খণ্ড 92
ফন্ট:100%
থিম:

১৩.৩৪ ফিলিস্তিন ও মধ্যপ্রাচ্য কনফ্লিক্ট: ইসলামোফোবিয়াকে কীভাবে জিওপলিটিক্যাল কভার-আপ (Geopolitical Cover-up) হিসেবে ব্যবহার করা হয়

ফিলিস্তিন ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কেবল ভূখণ্ডগত অধিকার বা ধর্মীয় বিশ্বাসের লড়াই নয়, বরং এটি একটি জটিল ভূ-রাজনৈতিক দাবার চাল, যেখানে 'ইসলামোফোবিয়া' বা ইসলাম-ভীতিকে একটি কৌশলগত ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় 'ন্যারেটিভ কন্ট্রোল' বা আখ্যান নিয়ন্ত্রণ। যখন কোনো পরাশক্তি মধ্যপ্রাচ্যের খনিজ সম্পদ নিয়ন্ত্রণ, কৌশলগত নৌ-পথ দখল অথবা নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চায়, তখন তারা সেই পদক্ষেপের নৈতিক বৈধতা তৈরির জন্য ইসলামোফোবিয়াকে একটি 'জিওপলিটিক্যাল কভার-আপ' হিসেবে নিয়োগ করে। এর মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে 'সভ্যতা রক্ষা' বা 'সন্ত্রাসবাদ দমন'-এর মোড়কে উপস্থাপন করা হয়, যাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং নিজস্ব জনমতকে প্রভাবিত করা যায়।

ইসলামোফোবিয়ার উৎপত্তি এবং রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে এর বিবর্তন

ইসলামোফোবিয়া শব্দটির উৎপত্তি এবং এর প্রসারের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি কোনো আকস্মিক সামাজিক প্রতিক্রিয়া নয়, বরং একটি পরিকল্পিত মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া। গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৭০-এর দশকের দিকে এই শব্দটির প্রচলন শুরু হয়, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল ইসলামের প্রতি সাধারণ মানুষের মনে এক ধরণের আতঙ্ক বা ভীতি সঞ্চার করা। ড. জয়নব আব্দুল আজিজ এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন যে, ইসলামোফোবিয়া শব্দটির মাধ্যমে ইসলামকে ভয়ংকর হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।


لقد تم اشتقاق كلمة "الإسلاموفوبيا" فى حوالى عام 1970 ، والمقصود منها التخويف من الإسلام بالإشارة الى ...
[1]

বিশ শতকের শেষভাগে, বিশেষ করে স্নায়ুযুদ্ধের সমাপ্তির পর যখন পূর্ব ব্লকের (Eastern Bloc) প্রভাব হ্রাস পায়, তখন পশ্চিমা বিশ্বের সামনে একটি নতুন 'শত্রু'র প্রয়োজন হয়ে দাঁড়ায়। এই শূন্যস্থান পূরণের জন্য 'ওরিয়েন্টালিজম' বা প্রাচ্যতত্ত্বের পুরনো কুসংস্কারগুলোকে আধুনিক রূপ দিয়ে 'ইসলামোফোবিয়া'র জন্ম দেওয়া হয়। এটি কেবল ধর্মীয় বিদ্বেষ নয়, বরং একটি রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়। আল-লুকাহ-এর এক গবেষণায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, পূর্ব ব্লকের প্রভাব কমে যাওয়ার পর এবং স্নায়ুযুদ্ধের তীব্রতা হ্রাস পাওয়ার পর পশ্চিমারা 'ইসলামোফোবিয়া' শব্দটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে শুরু করে।


ونحَت الغربُ مصطلح "الإسلام - فوبيا"، أو الإسلاموفوبيا "Islamophobia، لا سيما بعد انطفاء تأثير المعسكر الشرقي، وخفوت الحرب ...
[2]

এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সেখানে পশ্চিমা হস্তক্ষেপকে বৈধতা দেওয়া হয়। যখনই কোনো মুসলিম প্রধান দেশে ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের সংঘাত তৈরি হয়, তখনই সেখানে 'ইসলামিক এক্সট্রিমজম' বা চরমপন্থার কথা বলে বিশ্ব জনমতকে বিভ্রান্ত করা হয়। ফলে, প্রকৃত রাজনৈতিক নিপীড়ন এবং সম্পদ লুণ্ঠনের ঘটনাগুলো এই ইসলামোফোবিক আখ্যানের আড়ালে ঢাকা পড়ে যায়। এটি একটি সুপরিকল্পিত 'ইন্ডাস্ট্রি অফ হেট্রেড' বা ঘৃণার কারখানায় পরিণত হয়েছে, যেখানে মিডিয়া এবং থিংক-ট্যাংকগুলো যৌথভাবে কাজ করে। [3]

ফিলিস্তিন সংঘাত এবং সন্ত্রাসবাদের আখ্যানের ভূ-রাজনীতি

ফিলিস্তিনের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ক্ষেত্রে ইসলামোফোবিয়াকে যেভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, তা আধুনিক ইতিহাসের এক চরম বৈপরীত্য। ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার এবং ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের লড়াইকে পরিকল্পিতভাবে 'সন্ত্রাসবাদ' হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এখানে ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের কথা গোপন করে ধর্মীয় সংঘাতের রূপ দেওয়া হয়, যাতে বিশ্বব্যাপী মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। এই কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলনকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা এবং একে একটি বৈশ্বিক 'ইসলামিক টেররিজম' নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে প্রমাণ করা।

এই আখ্যানটি তৈরির পেছনে কাজ করে একটি সুসংগঠিত প্রোপাগান্ডা মেশিন। যখনই ফিলিস্তিনিরা তাদের অধিকারের দাবিতে সোচ্চার হয়, তখনই পশ্চিমা মিডিয়াতে 'ইসলামিক ফাসিস্ট' বা 'জহাদি' শব্দগুলোর ব্যবহার বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে সাধারণ মানুষ সংঘাতের মূল কারণ—যেমন অবৈধ দখলদারিত্ব, বসতি স্থাপন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন—বিস্মৃত হয়ে যায়। এই প্রক্রিয়ায় ইসলামোফোবিয়া একটি 'কভার-আপ' হিসেবে কাজ করে, যা দখলদার শক্তির অপরাধগুলোকে আড়াল করে এবং তাদের আক্রমণাত্মক পদক্ষেপগুলোকে 'আত্মরক্ষা' হিসেবে উপস্থাপন করে। [4]

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরণের ন্যারেটিভ তৈরির উদ্দেশ্য হলো মধ্যপ্রাচ্যে একটি স্থায়ী অস্থিরতা বজায় রাখা। কারণ, এই অস্থিরতা থাকলে সেখানে সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি এবং নিরাপত্তা চুক্তির মাধ্যমে অর্থনৈতিক লাভ করা সহজ হয়। ইসলামোফোবিয়া এখানে একটি মনস্তাত্ত্বিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়, যা মুসলিম বিশ্বের অভ্যন্তরীণ সংহতিকে নষ্ট করে এবং তাদের একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেয়। ফলে, ফিলিস্তিনের মতো ন্যায়সঙ্গত দাবিগুলোও 'ধর্মীয় উন্মাদনা'র তকমা পেয়ে আন্তর্জাতিক সমর্থন হারায়। [5]

ঐতিহাসিক পুনরাবৃত্তি: আন্দালুসিয়া থেকে বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য

বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং ইসলামোফোবিয়ার ব্যবহার কোনো নতুন ঘটনা নয়, বরং এর শিকড় প্রোথিত রয়েছে ইতিহাসের গভীরে। আন্দালুসিয়ার (স্পেন) মুসলিম শাসনের পতনের সময়ও একই ধরণের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ চালানো হয়েছিল। তৎকালীন খ্রিষ্টান শক্তিগুলো মুসলিমদের 'বর্বর' এবং 'আক্রমণকারী' হিসেবে চিত্রিত করেছিল, যদিও বাস্তব চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমির আবু ইয়াকুব ইউসুফ বিন তাশফিনের একটি চিঠিতে সেই সময়ের নৃশংসতার কথা বর্ণিত হয়েছে, যেখানে খ্রিষ্টান শাসকরা বৃদ্ধ, যুবক এবং শিশুদের হত্যা করত এবং নারীদের বন্দী করত।


وهم مع ذلك كله يقتلون الشيب والشبان، ويأسرون النساء والصبيان.
[6]

আন্দালুসিয়ার সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, মুসলিমরা যখন তাদের অধিকার পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছিল, তখন তাদের বিরুদ্ধেও ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানো হয়েছিল। বর্তমান ফিলিস্তিন সংঘাতের সাথে এর এক অদ্ভুত মিল রয়েছে। যেমনটি আবু ইয়াকুব ইউসুফ বিন তাশফিন বর্ণনা করেছেন, মুসলিম বাহিনী যখন আন্দালুসিয়ায় প্রবেশ করল, তখন সেখানকার মানুষ তাদের পোশাক এবং বাহ্যিক অবয়ব দেখে তাদের তুচ্ছজ্ঞান করেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত মুসলিমদের ন্যায়বিচার এবং সাহসিকতা তাদের জয়ী করেছিল।


وفدوا من كل قطر إليهم، متعجبين من هيأتهم، محتقرين لزيهم ونغماتهم...
[7]

ইতিহাসের এই পুনরাবৃত্তি প্রমাণ করে যে, যখনই মুসলিম শক্তি কোনো ভূখণ্ডে প্রভাব বিস্তার করে বা তাদের অধিকার দাবি করে, তখনই তাদের বিরুদ্ধে 'অন্যকরণ' (Othering) প্রক্রিয়া শুরু হয়। আন্দালুসিয়ার সময় যেমন 'কাফের' বা 'বর্বর' তকমা দেওয়া হয়েছিল, বর্তমান যুগে তাকে 'সন্ত্রাসবাদী' বা 'ইসলামোফোবিক' ফ্রেমওয়ার্কে উপস্থাপন করা হয়। এই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা এটাই নির্দেশ করে যে, ইসলামোফোবিয়া আসলে একটি সাম্রাজ্যবাদী কৌশল, যার লক্ষ্য হলো মুসলিমদের নৈতিকভাবে দুর্বল করে দেওয়া এবং তাদের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানকে নড়বড়ে করা। [8]

'পশ্চিমের ইসলামিকরণ' মিথ এবং বহিঃস্থ হস্তক্ষেপের বৈধতা

আধুনিক যুগে ইসলামোফোবিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী রূপটি দেখা যায় 'পশ্চিমের ইসলামিকরণ' (Islamization of the West) নামক একটি কাল্পনিক ভয়ের মাধ্যমে। এই মিথটি এমনভাবে প্রচার করা হয় যে, মুসলিমরা তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের মাধ্যমে পশ্চিমা সংস্কৃতি এবং শাসনব্যবস্থাকে ধ্বংস করতে চায়। এই ভীতি যখন সাধারণ মানুষের মনে গেঁথে দেওয়া হয়, তখন সরকারগুলো খুব সহজেই মুসলিমদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন করে এবং মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক হস্তক্ষেপের বৈধতা পায়।

আল-লুকাহ-এর এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে যে, পশ্চিমের ইসলামিকরণের ভয় এবং কট্টরপন্থী ধর্মীয় দলগুলোর উত্থানকে একে অপরের সাথে জুড়ে দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে সাধারণ মুসলিমদেরও সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।


الخوف من أسلمة الغرب واقترانه بصعود الأحزاب الدينية المتشددة ظاهرة صعود الأحزاب الدينية
[9]

এই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের ফলে একটি 'সিকিউরিটি প্যারাডক্স' তৈরি হয়। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়, অন্যদিকে ইসলামোফোবিয়ার দোহাই দিয়ে সেখানে স্বৈরাচারী শাসকদের সমর্থন করা হয়, যারা পশ্চিমা স্বার্থ রক্ষা করে। যখনই কোনো দেশ প্রকৃত ইসলামি মূল্যবোধের ভিত্তিতে শাসন করতে চায়, তখনই তাকে 'ইসলামিক ফাসিজম' হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় ইসলামোফোবিয়া একটি ভূ-রাজনৈতিক কভার-আপ হিসেবে কাজ করে, যা প্রকৃত গণতন্ত্রের পরিবর্তে 'কন্ট্রোলড ডেমোক্রেসি' বা নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র চাপিয়ে দেওয়ার পথ প্রশস্ত করে। [10]

পরিশেষে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের গভীরে তাকালে দেখা যায়, ইসলামোফোবিয়া কেবল একটি সামাজিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি উচ্চপর্যায়ের ভূ-রাজনৈতিক কৌশল। এটি ব্যবহার করে একদিকে ফিলিস্তিনের ন্যায়সঙ্গত দাবিগুলোকে স্তব্ধ করা হয়, অন্যদিকে মুসলিম বিশ্বের সম্পদ ও কৌশলগত অবস্থান দখল করা হয়। এই আখ্যানের আড়ালে লুকিয়ে থাকে তেল, গ্যাস, নৌ-পথ এবং ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্যের লড়াই। যতক্ষণ পর্যন্ত এই 'কভার-আপ' প্রক্রিয়াটি চলবে, ততক্ষণ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রকৃত সমাধান অসম্ভব হয়ে পড়বে, কারণ এখানে সমস্যাটি ধর্মীয় নয়, বরং সাম্রাজ্যবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষার। [11]

""
১৩.৩৪ ফিলিস্তিন ও মধ্যপ্রাচ্য কনফ্লিক্ট: ইসলামোফোবিয়াকে কীভাবে জিওপলিটিক্যাল কভার-আপ (Geopolitical Cover-up) হিসেবে ব্যবহার করা হয়
আমাদের নবী সা. সীরাত বিশ্বকোষ
ha-mims.world
এ আর্টিকেলের কুইজ(5টি প্রশ্ন)

১৩.৩৪ ফিলিস্তিন ও মধ্যপ্রাচ্য কনফ্লিক্ট: ইসলামোফোবিয়াকে কীভাবে জিওপলিটিক্যাল কভার-আপ (Geopolitical Cover-up) হিসেবে ব্যবহার করা হয় কুইজ

1 / 5

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে ইসলামোফোবিয়াকে পশ্চিমা শক্তিগুলো কী হিসেবে ব্যবহার করে?

এই আর্টিকেলটি কেমন লাগলো?

এই গবেষণাকে সহায়তা করুন

সীরাত বিশ্বকোষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আপনার সামান্য সহায়তা এই গবেষণাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

bKash / Nagad01XXXXXXXXXX(Send Money)
☕ Ko-fi দিয়ে সহায়তা

রেফারেন্স: "সীরাত বিশ্বকোষ" লিখুন

🌟 Ha-mim's World-এর একটি গবেষণা ও জ্ঞান-প্রযুক্তি প্রকল্প

কমিউনিটি রিফ্লেকশন

এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি কী শিখলেন বা আপনার অনুভূতি কী, তা সবার সাথে শেয়ার করুন।

আপনার রিফ্লেকশন শেয়ার করতে দয়া করে লগইন করুন।

লোড হচ্ছে...