একুশ শতকের বৈশ্বিক বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমণ্ডলে ইসলাম এক অভূতপূর্ব আদর্শিক সংকটের (Ideological Crisis) মুখোমুখি হয়েছে। একদিকে পশ্চিমা সেক্যুলার ও লিবারেল হেজিমোনির আগ্রাসী ডিসকোর্স, অন্যদিকে মুসলিম বিশ্বের অভ্যন্তরীণ মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক বিপর্যয়—এই দুইয়ের মধ্যবর্তী সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে ইসলামি চিন্তাজগতকে এক আত্মরক্ষামূলক বা অপোলজেটিক (Apologetic) অবস্থানের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। আধুনিক মুসলিম বুদ্ধিজীবী ও অপোলজিস্টদের একটি বড় অংশ পশ্চিমা আধুনিকতার মাপকাঠিতে ইসলামকে "যৌক্তিক" ও "শান্তিবাদী" প্রমাণ করার তাগিদে সীরাতের মূলধারার ঐতিহাসিক বাস্তবতা ও রাজনৈতিক দর্শনকে আংশিক বা বিকৃতভাবে উপস্থাপন করছেন। এই বুদ্ধিবৃত্তিক সংকটের স্বরূপ উন্মোচন এবং সীরাতের বাস্তববাদী ও সার্বভৌম রূপরেখার আলোকে তার তাত্ত্বিক পুনর্গঠনই এই অধ্যায়ের মূল প্রতিপাদ্য।
আধুনিক মতাদর্শিক মেরুকরণ: চরমপন্থা বনাম রাজনৈতিক আপসকামিতা
একুশ শতকে মুসলিম উম্মাহর বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক অঙ্গন দুটি চরমপন্থী ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়েছে, যা ইসলামের প্রকৃত দাওয়াত ও সীরাতের মূলধারা থেকে বিচ্যুত। প্রথম ধারাটি হলো চরমপন্থী ও উগ্রবাদী গোষ্ঠীসমূহ, যারা কৌশলগত বাস্তবতা ও শরীয়তের মাকাসিদকে উপেক্ষা করে কেবল সশস্ত্র সংঘাত, গুপ্তহত্যা ও আত্মঘাতী হামলার মাধ্যমে পরিবর্তন আনতে চায়। তারা সমাজ ও রাষ্ট্রের মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর এবং ঈমানি ভিত্তির পুনর্গঠনকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের সহিংস পথ বেছে নিয়েছে। এর ফলে মুসলিম উম্মাহর সামগ্রিক শক্তি অপচয় হচ্ছে এবং ইসলামোফোবিয়ার পথ সুগম হচ্ছে। সমকালীন এই সংকটের চিত্র অঙ্কন করে ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন:
"فريق من المسلمين ظنوا أن المواجهة المسلحة مع الباطل هي الطريق الصحيح؛ فبدأوا بالقتل والاغتيالات والتفجيرات للمسلم وغير المسلم، ومنهم من كَفَّرَ أباه وأمه، واستحل دمه، ومع ذلك فقد وصلوا إلى طريق مسدود وضاعت الثمار والجهود."অর্থাৎ, "মুসলমানদের একটি দল মনে করেছিল যে বাতিলের বিরুদ্ধে সশস্ত্র মোকাবিলাই একমাত্র সঠিক পথ; ফলে তারা মুসলিম ও অমুসলিম নির্বিশেষে হত্যা, গুপ্তহত্যা ও বোমা হামলা শুরু করে। এমনকি তাদের কেউ কেউ নিজের বাবা-মাকেও কাফের ফতোয়া দিয়ে তাদের রক্ত হালাল করে নেয়। অথচ এর মাধ্যমে তারা কেবল একটি বন্ধ গলিতেই উপনীত হয়েছে এবং তাদের সমস্ত শ্রম ও ফল পণ্ড হয়েছে।" [1] । এই চরমপন্থী ধারাটি ইসলামের রাজনৈতিক ও সামরিক ইতিহাসকে তার সামগ্রিক প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে এক সংকীর্ণ ও সহিংস রূপ দান করেছে।
এর বিপরীতে দ্বিতীয় ধারাটি হলো চরম রাজনৈতিক আপসকামিতা বা সেক্যুলার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে বিলীন হয়ে যাওয়ার প্রবণতা। এই ধারার প্রবক্তারা মনে করেন যে, পশ্চিমা ধাঁচের সংসদীয় রাজনীতি, ধর্মনিরপেক্ষ আইনসভা এবং আধুনিক রাষ্ট্রযন্ত্রের উচ্চপদ লাভের মাধ্যমেই কেবল ইসলামের পুনর্জাগরণ সম্ভব। তারা ইসলামের মৌলিক আকীদা ও আদর্শিক স্বাতন্ত্র্যকে জলাঞ্জলি দিয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতার অংশীদার হতে চায়, যা প্রকারান্তরে তাদের নিজস্ব দলীয় স্বার্থ ও বৈষয়িক সুযোগ-সুবিধা অর্জনের হাতিয়ারে পরিণত হয়। এই বিভ্রান্তি সম্পর্কে সীরাত গবেষকগণ সতর্ক করে বলেছেন:
"وفريق آخر ظنَّ أن الطريق الوحيد لقيام الدولة الإِسلامية هو الدخول في البرلمانات ومجالس الأمة، والوصول إلى المناصب العالية في الدولة ومن خلالها يخدمون الإِسلام، ومنهم مَنْ وصل إلى هذه المناصب وما وجدنا أنهم قدموا خدمة للإسلام والمسلمين، إلا أنهم قدموا خدمة لحزبهم؛ من جمع الأموال والوصول إلى المناصب."অর্থাৎ, "অন্য আরেকটি দল ধারণা করেছে যে, ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার একমাত্র পথ হলো সংসদ ও জাতীয় পরিষদে প্রবেশ করা এবং রাষ্ট্রের উচ্চপদে আসীন হওয়া, যার মাধ্যমে তারা ইসলামের সেবা করবে। কিন্তু তাদের মধ্যে যারা এই পদগুলোতে পৌঁছাতে পেরেছে, আমরা দেখিনি যে তারা ইসলাম ও মুসলমানদের কোনো প্রকৃত সেবা করেছে; বরং তারা কেবল অর্থ সংগ্রহ ও পদোন্নতির মাধ্যমে নিজেদের দলেরই সেবা করেছে।" [2] । এই দুই চরমপন্থার বিপরীতে ইসলামের প্রকৃত সমাধান হলো রাসুলুল্লাহ সা.-এর প্রদর্শিত দাওয়াত ও সমাজ সংস্কারের পদ্ধতি, যা শুরু হয় আকীদার সংশোধন এবং মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের মাধ্যমে।
ঐতিহাসিক বাস্তবতার নিরিখে এটি স্পষ্ট যে, কোনো সমাজ বা রাষ্ট্রের বাহ্যিক কাঠামো পরিবর্তন করার আগে মানুষের অভ্যন্তরীণ বিশ্বাস ও নৈতিকতার পরিবর্তন অপরিহার্য। আল্লাহ তাআলার চিরন্তন সুন্নাহ হলো, যতক্ষণ না কোনো জাতি নিজেদের মনস্তাত্ত্বিক ও আদর্শিক পরিবর্তন ঘটায়, ততক্ষণ তাদের বাহ্যিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটে না। পবিত্র কুরআনের ভাষায়:
"إِنَّ اللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّى يُغَيِّرُوا مَا بِأَنْفُسِهِمْ"অর্থাৎ, "নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো সম্প্রদায়ের অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা নিজেরা পরিবর্তন করে।" [3] । অতএব, একুশ শতকের এই আদর্শিক সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হলো রাসুলুল্লাহ সা. ও তাঁর সাহাবি রা.-এর বিশুদ্ধ আকীদা ও দাওয়াহর পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়া। যখন উম্মাহ এই আদর্শিক ভিত্তির ওপর ঐক্যবদ্ধ হবে, তখনই আল্লাহর সাহায্য ও জমিনে খেলাফত বা কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ঐশ্বরিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হবে, যেমনটি আল্লাহ তাআলা সূরা নূরের ৫৫ নম্বর আয়াতে ওয়াদা করেছেন [4] । এই তাত্ত্বিক ভিত্তি ছাড়া কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতা বা সামরিক শক্তি অর্জন কখনোই স্থায়ী কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না, বরং তা মানবজাতিকে আরও বড় বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেয় [5] ।
সীরাতের বাস্তববাদী রূপরেখা: প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান থেকে প্রো-অ্যাক্টিভ বা আক্রমণাত্মক বাস্তববাদে রূপান্তর
আধুনিক ইসলামি অ্যাপোলজেটিক্সের অন্যতম বড় দুর্বলতা হলো, তারা ইসলামের সামরিক ইতিহাসকে কেবলই "প্রতিরক্ষামূলক" (Defensive) হিসেবে চিত্রায়িত করতে চায়। পশ্চিমা লিবারেল ও প্যাসিফিস্ট (Pacifist) দর্শনের প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে অনেক মুসলিম চিন্তাবিদ দাবি করেন যে, ইসলামে যুদ্ধের অনুমতি কেবল তখনই দেওয়া হয়েছে যখন মুসলমানরা আক্রান্ত হয়েছে। কিন্তু সীরাতের গভীর ঐতিহাসিক ও কৌশলগত বিশ্লেষণ এই সংকীর্ণ দাবিকে নাকচ করে দেয়। হুদাইবিয়ার সন্ধি এবং মক্কা বিজয়ের পর, বিশেষ করে হুনাইন ও তায়েফের যুদ্ধের পর, ইসলামি রাষ্ট্র একটি নতুন কৌশলগত স্তরে প্রবেশ করে, যা আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিদ্যার ভাষায় "প্রো-অ্যাক্টিভ রিয়ালিজম" (Pro-active Realism) বা আক্রমণাত্মক বাস্তববাদ হিসেবে পরিচিত। এই পর্যায়ে ইসলামের দাওয়াত কেবল আত্মরক্ষার সীমানায় আবদ্ধ ছিল না, বরং তা ছিল আরবের বুক থেকে শিরক ও মূর্তিপূজার অবশিষ্টাংশ নির্মূল করে এক একক সার্বভৌম তাওহীদি শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করার চূড়ান্ত অভিযান। এই ঐতিহাসিক রূপান্তর সম্পর্কে সীরাত গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে:
"لقد كانت الغزوات السابقة كلها قائمة على أسباب دفاعية. أما هذه الغزوة، فهي تدل على أن الدعوة الإسلامية قد دخلت مرحلة جديدة، وهي مرحلة الهجوم بدل الدفاع، الهجوم لدعوة الناس إلى الإسلام، ومحاربتهم على كفرهم وعنادهم عن قبول الحق."অর্থাৎ, "পূর্ববর্তী যুদ্ধসমূহ মূলত প্রতিরক্ষামূলক কারণের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। কিন্তু এই যুদ্ধটি (তবুক ও পরবর্তী অভিযানসমূহ) প্রমাণ করে যে, ইসলামি দাওয়াত একটি নতুন যুগে প্রবেশ করেছে; আর তা হলো প্রতিরক্ষার পরিবর্তে আক্রমণাত্মক বা প্রো-অ্যাক্টিভ যুগ। এই আক্রমণ ছিল মানুষকে ইসলামের দিকে আহ্বান করার জন্য এবং সত্য গ্রহণে তাদের কুফর ও হঠকারিতার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য।" [6] । এটি কোনো সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন ছিল না, বরং তা ছিল মানবতাকে মানুষের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে আল্লাহর দাসত্বের দিকে নিয়ে যাওয়ার এক বৈপ্লবিক ভূ-রাজনৈতিক প্রয়াস।
হুনাইন ও তায়েফের চূড়ান্ত বিজয়ের পরও জাজিরাতুল আরবের বিভিন্ন প্রান্তে কিছু ছোট ছোট পৌত্তলিক পকেট (Pagan Pockets) অবশিষ্ট ছিল। যদিও এই পকেটগুলো সামরিকভাবে মদিনার কেন্দ্রীয় কর্তৃত্বের জন্য কোনো বড় হুমকি ছিল না, তবুও আরবের বুকে তাওহীদের নিরঙ্কুশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা এবং কোনো প্রকার পৌত্তলিকতার চিহ্ন অবশিষ্ট না রাখার ঐশ্বরিক লক্ষ্য অর্জনে এগুলোকে নির্মূল করা অপরিহার্য ছিল। এই কৌশলগত পদক্ষেপের বিবরণ দিতে গিয়ে ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন:
"وبعد انتصار المسلمين الحاسِم في حنين، وبالرغم من هذا الانتصار العظيم، فقد بقيت للوثنية جيوب... تتحدى المسلمين، وتبدى شيئًا من الاستهانة بهم، وترفض الدخول فيما دخل فيه أكثر سكان الجزيرة من الإِسلام."অর্থাৎ, "হুনাইনে মুসলমানদের নিষ্পত্তিমূলক বিজয়ের পর এবং এই মহান বিজয় সত্ত্বেও, পৌত্তলিকতার কিছু পকেট অবশিষ্ট রয়ে গিয়েছিল... যা মুসলমানদের চ্যালেঞ্জ করছিল, তাদের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করছিল এবং আরবের অধিকাংশ অধিবাসী যে ইসলামে প্রবেশ করেছিল, তাতে প্রবেশ করতে অস্বীকার করছিল।" [7] । এই বিক্ষিপ্ত পৌত্তলিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে কোনো সামরিক সমন্বয় ছিল না এবং তারা মদিনার জন্য সরাসরি কোনো অস্তিত্বের সংকট তৈরি করতে সক্ষম ছিল না। কিন্তু তাদের এই অবাধ্যতা ও পৌত্তলিকতার ওপর জেদ ধরে রাখা ইসলামের চূড়ান্ত লক্ষ্যের পরিপন্থী ছিল।
তাই রাসুলুল্লাহ সা. জাজিরাতুল আরবকে সম্পূর্ণরূপে শিরকমুক্ত করার জন্য এবং মদিনার রাজনৈতিক ও আদর্শিক সার্বভৌমত্বকে চূড়ান্ত রূপ দেওয়ার জন্য পাঁচটি বিশেষ সামরিক অভিযান প্রেরণ করেন। এই অভিযানের মূল উদ্দেশ্য ছিল আরবের বুক থেকে পৌত্তলিকতার শেষ চিহ্নটুকু মুছে ফেলা, যাতে সমগ্র উপদ্বীপে কেবল আল্লাহর দ্বীনই বিজয়ী থাকে। ঐতিহাসিক সূত্রে বর্ণিত হয়েছে:
"جرّد الرسول صلى الله عليه وسلم خمس حملات عسكرية تولت تصفية كلِّ ما تبقى من جيوب وثنية في مختلف أنحاء الجزيرة."অর্থাৎ, "রাসুলুল্লাহ সা. পাঁচটি সামরিক অভিযান প্রেরণ করেন, যা আরবের বিভিন্ন প্রান্তে অবশিষ্ট সমস্ত পৌত্তলিক পকেট নির্মূল করার দায়িত্ব পালন করেছিল।" [8] । এই প্রো-অ্যাক্টিভ সামরিক পদক্ষেপগুলো প্রমাণ করে যে, ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা কেবল নিষ্ক্রিয় প্রতিরক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা আদর্শিক ও ভূ-রাজনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। নবম হিজরিতে প্রেরিত এই অভিযানসমূহের মধ্যে অন্যতম ছিল বনু তামীম গোত্রের অবাধ্যতা দমনের জন্য প্রেরিত অভিযান, যা মদিনার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত [9] ।
জিওপলিটিক্যাল সিকিউরিটি ও অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষা: নবম হিজরির অভিযানসমূহের কৌশলগত বিশ্লেষণ
নবম হিজরিতে প্রেরিত সামরিক অভিযানসমূহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এগুলো কেবল ধর্মীয় প্রচারের উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়নি, বরং এগুলো ছিল মদিনা রাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক নিরাপত্তা (Geopolitical Security) এবং অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য অত্যন্ত সুপরিকল্পিত কৌশলগত পদক্ষেপ। মক্কা বিজয় ও হুনাইন যুদ্ধের পর আরবের অধিকাংশ গোত্র মদিনার কেন্দ্রীয় কর্তৃত্বের অধীনে চলে আসে এবং যাকাত প্রদানের মাধ্যমে তাদের আনুগত্য প্রকাশ করে। কিন্তু কিছু গোত্র এই নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শৃঙ্খলার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বা অবাধ্যতার চেষ্টা করে। এর মধ্যে বনু তামীম গোত্রের ঘটনাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ সা. যখন বিভিন্ন গোত্রে যাকাত সংগ্রহের জন্য প্রতিনিধি প্রেরণ করেন, তখন বনু তামীমের কিছু শাখা এই কর বা যাকাত প্রদানকে "অন্যায়ভাবে সম্পদ হরণ" বলে আখ্যায়িত করে এবং মদিনার প্রতিনিধির বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করে। এই ঘটনার বিবরণ দিয়ে ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন:
"ثم احتشدوا وأخذوا أسلحتهم، فتقلدوا القسى وشهروا السيوف ليمنعوا بالقوة مبعوث الرسول صلى الله عليه وسلم من أن يأخذ زكاة مواشى خزاعة المسلمة."অর্থাৎ, "অতঃপর তারা একত্রিত হলো এবং তাদের অস্ত্রশস্ত্র গ্রহণ করল। তারা ধনুক কাঁধে ঝুলাল এবং তরবারি কোষমুক্ত করল, যাতে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ সা.-এর প্রতিনিধিকে মুসলিম খুজাআ গোত্রের গবাদিপশুর যাকাত গ্রহণ করা থেকে বিরত রাখতে পারে।" [10] । বনু তামীমের এই আচরণ ছিল মদিনা রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের সরাসরি লঙ্ঘন এবং একটি সশস্ত্র বিদ্রোহের শামিল।
এই অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমনের জন্য রাসুলুল্লাহ সা. মুহররম ৯ হিজরিতে উয়াইনা ইবনে হিসন রা.-এর নেতৃত্বে ৫০ জন অশ্বারোহীর একটি বিশেষ বাহিনী প্রেরণ করেন। এই বাহিনীতে কোনো মুহাজির বা আনসার ছিলেন না, বরং তারা ছিলেন মরুবাসী বেদুইন যোদ্ধা, যারা দ্রুত গতিতে আক্রমণ করতে পারদর্শী ছিলেন। উয়াইনা রা. অত্যন্ত সফলতার সাথে এই অভিযান পরিচালনা করেন এবং বনু তামীমের বিদ্রোহীদের পরাস্ত করে তাদের ১১ জন পুরুষ, ১১ জন নারী এবং ৩০ জন শিশুকে বন্দী করে মদিনায় নিয়ে আসেন [11] । এই কঠোর সামরিক পদক্ষেপের ফলে বনু তামীমের একটি বড় প্রতিনিধি দল মদিনায় এসে রাসুলুল্লাহ সা.-এর কাছে আত্মসমর্পণ করে এবং সমগ্র গোত্র ইসলাম গ্রহণ করে। এই ঘটনার প্রেক্ষিতেই সূরা হুজুরাতের ৪ নম্বর আয়াত নাজিল হয়, যেখানে রাসুলুল্লাহ সা.-এর হুজরার বাইরে থেকে উচ্চস্বরে ডাক দেওয়া বেদুইনদের অজ্ঞতার সমালোচনা করা হয়েছে [12] ।
একইভাবে, সফর ৯ হিজরিতে কুতবাহ ইবনে আমির রা.-এর নেতৃত্বে খাসআম গোত্রের অবাধ্য শাখাগুলোর বিরুদ্ধে ২০ জনের একটি ছোট কিন্তু অত্যন্ত গোপন সামরিক দল প্রেরণ করা হয়। তারা দিনের বেলা আত্মগোপন করে এবং রাতের বেলা পথ চলে তাবালায় অবস্থিত খাসআমের ঘাঁটিতে আকস্মিক আক্রমণ পরিচালনা করে। তীব্র লড়াইয়ের পর মুসলমানরা বিজয়ী হন এবং প্রচুর গবাদিপশু গনীমত হিসেবে লাভ করেন [13] । এর পরপরই, রবীউল আউয়াল ৯ হিজরিতে বনু কিলাব গোত্রের অবাধ্য শাখা 'আল-কুরতা'-এর বিরুদ্ধে যাহহাক ইবনে সুফিয়ান রা.-এর নেতৃত্বে আরেকটি অভিযান পরিচালিত হয়। এই গোত্রটি রাসুলুল্লাহ সা.-এর দাওয়াতনামাকে উপহাস করেছিল এবং তা ধুয়ে তাদের বালতির তালি বানিয়েছিল। এই ধৃষ্টতার জবাবে পরিচালিত অভিযানে মদিনার বাহিনী তাদের পরাজিত করে এবং তাদের অবাধ্যতার অবসান ঘটায় [14] । এই প্রতিটি অভিযানই প্রমাণ করে যে, মদিনা রাষ্ট্র তার অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষা এবং সার্বভৌমত্ব বজায় রাখতে কতটা আপসহীন ও প্রো-অ্যাক্টিভ ছিল।
বাহ্যিক হুমকি ও নৌ-প্রতিরক্ষা কৌশল: আলকামা ইবনে মুজাদ্দির-এর লোহিত সাগর অভিযান
মদিনা রাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক দূরদর্শিতা কেবল আরবের স্থলভাগেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা সমুদ্রসীমা ও নৌ-নিরাপত্তা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। নবম হিজরির রবীউল আখের মাসে পরিচালিত আলকামা ইবনে মুজাদ্দির আল-মুদলিজী রা.-এর সমুদ্র অভিযানটি ইসলামের ইতিহাসে প্রথম নৌ-প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মদিনা রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিরাপত্তার জন্য লোহিত সাগরের নৌপথ অত্যন্ত সংবেদনশীল ছিল। যখন রাসুলুল্লাহ সা. খবর পেলেন যে, আবিসিনিয়ার (ইথিওপিয়া) জলদস্যুরা জেদ্দার নিকটবর্তী শুআইবা বন্দরে তাদের জাহাজ নিয়ে ঘোরাফেরা করছে এবং মুসলিম বাণিজ্য তরীর জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে, তখন তিনি তাৎক্ষণিকভাবে ৩০০ জন যোদ্ধার একটি বাহিনী গঠন করে আলকামা রা.-এর নেতৃত্বে প্রেরণ করেন। এই অভিযানের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে সীরাত গ্রন্থে বলা হয়েছে:
"وسبب تجريد هذه الحملة أن النبي صلى الله عليه وسلم بلغه أن قرصانًا من الحبشة شاهدهم أهل الشعيبة (وهي ميناء قرب جدة) يجوبون البحر بسفنهم، فجند الرسول صلى الله عليه وسلم ثلاثمائة من أصحابه، وأعطى قيادتهم علقمة بن مجزر ليهاجم بهم القراصنة الأحباش."অর্থাৎ, "এই অভিযান প্রেরণের কারণ ছিল যে, নবি সা.-এর কাছে সংবাদ পৌঁছায় যে আবিসিনিয়ার একদল জলদস্যুকে শুআইবার (যা জেদ্দার নিকটবর্তী একটি বন্দর) অধিবাসীরা তাদের জাহাজে করে সমুদ্রে টহল দিতে দেখেছে। ফলে রাসুলুল্লাহ সা. তাঁর সাহাবিদের মধ্য থেকে ৩০০ জন যোদ্ধাকে সংগঠিত করেন এবং আবিসিনিয়ার জলদস্যুদের আক্রমণ করার জন্য আলকামা ইবনে মুজাদ্দিরের নেতৃত্বে তাদের প্রেরণ করেন।" [15] । আলকামা রা. তাঁর বাহিনী নিয়ে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে একটি দ্বীপে পৌঁছান, যেখানে জলদস্যুরা অবস্থান করছিল। কিন্তু মুসলিম বাহিনীর রণপ্রস্তুতি ও সাহসিকতা দেখে জলদস্যুরা যুদ্ধ না করেই জাহাজে করে আবিসিনিয়ার দিকে পালিয়ে যায় [16] । এই অভিযানটি প্রমাণ করে যে, মদিনা রাষ্ট্র তার সমুদ্রসীমা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথ নিরাপদ রাখতে কতটা সচেতন ও প্রো-অ্যাক্টিভ ছিল।
এই অভিযানের আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সামরিক শৃঙ্খলা এবং নেতৃত্বের আনুগত্যের সীমা নির্ধারণ। আলকামা রা.-এর এই অভিযানে যখন কিছু সৈন্যকে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়, তখন তাদের আমির নিযুক্ত করা হয় আবদুল্লাহ ইবনে হুজাফাহ আস-সাহমী রা.-কে, যিনি অত্যন্ত রসিক স্বভাবের মানুষ ছিলেন। পথিমধ্যে তিনি রাগান্বিত হয়ে বা কৌতুকবশত তাঁর অধীনস্থ সৈন্যদের একটি জ্বলন্ত আগুনে ঝাঁপ দেওয়ার নির্দেশ দেন। মদিনার কঠোর সামরিক শৃঙ্খলার কারণে সৈন্যরা প্রথমে আগুনে ঝাঁপ দিতে প্রস্তুত হয়েছিল, কিন্তু পরবর্তীতে তারা বুঝতে পারে যে এটি আমিরের একটি কৌতুক বা অযৌক্তিক নির্দেশ ছিল। মদিনায় ফিরে এই ঘটনা রাসুলুল্লাহ সা.-কে জানানো হলে তিনি ইসলামের রাষ্ট্রদর্শন ও সামরিক আইনের একটি মৌলিক নীতি ঘোষণা করেন:
"فقال: من أمركم بمعصية فلا تطيعوه"অর্থাৎ, "তিনি (সা.) বললেন: যে ব্যক্তি তোমাদের আল্লাহর অবাধ্যতার নির্দেশ দেয়, তোমরা তার আনুগত্য করবে না।" [17] । এই ঐতিহাসিক ঘোষণাটি আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের "Rule of Law" বা আইনের শাসনের একটি অনন্য উদাহরণ। ইসলামে আমিরের বা রাষ্ট্রের আনুগত্য অন্ধ বা নিরঙ্কুশ নয়, বরং তা শরীয়তের নৈতিক ও আইনি কাঠামোর অধীন।
এই নীতিটি প্রমাণ করে যে, ইসলামি সামরিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা কোনো স্বৈরতান্ত্রিক বা অন্ধ আনুগত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। যেখানে আধুনিক সামরিক বাহিনীগুলোতে "উর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশই চূড়ান্ত" বলে গণ্য করা হয়, সেখানে ইসলাম আজ থেকে চৌদ্দশত বছর আগে ঘোষণা করেছে যে, কোনো অন্যায় বা পাপের কাজে আনুগত্য করা যাবে না। এই ভারসাম্যপূর্ণ রাজনৈতিক দর্শনই ইসলামকে অন্যান্য সমস্ত মানব রচিত মতাদর্শ থেকে পৃথক করে [18] । এটি একদিকে যেমন রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে, অন্যদিকে তেমনি ব্যক্তির মৌলিক অধিকার ও নৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করে।
অ্যাপোলজেটিক্সের ভ্রান্তিবিলাস বনাম সীরাতের বস্তুনিষ্ঠ ঐতিহাসিকতা
একুশ শতকের ইসলামি অ্যাপোলজেটিক্স বা বুদ্ধিবৃত্তিক আত্মরক্ষামূলক প্রবণতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তা মূলত পশ্চিমা লিবারেল ও সেক্যুলার হেজিমোনির মনস্তাত্ত্বিক পরাজয়ের ফসল। আধুনিক অপোলজিস্টরা অমুসলিমদের কাছে ইসলামকে "গ্রহণযোগ্য" করার জন্য সীরাতের এমন একটি সংস্করণ উপস্থাপন করতে চান, যা সম্পূর্ণরূপে অহিংস, নিষ্ক্রিয় এবং আধুনিক পশ্চিমা মূল্যবোধের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তারা সীরাতের সামরিক অভিযানসমূহ, বিশেষ করে নবম হিজরির প্রো-অ্যাক্টিভ অভিযানসমূহকে আড়াল করতে চান অথবা সেগুলোকে কেবলই প্রতিরক্ষামূলক বলে ব্যাখ্যা করার জন্য ঐতিহাসিক তথ্যের অপলাপ ঘটান। কিন্তু সীরাতের প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল আরবের বুক থেকে পৌত্তলিকতার অবসান ঘটিয়ে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করা, যা কোনো আপসকামিতার মাধ্যমে অর্জিত হয়নি। সীরাতের এই আপসহীন লক্ষ্য সম্পর্কে বলা হয়েছে:
"وكى لا يبقى أيّ سلطان في جزيرة العرب إلا للإِسلام وكى لا يبقى فيها شيء من معالم الوثنية"অর্থাৎ, "যাতে আরব উপদ্বীপে ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো কর্তৃত্ব বা শাসন অবশিষ্ট না থাকে এবং সেখানে পৌত্তলিকতার কোনো চিহ্নই আর বাকি না থাকে।" [19] । এটিই ছিল রাসুলুল্লাহ সা.-এর ভূ-রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মিশন, যা তিনি অত্যন্ত সফলতার সাথে বাস্তবায়ন করেছিলেন।
আধুনিক অ্যাপোলজিস্টরা প্রায়শই ভুলে যান যে, একটি আদর্শিক রাষ্ট্র কেবল নৈতিক উপদেশের মাধ্যমে টিকে থাকতে পারে না; তার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক ক্ষমতা, সামরিক শক্তি এবং সার্বভৌমত্বের কঠোর প্রয়োগ। যে জাতি তার আদর্শিক সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে পারে না, সে জাতি অচিরেই অন্য জাতির অধীনস্থ হয়ে পড়ে এবং তার নিজস্ব অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলে। সীরাতের এই শিক্ষাটি তুলে ধরে ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন:
"والأمة التي تتكبر وتتبطر تفقد امتلاكها لنفسها وحقها وأمرها، وتقع تحت سيطرة الآخرين، فيصرّفون أمورها وشؤونها كما يشاؤون."অর্থাৎ, "যে জাতি অহংকার ও ঔদ্ধত্য প্রকাশ করে, তারা নিজেদের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ, অধিকার ও কর্তৃত্ব হারিয়ে ফেলে এবং অন্যের আধিপত্যের অধীনে চলে যায়; ফলে তারা (বিজয়ীরা) তাদের বিষয়াবলী ও সিদ্ধান্তসমূহ যেভাবে ইচ্ছা পরিচালনা করে।" [20] । অতএব, ইসলামে সামরিক শক্তি ও রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়, বরং তা দ্বীনের অস্তিত্ব ও উম্মাহর নিরাপত্তা রক্ষার অপরিহার্য শর্ত।
একুশ শতকের এই আদর্শিক সংকটে মুসলিম উম্মাহকে যদি পুনরায় তার গৌরবময় অবস্থানে ফিরে যেতে হয়, তবে অ্যাপোলজেটিক বা আত্মরক্ষামূলক মনস্তত্ত্ব পরিহার করতে হবে। ইসলামকে কোনো পশ্চিমা মতাদর্শের আলোচায় জাস্টিফাই করার প্রয়োজন নেই; বরং ইসলামের নিজস্ব রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক দর্শনকে তার পূর্ণাঙ্গরূপে উপস্থাপন করতে হবে। রাসুলুল্লাহ সা.-এর সীরাত আমাদের শেখায় কীভাবে আকীদার সংশোধনের মাধ্যমে শুরু করে একটি শক্তিশালী, সার্বভৌম ও প্রো-অ্যাক্টিভ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হয় [21] । এই বস্তুনিষ্ঠ ঐতিহাসিকতা ও আদর্শিক দৃঢ়তাই পারে আধুনিক যুগের বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক গোলকধাঁধা থেকে উম্মাহকে মুক্ত করতে।