৫.১.২ কমন এনিমি (Common Enemy) তত্ত্ব: ইসলামি রাষ্ট্রের উত্থান ঠেকাতে মুশরিক-ইহুদি-মুনাফিক ট্রায়াঙ্গেল (Triangle)
ইসলামি রাষ্ট্রের প্রাক-প্রতিষ্ঠা ও মদিনা পরবর্তী প্রাথমিক পর্যায়ে ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ছিল অত্যন্ত জটিল ও সংঘাতময়। যখন মদিনায় একটি সুসংগঠিত ইসলামি রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে উঠতে শুরু করল, তখন আরবের বিদ্যমান সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় স্থিতাবস্থা (Status Quo) চরম হুমকির মুখে পড়ে। এই প্রেক্ষাপটে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও সূক্ষ্ম রাজনৈতিক কৌশল পরিলক্ষিত হয়, যাকে আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়
'Common Enemy' Theory
বা 'সাধারণ শত্রু' তত্ত্ব হিসেবে অভিহিত করা যেতে পারে। এই তত্ত্বের মূল ভিত্তি হলো—ভিন্ন ভিন্ন আদর্শ, ভিন্ন ভিন্ন স্বার্থ এবং ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠী হওয়া সত্ত্বেও, একটি বৃহত্তর ও শক্তিশালী শক্তির উত্থান ঠেকাতে তারা একটি অভিন্ন লক্ষ্য বা শত্রুর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়। মদিনার ইসলামি রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এই অভিন্ন শত্রু ছিল নবি সা.-এর নেতৃত্বাধীন নতুন রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক ব্যবস্থা।
এই 'কমন এনিমি' তত্ত্বের প্রয়োগে একটি ত্রিমাত্রিক বা ত্রিভুজাকার (Triangle) জোট গঠিত হয়েছিল, যার তিনটি শীর্ষবিন্দু ছিল: মক্কার মুশরিকরা, মদিনার ইহুদি গোষ্ঠী এবং মদিনার অভ্যন্তরে অবস্থানরত মুনাফিকরা। যদিও এই তিনটি গোষ্ঠীর মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত ভঙ্গুর এবং তাদের স্বার্থ ছিল ভিন্ন ভিন্ন, তবুও ইসলামি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব বিলীন করার লক্ষ্যে তারা একটি কৌশলগত মৈত্রীর বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিল। এই ত্রিভুজাকার জোটটি কেবল সামরিক সংঘাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এটি ছিল মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ, অর্থনৈতিক অবরোধ এবং অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির একটি সমন্বিত প্রচেষ্টা।
ভূ-রাজনৈতিক বাস্তববাদ ও 'কমন এনিমি' তত্ত্বের প্রয়োগ
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তাত্ত্বিক কাঠামোয়, বিশেষ করে
Realism
বা বাস্তববাদবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে, রাষ্ট্র বা রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো সর্বদা তাদের ক্ষমতা ও অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে কাজ করে। মদিনার ইসলামি রাষ্ট্রের উত্থান আরবের তৎকালীন ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যকে (Geopolitical Balance of Power) আমূল পরিবর্তন করার উপক্রম করেছিল। মুশরিক, ইহুদি ও মুনাফিকদের এই জোটটি মূলত একটি 'Power Dynamics' বা ক্ষমতার লড়াইয়ের অংশ ছিল। তারা বুঝতে পেরেছিল যে, ইসলামি রাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান প্রভাব কেবল তাদের ধর্মীয় আধিপত্য নয়, বরং তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক Hegemony বা আধিপত্যকেও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে।
এই জোটের কার্যকারিতা বুঝতে হলে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সেই তত্ত্বটি বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন যেখানে বিভিন্ন শক্তি তাদের পারস্পরিক বিরোধ ভুলে একটি সাধারণ হুমকির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়। আধুনিক তাত্ত্বিক আলোচনায় যেমনটি দেখা যায়,
অর্থাৎ, শক্তির তত্ত্ব বা বাস্তববাদী তত্ত্বসমূহ আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তবতাকে বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে অপরিহার্য [1] । মদিনার প্রেক্ষাপটেও মুশরিক, ইহুদি ও মুনাফিকরা তাদের ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব বিসর্জন দিয়ে একটি 'Realist' বা বাস্তববাদী অবস্থান গ্রহণ করেছিল। তাদের লক্ষ্য ছিল একটি 'Collective Security' বা সম্মিলিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যা কেবল ইসলামি রাষ্ট্রের পতনের মাধ্যমেই সম্ভব ছিল।
এই ত্রিভুজাকার জোটের কৌশলগত গভীরতা ছিল অপরিসীম। মুশরিকরা মক্কার বাইরে থেকে সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছিল, ইহুদিরা মদিনার কৌশলগত ও বুদ্ধিবৃত্তিক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল, আর মুনাফিকরা মদিনার অভ্যন্তরে থেকে একটি 'Fifth Column' বা অভ্যন্তরীণ শত্রু হিসেবে কাজ করছিল। এই তিন স্তরের সমন্বিত আক্রমণ ইসলামি রাষ্ট্রের ভিত্তিপ্রস্তরকে নাড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। এটি কেবল একটি আকস্মিক সংঘাত ছিল না, বরং এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত ভূ-রাজনৈতিক কৌশল যা মদিনার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে বিনষ্ট করার জন্য প্রণীত হয়েছিল।
মুশরিক-ইহুদি অক্ষ: অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই ও কৌশলগত মৈত্রী
মুশরিক ও ইহুদিদের মধ্যকার সম্পর্কটি ছিল মূলত একটি 'Strategic Alliance' বা কৌশলগত মৈত্রী। মক্কার কুরাইশদের প্রধান লক্ষ্য ছিল মক্কা ও তার আশেপাশের অঞ্চলের ধর্মীয় ও বাণিজ্যিক আধিপত্য বজায় রাখা। অন্যদিকে, মদিনার ইহুদি গোষ্ঠীগুলো (যেমন: বনু নাজির, বনু কুরাইজা) তাদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাব ও অর্থনৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব রক্ষা করতে চেয়েছিল। ইসলামি রাষ্ট্রের উত্থান এই দুই গোষ্ঠীর জন্য একটি 'Zero-sum game' বা অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছিল।
ইহুদি গোষ্ঠীগুলো মদিনার ভূ-প্রকৃতি ও কৌশলগত অবস্থান সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখত। তারা জানত যে, মক্কার মুশরিকদের পক্ষে মদিনায় সরাসরি আক্রমণ করা কঠিন। তাই তারা একটি পরোক্ষ বা প্রক্সি কৌশলের মাধ্যমে মুশরিকদের সাথে সমন্বয় সাধনের চেষ্টা করেছিল। এই সমন্বয়টি ছিল মূলত একটি 'Common Interest' বা সাধারণ স্বার্থের ভিত্তিতে। মুশরিকদের সামরিক শক্তি এবং ইহুদিদের কৌশলগত ও বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা মিলে একটি শক্তিশালী বলয় তৈরি করার চেষ্টা করেছিল। এই জোটের মূল উদ্দেশ্য ছিল ইসলামি রাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান শক্তিকে একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আটকে রাখা বা সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করা।
এই জোটের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তাদের মধ্যকার 'Conflict of Interest' বা স্বার্থের সংঘাত সত্ত্বেও একটি অভিন্ন লক্ষ্যে স্থির থাকা। যদিও ইহুদিরা মুশরিকদের পৌত্তলিকতা পছন্দ করত না, তবুও ইসলামি রাষ্ট্রের উত্থান তাদের জন্য যে পরিমাণ বিপদ বয়ে আনছিল, তা তাদের এই সাময়িক মৈত্রীতে বাধ্য করেছিল। এই পরিস্থিতিটি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সেই তত্ত্বের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ যেখানে বিভিন্ন আদর্শিক ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও একটি সাধারণ শত্রুর বিরুদ্ধে জোট গঠন করা হয় [2] । এই ত্রিভুজাকার জোটের মাধ্যমে তারা মদিনার চারপাশে একটি কৌশলগত বেষ্টনী তৈরির চেষ্টা করেছিল, যাতে ইসলামি রাষ্ট্রটি বহিঃস্থ ও অভ্যন্তরীণ উভয় দিক থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা ও মুনাফিকদের 'পঞ্চম কলাম' হিসেবে ভূমিকা
এই ত্রিভুজাকার জোটের সবচেয়ে বিপজ্জনক এবং সূক্ষ্ম উপাদানটি ছিল মদিনার অভ্যন্তরে অবস্থানরত মুনাফিকরা। যদি মুশরিক ও ইহুদিরা ছিল বহিঃস্থ শত্রু, তবে মুনাফিকরা ছিল একটি 'Internal Destabilizer' বা অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী শক্তি। তারা মদিনার ভেতরে ইসলামি রাষ্ট্রের সদস্য হিসেবে পরিচয় দিলেও তাদের প্রকৃত আনুগত্য ছিল শত্রু পক্ষগুলোর প্রতি। রাজনৈতিক বিজ্ঞানের ভাষায়, তারা ছিল একটি 'Fifth Column' বা এমন একটি গোষ্ঠী যারা শত্রুর সহায়তায় রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ষড়যন্ত্র চালায়।
মুনাফিকদের ভূমিকা ছিল মূলত মনস্তাত্ত্বিক ও গোয়েন্দা সংক্রান্ত। তারা ইসলামি রাষ্ট্রের সংহতি বিনষ্ট করতে, সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে সন্দেহ সৃষ্টি করতে এবং যুদ্ধের ময়দানে মুসলিম বাহিনীর মনোবল ভেঙে দিতে কাজ করত। তাদের এই কর্মকাণ্ড ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। তারা একদিকে যেমন ইসলামি রাষ্ট্রের নীতি ও সিদ্ধান্তের সমালোচনা করত, অন্যদিকে গোপনে মুশরিক ও ইহুদিদের সাথে তথ্য আদান-প্রদান করত। এই অভ্যন্তরীণ শত্রুতা ইসলামি রাষ্ট্রের জন্য একটি নিরন্তর চ্যালেঞ্জ হিসেবে কাজ করেছিল, যা বহিঃস্থ আক্রমণের চেয়েও অনেক সময় বেশি মারাত্মক প্রমাণিত হতো।
মুনাফিকদের এই ভূমিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, তারা মূলত একটি 'Asymmetric Warfare' বা অসম যুদ্ধের কৌশল অবলম্বন করেছিল। তারা সরাসরি যুদ্ধের পরিবর্তে প্রোপাগান্ডা, গুজব এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির মাধ্যমে রাষ্ট্রের ভিত্তি দুর্বল করার চেষ্টা করত। এই মুনাফিক উপাদানটি ছিল সেই ত্রিভুজাকার জোটের 'Internal Linkage' বা অভ্যন্তরীণ সংযোগকারী, যা বহিঃস্থ শক্তিগুলোকে মদিনার অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা সম্পর্কে অবহিত করত। ফলে মুশরিক ও ইহুদিদের আক্রমণগুলো আরও সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর হয়ে উঠত।
'আহজাব' বা বহুবলীয় জোট গঠন ও সামরিক কৌশলগত বিশ্লেষণ
এই 'Common Enemy' তত্ত্বের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল যখন শত্রু পক্ষগুলো বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গোষ্ঠীকে একত্রিত করে একটি বিশাল বহুবলীয় জোট বা 'Confederacy' গঠনের চেষ্টা করেছিল। ঐতিহাসিক নথিতে এই ধরনের জোটবদ্ধতাকে অনেক সময় 'আহজাব' (أحزاب) হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। যখন কোনো শক্তিশালী পক্ষকে মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়ে, তখন পরাজিত বা দুর্বল পক্ষগুলো তাদের শক্তিকে বিভিন্ন ছোট ছোট দলে বা 'Ahzab'-এ বিভক্ত করে এবং প্রয়োজনে একে অপরের সাথে সহযোগিতা করে একটি বড় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয় [3] ।
এই 'Ahzab' বা দলবদ্ধ হওয়ার কৌশলটি ছিল মূলত একটি 'Guerrilla-style' বা গেরিলা ধাঁচের কৌশলগত পদক্ষেপ। শত্রুরা জানত যে, ইসলামি রাষ্ট্রের একটি সুসংগঠিত সেনাবাহিনী রয়েছে। তাই তারা সরাসরি সম্মুখ যুদ্ধে লিপ্ত না হয়ে বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন দিক থেকে এবং বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দল নিয়ে আক্রমণ করার পরিকল্পনা করেছিল। এই কৌশলটি ছিল মূলত মুসলিম বাহিনীর মনোযোগ ও শক্তিকে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে দেওয়ার একটি প্রচেষ্টা। শত্রুরা চেয়েছিল মুসলিমরা যেন একই সাথে বহু ফ্রন্টে যুদ্ধ করতে বাধ্য হয়, যা তাদের সামরিক ও মনস্তাত্ত্বিক সক্ষমতাকে দুর্বল করে দেবে।
সামরিক কৌশলগত দিক থেকে এই 'Ahzab' বা বহুবলীয় জোট গঠন ছিল একটি অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়া। এর জন্য প্রয়োজন ছিল অত্যন্ত উচ্চমানের সমন্বয় ও গোয়েন্দা তথ্য। শত্রুরা তাদের আক্রমণ করার জন্য বিভিন্ন প্রাকৃতিক বাধা বা দুর্গম স্থানকে ব্যবহার করার পরিকল্পনা করেছিল, যাতে তারা মুসলিম বাহিনীর ওপর আকস্মিক ও অপ্রত্যাশিত আক্রমণ (Surprise Attack) চালাতে পারে। এই ধরনের কৌশলগত অবস্থান বা
অর্থাৎ, এমন স্থান থেকে আক্রমণ করা যা শত্রু কল্পনাও করতে পারে না, ছিল তাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এই ত্রিভুজাকার জোটের মাধ্যমে গঠিত এই বহুবলীয় আক্রমণাত্মক কাঠামোটি ছিল ইসলামি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য একটি চরম পরীক্ষা।