মানব সভ্যতার ইতিহাসে জনসমষ্টি বা 'মব' (Mob) কেবল একটি সংখ্যাতাত্ত্বিক সমষ্টি নয়, বরং এটি একটি শক্তিশালী মনস্তাত্ত্বিক সত্তা। যখন ব্যক্তিসত্তার বিচ্ছুরণ ঘটে এবং একটি বৃহৎ জনসমষ্টি একক ও অভিন্ন সংবেদনশীলতায় নিমগ্ন হয়, তখন সেখানে 'মব সাইকোলজি' বা জনসমষ্টির মনস্তত্ত্বের উদ্ভব ঘটে। রাজনৈতিক বিজ্ঞানের ভাষায়, এই মনস্তাত্ত্বিক শক্তিকে অনেক সময় 'ডেটারেন্স পলিসি' বা প্রতিরোধমূলক কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এর মূল লক্ষ্য হলো, একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বা রাষ্ট্রের ওপর এমন এক সম্মিলিত ভীতি বা আতঙ্কের ছায়া বিস্তার করা, যা তাদের সম্ভাব্য প্রতিরোধমূলক কর্মকাণ্ড বা বিদ্রোহের মানসিক শক্তিকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দেয়। এই প্রক্রিয়াটি মূলত 'Fear of the Collective' বা সামষ্টিক ভয়ের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়।
মব সাইকোলজির এই জটিল প্রক্রিয়াটি বুঝতে হলে প্রথমে জনসমষ্টির গঠনগত ও মনস্তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যগুলো বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। ঐতিহাসিক ও সমাজতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটে জনসমষ্টির এই সংহতি বা ঐক্যবদ্ধতা অনেক সময় অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। আরবি ভাষায় জনসমষ্টি বা গোষ্ঠীকে বোঝাতে
الفئام: الجماعة من الناس [1] শব্দটি ব্যবহৃত হয়, যা নির্দেশ করে যে এটি কেবল বিচ্ছিন্ন কিছু মানুষের সমাবেশ নয়, বরং একটি সুসংবদ্ধ ও অভিন্ন লক্ষ্য বা আবেগে আচ্ছন্ন গোষ্ঠী। যখন এই গোষ্ঠীটি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা সামাজিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়, তখন তাদের ব্যক্তিগত বিচারবুদ্ধি লোপ পায় এবং তারা একটি 'কলেক্টিভ কনশাসনেস' বা সামষ্টিক অবচেতনের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। এই অবস্থায় মব বা জনসমষ্টির আচরণ অত্যন্ত অননুমেয় এবং বিধ্বংসী হয়ে উঠতে পারে, যা রাষ্ট্র বা শাসকগোষ্ঠী তাদের প্রতিপক্ষকে দমানোর জন্য একটি কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে।জনসমষ্টির মনস্তাত্ত্বিক বিবর্তন ও 'আল-ফিয়াম' (الفئام) এর সংহতি
মব সাইকোলজির মূল ভিত্তি হলো ব্যক্তির স্বতন্ত্র সত্তার বিলুপ্তি। যখন একটি বিশাল জনতা কোনো নির্দিষ্ট আবেগ—তা হতে পারে চরম ক্রোধ, চরম লোভ বা চরম আতঙ্ক—এর দ্বারা তাড়িত হয়, তখন সেখানে 'সাইকোলজিক্যাল কন্টাজিয়ন' বা মনস্তাত্ত্বিক সংক্রামণ ঘটে। এই প্রক্রিয়ায় একজন ব্যক্তির আবেগ মুহূর্তের মধ্যে হাজার হাজার মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। ঐতিহাসিক দলিল অনুযায়ী, জনসমষ্টির এই ঘনত্বের কারণে অনেক সময় বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। যেমনটি বর্ণিত হয়েছে:
أي: مزدحمون كأن بعضهم يقصف بعضًا لفرط الزحام [2] । এই অত্যধিক ঘনত্বের শারীরিক ও মানসিক চাপ জনসমষ্টির মধ্যে একটি অস্থিরতা তৈরি করে, যা নিয়ন্ত্রিত বা অপপ্রয়োগ করা সম্ভব।এই মনস্তাত্ত্বিক সংহতি কেবল আকস্মিক নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী সাংস্কৃতিক ও সামাজিক প্রক্রিয়ার ফসল। সংস্কৃতির উপাদানগুলোই মূলত এই মব বা জনসমষ্টির মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরি করে দেয়। আরবি তাত্ত্বিকদের মতে, সংস্কৃতি হলো এমন একটি ভর বা সমষ্টি যা অভিন্ন অভ্যাস, প্রতিভা এবং ঐতিহ্যের সমন্বয়ে গঠিত।
فالثقافة هي تلك الكتلة نفسها، بما تتضمنه من عادات متجانسة وعبقريات متقاربة، وتقاليد متكاملة وأذواق متناسبة. وعواطف متشابهة [3] । অর্থাৎ, যখন একটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে 'অভিন্ন আবেগ' (عواطف متشابهة) বিদ্যমান থাকে, তখন তাদের একটি মব বা জনসমষ্টিতে রূপান্তর করা অত্যন্ত সহজ হয়ে পড়ে। এই অভিন্ন আবেগকেই রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ব্যবহার করে একটি 'ডেটারেন্স' বা প্রতিরোধমূলক ভীতি তৈরি করা হয়।ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, যখন কোনো রাষ্ট্র বা গোষ্ঠী তাদের প্রতিপক্ষকে দমানোর জন্য এই 'মব সাইকোলজি' ব্যবহার করে, তখন তারা মূলত জনসমষ্টির এই সাংস্কৃতিক ও আবেগীয় অভিন্নতাকে কাজে লাগায়। তারা এমন একটি পরিস্থিতি বা ন্যারেটিভ তৈরি করে যা জনসমষ্টির মধ্যে একটি সম্মিলিত ভীতি বা উত্তেজনার সৃষ্টি করে। এই উত্তেজনার মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে বোঝানো হয় যে, যদি তারা কোনো পদক্ষেপ নেয়, তবে এই বিশাল ও আবেগপ্রবণ জনসমষ্টি তাদের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়বে। এটি মূলত একটি 'সাইকোলজিক্যাল ওয়ারফেয়ার' বা মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ, যেখানে সরাসরি সংঘাতের পরিবর্তে জনসমষ্টির অবচেতন মনকে ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে নিরস্ত করা হয়।
সম্মষ্টিক আতঙ্ক ও ডেটারেন্স: একটি ঐতিহাসিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ
ডেটারেন্স পলিসির একটি অত্যন্ত কার্যকর ও ভয়াবহ দিক হলো 'ম্যাস প্যানিক' বা গণ-আতঙ্ক সৃষ্টি করা। যখন একটি জনসমষ্টির মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, তখন তারা যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। ইতিহাসের বিভিন্ন সন্ধিক্ষণে দেখা গেছে, এই গণ-আতঙ্ককে রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। 'স্টোরি অফ সিভিলাইজেশন' (Story of Civilization) গ্রন্থের ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, জনসমষ্টির আবেগ অত্যন্ত দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে—লোভ থেকে তারা মুহূর্তের মধ্যে আতঙ্কে নিমজ্জিত হতে পারে।
দক্ষিণ সাগর বুদবুদ বা 'South Sea Bubble'-এর ঐতিহাসিক ঘটনাটি মব সাইকোলজির একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। সেখানে দেখা গেছে, যে জনসমষ্টি প্রথমে চরম লোভ বা লালসায় (Greed) আচ্ছন্ন ছিল, তারা মুহূর্তের মধ্যে চরম আতঙ্কে (Panic) পর্যবসিত হয়। যখন শেয়ারের দাম কমতে শুরু করে, তখন সেই জনসমষ্টির আচরণে এক ভয়াবহ পরিবর্তন আসে। আরবি ভাষায় এই অবস্থাকে বলা হয়েছে:
هذا استحال التهافت على البيع ضرباً من الهلع والذعر الجماعي [4] । অর্থাৎ, বিক্রির জন্য যে তীব্র প্রতিযোগিতা ছিল, তা মুহূর্তের মধ্যে 'সম্মষ্টিক আতঙ্ক ও ভীতি'তে (Mass Panic) রূপান্তরিত হয়। এই প্যানিক বা আতঙ্কটি এতটাই তীব্র ছিল যে, এটি পুরো অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোকে নাড়িয়ে দিয়েছিল।এই ঘটনাটি থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, মব সাইকোলজি কীভাবে একটি 'ডেটারেন্স' হিসেবে কাজ করতে পারে। যখন কোনো শাসক বা প্রভাবশালী গোষ্ঠী জনসমষ্টির মধ্যে এই ধরনের 'গণ-আতঙ্ক' সৃষ্টির ক্ষমতা প্রদর্শন করে, তখন তারা প্রতিপক্ষকে একটি বার্তা দেয়—"আপনার সামান্য একটি ভুল পুরো জনসমষ্টির এই উন্মত্ত ও নিয়ন্ত্রিত আতঙ্কের শিকার হতে পারে।" এই ভয়টি প্রতিপক্ষের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে পঙ্গু করে দেয়। এখানে ডেটারেন্সটি সরাসরি সামরিক শক্তির মাধ্যমে নয়, বরং জনসমষ্টির মনস্তাত্ত্বিক অস্থিরতাকে ব্যবহার করে প্রয়োগ করা হয়।
তদুপরি, এই ধরনের আতঙ্ক সৃষ্টির প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত হতে পারে। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দেখা গেছে, যখন কোনো বড় ধরনের অর্থনৈতিক বা সামাজিক বিপর্যয় ঘটে, তখন জনসমষ্টির মধ্যে যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়, তা অনেক সময় রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হয়। যেমনটি 'South Sea Bubble'-এর ক্ষেত্রে দেখা গেছে, যেখানে মানুষের জঘন্য লোভ এবং পরবর্তীতে চরম আতঙ্কিত হয়ে পড়া একটি বিশাল সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্ম দিয়েছিল [5] । এই অস্থিরতা বা বিশৃঙ্খলা (Chaos) নিজেই একটি ডেটারেন্স হিসেবে কাজ করে, যা সাধারণ মানুষকে বা প্রতিপক্ষকে কোনো বড় ধরনের পরিবর্তনের সাহস নিতে বাধা দেয়।
গণ-আবেগীয় কারসাজি ও আধুনিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভূমিকা
মব সাইকোলজি বা জনসমষ্টির মনস্তত্ত্বকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আধুনিক যুগে 'মিডিয়া' এবং 'কমিউনিকেশন' অত্যন্ত শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। প্রাচীনকালে যেখানে গুজব বা সংবাদের বিস্তার ছিল ধীরগতির, আধুনিক যুগে তা মুহূর্তের মধ্যে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়তে পারে। এই দ্রুততা মব সাইকোলজির প্রভাবকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। জনসমষ্টির মধ্যে একটি নির্দিষ্ট আবেগ বা ভীতি ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য আধুনিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো একটি 'ক্যাটালিস্ট' বা অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।
ফিলিস্তিনি নাগরিক সমাজের প্রেক্ষাপটে এবং আধুনিক বৈজ্ঞানিক ও মানবিক অগ্রগতির যুগে দেখা যায় যে, গণমাধ্যম ও যোগাযোগের আধুনিক সরঞ্জামগুলো কীভাবে জনমত গঠন এবং জনসমষ্টির মনস্তাত্ত্বিক অবস্থাকে প্রভাবিত করে [6] । যখন কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য জনসমষ্টির মধ্যে ভীতি বা ক্রোধ সঞ্চারিত করতে হয়, তখন মিডিয়া ব্যবহার করে একটি কৃত্রিম 'মব সাইকোলজি' তৈরি করা হয়। এই কৃত্রিম মব বা জনসমষ্টির মাধ্যমে একটি 'ডেটারেন্স' তৈরি করা হয়, যা প্রতিপক্ষকে আন্তর্জাতিক বা অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে চাপে ফেলে দেয়।
এই প্রক্রিয়ায় 'ডেটারেন্স' শব্দটি কেবল সামরিক প্রতিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং এটি একটি 'ইনফরমেশনাল ডেটারেন্স' (Informational Deterrence)-এ রূপান্তরিত হয়। অর্থাৎ, তথ্যের মাধ্যমে জনসমষ্টির মধ্যে এমন এক মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা তৈরি করা হয়, যা প্রতিপক্ষকে কোনো পদক্ষেপ নিতে বাধা দেয়। যদি কোনো গোষ্ঠী বুঝতে পারে যে, তাদের একটি পদক্ষেপ জনসমষ্টির মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে, তবে তারা সেই পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকে। এটি মূলত মব সাইকোলজির একটি কৌশলগত প্রয়োগ, যেখানে জনসমষ্টির 'আবেগীয় শক্তি'কে একটি ঢাল বা অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
পরিশেষে বলা যায়, মব সাইকোলজি বা জনসমষ্টির মনস্তত্ত্ব একটি দ্বি-মুখী তলোয়ার। এটি একদিকে যেমন সামাজিক পরিবর্তনের বিশাল শক্তি হতে পারে, অন্যদিকে এটি শাসক বা প্রভাবশালী গোষ্ঠী কর্তৃক 'ডেটারেন্স পলিসি' হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে প্রতিপক্ষকে দমানোর একটি অত্যন্ত কার্যকর ও সূক্ষ্ম হাতিয়ার। জনসমষ্টির অভিন্ন সংস্কৃতি, আবেগ এবং গণ-আতঙ্কের এই জটিল সমন্বয়টিই নির্ধারণ করে দেয় যে, একটি রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রেক্ষাপটে ক্ষমতার ভারসাম্য কীভাবে বজায় থাকবে বা পরিবর্তিত হবে।