খণ্ড 89
ফন্ট:100%
থিম:

১২.৩.১ "দূতদের হত্যা করা হয় না"—মুসায়লামা আল-কাজ্জাবের দূতের প্রতি রাসুল (সা.)-এর আচরণ এবং আধুনিক ভিয়েনা কনভেনশন (Vienna Convention)

মুসায়লামা আল-কাজ্জাবের দুর্ধর্ষ বার্তা ও মদিনা রাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক সংকট

ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থার সম্প্রসারণ ও আরব উপদ্বীপের রাজনৈতিক মানচিত্রে মদিনা সনদের অধীনে সার্বভৌম শক্তির উত্থান যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হয়, তখন নবম ও দশম হিজরিতে ভণ্ড নবুয়তের দাবিদারদের আত্মপ্রকাশ ঘটে। বিশেষত ইয়ামামার বানু হানিফা গোত্রের নেতা মুসায়লামা আল-কাজ্জাব কেবল ধোকা ও ধর্মীয় বিভ্রান্তি ছড়ায়নি, বরং মদিনা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও ভূ-রাজনৈতিক অখণ্ডতার বিরুদ্ধে এক প্রত্যক্ষ চ্যালেঞ্জ উপস্থাপন করে [1] । মুসায়লামা মদিনার কেন্দ্রীয় কর্তৃত্বকে নস্যাৎ করার মানসে রাসুলুল্লাহ সা.-এর নিকট এক ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও সার্বভৌমত্ব-বিরোধী কূটনৈতিক বার্তা প্রেরণ করে। এই বার্তাবাহী প্রতিনিধি দলে ছিল আব্দুল্লাহ ইবনুন নওয়াহা এবং রাজ্জাল ইবনে আফআতা (বা ইবনে আছাল)। তারা কেবল একটি চরমপত্র হস্তান্তর করেনি, বরং রাসুলুল্লাহ সা.-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে প্রকাশ্য রাজদ্রোহ ও ধর্মত্যাগের সঘোষিত স্বীকারোক্তি প্রদান করে [2] launch.

মুসায়লামা তার প্রেরিত পত্রে ইসলামি রাষ্ট্রের ভূখণ্ড দ্বিখণ্ডিত করার এক অগ্রহণযোগ্য দাবি উত্থাপন করেছিল। ইবনে ইশহাক ও ইবনে হিশাম উল্লেখিত বর্ণনায় মুসায়লামার মূল আরবি পত্রটি ছিল নিম্নরূপ:


«مِنْ مُسَيْلَمَةَ رَسُولِ اللَّهِ إِلَى مُحَمَّدٍ رَسُولِ اللَّهِ، سَلَامٌ عَلَيْكَ. أَمَّا بَعْدُ؛ فَإِنِّي قَدْ أُشْرِكْتُ فِي الْأَمْرِ مَعَكَ، وَإِنَّ لَنَا نِصْفَ الْأَرْضِ وَلِقُرَيْشٍ نِصْفَ الْأَرْضِ، وَلَكِنَّ قُرَيْشًا قَوْمٌ لَا يَعْدِلُونَ»

অর্থাৎ: "আল্লাহর রাসুল মুসায়লামার পক্ষ থেকে আল্লাহর রাসুল মুহাম্মাদের প্রতি। আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। অতপর, আমি আপনার সাথে নবুয়ত ও রাষ্ট্রপরিচালনার কর্তৃত্বে অংশীদার মনোনীত হয়েছি। সুতরাং অর্ধেক পৃথিবীর মালিকানা আমাদের এবং অর্ধেক পৃথিবীর মালিকানা কুরাইশদের; কিন্তু কুরাইশরা এমন এক জাতি যারা ইনসাফ করে না।" [3] । এই পত্রটি হস্তান্তরের পর রাসুলুল্লাহ সা. দূতদ্বয়কে জিজ্ঞাসা করলেন, "এ বিষয়ে তোমাদের নিজেদের বক্তব্য কী?" তারা বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে উত্তর দিল, "মুসায়লামা যা বলেছে, আমরাও ঠিক তা-ই বিশ্বাস করি এবং তা-ই বলি।" [4] launch।

ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, এটি সাধারণ কোনো কূটনৈতিক আদান-প্রদান ছিল না; বরং তা ছিল একটি প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধানের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিদ্রোহ, সার্বভৌমত্ব অস্বীকার এবং রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল। তৎকালীন ও আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনানুসারে, যেকোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রপ্রধানের দরবারে দাঁড়িয়ে তার বৈধতা অস্বীকার করা এবং প্রতিপক্ষের বিদ্রোহী দাবিকে সমর্থন করা চরম অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। অথচ এই তীব্র উসকানিমূলক পরিস্থিতিতেও রাসুলুল্লাহ সা. যে কূটনৈতিক প্রজ্ঞা ও আইনি পরমতসহিষ্ণুতা প্রদর্শন করেছিলেন, তা তৎকালীন প্রাচীন বিশ্বের যুদ্ধরীতি ও রাষ্ট্রাচারের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব নজির স্থাপন করে [5] launch।

"লওলা আন্না রুসুলা লা তুকতাল"—কূটনৈতিক সচ্ছলতা ও অনাক্রম্যতার চিরন্তন মূলনীতি

মুসায়লামার দূতদ্বয়ের চরম উসকানিমূলক ও রাষ্ট্রদ্রোহিতামূলক বক্তব্যের জবাবে সার্বভৌম ইসলামি রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে রাসুলুল্লাহ সা. যে কালজয়ী বাণী উচ্চারণ করেছিলেন, তা-ই পরবর্তীকালে আন্তর্জাতিক আইনের ইতিহাসে "কূটনৈতিক অনাক্রম্যতা" (Diplomatic Immunity)-র মূল ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে গৃহীত হয় [6] launch। দূতদ্বয়ের স্পর্ধাপূর্ণ বক্তব্যের জবাবে রাসুলুল্লাহ সা. মুসায়লামাকে কোনো সামরিক হুমকি দেননি, বরং আইনগত নীতি নির্ধারণ করে বলেন:


«أَمَا وَاللَّهِ لَوْلَا أَنَّ الرُّسُلَ لَا تُقْتَلُ لَضَرَبْتُ أَعْنَاقَكُمَا»

অর্থ: "আল্লাহর কসম! যদি এই নিয়ম না থাকত যে, 'দূতদের হত্যা করা যায় না', তবে আমি অবশ্যই তোমাদের দুজনের শিরচ্ছেদ করতাম।" [7] launch। অতপর রাসুলুল্লাহ সা. অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও প্রজ্ঞাপূর্ণ বাক্যে মুসায়লামার পত্রের জবাব লিখে দূতদ্বয়কে নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের সুযোগ দেন। রাসুলুল্লাহ সা.-এর উত্তরটি ছিল:


«مِنْ مُحَمَّدٍ رَسُولِ اللَّهِ إِلَى مُسَيْلَمَةَ الْكَذَّابِ، السَّلَامُ عَلَى مَنِ اتَّبَعَ الْهُدَى. أَمَّا بَعْدُ؛ فَإِنَّ الْأَرْضَ لِلَّهِ يُورِثُهَا مَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ وَالْعَاقِبَةُ لِلْمُتَّقِينَ»

অর্থ: "আল্লাহর রাসুল মুহাম্মাদের পক্ষ থেকে চরম মিথ্যাবাদী মুসায়লামার প্রতি। শান্তি কেবল তার ওপরই বর্ষিত হোক, যে সৎপথ অনুসরণ করে। অতপর, নিশ্চয়ই সমগ্র জমিন আল্লাহর; তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা এর উত্তরাধিকারী করেন এবং চূড়ান্ত সাফল্য পরহেজগারদের জন্যই নির্ধারিত।" [8] launch।

মনস্তাত্ত্বিক ও আইনি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তৎকালীন যুগে যুদ্ধরত বা প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রের দূতদের হত্যা করা বা বন্দি করা অত্যন্ত সাধারণ একটি প্রথা ছিল। কিন্তু বিশ্বনবি সা. বার্তা বা বার বার্তাবাহকের আদর্শিক ও রাজনৈতিক অবস্থানকে পৃথক করে দেখেন। ব্যক্তি দূত তার প্রেরণকারী রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করে মাত্র; তার নিজস্ব বক্তব্য বা প্রেরকের মতাদর্শের জন্য তাকে ব্যক্তিগতভাবে দায়ী করে হত্যা বা নির্যাতন করা যাবে না—এই চিরন্তন নীতিকে রাসুলুল্লাহ সা. একটি অলঙ্ঘনীয় আইনি অনুশাসনে পরিণত করেন [9] launch। এখানে "লওলা আন্নার রুসুলা লা তুকতাল" (لو أن الرسل لا تقتل) বাক্যটি ইসলামি রাষ্ট্রবিজ্ঞানে প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইনের (Customary International Law) রূপ লাভ করে, যা কেবল কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর জন্য নয়, বরং শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে সমস্ত রাষ্ট্রের রাজদূতদের জন্য সুরক্ষা কবচ হিসেবে দাঁড়িয়ে যায় [10] launch।

১৯৬১ সালের ভিয়েনা কনভেনশন (Vienna Convention) এবং ইসলামি শরিআতের পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক আইনগত তুলনা

আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনের ক্ষেত্রে কূটনৈতিক সম্পর্কের সার্বজনীন রূপরেখা নির্ধারিত হয় ১৯৬১ সালের 'কূটনৈতিক সম্পর্ক বিষয়ক ভিয়েনা কনভেনশন' (Vienna Convention on Diplomatic Relations, 1961)-এর মাধ্যমে। আধুনিক বিশ্ব রাষ্ট্রদূতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যে আইন প্রণয়ন করেছে, তার মূল নির্যাস ইসলামি শরিআতে প্রবর্তিত নীতিসমূহের সাথে আশ্চর্যজনকভাবে অভিন্ন, যা সপ্তম শতকে রসূলুল্লাহ সা. বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছিলেন [11] launch।

ভিয়েনা কনভেনশনের ২৯ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে: "কূটনৈতিক প্রতিনিধির ব্যক্তিত্ব অলঙ্ঘনীয়। তিনি কোনো প্রকার গ্রেপ্তার বা আটকযোগ্য হবেন না। গ্রহণকারী রাষ্ট্র তাকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করবে এবং তার ব্যক্তি, স্বাধীনতা বা মর্যাদার ওপর যেকোনো আক্রমণ প্রতিরোধে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।" (Article 29, VCDR) [12] launch। একইসাথে ৩১ নম্বর অনুচ্ছেদে দূতদের দেওয়ানি ও ফৌজদারি বিচারিক রাষ্ট্রীয় এখতিয়ার থেকে অনাক্রম্যতা (Immunity from Jurisdiction) প্রদান করা হয়েছে [13] launch।

তুলনামূলক পর্যালোচনায় দেখা যায়, ইসলামি ফিকহ ও আধুনিক ভিয়েনা কনভেনশনের মধ্যে দার্শনিক ও আইনি কাঠামোর গভীর সামঞ্জস্য বিদ্যমান, যা নিচের সারণীতে দৃশ্যমান:


  • ব্যক্তিগত অনাক্রম্যতা (Personal Inviolability): ভিয়েনা কনভেনশনের ২৯ ধারা এবং রাসুলুল্লাহ সা.-এর ঘোষিত "দূতদের হত্যা করা যায় না" নীতি হুবহু একই উদ্দেশ্য সাধন করে। মুসায়লামার দূতদ্বয় প্রকাশ্য রাজদ্রোহী বক্তব্য দেওয়া সত্ত্বেও তাদের শারীরিক অনাক্রম্যতা (Physical Inviolability) পূর্ণাঙ্গভাবে রক্ষিত হয়েছিল [14] launch।

  • রাজনৈতিক অনাক্রম্যতা (Political Immunity): ভিয়েনা কনভেনশনে যেমন দূতদের রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে গ্রেপ্তার বা শাস্তি দেওয়া নিষিদ্ধ, তেমনই মদিনা রাষ্ট্রে ভণ্ড নবির প্রচারক ও প্রেরিত প্রতিনিধি হওয়া সত্ত্বেও তাদের ওপর কোনো প্রশাসনিক শাস্তি আরোপ করা হয়নি [15] launch।

  • আইনি ভিত্তির শ্রেষ্ঠত্ব: ভিয়েনা কনভেনশনের ভিত্তি হলো রাষ্ট্রসমূহের পারস্পরিক চুক্তি ও 'পারস্পরিক সুবিধা' (Reciprocity); কিন্তু ইসলামি শরিআতে এটি কোনো রাজনৈতিক সুবিধার সমীকরণ নয়, বরং এটি একটি নৈতিক ও ঐশ্বরিক অনুশাসন (عبادة ও চুক্তি রক্ষা) [16] launch। ইসলাম একতরফাভাবেও প্রতিপক্ষের দূতের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বাধ্য, এমনকি প্রতিপক্ষ যদি ইতিপূর্বে মদিনার দূতকে নির্যাতনও করে থাকে।

ফকীহগণ উল্লেখ করেছেন, রাসুলুল্লাহ সা.-এর এই সুন্নাহ থেকে ফিকহবিদগণ সর্বসম্মত নীতি গ্রহণ করেছেন যে, কোনো অমুসলিম বা শত্রুভাবাপন্ন দেশের মبعূছ (দূত) যখন ইসলামি রাষ্ট্রে প্রবেশ করে, সে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই 'আমানে খাস' (বিশেষ কূটনৈতিক নিরাপত্তা) লাভ করে [17] launch। তার মালামাল, জীবন এবং সম্মান রক্ষা করা ইসলামি রাষ্ট্রের জন্য একটি শরয়ী বাধ্যবাধকতা [18] launch।

ফারসি ও অন্যান্য পরাশক্তির রাষ্ট্রদূতের সাথে প্রদেয় আচরণের ধারাবাহিকতা

মুসায়লামার দূতদের সাথেই কেবল নয়, বরং তদানীন্তন বিশ্বের সর্ববৃহৎ দুই পরাশক্তি—পারস্যের কিসরা (দ্বিতীয় খসরু পারভেজ) ও রোমান সাম্রাজ্যের রাজপ্রতিনিধিদের সাথেও রাসুলুল্লাহ সা. সমপরিমাণ কূটনৈতিক অনাক্রম্যতা ও রাষ্ট্রাচার রক্ষা করে চলেছিলেন। নবম-দশম হিজরির দিকে (আমুল উফুদ বা প্রতিনিধি দলের বর্ষে) যখন রাসুলুল্লাহ সা. বিশ্বনেতৃবৃন্দের নিকট রাজকীয় পত্র পাঠাতে শুরু করেন, তখন পারস্যের সম্রাটের প্রতিক্রিয়া ছিল চরম ঔদ্ধত্যপূর্ণ [19] launch। খসরু পারভেজ রাসুলুল্লাহ সা.-এর পত্র ছিঁড়ে ফেলে এবং ইয়েমেনের পারসিক গভর্নর বাধানকে নির্দেশ দেয় যেন দুজন সশস্ত্র দূত পাঠিয়ে মদিনার রাষ্ট্রপ্রধানকে শিকল পরিয়ে গ্রেপ্তার করে কিসরার দরবারে হাজির করা হয় [20] launch।

বাধানের প্রেরিত দুজন পারসিক দূত যখন মদিনায় উপস্থিত হয়ে পরম ঔদ্ধত্যের সাথে ঘোষণা করল যে তারা রাসুলুল্লাহ সা.-কে গ্রেপ্তার করতে এসেছে, তখন মদিনার সাহাবিদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। কিন্তু রসূলুল্লাহ সা. রাষ্ট্রীয় প্রধানের প্রশাসনিক সংযম বজায় রাখেন। তিনি তাদের সাথে কোনো দুর্ব্যবহার তো করেনইনি, বরং তাদের কূটনৈতিক মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রেখে মেহমানদারির ব্যবস্থা করেন [21] launch। রাসুলুল্লাহ সা. শান্তভাবে তাদের কিসরার নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঐশ্বরিক বার্তা অবহিত করেন এবং অত্যন্ত সম্মানজনকভাবে ইয়েমেনে ফেরত পাঠান [22] launch।

এই ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করে যে, রাসুলুল্লাহ সা. কর্তৃক দূতদের নিরাপত্তা প্রদান কোনো আকস্মিক বা সাময়িক নমনীয়তা ছিল না; বরং তা ছিল একটি সুসংহত আন্তর্জাতিক নীতি। কিসরার প্রেরিত দূতদ্বয় সরাসরি মদিনার রাষ্ট্রপ্রধানের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা হরণের প্ররোচনা দেওয়া সত্ত্বেও রাসুলুল্লাহ সা. আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনীতির মর্যাদা রক্ষা করে তাদের গায়ে একটি আঁচড়ও লাগতে দেননি [23] launch। এমনকি বিভিন্ন সময় আগত দূতদের রাসুলুল্লাহ সা. রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে মূল্যবান উপহার-উপঢৌকন প্রদান করতেন এবং অনুদান দিতেন, যা আধুনিক কূটনৈতিক প্রটোকলের প্রারম্ভিক রূপ ছিল [24] launch।

আন্তর্জাতিক পাবলিক আইন (Public International Law)-এ ইসলামি কূটনৈতিক দর্শনের চিরন্তন তাৎপর্য

আধুনিক বিশ্ব যখন ১৭ শতকে ওয়েস্টফেলিয়া চুক্তির (Peace of Westphalia, 1648) পর থেকে আন্তর্জাতিক আইনের ক্রমবিকাশ দেখতে শুরু করে, তার এক হাজার বছর পূর্বেই ইসলামি শরিআত পাবলিক ইন্টারন্যাশনাল ল (Public International Law)-এর সবচেয়ে মানবিক ও নীতিগত অধ্যায়টি রচনা করেছিল [25] launch। রাসুলুল্লাহ সা. বিশ্বকে দেখিয়েছেন যে, চরম যুদ্ধাবস্থাতেও (State of War) কূটনৈতিক যোগাযোগের পথ রুদ্ধ করা যাবে না এবং বার্তাবাহকের গায়ে হাত তোলা যাবে না [26] launch।

কুরআন মাজীদে এর মূল নীতি নির্ধারণ করে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন:


﴿وَأَوْفُوا بِالْعَهْدِ إِنَّ الْعَهْدَ كَانَ مَسْؤُولًا

অর্থাৎ: "এবং তোমরা অঙ্গীকার পূর্ণ করো; নিশ্চয়ই অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।" ইসরা: ৩৪; السيرة النبوية والتاريخ الإسلامي: ص ১৮৪">[27] launch। রাসুলুল্লাহ সা. কূটনৈতিক সম্পর্ককে নিছক একটি রাজনৈতিক বা সামরিক কৌশল হিসেবে দেখেননি, বরং এটিকে ধর্মের অপরিহার্য নৈতিক দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে, প্রতিপক্ষ যদি বিশ্বস্ততা ভঙ্গ করে বা বিশ্বাসঘাতকতাও করে, তাহলেও ইসলামি রাষ্ট্র চুক্তি বা আন্তর্জাতিক প্রথা লঙ্ঘন করে তাদের দূতকে আক্রমণ করতে পারবে না, যতক্ষণ না আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ ঘোষণা করা হয় [28] launch।

উপসংহারে, মুসায়লামা আল-কাজ্জাবের দূতদের সাথে রাসুল সা.-এর ঐতিহাসিক ও আইনি আচরণ কেবল ইতিহাস নয়, বরং মানব সভ্যতার কূটনৈতিক বিকাশের এক উজ্জ্বল মাইলফলক। আন্তর্জাতিক আইনের জনক বলে খ্যাত হুগো গ্রোশিয়াস (Hugo Grotius) কিংবা অ্যালমেরিকো জেন্টিলি (Alberico Gentili)-র বহুকাল পূর্বে, মদিনা রাষ্ট্রের ধূলিময় প্রাঙ্গণে যে 'কূটনৈতিক অনাক্রম্যতা'-র ভিত্তি রচিত হয়েছিল, তা আজও বিশ্বের সর্বাধুনিক কূটনৈতিক আইনি কাঠামোর আলোকবর্তিকা হিসেবে বিদ্যমান [29] launch।

""
১২.৩.১ "দূতদের হত্যা করা হয় না"—মুসায়লামা আল-কাজ্জাবের দূতের প্রতি রাসুল (সা.)-এর আচরণ এবং আধুনিক ভিয়েনা কনভেনশন (Vienna Convention)
আমাদের নবী সা. সীরাত বিশ্বকোষ
ha-mims.world
এ আর্টিকেলের কুইজ(5টি প্রশ্ন)

১২.৩.১ "দূতদের হত্যা করা হয় না"—মুসায়লামা আল-কাজ্জাবের দূতের প্রতি রাসুল (সা.)-এর আচরণ এবং আধুনিক ভিয়েনা কনভেনশন (Vienna Convention) কুইজ

1 / 5

মুসায়লামা আল-কাজ্জاب রাসূলুল্লাহ (সা.) এর নিকট প্রেরিত পত্রে কী দাবি করেছিল?

এই আর্টিকেলটি কেমন লাগলো?

এই গবেষণাকে সহায়তা করুন

সীরাত বিশ্বকোষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আপনার সামান্য সহায়তা এই গবেষণাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

bKash / Nagad01XXXXXXXXXX(Send Money)
☕ Ko-fi দিয়ে সহায়তা

রেফারেন্স: "সীরাত বিশ্বকোষ" লিখুন

🌟 Ha-mim's World-এর একটি গবেষণা ও জ্ঞান-প্রযুক্তি প্রকল্প

কমিউনিটি রিফ্লেকশন

এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি কী শিখলেন বা আপনার অনুভূতি কী, তা সবার সাথে শেয়ার করুন।

আপনার রিফ্লেকশন শেয়ার করতে দয়া করে লগইন করুন।

লোড হচ্ছে...