খণ্ড 88
ফন্ট:100%
থিম:

৮.১ প্রি-ইসলামিক স্লেভ ট্রেড (Global Slave Trade): রোমান, পারসিক ও আরব অর্থনীতিতে স্লেভ লেবারের (Slave Labor) অপরিহার্যতা

মানব সভ্যতার ইতিহাসে প্রাক-ইসলামি যুগ ছিল এমন এক জটিল অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিন্যাসে আচ্ছন্ন, যেখানে দাসশ্রম (Slave Labor) কেবল একটি সাধারণ প্রথা ছিল না, বরং তা ছিল তৎকালীন বৈশ্বিক সাম্রাজ্য ও আঞ্চলিক রাষ্ট্রসমূহের টিকে থাকার মূল চালিকাশক্তি। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় উৎপাদন পদ্ধতিতে পুঁজি ও প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতার কারণে কায়িক শ্রমের ওপর রাষ্ট্রীয় উৎপাদনশীলতা সম্পূর্ণ নির্ভরশীল ছিল। এই ঐতিহাসিক বাস্তবতায় রোমান সাম্রাজ্য, পারসিক সাসানীয় সাম্রাজ্য এবং প্রাক-ইসলামি আরব উপদ্বীপের অর্থনীতিতে দাসশ্রমের ভূমিকা ছিল অপরিহার্য ও কাঠামোগত। তৎকালীন ভূ-রাজনীতি (Geopolitics) এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তা (Collective Security) মূলত নিয়ন্ত্রিত হতো দাসদের সরবরাহ, তাদের শ্রমের শোষণ এবং দাস বাজারের গতিশীলতার ওপর ভিত্তি করে।

ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রাচীন বিশ্বের বৃহৎ শক্তিগুলো দাসদের কেবল পণ্য হিসেবে বিবেচনা করত না, বরং তাদের উৎপাদন ব্যবস্থার মূল ভিত্তি বা 'উৎপাদনের হাতিয়ার' (Means of Production) হিসেবে গণ্য করত। রোমানদের বিশাল কৃষি খামার থেকে শুরু করে পারস্যের রাজকীয় অবকাঠামো নির্মাণ এবং আরবের মরূদ্যানসমূহের মরুময় কৃষিব্যবস্থা—সর্বত্রই দাসশ্রমের একচ্ছত্র আধিপত্য বিদ্যমান ছিল। এই অর্থনৈতিক কাঠামোর গভীরতা এবং এর বৈশ্বিক বিস্তৃতি অনুধাবন করা ব্যতীত প্রাক-ইসলামি যুগের সমাজ ও অর্থনীতিকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা অসম্ভব।

১. রোমান সাম্রাজ্যের অর্থনীতিতে স্লেভ লেবারের (Slave Labor) অপরিহার্যতা ও কাঠামোগত ভূমিকা

রোমান সাম্রাজ্যকে সমাজবিজ্ঞানী ও ঐতিহাসিকগণ একটি খাঁটি "দাস সমাজ" (Slave Society) হিসেবে অভিহিত করেছেন, যেখানে সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক স্থিতিশীলতা সরাসরি দাসশ্রমের ওপর নির্ভরশীল ছিল। রোমান কৃষি ব্যবস্থার মূল ভিত্তি ছিল 'লতিফুন্দিয়া' (Latifundia) বা বিশাল ভূসম্পত্তি, যা সম্পূর্ণভাবে ক্রীতদাসদের শ্রমের মাধ্যমে পরিচালিত হতো। রোমান যুদ্ধবিগ্রহের মাধ্যমে অর্জিত লক্ষ লক্ষ যুদ্ধবন্দী এই বিশাল খামারগুলোতে অমানবিক পরিবেশে শ্রম দিতে বাধ্য হতো, যা রোমান অভিজাত শ্রেণীর জন্য বিপুল উদ্বৃত্ত মূল্য (Surplus Value) সৃষ্টি করত। এই দাসদের কোনো আইনি সত্তা ছিল না; রোমান আইনে তাদের 'কথা বলা সরঞ্জাম' (Instrumentum Vocale) হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হতো [1]

রোমান খনি শিল্পে, বিশেষ করে স্পেনের রূপা ও তামার খনিগুলোতে দাসদের ব্যবহার ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ ও নির্মম। খনির অন্ধকার ও বিষাক্ত পরিবেশে হাজার হাজার দাসকে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কাজ করতে হতো, কারণ রোমান সাম্রাজ্যের মুদ্রা ব্যবস্থা ও রাজকীয় কোষাগারের তারল্য বজায় রাখার জন্য এই খনিজ উৎপাদন ছিল অপরিহার্য। খনি থেকে উত্তোলিত সম্পদ রোমান সামরিক বাহিনীকে অর্থায়ন করতে এবং সাম্রাজ্যের সীমানা রক্ষা করতে ব্যবহৃত হতো। ফলে, রোমান ভূ-রাজনীতি ও সামরিক আধিপত্যের পেছনে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করত এই দাসশ্রমিকদের জীবন উৎসর্গকারী শ্রম [2]

শহুরে অর্থনীতিতেও রোমান দাসদের ভূমিকা ছিল বহুমুখী। গৃহস্থালি কাজ, রাজকীয় আমলাতন্ত্রের লিপিকার, শিক্ষক, চিকিৎসক থেকে শুরু করে গ্ল্যাডিয়েটর হিসেবে বিনোদন শিল্পে তাদের ব্যবহার ছিল ব্যাপক। রোমান সাম্রাজ্যের এই দাস-নির্ভর অর্থনৈতিক মডেলটি এমন এক কাঠামোগত নির্ভরতা তৈরি করেছিল যে, দাস সরবরাহ হ্রাস পেলে সমগ্র সাম্রাজ্যের অর্থনীতিতে ধস নামার আশঙ্কা তৈরি হতো। এই কারণেই রোমান আইন ও সামরিক নীতি সর্বদা নতুন দাস সংগ্রহের উদ্দেশ্যে যুদ্ধ ও বিজয়াভিযানকে উৎসাহিত করত [3]

২. পারসিক (সাসানীয়) সাম্রাজ্যে দাসশ্রমের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উপযোগিতা

সাসানীয় পারস্য সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক কাঠামো ছিল মূলত সামন্ততান্ত্রিক (Feudalistic), যেখানে রাজকীয় অভিজাত শ্রেণী (Azatan) এবং পুরোহিত শ্রেণী (Mowbedan) বিশাল ভূসম্পত্তির মালিক ছিল। পারস্যের এই সামন্ততান্ত্রিক অর্থনীতিতে দাসশ্রমের ব্যবহার রোমান সাম্রাজ্যের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন হলেও এর অপরিহার্যতা কোনো অংশে কম ছিল না। সাসানীয় সাম্রাজ্যের কৃষি উৎপাদন, বিশেষ করে মেসোপটেমিয়ার উর্বর অববাহিকায় সেচ খাল খনন এবং বাঁধ নির্মাণের মতো বিশাল অবকাঠামোগত প্রকল্পগুলো মূলত যুদ্ধবন্দী ও ক্রীতদাসদের বাধ্যতামূলক শ্রমের মাধ্যমে সম্পন্ন হতো [4]

পারস্যের রাজকীয় কারখানাগুলোতে, বিশেষ করে রেশম ও কার্পেট বয়ন শিল্পে, যা ছিল সাসানীয় সাম্রাজ্যের অন্যতম প্রধান রপ্তানি পণ্য, দাসদের ব্যাপক হারে নিয়োজিত করা হতো। এই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য থেকে অর্জিত রাজস্ব পারস্যের রাজকীয় কোষাগারকে সমৃদ্ধ করত এবং রোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ পরিচালনায় সহায়তা করত। ফলে, পারস্যের অর্থনৈতিক কূটনীতি (Economic Diplomacy) এবং ভূ-রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের পেছনে এই দাসশ্রমিকদের অবদান ছিল অনস্বীকার্য [5]

এছাড়াও, দক্ষিণ আরবের ইয়েমেন অঞ্চলে পারস্যের যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য ছিল, সেখানেও দাসদের মাধ্যমে খনি ও কৃষি কাজ পরিচালিত হতো। ইয়েমেনের স্থানীয় শাসক বা 'আকিয়াল' (الأقيال) এবং 'আযওয়া' (الأذواء) শ্রেণী তাদের বিশাল কৃষি জমি ও পানির উৎসসমূহ নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য দাসদের ব্যবহার করত, যা পারস্যের সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থারই একটি আঞ্চলিক রূপ ছিল [6] । এই দাসশ্রমের মাধ্যমেই পারস্য সাম্রাজ্য তার অভ্যন্তরীণ খাদ্য নিরাপত্তা এবং বাহ্যিক বাণিজ্য ভারসাম্য বজায় রাখতে সক্ষম হতো।

৩. প্রাক-ইসলামি আরব উপদ্বীপে দাস ব্যবসার ভূ-অর্থনৈতিক গতিশীলতা

প্রাক-ইসলামি আরব উপদ্বীপে দাস ব্যবসা ছিল অত্যন্ত লাভজনক এবং সক্রিয় একটি অর্থনৈতিক খাত। আরবের ভৌগোলিক অবস্থান ছিল পূর্ব ও পশ্চিমের বাণিজ্য পথের সংযোগস্থলে, যা একে দাস আমদানির একটি প্রধান ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত করেছিল। আরবের দাস ব্যবসায়ীরা বাহ্যিক বাজার থেকে দাস ক্রয় করে মক্কা, ইয়াছরিব, তায়েফ এবং নাজরানের মতো স্থায়ী ও মৌসুমী বাজারগুলোতে বিক্রি করত। ঐতিহাসিক ড. জাওয়াদ আলি তাঁর গ্রন্থে এই বাণিজ্য ব্যবস্থার চিত্র তুলে ধরে লিখেছেন:

"وكان الرقيق إذا ذاك تجارة نشطة مربحة، يكسب صاحبها منها ربحا طيبا، وكان المتاجر بالرقيق يشتري تجارته من الأسواق الخارجية، ثم يأتي بسلعته إلى أسواق جزيرة العرب لبيعها فيها؛ في الأسواق الموسمية وفي الأسواق المحلية الدائمة، مثل: سوق مكة ويثرب والطائف ونجران وغيرها."

অনুবাদ: "সে যুগে দাস ব্যবসা ছিল একটি অত্যন্ত সক্রিয় ও লাভজনক বাণিজ্য, যা থেকে এর মালিক প্রচুর মুনাফা অর্জন করত। দাস ব্যবসায়ী বহিরাগত বাজার থেকে তার পণ্য (দাস) ক্রয় করত, অতঃপর তা আরব উপদ্বীপের বাজারে বিক্রির জন্য নিয়ে আসত; যেমন মৌসুমী বাজার এবং স্থায়ী স্থানীয় বাজারসমূহ, যার মধ্যে মক্কা, ইয়াছরিব, তায়েফ ও নাজরানের বাজার অন্যতম।" [7]

আরব উপদ্বীপের এই দাস বাজারের সরবরাহ শৃঙ্খলটি ছিল অত্যন্ত সুসংগঠিত। ইরাক ও সিরিয়ার (শাম) বাজারগুলো থেকে মূলত শ্বেতাঙ্গ দাস (রقيق أبيض) আমদানি করা হতো, যা ছিল অত্যন্ত মূল্যবান এবং উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন। অন্যদিকে, আফ্রিকার উপকূলীয় অঞ্চল থেকে কৃষ্ণাঙ্গ দাস (رقيق أسود) আমদানি করা হতো, যা ছিল তুলনামূলকভাবে সস্তা এবং কায়িক শ্রমের জন্য ব্যবহৃত হতো। এই বৈচিত্র্যময় সরবরাহ শৃঙ্খল আরবের ভূ-অর্থনৈতিক গতিশীলতাকে নিয়ন্ত্রণ করত। ড. জাওয়াদ আলি আরও উল্লেখ করেছেন:

"وأسواق العراق وبلاد الشام من أهم الأسواق التي موَّنت جزيرة العرب بالرقيق الأبيض، أما السواحل الإفريقية، فقد مونتها بالرقيق الأسود، وهو أرخص ثمنًا من الرقيق الأبيض، وكفاءته محدودة، وقابلياته للعمل معينة..."

অনুবাদ: "ইরাক ও শামের বাজারগুলো ছিল অন্যতম প্রধান বাজার যা আরব উপদ্বীপে শ্বেতাঙ্গ দাস সরবরাহ করত। আর আফ্রিকার উপকূলীয় অঞ্চলগুলো কৃষ্ণাঙ্গ দাস সরবরাহ করত, যা শ্বেতাঙ্গ দাসের চেয়ে সস্তা ছিল এবং তাদের কর্মক্ষমতা ও যোগ্যতা ছিল নির্দিষ্ট ও সীমিত..." [8]

এই দাস বাণিজ্য কেবল আরবের অভ্যন্তরীণ চাহিদাই মেটাত না, বরং তা ছিল কুরাইশ ও অন্যান্য আরব গোত্রের বাণিজ্যিক কাফেলাগুলোর অন্যতম প্রধান পণ্য। মক্কার অর্থনীতি, যা মূলত বাণিজ্য-নির্ভর ছিল, এই দাস আমদানির মাধ্যমে তাদের শ্রমশক্তির ঘাটতি পূরণ করত এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করত [9]

৪. আরব অর্থনীতিতে দাসশ্রমের বহুমুখী উপযোগিতা: কৃষি, খনি ও সামরিক প্রতিরক্ষা

আরব উপদ্বীপের শুষ্ক ও আধা-শুষ্ক জলবায়ুতে কৃষিকাজ ছিল অত্যন্ত কঠিন এবং শ্রমসাধ্য। বিশেষ করে ইয়েমেন, ইয়ামামা এবং হিজাজের মরূদ্যানগুলোতে কৃষিকাজ পরিচালনার জন্য প্রচুর শ্রমিকের প্রয়োজন হতো। ইয়ামামার মতো উর্বর অঞ্চলে, যেখানে গম ও অন্যান্য শস্য উৎপাদিত হতো, সেখানে দাসদের প্রধানত কৃষি শ্রমিক হিসেবে ব্যবহার করা হতো। ইয়ামামার দুর্গ ও উর্বর জমিগুলোর সুরক্ষায় এবং চাষাবাদে দাসদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা পরবর্তীতে খালিদ বিন ওয়ালিদ রা. এর সাথে মুজ্জাআ বিন মারারাহ-এর চুক্তির বিবরণ থেকে স্পষ্ট হয়, যেখানে 'অর্ধেক দাস' (نصف المملوكين) হস্তান্তরের শর্ত ছিল [10]

কৃষির পাশাপাশি খনি শিল্পেও দাসদের ব্যবহার ছিল ব্যাপক। আরবের বিভিন্ন অঞ্চলে সোনা, রূপা ও তামার খনি ছিল, যা 'মওয়াযি' আত-তা'দিন' (مواضع التعدين) নামে পরিচিত ছিল। এই খনিগুলোতে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও কঠিন কাজগুলো করানোর জন্য দাসদের নিয়োজিত করা হতো। ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী:

"وقد وجد الرقيق في كل مكان من جزيرة العرب، لا سيما في المستوطنات الزراعية والقرى ومواضع التجار والتعدين؛ لحاجة هذه المواضع إلى الأيدي العاملة وإلى من يدافع عنها..."

অনুবাদ: "আরব উপদ্বীপের সর্বত্রই দাসদের অস্তিত্ব ছিল, বিশেষ করে কৃষি বসতি, গ্রাম, বাণিজ্যিক কেন্দ্র এবং খনি অঞ্চলগুলোতে; কারণ এই স্থানগুলোতে প্রচুর শ্রমশক্তির প্রয়োজন ছিল এবং এমন লোকের প্রয়োজন ছিল যারা এগুলোর প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে..." [11]

সামরিক প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রেও প্রাক-ইসলামি আরবে দাসদের ভূমিকা ছিল অনন্য। গোত্রীয় যুদ্ধবিগ্রহে নিজেদের জনবল বৃদ্ধির জন্য এবং প্রতিরক্ষামূলক প্রাচীর হিসেবে দাসদের যুদ্ধে নামিয়ে দেওয়া হতো। ইয়ামামার যুদ্ধে বনু হানিফা গোত্রের সলমা বিন উমাইর আল-হানাফি মুসলিম বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য গ্রামীণ জনগোষ্ঠী ও দাসদের একত্রিত করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যা প্রমাণ করে যে দাসরা কেবল অর্থনৈতিক উৎপাদকই ছিল না, বরং তারা ছিল গোত্রীয় সামরিক শক্তিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ [12]

৫. প্রাক-ইসলামি যুগে দাসত্বের আইনি ও সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস

প্রাক-ইসলামি আরবে দাসদের আইনি ও সামাজিক মর্যাদা ছিল অত্যন্ত জটিল এবং বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত। আরবি ভাষায় দাসত্বের গভীরতা বোঝানোর জন্য বিভিন্ন পরিভাষা ব্যবহৃত হতো, যা তাদের সামাজিক অবস্থান ও অধিকারের তারতম্য নির্দেশ করত। 'রقيق' (Raqiq) শব্দটি এসেছে 'রিক্কাত' বা নম্রতা ও অধীনতা থেকে, কারণ দাসরা তাদের মালিকের সামনে সর্বদা নত ও বাধ্য থাকত। অন্যদিকে 'মমলুক' (Mamluk) বলতে এমন দাসকে বোঝাত যার পিতা-মাতা দাস ছিলেন না, বরং সে নিজে কোনো কারণে দাসত্বে পতিত হয়েছে [13]

দাসদের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট ও স্থায়ী শ্রেণী ছিল 'ক্বিন' (القن)। এরা ছিল খাঁটি দাস, যাদের নিজেদের কোনো ব্যক্তিগত অধিকার ছিল না এবং তাদের মুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল অত্যন্ত ক্ষীণ। ঐতিহাসিক গ্রন্থসমূহে এর সংজ্ঞা এভাবে দেওয়া হয়েছে:

"والقِنّ: العبد، ويقال: المشتري. والعبد: المملوك خلاف الحر، و"العِبِديّ": جماعة العبيد الذين ولدوا في العبودية."

অনুবাদ: "ক্বিন (القن) হলো সেই দাস যাকে ক্রয় করা হয়েছে। আর আবদ (العبد) হলো মমলুক বা দাসের বিপরীত শব্দ যা স্বাধীনের বিপরীত। এবং ইবিদি (العِبِديّ) হলো সেই দাসদের দল যারা দাসত্বের মধ্যেই জন্মগ্রহণ করেছে।" [14]

দক্ষিণ আরবে, বিশেষ করে ইয়েমেনে, এক বিশেষ শ্রেণীর দাস ছিল যারা ভূমির সাথে আবদ্ধ ছিল, যাদের 'রقيق تبع الأرض' (ভূমি-সংলগ্ন দাস) বলা হতো। এদের স্বাধীনভাবে চলাফেরা বা পেশা পরিবর্তনের কোনো অধিকার ছিল না; জমি বিক্রি হলে এরাও জমির সাথে বিক্রি হয়ে যেত। দক্ষিণ আরবিয় ভাষায় এদের 'আমতি' (أمتى) বলা হতো [15] । এই আইনি ও সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস প্রমাণ করে যে, প্রাক-ইসলামি আরবে দাসত্ব কেবল একটি সাময়িক অবস্থা ছিল না, বরং তা ছিল একটি সুপ্রতিষ্ঠিত আইনি ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান যা মানুষের মৌলিক অধিকারকে সম্পূর্ণভাবে খর্ব করেছিল।

৬. দাস সংগ্রহের প্রধান উৎসসমূহ: যুদ্ধ, দারিদ্র্য এবং ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা

প্রাক-ইসলামি যুগে দাস সংগ্রহের সবচেয়ে প্রাচীন ও প্রধান উৎস ছিল যুদ্ধ ও গোত্রীয় আক্রমণ (غزوات)। যুদ্ধজয়ের পর বিজয়ী পক্ষ পরাজিত পক্ষের নারী, শিশু ও পুরুষদের বন্দী করত এবং তাদের নিজেদের সম্পত্তি হিসেবে ঘোষণা করত। এই বন্দীদের মুক্ত করার একমাত্র উপায় ছিল 'ফিদা' বা মুক্তিপণ প্রদান করা। যদি কোনো বন্দী বা তার পরিবার মুক্তিপণ দিতে ব্যর্থ হতো, তবে সে স্থায়ীভাবে দাসে পরিণত হতো এবং তাকে বাজারে বিক্রি করে দেওয়া হতো। ঐতিহাসিক গ্রন্থে উল্লেখ আছে:

"وكانت الغزوات والحروب أهم مورد لتجارة الرقيق، وهو مورد قديم معروف. فالغالب المنتصر يأخذ من يقع في قبضته من أسرى، ويعده ملكًا له..."

অনুবাদ: "যুদ্ধ ও সামরিক অভিযানগুলো ছিল দাস বাণিজ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎস, যা ছিল একটি প্রাচীন ও সুপরিচিত মাধ্যম। বিজয়ী পক্ষ সাধারণত তার কব্জায় আসা বন্দীদের গ্রহণ করত এবং তাদের নিজের মালিকানাধীন সম্পত্তি হিসেবে গণ্য করত..." [16]

যুদ্ধের পাশাপাশি চরম দারিদ্র্য ও দুর্ভিক্ষও ছিল দাসত্বের অন্যতম কারণ। প্রাক-ইসলামি আরবে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী না থাকায় অনেক দরিদ্র পরিবার ক্ষুধার জ্বালায় তাদের নিজেদের সন্তানদের দাস হিসেবে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হতো। হাদিস ও ঐতিহাসিক বিবরণে এর বহু প্রমাণ পাওয়া যায়:

"ومن أسباب الرق الفقر، ونجد في كتب الحديث والأخبار أن عوائل باعت أولادها من ذكور وإناث، من الفقر."

অনুবাদ: "দাসত্বের অন্যতম কারণ ছিল দারিদ্র্য। আমরা হাদিস ও ইতিহাসের গ্রন্থসমূহে দেখতে পাই যে, অনেক পরিবার চরম দারিদ্র্যের কারণে তাদের পুত্র ও কন্যা সন্তানদের বিক্রি করে দিত।" [17]

এছাড়াও, ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতা এবং অপহরণের মাধ্যমেও স্বাধীন মানুষকে দাসে পরিণত করার ঘটনা অহরহ ঘটত। এই ভূ-রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় দাসপ্রথা ছিল তৎকালীন বিশ্বের এক অনিবার্য অন্ধকার দিক, যা রোমান, পারসিক ও আরব অর্থনীতিকে সচল রেখেছিল কিন্তু মানবতাকে ঠেলে দিয়েছিল চরম লাঞ্ছনার অতল গহ্বরে [18] । এই অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছিল প্রাচীন বিশ্বের বিশাল সব সাম্রাজ্য, যার অবসান ঘটাতে পরবর্তীতে এক আমূল বৈপ্লবিক পরিবর্তনের প্রয়োজন ছিল।

""
৮.১ প্রি-ইসলামিক স্লেভ ট্রেড (Global Slave Trade): রোমান, পারসিক ও আরব অর্থনীতিতে স্লেভ লেবারের (Slave Labor) অপরিহার্যতা
আমাদের নবী সা. সীরাত বিশ্বকোষ
ha-mims.world
এ আর্টিকেলের কুইজ(5টি প্রশ্ন)

৮.১ প্রি-ইসলামিক স্লেভ ট্রেড (Global Slave Trade): রোমান, পারসিক ও আরব অর্থনীতিতে স্লেভ লেবারের (Slave Labor) অপরিহার্যতা কুইজ

1 / 5

রোমান কৃষি ব্যবস্থার মূল ভিত্তি 'লতিফুন্দিয়া' কীসের মাধ্যমে পরিচালিত হতো?

এই আর্টিকেলটি কেমন লাগলো?

এই গবেষণাকে সহায়তা করুন

সীরাত বিশ্বকোষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আপনার সামান্য সহায়তা এই গবেষণাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

bKash / Nagad01XXXXXXXXXX(Send Money)
☕ Ko-fi দিয়ে সহায়তা

রেফারেন্স: "সীরাত বিশ্বকোষ" লিখুন

🌟 Ha-mim's World-এর একটি গবেষণা ও জ্ঞান-প্রযুক্তি প্রকল্প

কমিউনিটি রিফ্লেকশন

এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি কী শিখলেন বা আপনার অনুভূতি কী, তা সবার সাথে শেয়ার করুন।

আপনার রিফ্লেকশন শেয়ার করতে দয়া করে লগইন করুন।

লোড হচ্ছে...