীয়তা হিসেবে দেখা হয়, তখন অ-যোদ্ধাদের প্রতি নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন করাটা অর্থহীন হয়ে পড়ে। এই দর্শনের মাধ্যমেই রাসুল সা. যুদ্ধের ময়দানেও একটি নৈতিক শাসনব্যবস্থা কায়েম করেছিলেন, যা মানব ইতিহাসের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। [2] নন-কমব্যাট্যান্টদের সুরক্ষার নৈতিক ও ঐশ্বরিক ভিত্তি
রাসুল সা. এর যুদ্ধনীতিতে অ-যোদ্ধাদের প্রতি যে সুরক্ষা প্রদান করা হয়েছে, তার উৎস ছিল তাঁর সহজাত এবং ঐশ্বরিক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। তাঁর নৈতিকতা কেবল কোনো জাগতিক লাভ-লোকসানের হিসাব বা রাজনৈতিক কৌশলের ফসল ছিল না, বরং এটি ছিল আসমানি নির্দেশনার বাস্তব রূপ। তিনি যুদ্ধের ময়দানেও সেই একই আদর্শ মেনে চলেছেন যা তিনি সাধারণ জীবনে পালন করতেন। এই চারিত্রিক দৃঢ়তা অ-যোদ্ধাদের জন্য এক অভেদ্য নিরাপত্তা দেয়, কারণ তারা জানত যে রাসুল সা. এর নির্দেশনায় কোনো অবস্থাতেই নিরপরাধ মানুষকে কষ্ট দেওয়া সম্ভব নয়।
রাসুল সা. এর এই উচ্চমার্গীয় নৈতিকতা তাঁর জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলো ছিল 'জাবিল্লি' বা সহজাত, যা তাঁকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করেছিল। যুদ্ধের ময়দানে যখন ক্রোধ এবং প্রতিহিংসা চরম পর্যায়ে থাকে, তখন এই সহজাত নৈতিকতা তাঁকে অ-যোদ্ধাদের প্রতি দয়ালু হতে উদ্বুদ্ধ করত। এটি প্রমাণ করে যে, ইসলামের যুদ্ধনীতি কেবল কিছু লিখিত নিয়মের সমষ্টি নয়, বরং এটি ছিল একটি জীবন্ত আদর্শের প্রতিফলন।
بزغ فجر الإسلام، وسطع نوره على أرجاء الأرض وبعث الرسول الخاتم والرحمة المهداة محمد صلى الله عليه وسلم فغير مبادئ الحروب، وقيدها بأهداف سامية، وضبطها بأخلاق [3] এই ইবারতটি স্পষ্ট করে যে, রাসুল সা. যুদ্ধের মূলনীতিগুলোকেই পরিবর্তন করে দিয়েছিলেন। তিনি যুদ্ধকে 'সামিয়া' বা উচ্চতর লক্ষ্য এবং নৈতিকতার শিকলে বেঁধে ফেলেছিলেন। এর ফলে যুদ্ধ আর কেবল রক্তপাতের মাধ্যম হিসেবে থাকেনি, বরং তা হয়ে উঠেছিল সত্য ও ন্যায়ের লড়াই। অ-যোদ্ধাদের সুরক্ষা এই উচ্চতর লক্ষ্যেরই একটি অংশ। যখন যুদ্ধের লক্ষ্য হয় মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোতে আনা, তখন নিরপরাধ অ-যোদ্ধাদের হত্যা করা সেই লক্ষ্যের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এই নৈতিক সীমাবদ্ধতা যুদ্ধের ময়দানে এক ধরণের 'এথিক্যাল ফিল্টার' হিসেবে কাজ করত, যা কেবল যোদ্ধাদের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত করত।
রাসুল সা. এর এই নৈতিক অবস্থান কেবল মুসলিম বাহিনীর জন্য নির্দেশ ছিল না, বরং এটি ছিল সমগ্র মানবজাতির জন্য একটি বার্তা। তিনি দেখিয়েছেন যে, চরম শত্রুর সাথে যুদ্ধের সময়ও মানবিকতা বজায় রাখা সম্ভব। এই দৃষ্টিভঙ্গিটি অ-যোদ্ধাদের মনে এক ধরণের নিরাপত্তা বোধ তৈরি করত, যা অনেক ক্ষেত্রে শত্রুপক্ষকে যুদ্ধের পরিবর্তে আলোচনার টেবিলে আসতে উৎসাহিত করত। সুতরাং, অ-যোদ্ধাদের সুরক্ষা ছিল রাসুল সা. এর সেই সামগ্রিক নৈতিক কাঠামোর অংশ, যা আসমানি উৎস থেকে প্রাপ্ত এবং মানবিয় সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে। [4] ন্যায়বিচার এবং অ-যোদ্ধাদের অধিকার রক্ষা
ইসলামি যুদ্ধনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো 'আদল' বা ন্যায়বিচার। যুদ্ধের ময়দানে যখন ক্ষমতা এবং শক্তির ভারসাম্য একদিকে থাকে, তখন দুর্বল এবং অ-যোদ্ধাদের অধিকার রক্ষা করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। রাসুল সা. এই চ্যালেঞ্জটি মোকাবিলা করেছেন কঠোর ন্যায়বিচারের মাধ্যমে। তাঁর কাছে ন্যায়বিচার কেবল বন্ধুদের জন্য ছিল না, বরং তা ছিল শত্রুর জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য। অ-যোদ্ধাদের প্রতি অন্যায় আচরণ করাকে তিনি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছিলেন, কারণ এটি ইসলামের মৌলিক ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
وبناءا على ذلك، فإن من أعظم خصائص الحروب النبوية: العدل والبعد عن الظلم والجزر بجميع أشكاله وأنواعه، فكان عليه السلام يراعي حقوق الآخرين ولو كانوا كفارا أو [5] উপরোক্ত ইবারতটি থেকে প্রতীয়মান হয় যে, নববী যুদ্ধের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল ন্যায়বিচার এবং সব ধরণের জুলুম ও নৃশংসতা থেকে দূরে থাকা। রাসুল সা. অ-মুসলিমদের অধিকারের প্রতি অত্যন্ত যত্নবান ছিলেন, এমনকি তারা যখন চরম শত্রু হিসেবে গণ্য হতো তখনও। এই নীতিটি অ-যোদ্ধাদের জন্য একটি আইনি ঢাল হিসেবে কাজ করত। যুদ্ধের ময়দানে কোনো অ-যোদ্ধাকে হত্যা করা বা তার সম্পদ লুণ্ঠন করাকে কেবল সামরিক অপরাধ নয়, বরং তা হিসেবে গণ্য করা হতো একটি গুরুতর ধর্মীয় পাপ হিসেবে।
এই ন্যায়বিচারের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। যখন অ-যোদ্ধারা দেখল যে, মুসলিম বাহিনী বিজয়ী হয়েও তাদের প্রতি কোনো অন্যায় করছে না, বরং তাদের অধিকার রক্ষা করছে, তখন তাদের মনে ইসলামের প্রতি এক ধরণের শ্রদ্ধা জন্ম নিল। এটি ছিল এক ধরণের 'সফট পাওয়ার' (Soft Power) ডিপ্লোম্যাসি, যা তলোয়ারের চেয়ে বেশি কার্যকর ছিল। অ-যোদ্ধাদের প্রতি এই ন্যায়বিচার প্রমাণ করে যে, ইসলাম কেবল শক্তির মাধ্যমে আধিপত্য বিস্তার করতে চায় না, বরং নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের মাধ্যমে মানুষের হৃদয় জয় করতে চায়।
রাসুল সা. এর এই ন্যায়বিচারবোধ কেবল যুদ্ধের ময়দানে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ছিল তাঁর সামগ্রিক জীবনদর্শনের অংশ। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, আল্লাহ তাআলা ন্যায়বিচার পছন্দ করেন এবং মুমিনদের কাছ থেকেও সেই একই প্রত্যাশা করেন। তাই যুদ্ধের চরম উত্তেজনার মুহূর্তেও তিনি তাঁর সাহাবিদের সতর্ক করতেন যেন কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। এই কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং ন্যায়বিচারের প্রতি আনুগত্যই ইসলামি যুদ্ধনীতিকে বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে মানবিক যুদ্ধনীতিতে পরিণত করেছে। [6] ক্ষমা এবং কৌশলগত কূটনীতির সমন্বয়
নন-কমব্যাট্যান্টদের প্রতি আচরণের ক্ষেত্রে রাসুল সা. কেবল সুরক্ষাই প্রদান করেননি, বরং তিনি ক্ষমার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। কুরআনের নির্দেশনায় তিনি অ-যোদ্ধাদের এবং এমনকি শত্রুদের প্রতিও ক্ষমাশীল হতে উৎসাহিত হয়েছেন। এই ক্ষমা কেবল ব্যক্তিগত দয়া ছিল না, বরং এটি ছিল একটি উচ্চতর কৌশলগত কূটনীতি। যখন একজন বিজয়ী পক্ষ পরাজিত অ-যোদ্ধাদের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করে, তখন তা শত্রুর মনে এক ধরণের নৈতিক পরাজয় তৈরি করে এবং তাদের হৃদয়ে ইসলামের প্রতি আকর্ষণ বৃদ্ধি করে।
{خُذِ الْعَفْوَ وَأْمُرْ بِالْعُرْفِ وَأَعْرِضْ عَنِ الْجَاهِلِينَ (199)} [7] এই আয়াতের নির্দেশনায় রাসুল সা. কে ক্ষমা গ্রহণ করতে এবং সৎকাজের আদেশ দিতে বলা হয়েছে। এই 'আফউ' বা ক্ষমা কেবল সাধারণ ক্ষমা নয়, বরং এটি ছিল চরম প্রতিকূলতার মাঝেও শত্রুর প্রতি উদারতা প্রদর্শনের নির্দেশ। অ-যোদ্ধাদের ক্ষেত্রে এই ক্ষমাটি ছিল অত্যন্ত কার্যকর। যখন তারা দেখল যে, তাদের প্রতি কোনো প্রতিশোধ নেওয়া হচ্ছে না, বরং তাদের সাথে সদয় আচরণ করা হচ্ছে, তখন তাদের মধ্যকার ঘৃণা ও বিদ্বেষ দূর হয়ে গেল। এটি ছিল এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর, যা যুদ্ধের ধ্বংসলীলাকে প্রশমিত করে শান্তির পথ প্রশস্ত করল।
এই ক্ষমাশীলতা এবং উদারতা রাসুল সা. এর চারিত্রিক দৃঢ়তার প্রমাণ। তিনি জানতেন যে, প্রতিশোধ নেওয়া সহজ, কিন্তু ক্ষমা করা কঠিন। তবে তিনি কঠিন পথটিই বেছে নিয়েছিলেন কারণ তিনি জানতেন যে, দীর্ঘমেয়াদী শান্তি কেবল ক্ষমার মাধ্যমেই সম্ভব। এই কৌশলটি আধুনিক কূটনীতির 'রিকনসিলিয়েশন' (Reconciliation) বা পুনর্মিলন প্রক্রিয়ার সাথে হুবহু মিলে যায়। অ-যোদ্ধাদের প্রতি এই ক্ষমা প্রদর্শন করে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, ইসলামের লক্ষ্য রক্তপাত নয়, বরং মানুষের হৃদয়ে ঈমানের আলো জ্বালানো।
সুতরাং, অ-যোদ্ধাদের প্রতি ক্ষমার এই নীতিটি কেবল ধর্মীয় আচার ছিল না, বরং এটি ছিল এক গভীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা। এই উদারতার ফলে অনেক অ-যোদ্ধা এবং এমনকি অনেক যোদ্ধা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তারা বুঝতে পেরেছিলেন যে, এই নতুন ধর্মটি কেবল শক্তির পূজা করে না, বরং এটি মানুষের মর্যাদা এবং সম্মানের কথা বলে। এই নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বই ইসলামকে খুব অল্প সময়ে আরবের মরুভূমি থেকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করেছে। [8] বন্দী এবং অসহায়দের প্রতি মানবিক আচরণ
যুদ্ধের ময়দানে যখন কোনো যোদ্ধা পরাজিত হয়ে বন্দী হয়, তখন সে আর 'কমব্যাট্যান্ট' থাকে না, বরং সে 'নন-কমব্যাট্যান্ট' বা অ-যোদ্ধার কাতারে চলে আসে। ইসলামি যুদ্ধনীতিতে বন্দীদের প্রতি আচরণের বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং মানবিক। রাসুল সা. বন্দীদের প্রতি এমন আচরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন যা তৎকালীন বিশ্বের জন্য ছিল অভাবনীয়। বন্দীদের সাথে সদয় আচরণ করা, তাদের খাদ্য ও বস্ত্রের ব্যবস্থা করা এবং তাদের সাথে সম্মানজনক ব্যবহার করা ছিল ইসলামের বাধ্যতামূলক নিয়ম।
أولا: حسن معاملة الأسرى والرقيق والسبي: أمر الإسلام بحسن معاملة الأسرى والرقيق والسبي بعد أن تضع الحرب أوزارها، وقد أرشد الله عز وجل إلى الإحسان في معاملة [9] এই ইবারতটি থেকে স্পষ্ট হয় যে, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর বন্দী, দাস এবং যুদ্ধবন্দীদের সাথে সুন্দর আচরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইসলাম এখানে 'ইহসান' বা সর্বোচ্চ পর্যায়ের দয়ার কথা বলেছে। বন্দীদের প্রতি এই মানবিক আচরণ কেবল তাদের প্রতি দয়া ছিল না, বরং এটি ছিল ইসলামের সেই বৈশ্বিক মানবিকতার অংশ যা জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের জন্য প্রযোজ্য। বন্দীদের সাথে খারাপ ব্যবহার করা বা তাদের ওপর নির্যাতন চালানোকে ইসলাম কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে।
রাসুল সা. এর এই নীতিটি বন্দীদের মনে এক ধরণের মানসিক প্রশান্তি এনে দিত। তারা দেখত যে, তাদের শত্রুরা তাদের প্রতি এমন দয়া দেখাচ্ছে যা তারা নিজেদের আত্মীয়দের কাছ থেকেও পায়নি। এই আচরণটি বন্দীদের মনে ইসলামের প্রতি এক গভীর শ্রদ্ধা তৈরি করত। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, বন্দীরা মুসলিমদের এই মানবিক আচরণে মুগ্ধ হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। এটি প্রমাণ করে যে, মানবিকতা এবং দয়া যুদ্ধের ময়দানেও সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হতে পারে।
এছাড়া, অসহায় এবং নিঃস্বদের প্রতি রাসুল সা. এর যে মমতা ছিল, তা অ-যোদ্ধাদের সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি বড় ভূমিকা পালন করেছে। তিনি কেবল যুদ্ধবন্দীদের নয়, বরং যুদ্ধের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ মানুষের প্রতিও দয়া প্রদর্শন করেছেন। তাঁর এই সামগ্রিক মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি অ-যোদ্ধাদের জন্য এক নিরাপদ আশ্রয় তৈরি করেছিল, যেখানে তারা জানত যে ইসলাম তাদের ক্ষতি করবে না, বরং তাদের অধিকার রক্ষা করবে। এই মানবিক মানদণ্ডই ইসলামি যুদ্ধনীতিকে ইতিহাসের পাতায় এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। [10]