মানব সভ্যতার রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক ইতিহাসে ক্ষমতার সুষম বণ্টন এবং রাষ্ট্রীয় অঙ্গসমূহের পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ধারণ একটি অত্যন্ত জটিল ও সংবেদনশীল বিষয়। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ফরাসি দার্শনিক মন্টেস্কুর ‘ক্ষমতার পৃথকীকরণ নীতি’ (Separation of Powers) শাসনব্যবস্থার মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হলেও, এর প্রায় সহস্রাব্দকাল পূর্বে মদিনার ইসলামি রাষ্ট্রে এই তিন বিভাগের—এক্সিকিউটিভ (নির্বাহী বিভাগ), লেজিসলেটিভ (আইনসভা বা আইন প্রণয়নকারী কর্তৃপক্ষ) এবং জুডিশিয়ারি (বিচার বিভাগ)—কার্যাবলির এক অনন্য, সমন্বিত এবং ভারসাম্যপূর্ণ আন্তঃসম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। প্রফেটিক শাসনব্যবস্থায় এই তিন বিভাগের সম্পর্ক কেবল যান্ত্রিক পৃথকীকরণের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেনি, বরং তা গড়ে উঠেছিল ঐশী আইনের সার্বভৌমত্ব (Sovereignty of Shariah) এবং পারস্পরিক সহযোগিতার (Cooperation of Powers) এক সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর। এই প্রবন্ধে আমরা মদিনা রাষ্ট্রের শাসনতান্ত্রিক কাঠামোতে নির্বাহী, আইন প্রণয়ন ও বিচার বিভাগের কার্যাবলির তাত্ত্বিক ভিত্তি, প্রায়োগিক রূপ এবং তাদের পারস্পরিক ভারসাম্য ও নিয়ন্ত্রণের (Checks and Balances) গতিশীল রূপরেখা আলোচনা করব।
ইসলামি রাষ্ট্রদর্শনে তিন ক্ষমতার তাত্ত্বিক ভিত্তি ও সার্বভৌমত্ব (Sovereignty and Theoretical Foundations)
ইসলামি শাসনতান্ত্রিক দর্শনে সার্বভৌমত্ব বা চূড়ান্ত ক্ষমতার মালিক একমাত্র মহান আল্লাহ তাআলা। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে যেখানে আইনসভার সার্বভৌমত্ব বা জনগণের সার্বভৌমত্বকে স্বীকার করা হয়, সেখানে ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থায় সার্বভৌমত্ব অর্পিত হয়েছে ঐশী আইনের (শরীআহ) ওপর। এই মৌলিক পার্থক্যের কারণে ইসলামি রাষ্ট্রে নির্বাহী, আইন প্রণয়ন ও বিচার বিভাগের পারস্পরিক সম্পর্ক পশ্চিমা মডেলের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও অনন্য রূপ লাভ করে। প্রখ্যাত ফকীহ ড. ওয়াহবাহ আল-জুহাইলি তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ ‘আল-ফিকহুল ইসলামি ওয়া আদিল্লাতুহু’-তে এই তিন বিভাগের অবস্থান ও পারস্পরিক সহযোগিতার স্বরূপ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে লিখেছেন:
"إن السلطات الثلاث: التشريعية ممثلة بأولي الحل والعقد للاجتهاد في استنباط الأحكام من نصوص الشريعة، والتنفيذية ... والقضائية"অনুবাদ: "নিশ্চয়ই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বা কর্তৃপক্ষ তিনটি বিভাগে বিভক্ত: আইন প্রণয়নকারী বিভাগ (লেজিসলেটিভ), যা শরীআতের উৎসসমূহ থেকে ইজতিহাদের মাধ্যমে বিধান আহরণের জন্য ‘আহলুল হাল্লি ওয়াল আকদ’ (নীতি-নির্ধারক সমাজ)-এর প্রতিনিধিত্ব করে; নির্বাহী বিভাগ (এক্সিকিউটিভ) এবং বিচার বিভাগ (জুডিশিয়ারি)।" [1]
এই তাত্ত্বিক কাঠামোটি স্পষ্ট করে যে, ইসলামি রাষ্ট্রে আইন প্রণয়নকারী বিভাগ (Legislative) সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে বা খেয়ালখুশিমতো আইন তৈরি করতে পারে না। তাদের মূল কাজ হলো শরীআতের মূল উৎস (কুরআন ও সুন্নাহ) থেকে ইজতিহাদ ও ইস্তিনবাতের (আইনগত গবেষণা ও বিশ্লেষণ) মাধ্যমে সমসাময়িক সমস্যার সমাধান সূত্র বের করা। অন্যদিকে, নির্বাহী বিভাগ (Executive) এই আইনসমূহ বাস্তবায়নের জন্য দায়বদ্ধ এবং বিচার বিভাগ (Judiciary) এই আইনের আলোকে বিরোধ নিষ্পত্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য নিয়োজিত। এই তিন বিভাগের এই যে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা, তা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে এক অলঙ্ঘনীয় প্রাচীর হিসেবে কাজ করে। ক্ষমতার এই সুষম বণ্টন ও পারস্পরিক সহযোগিতা রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা ও নাগরিক অধিকার সুরক্ষার প্রধান গ্যারান্টি হিসেবে কাজ করে [2] ।
মদিনার প্রফেটিক রাষ্ট্রে এই তিন ক্ষমতার উৎস ও প্রয়োগের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সা.। তবে তাঁর এই একক নেতৃত্বের মধ্যেও ক্ষমতার কার্যগত বিভাজন (Functional Division) অত্যন্ত স্পষ্ট ছিল। তিনি যখন ওহীর বাণী প্রচার ও ব্যাখ্যা করতেন, তখন তিনি ছিলেন সর্বোচ্চ আইন প্রণেতা (Legislator); যখন তিনি রাষ্ট্র পরিচালনা, চুক্তি সম্পাদন ও সেনাদল প্রেরণ করতেন, তখন তিনি ছিলেন প্রধান নির্বাহী (Chief Executive); আর যখন তিনি সাহাবিদের মধ্যকার বিরোধ মীমাংসা করতেন, তখন তিনি ছিলেন প্রধান বিচারপতি (Chief Justice)। এই ত্রিমুখী ভূমিকার মাধ্যমে তিনি এমন এক শাসনতান্ত্রিক মডেল রেখে গেছেন, যা পরবর্তীকালের খিলাফতে রাশেদার যুগে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে এবং ক্ষমতার পৃথকীকরণ ও ভারসাম্যের এক শাশ্বত দৃষ্টান্ত স্থাপন করে [3] ।
লেজিসলেটিভ বা আইন প্রণয়ন ক্ষমতা: ওহী, ইজতিহাদ এবং রাসুলুল্লাহ সা.-এর দ্বৈত ভূমিকা
প্রফেটিক যুগে আইন প্রণয়ন বা লেজিসলেটিভ প্রক্রিয়ার স্বরূপ ছিল অত্যন্ত অনন্য। আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইনসভা যেভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে যেকোনো আইন পাস করতে পারে, ইসলামি শাসনব্যবস্থায় আইনসভার সেই অবাধ ক্ষমতা নেই। এখানে আইন প্রণয়নের মূল ভিত্তি হলো ওহী (কুরআন) এবং রাসুলুল্লাহ সা.-এর সুন্নাহ। তবে এর অর্থ এই নয় যে, মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক আইন প্রণয়নের কোনো সুযোগ নেই। বরং শরীআতের সাধারণ মূলনীতিমালার আলোকে সমসাময়িক প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রয়োজনে নতুন নতুন আইন ও বিধিমালা প্রণয়নের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে, যাকে পরিভাষায় ‘সিয়াসা শরইয়্যাহ’ (Shariah-compliant Policy) বলা হয়। ড. আদিব সালিহ তাঁর ‘তাফসীরুন নুসূস ফিল ফিকহিল ইসলামি’ গ্রন্থে আইনসভার এই সীমাবদ্ধতা ও কার্যপরিধি সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছেন:
"مبدأ فصل السلطات، واقتصار المشرع على إصدار القواعد القانونية والإلزام بها، تاركًا إلى السلطة..."অনুবাদ: "ক্ষমতার পৃথকীকরণ নীতির দাবি হলো, আইন প্রণেতা কেবল সাধারণ আইনগত বিধিমালা প্রণয়ন ও তা মান্য করার বাধ্যবাধকতা আরোপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবেন এবং এর বাস্তবায়নের দায়িত্ব নির্বাহী বিভাগের ওপর ছেড়ে দেবেন..." [4]
রাসুলুল্লাহ সা.-এর যুগে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে ওহীর পাশাপাশি ইজতিহাদ ও পারস্পরিক পরামর্শের (শূরা) এক চমৎকার সমন্বয় দেখা যায়। রাসুলুল্লাহ সা. অনেক সময় সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে সাহাবিদের সাথে পরামর্শ করতেন। উদাহরণস্বরূপ, বদরের যুদ্ধের স্থান নির্ধারণ, উহুদের যুদ্ধের রণকৌশল এবং খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননের সিদ্ধান্ত ছিল যৌথ বুদ্ধিমত্তা ও পরামর্শের ফসল। এটি প্রমাণ করে যে, আইন প্রণয়ন বা নীতি নির্ধারণী প্রক্রিয়ায় একক কর্তৃত্বের চেয়ে যৌথ প্রজ্ঞা ও পরামর্শকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
এই লেজিসলেটিভ প্রক্রিয়ার সাথে নির্বাহী বিভাগের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত নিবিড়। আইনসভা (যা প্রফেটিক যুগে রাসুলুল্লাহ সা. এবং বিশিষ্ট সাহাবিদের সমন্বয়ে গঠিত ছিল) যে সিদ্ধান্ত বা আইন প্রণয়ন করত, নির্বাহী বিভাগ তা বাস্তবায়নে বাধ্য থাকত। আইন প্রণয়নকারী কর্তৃপক্ষ কেবল আইন তৈরি করেই ক্ষান্ত হতো না, বরং নির্বাহী বিভাগ সেই আইন সঠিকভাবে প্রয়োগ করছে কি না, তাও পর্যবেক্ষণ করত। এই দ্বিমুখী প্রক্রিয়া রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে স্বৈরাচারী প্রবণতা রোধে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করেছিল [5] ।
এক্সিকিউটিভ বা নির্বাহী ক্ষমতা: মদিনা রাষ্ট্রের শাসনতান্ত্রিক প্রয়োগ ও প্রশাসনিক কাঠামো
মদিনার ইসলামি রাষ্ট্রে নির্বাহী বিভাগ বা এক্সিকিউটিভের মূল দায়িত্ব ছিল আইনসভার প্রণীত আইন এবং ঐশী বিধানের সফল বাস্তবায়ন করা। রাসুলুল্লাহ সা. ছিলেন এই নির্বাহী বিভাগের প্রধান (Chief Executive)। তাঁর অধীনে একটি অত্যন্ত দক্ষ, গতিশীল এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে উঠেছিল। তিনি মদিনার বাইরে বিভিন্ন প্রদেশে গভর্নর (ওয়ালি), কর সংগ্রাহক (আমিল) এবং বিচারক (কাজী) নিয়োগ করতেন। এই নিয়োগ ও প্রশাসনিক নির্দেশনার ক্ষেত্রে তিনি যোগ্যতা, আমানতদারী এবং তাকওয়াকে একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করতেন।
নির্বাহী বিভাগের এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে মানুষের মস্তিষ্কের সম্মুখভাগের (Prefrontal Cortex) কার্যকারিতার সাথে তুলনা করা যেতে পারে, যা মানবদেহের সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করে। একটি বৈজ্ঞানিক ও তাত্ত্বিক গ্রন্থে নির্বাহী ক্ষমতার এই কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা সম্পর্কে বলা হয়েছে:
"الناصية هي المسئولة عن المقايسات العليا وتوجيه سلوك الإنسان، وما الجوارح إلا جنود تنفذ هذه القرارات التي تتخذ في الناصية؛ لذلك فالقانون... يجعل عقوبة كبار المجرمين... هي استئصال الجزء الأمامي من المخ (الناصية) ؛ (لأنه مركز القيادة والتوجيه)"অনুবাদ: "মস্তিষ্কের সম্মুখভাগ (নাছিয়াহ বা কপাল) মানুষের উচ্চতর পরিমাপ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং আচরণ নিয়ন্ত্রণের জন্য দায়ী। আর শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেবলই সৈন্যের মতো, যা এই সম্মুখভাগে গৃহীত সিদ্ধান্তসমূহ বাস্তবায়ন করে। এই কারণেই আইনগতভাবে... অপরাধীদের এই অংশটি নিষ্ক্রিয় করার কথা ভাবা হয়; কারণ এটিই হলো নেতৃত্ব ও নির্দেশনার মূল কেন্দ্র।" [6]
এই বৈজ্ঞানিক সত্যটি যেভাবে মানবদেহের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, ঠিক তেমনি একটি রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে নির্বাহী বিভাগ হলো সেই ‘নাছিয়াহ’ বা সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কেন্দ্র। মদিনা রাষ্ট্রে রাসুলুল্লাহ সা.-এর নেতৃত্বাধীন নির্বাহী বিভাগ এই কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করত। তবে এই নির্বাহী ক্ষমতা কখনোই অনিয়ন্ত্রিত বা স্বৈরাচারী ছিল না। নির্বাহী বিভাগের প্রতিটি সিদ্ধান্তকে অবশ্যই লেজিসলেটিভ (শরীআতের বিধান) এবং জুডিশিয়ারির (বিচারিক জবাবদিহিতা) অধীন হতে হতো। রাসুলুল্লাহ সা. তাঁর কর্মকর্তাদের স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, স্রষ্টার অবাধ্যতা করে কোনো সৃষ্টির আনুগত্য করা যাবে না (لا طاعة في معصية الخالق)। এই নীতিটি নির্বাহী বিভাগের কর্মকর্তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে বিরত রাখত এবং তাদের জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ হতে বাধ্য করত।
জুডিশিয়ারি বা বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতা: ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও ক্ষমতার ভারসাম্য (Checks and Balances)
একটি রাষ্ট্রের শাসনতান্ত্রিক সুস্থতা ও নাগরিক অধিকার সুরক্ষার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচার বিভাগ (Judiciary)। মদিনার ইসলামি রাষ্ট্রে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা এমন এক উচ্চতায় পৌঁছেছিল, যা আধুনিক বিশ্বের যেকোনো উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য অনুকরণীয়। ইসলামি বিচার ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য ছিল ‘আদল’ বা পরম ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে ধনী-দরিদ্র, শাসক-শাসিত, মুসলিম-অমুসলিম সকলের জন্য আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করা হতো।
বিচার বিভাগের এই স্বাধীনতা ও ক্ষমতার পৃথকীকরণের গুরুত্ব সম্পর্কে ঐতিহাসিক ও আইনবিদগণ একমত যে, এটিই নাগরিক স্বাধীনতা ও সমতার মূল চাবিকাঠি। যেমনটি একটি ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে:
"الفصل بين السلطات الثلاث. ضمان الحريات والمساواة."অনুবাদ: "তিনটি বিভাগের (নির্বাহী, আইন প্রণয়ন ও বিচার) মধ্যে ক্ষমতার পৃথকীকরণ হলো নাগরিক স্বাধীনতা ও সমতা নিশ্চিতকরণের একমাত্র গ্যারান্টি।" [7]
প্রফেটিক যুগে বিচার বিভাগ কীভাবে নির্বাহী বিভাগের প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিল, তার বহু ঐতিহাসিক প্রমাণ রয়েছে। স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সা. বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে নিজের ব্যক্তিগত অবস্থান এবং বিচারকের অবস্থানকে সম্পূর্ণ পৃথক রাখতেন। তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে, তাঁর নিজের মেয়ে ফাতিমাও যদি চুরি করত, তবে তিনি তাঁর হাত কাটার নির্দেশ দিতেন। এই ঘোষণাটি বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা এবং আইনের শাসনের (Rule of Law) এক চরম দৃষ্টান্ত।
পরবর্তীকালে খিলাফতে রাশেদার যুগে এই বিচারিক স্বাধীনতা আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। খলীফা উমর রা. যখন কাজী শুরাইহকে বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেন, তখন তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে, খলীফা বা নির্বাহী প্রধানের কোনো বিশেষ সুবিধা বিচারালয়ে থাকবে না। খলীফা আলি রা. এবং একজন সাধারণ ইহুদির মধ্যকার বর্ম সংক্রান্ত মামলায় কাজী শুরাইহ খলীফার বিপক্ষে এবং ইহুদির পক্ষে রায় দিয়েছিলেন, কারণ খলীফা পর্যাপ্ত প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি। বিচার বিভাগের এই যে স্বাধীনতা, যেখানে নির্বাহী প্রধানকেও সাধারণ নাগরিকের মতো আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়, তা ক্ষমতার ভারসাম্য ও নিয়ন্ত্রণের (Checks and Balances) এক অনন্য উদাহরণ। বিচার বিভাগ এখানে নির্বাহী বিভাগের যেকোনো বেআইনি বা স্বৈরাচারী পদক্ষেপকে বাতিল করার ক্ষমতা রাখত, যা রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে ন্যায়বিচার ও সমতা নিশ্চিত করেছিল [8] ।
ক্ষমতার পৃথকীকরণ বনাম ক্ষমতার সহযোগিতা: আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও প্রফেটিক মডেলের তুলনামূলক বিশ্লেষণ
আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মন্টেস্কুর ক্ষমতার পৃথকীকরণ নীতি মূলত একটি ‘নেতিবাচক ভারসাম্য’ (Negative Balance)-এর ওপর প্রতিষ্ঠিত, যেখানে এক বিভাগ অন্য বিভাগকে অবিশ্বাস ও সন্দেহের চোখে দেখে এবং একে অপরের পথ আগলে দাঁড়ায় (Checks and Balances)। এর ফলে অনেক সময় রাষ্ট্রীয় স্থবিরতা বা ‘গ্রিডলক’ (Gridlock) তৈরি হয়। কিন্তু মদিনার প্রফেটিক রাষ্ট্রে এবং সামগ্রিকভাবে ইসলামি রাষ্ট্রদর্শনে ক্ষমতার এই সম্পর্কটি ছিল ‘ইতিবাচক সহযোগিতা’ বা ‘তাআউন’ (Cooperation of Powers)-এর ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। ড. ওয়াহবাহ আল-জুহাইলি তাঁর গ্রন্থে এই ধারণাকে ‘সিয়াদাতুত তাশরীয়াহ ওয়া তাআউনুস সুলতাত’ (Sovereignty of Legislation and Cooperation of Powers) হিসেবে অভিহিত করেছেন [9] ।
ইসলামি মডেলে তিন বিভাগের কার্যাবলির আন্তঃসম্পর্ককে নিচের ছকের মাধ্যমে সংক্ষেপে বোঝা যেতে পারে:
| বিভাগ (Branch) | মূল দায়িত্ব (Primary Function) | অন্য বিভাগের সাথে আন্তঃসম্পর্ক (Interrelation) |
|---|---|---|
| লেজিসলেটিভ (আইনসভা) | ঐশী আইনের আলোকে ইজতিহাদ ও নীতি নির্ধারণ। | নির্বাহী বিভাগকে দিকনির্দেশনা প্রদান এবং বিচার বিভাগের জন্য আইনি কাঠামো তৈরি করা। |
| এক্সিকিউটিভ (নির্বাহী বিভাগ) | আইন ও নীতিমালার বাস্তবায়ন এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা। | আইনসভার সিদ্ধান্তের অধীন থাকা এবং বিচার বিভাগের রায় বাস্তবায়নে বাধ্য থাকা। |
| জুডিশিয়ারি (বিচার বিভাগ) | আইনের ব্যাখ্যা, বিরোধ নিষ্পত্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। | নির্বাহী বিভাগের বেআইনি পদক্ষেপের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ এবং আইনসভার আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা। |
এই আন্তঃসম্পর্কের মূল উদ্দেশ্য ছিল ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করা এবং নাগরিক অধিকার রক্ষা করা। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ক্ষমতার পৃথকীকরণের গুরুত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে:
"يكمن أهمية مبدأ الفصل بين السلطات في ترسيخ الديمقراطية وضمان الحريات، بمنع تغوّل السلطات أو طغيان نفوذ سلطة ما على باقي السلطات، فلكلّ سلطة حق المراقبة وتفعيل..."অনুবাদ: "ক্ষমতার পৃথকীকরণ নীতির গুরুত্ব নিহিত রয়েছে গণতন্ত্রকে সুসংহত করা এবং স্বাধীনতা নিশ্চিত করার মধ্যে, যা কোনো একটি বিভাগের অন্য বিভাগের ওপর আধিপত্য বিস্তার বা স্বৈরাচারী হয়ে ওঠাকে রোধ করে। ফলে প্রতিটি বিভাগেরই রয়েছে পর্যবেক্ষণ ও সক্রিয় করার অধিকার..." [10]
ইসলামি শাসনব্যবস্থায় এই ‘তগোয়ুল’ বা ক্ষমতার অন্যায় আধিপত্য রোধ করার জন্য কেবল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোই তৈরি করা হয়নি, বরং কর্মকর্তাদের মধ্যে ‘তাকওয়া’ বা আল্লাহর ভয় এবং আখিরাতের জবাবদিহিতার মানসিকতা তৈরি করা হয়েছিল। ফলে, আইন প্রণেতা, নির্বাহী কর্মকর্তা এবং বিচারক—সকলেই নিজেদের আল্লাহর দরবারে জবাবদিহি করতে বাধ্য মনে করতেন। এই নৈতিক ও আধ্যাত্মিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে আরও বেশি কার্যকর ও গতিশীল করে তুলেছিল।
পরিশেষে বলা যায়, মদিনার ইসলামি রাষ্ট্রে এক্সিকিউটিভ, লেজিসলেটিভ এবং জুডিশিয়ারির কার্যাবলির আন্তঃসম্পর্ক ছিল অত্যন্ত সুসমন্বিত, বৈজ্ঞানিক এবং ভারসাম্যপূর্ণ। এটি কেবল ক্ষমতার পৃথকীকরণই নিশ্চিত করেনি, বরং ক্ষমতার সুষম বণ্টন ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে এমন এক কল্যাণ রাষ্ট্র (Welfare State) প্রতিষ্ঠা করেছিল, যেখানে ন্যায়বিচার, সমতা এবং নাগরিক স্বাধীনতা কেবল কাগজে-কলমে নয়, বরং বাস্তব জীবনে প্রতিফলিত হয়েছিল। প্রফেটিক যুগের এই শাসনতান্ত্রিক মডেলটি সমকালীন বিশ্বের ভঙ্গুর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় ক্ষমতার ভারসাম্য ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য এক চিরন্তন ও জীবন্ত আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করে।