৭.৩ উত্তরাধিকার (Inheritance) থেকে নারী ও শিশুদের বঞ্চনা: ক্যাপিটালিস্টিক প্যাট্রিয়ার্কি (Capitalistic Patriarchy)
মানব সভ্যতার অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিবর্তনের ইতিহাসে সম্পদের বণ্টন ও মালিকানা সংক্রান্ত আইনসমূহ সর্বদা ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করেছে। বিশেষ করে, যখন পুঁজিবাদী কাঠামোর সাথে পিতৃতান্ত্রিক প্রথার (Patriarchy) একটি অবিচ্ছেদ্য ও সংমিশ্রিত রূপ তৈরি হয়, তখন তাকে 'ক্যাপিটালিস্টিক প্যাট্রিয়ার্কি' বা 'পুঁজিবাদী পিতৃতন্ত্র' হিসেবে অভিহিত করা হয়। এই ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হলো সম্পদের কেন্দ্রীকরণ এবং পুঞ্জীভূত মূলধনকে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির হাতে সীমাবদ্ধ রাখা। এই প্রক্রিয়ায় উত্তরাধিকার আইনকে একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে নারী ও শিশুদের প্রাপ্য অধিকার থেকে পদ্ধতিগতভাবে বঞ্চিত করা হয়। ইসলামের ন্যায়সঙ্গত ও সুনির্দিষ্ট উত্তরাধিকার বণ্টন ব্যবস্থার বিপরীতে, এই পুঁজিবাদী পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোতে সম্পদের মালিকানা কেবল পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্য বজায় রাখার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়, যা সামাজিক ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক সাম্যকে চরমভাবে বিঘ্নিত করে।
পুঁজিবাদী পিতৃতন্ত্রের কাঠামোগত স্বরূপ ও সম্পদের কেন্দ্রীকরণ
পুঁজিবাদী পিতৃতন্ত্র কেবল একটি সামাজিক প্রথা নয়, বরং এটি একটি সুসংগঠিত অর্থনৈতিক কৌশল। এই ব্যবস্থায় সম্পদের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ এমনভাবে বিন্যস্ত করা হয় যাতে তা পরিবারের পুরুষ সদস্যদের হাতেই পুঞ্জীভূত থাকে। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, পুঁজিবাদের উত্থান ও বিকাশের সময় পিতৃতান্ত্রিক আধিপত্যকে একটি আবরণের মতো ব্যবহার করা হয়েছে। এই আবরণের আড়ালে সম্পদের অসম বণ্টন ও শোষণকে বৈধতা দেওয়া হয়।
ঐতিহাসিক দলিল অনুযায়ী, অনেক ক্ষেত্রে পিতৃতান্ত্রিক সম্পর্কের আড়ালে আধিপত্য বিস্তার করা হয়েছে।
"وطبعت الهيمنة المتخفية تحت أقنعة روابط الأبوية..." [1] । এই উক্তিটি নির্দেশ করে যে, পিতৃতন্ত্রের মুখোশ পরে কীভাবে অর্থনৈতিক আধিপত্য ও পুঁজি সঞ্চয় করা হয়েছে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় যখন সম্পদ কেবল পুরুষদের হাতেই সীমাবদ্ধ থাকে, তখন নারী ও শিশুরা অর্থনৈতিকভাবে সম্পূর্ণভাবে পুরুষদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এই নির্ভরশীলতা তাদের আইনি ও সামাজিক অধিকার আদায়ের পথকে রুদ্ধ করে দেয়।
পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ব্যক্তিগত মালিকানা ও বাজারের ওপর অত্যধিক গুরুত্বারোপ।
"الدول الرأسمالية التي تحولت إلى نظام رأسمالي مختلط مازالت تحتفظ بنظام السوق وبالملكية الخاصة..." [2] । এই ব্যক্তিগত মালিকানার ধারণাটি যখন পিতৃতান্ত্রিক পারিবারিক কাঠামোর সাথে মিলিত হয়, তখন উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ নারী বা শিশুদের কাছে পৌঁছানোর পরিবর্তে পরিবারের প্রধান বা পুরুষ উত্তরাধিকারীর কাছেই আটকে থাকে। এর ফলে সম্পদের একটি বিশাল অংশ সমাজের একটি ক্ষুদ্র ও শক্তিশালী গোষ্ঠীর হাতে পুঞ্জীভূত হয়, যা সামাজিক বৈষম্যকে আরও প্রকট করে তোলে।
এই কাঠামোগত বঞ্চনা কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক কৌশল। সম্পদের কেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে পুরুষতান্ত্রিক গোষ্ঠীটি পরিবারের অভ্যন্তরে এবং বৃহত্তর সমাজে তাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব বজায় রাখতে সক্ষম হয়। উত্তরাধিকার আইনকে যখন এই উদ্দেশ্যে বিকৃত করা হয়, তখন তা কেবল একটি পারিবারিক বিষয় থাকে না, বরং তা একটি বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়।
ঐতিহাসিক শোষণ ও দুর্বল শ্রেণির প্রান্তিকীকরণ
ইতিহাসের পাতায় পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, শক্তিশালী পক্ষ কর্তৃক দুর্বল পক্ষের শোষণ একটি চিরন্তন সত্য। রোমান সাম্রাজ্যের মতো প্রাচীন সভ্যতাগুলোতেও এই শোষণের চিত্র অত্যন্ত ভয়াবহ ছিল। সম্পদের অসম বণ্টন ও শোষণের এই প্রবণতা কেবল আধুনিক পুঁজিবাদে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া।
রোমান সাম্রাজ্যের প্রেক্ষাপটে দেখা যায় যে, শক্তিশালীরা দুর্বলদের শোষণ করাকে একটি স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে গ্রহণ করেছিল।
"وجد من الجدير بنا أن ننسى ان استغلال الأقوياء للضعفاء أمر طبيعي كالطعام والشراب..." [3] । এই ঐতিহাসিক সত্যটি বর্তমান পুঁজিবাদী পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোর সাথে সরাসরি সামঞ্জস্যপূর্ণ। এখানে 'দুর্বল' বলতে নারী ও শিশুদের বোঝানো হচ্ছে, যাদের উত্তরাধিকারের অধিকার থাকা সত্ত্বেও পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোর চাপে তারা সম্পদ থেকে বঞ্চিত হয়।
পুঁজিবাদী পিতৃতন্ত্রে সম্পদের মালিকানা কেবল ভোগের জন্য নয়, বরং এটি সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হিসেবে কাজ করে। রোমান যুগেও দেখা যেত যে, যারা সম্পদ অর্জন করতে পারত, তারা দ্রুত উচ্চ সামাজিক স্তরে উন্নীত হতো।
"وكانت هذه الطبقة وقتئذ تتألف من رجال الأعمال الذين لم يرشحوا لعضوية طبقة أخرى..." [4] । বর্তমান প্রেক্ষাপটে, উত্তরাধিকার থেকে নারী ও শিশুদের বঞ্চিত করার মাধ্যমে পুরুষতান্ত্রিক গোষ্ঠীটি তাদের এই 'উচ্চ সামাজিক স্তর' বা 'শ্রেণিগত শ্রেষ্ঠত্ব' বজায় রাখার চেষ্টা করে। যখন সম্পদ নারী বা শিশুদের হাতে পৌঁছায়, তখন পরিবারের প্রচলিত ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে, যা পুঁজিবাদী পিতৃতন্ত্রের অস্তিত্বের জন্য হুমকি স্বরূপ।
এই শোষণের ফলে একটি বিশাল জনগোষ্ঠী—বিশেষ করে নারী ও শিশুরা—অর্থনৈতিকভাবে প্রান্তিক হয়ে পড়ে। তারা কেবল সম্পদ থেকে বঞ্চিত হয় না, বরং তাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক কণ্ঠস্বরও স্তব্ধ হয়ে যায়। এই প্রান্তিকীকরণ একটি চক্রাকার প্রক্রিয়া তৈরি করে; সম্পদহীনতা তাদের আরও বেশি নির্ভরশীল করে তোলে, আর নির্ভরশীলতা তাদের অধিকার আদায়ের লড়াইকে আরও কঠিন করে তোলে।
ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ বনাম সামাজিক ও ধর্মীয় ন্যায়বিচার
পুঁজিবাদী দর্শনের মূল ভিত্তি হলো ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ (Individualism) এবং সীমাহীন সম্পদ আহরণ। এই দর্শনে ব্যক্তির মুনাফা অর্জনই সর্বোচ্চ লক্ষ্য, যেখানে সামাজিক দায়বদ্ধতা বা পরিবারের সদস্যদের প্রতি আইনি ও নৈতিক দায়িত্ব গৌণ হয়ে পড়ে। এর বিপরীতে, ইসলামি ও অনেক সমাজতান্ত্রিক দর্শনে সম্পদের বণ্টনকে একটি সামাজিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবে দেখা হয়।
ক্যালভিনিস্ট মতবাদ বা প্রটেস্ট্যান্ট নৈতিকতার একটি দিক ছিল কঠোর পরিশ্রম ও মিতব্যয়িতা, যা আধুনিক পুঁজিবাদী মানসিকতার ভিত্তি স্থাপন করেছে। তবে সেখানেও সম্প্রদায়ের স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল।
"ولم يكن يظهر أي عطف نحو المضاربة لجمع المال أو تكديسه بصورة جائرة..." [5] । যদিও এখানে অন্যায্যভাবে সম্পদ পুঞ্জীভূত করার বিরুদ্ধে কথা বলা হয়েছে, তবুও পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিবর্তনে এই নৈতিকতা অনেক ক্ষেত্রে হারিয়ে গেছে। আধুনিক পুঁজিবাদী পিতৃতন্ত্রে 'সম্পদ পুঞ্জীভূতকরণ' বা 'Accumulation' একটি নেশার মতো কাজ করে, যেখানে উত্তরাধিকার আইনকে কেবল পরিবারের পুরুষ সদস্যদের সম্পদ বৃদ্ধির মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়।
ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সম্পদের বণ্টন একটি ঐশ্বরিক বিধান, যা সামাজিক ভারসাম্য বজায় রাখতে ডিজাইন করা হয়েছে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় যেখানে সম্পদ কেবল শক্তিশালী ও পুরুষতান্ত্রিক হাতে পুঞ্জীভূত হওয়ার প্রবণতা দেখায়, সেখানে ইসলামি উত্তরাধিকার আইন নারী ও শিশুদের সুনির্দিষ্ট অংশ নিশ্চিত করে।
"تفعل الرأسمالية التي أعطت الفرد..." [6] । এই উক্তিটি নির্দেশ করে যে, পুঁজিবাদ ব্যক্তিকে কেবল তার নিজস্ব স্বার্থের কথা ভাবতে শেখায়, যা পারিবারিক ও সামাজিক ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
যখন উত্তরাধিকার আইনকে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী ও পিতৃতান্ত্রিক স্বার্থে ব্যবহার করা হয়, তখন তা সামাজিক সংহতি বিনষ্ট করে। সম্পদ যখন কেবল একটি নির্দিষ্ট লিঙ্গের হাতে সীমাবদ্ধ থাকে, তখন সমাজে একটি গভীর বিভাজন তৈরি হয়। এই বিভাজন কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধকেও জন্ম দেয়, যেখানে নারীরা নিজেদের পরিবারেরই অংশ হওয়া সত্ত্বেও অর্থনৈতিকভাবে 'বহিরাগত' হিসেবে গণ্য হয়।
পুঞ্জীভূত মূলধন ও নৈতিক অবক্ষয়ের প্রভাব
পুঁজিবাদী পিতৃতন্ত্রের চূড়ান্ত পরিণতি হলো সম্পদের এমন একটি কেন্দ্রীকরণ, যা নৈতিক অবক্ষয় ও সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করে। যখন সম্পদ অর্জনের লক্ষ্য কেবল সীমাহীন পুঞ্জীভূতকরণে পরিণত হয়, তখন মানুষের নৈতিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা লোপ পায়।
ইতিহাসে দেখা গেছে, যারা দ্রুত সম্পদ অর্জন করে এবং যাদের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল, তারা প্রায়শই সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। রোমান সাম্রাজ্যের মুক্ত হওয়া দাসদের (Freedmen) উদাহরণ এক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
"ولم يكن ماضيهم يتيح لهم الفرص لرفع مستواهم الخلقي أو يسمو بأغراضهم وأسباب اهتمامهم، فلما حرروا أصبح المال شغلهم الشاغل..." [7] । এই ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণটি বর্তমানের সেইসব পুঁজিবাদী মানসিকতার প্রতিফলন, যারা উত্তরাধিকার আইনের অপব্যবহার করে নারী ও শিশুদের সম্পদ থেকে বঞ্চিত করে কেবল নিজেদের অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য বিস্তারের নেশায় মত্ত।
এই অর্থনৈতিক লোভ ও পিতৃতান্ত্রিক আধিপত্যের সংমিশ্রণ একটি বিষাক্ত পরিবেশ তৈরি করে। উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত নারী ও শিশুরা যখন বড় হয়, তখন তাদের মধ্যে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি এক ধরণের অনাস্থা ও ক্ষোভ তৈরি হয়। এটি দীর্ঘমেয়াদে একটি অস্থির সমাজ ও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার জন্ম দেয়।
"وقد شهدنا في الماضي أمثال هذه الظاهرة الأولى، وهي بزوغ نظريات معادية لليبرالية نتيجة فشل اقتصادي..." [8] । অর্থনৈতিক ব্যর্থতা ও বৈষম্য যখন চরম সীমায় পৌঁছায়, তখন তা নতুন ধরণের রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার জন্ম দেয়, যা পুঁজিবাদী কাঠামোর ভিত্তিকে নাড়িয়ে দিতে পারে।
পরিশেষে, উত্তরাধিকার থেকে নারী ও শিশুদের বঞ্চনা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়; এটি পুঁজিবাদী পিতৃতন্ত্রের একটি কাঠামোগত ও পদ্ধতিগত অপরাধ। সম্পদের এই অসম বণ্টন ও পিতৃতান্ত্রিক আধিপত্য বজায় রাখার কৌশলটি সামাজিক ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক সাম্য এবং মানবিক মর্যাদাকে চরমভাবে অবদমিত করে। এই বৈষম্য দূর না করা পর্যন্ত একটি স্থিতিশীল ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠন করা অসম্ভব।