১. পারস্যের অগ্নিপূজক থেকে সত্যের ব্যাকুল পথিক: প্রারম্ভিক পটভূমি ও অগ্নি উপাসনালয় ত্যাগ
ইসলামের ইতিহাসে আত্মিক মুক্তি ও সত্য অনুসন্ধানের এক মহাকাব্যিক রূপকার হযরত সালমান ফারসি রা.। তদানীন্তন পারস্য সাম্রাজ্যের (সাসানীয় সাম্রাজ্য) ইসফাহান অঞ্চলের 'জয়ী' (Jayy) নামক গ্রামে এক অভিজাত ও প্রভাবশালী 'দেহকান' (ভূস্বামী ও ধর্মীয় নেতা) পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মূল নাম ছিল রূযবেহ (Ruzbeh)। পিতা তাঁকে এতই স্নেহ করতেন যে, গৃহের বাইরে জগতের কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ যেন তাঁকে স্পর্শ করতে না পারে, সেজন্য তাঁকে সুরম্য প্রাসাদে বন্দির মতো লালন-পালন করতেন [1] । অগ্নিপূজার (মাজুসিয়াত) গোঁড়া পরিবেশে বেড়ে ওঠা সালমান রা. তাঁর নিষ্ঠা ও একাগ্রতার কারণে উপাসনালয়ের প্রধান অগ্নি-সংরক্ষক (سادن النار) পদে উন্নীত হন। তাঁর মূল দায়িত্ব ছিল পবিত্র অগ্নির শিখা যেন মুহূর্তের জন্যও নির্বাপিত না হয় তা নিশ্চিত করা। মূল আরবি সূত্রে বর্ণিত হয়েছে:
«كان مجوسياً يعبد النار، بل ويعمل خادماً لها، يوقدها حتى لا تخبو»পিতার এতিহ্যবাহী সম্পত্তি ও অগ্নিকুণ্ডের প্রধান সেবকের রাজকীয় জীবন সালমানকে রা. আত্মিক তৃপ্তি দিতে ব্যর্থ হয়। পারস্যের আধ্যাত্মিক শূন্যতা তাঁর অনুসন্ধিৎসু আত্মাকে তীব্রভাবে ব্যাকুল করে তোলে। একদিন পিতা তাঁকে এস্টেটের কাজ তদারকির জন্য বাইরে পাঠান। পথিমধ্যে তিনি খ্রিস্টানদের একটি গির্জার পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় ভেতর থেকে প্রার্থনার সুর শুনতে পান। যে সুর ও প্রার্থনার বিনম্রতা তাঁর হৃদয়কে গভীরভাবে নাড়া দেয়। তিনি ভেতরে প্রবেশ করে তাদের উপাসনা প্রত্যক্ষ করেন এবং অনুভব করেন যে, তাদের এই ধর্ম তাঁর পিতৃপুরুষের অগ্নিপূজা অপেক্ষা বহুলাংশে শ্রেষ্ঠ ও সত্যের নিকটবর্তী [2] ।
সন্ধ্যায় গৃহে প্রত্যাবর্তন করে সালমান রা. তাঁর পিতাকে এই নতুন অভিজ্ঞতার কথা জানান এবং অগ্নিপূজার অসারতা প্রকাশ করেন। পিতা এতে চরম ক্রুদ্ধ হন এবং সালমানের রা. পায়ে শিকল পরিয়ে নিজ গৃহে বন্দি করে রাখেন। কিন্তু সত্যের আলো যার অন্তরে প্রজ্জ্বলিত হয়েছে, তাকে লৌহশৃঙ্খলে আবদ্ধ রাখা অসম্ভব ছিল। সালমান রা. গোপনে গির্জার খ্রিস্টানদের নিকট বার্তা পাঠান যে, শাম (সিরিয়া) অঞ্চল থেকে কোনো বাণিজ্যিক কাফেলা এলে যেন তাঁকে অবহিত করা হয়। পরবর্তীতে শামের কাফেলা উপস্থিত হলে তিনি শৃঙ্খল মুক্ত হয়ে নিজ জন্মভূমি, আভিজাত্য ও বিপুল ধন-সম্পদ চিরতরে ত্যাগ করে শামের উদ্দেশ্যে এক অনিশ্চিত কিন্তু সত্যের আলোকোজ্জ্বল অভিযাত্রায় বেরিয়ে পড়েন [3] ।
২. শাম থেকে আম্মুরিয়া: খ্রিস্টান এসকেটিক বিশ্বস্ততার অনুক্রম ও সন্ন্যাসীদের ঐতিহাসিক দিকনির্দেশনা
শাম অঞ্চলে উপনীত হয়ে সালমান ফারসি রা. তৎকালীন খ্রিস্টান সমাজের সর্বোচ্চ ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ও আসকোটিক (সন্ন্যাসী) বিশপের সান্নিধ্য লাভ করেন। তিনি গির্জার সেবা এবং বাইবেলের গভীর তাত্ত্বিক জ্ঞানার্জনে আত্মনিয়োগ করেন। কিন্তু প্রথম বিশপ ছিলেন চরম দুর্নীতিগ্রস্ত; তিনি সাধুতার অন্তরালে যাকাত ও সদকার অর্থ নিজের ব্যক্তিগত তহবিলে জমা করতেন। তাঁর মৃত্যুর পর সালমান রা. যখন তাঁর অসৎ চরিত উন্মোচন করেন, তখন স্থানীয়রা তাঁকে ক্রুশবিদ্ধ করে। অতঃপর তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন এক অত্যন্ত সৎ, যাহিদ (সংসারবিরাগী) এবং প্রকৃত অর্থে একত্ববাদী সন্ন্যাসী, যার সান্নিধ্যে সালমান রা. দীর্ঘকাল তাওহীদের পাঠ গ্রহণ করেন [4] ।
ইসলামি ইতিহাস ও গবেষণার আলোকে সালমান ফারসির রা. এই সফরটি ছিল বিশুদ্ধ একেশ্বরবাদের (Original Monotheism) সন্ধানে খ্রিস্টীয় মনাস্টিক পারম্পর্যের এক ঐতিহাসিক যাত্রা। শামের সেই সৎ সন্ন্যাসী মৃত্যুর সাকরাতের পূর্বে সালমানকে রা. এক স্থান থেকে অন্য স্থানে তাওহীদের ওপর প্রতিষ্ঠিত বিশুদ্ধ সাধুদের নিকট যাওয়ার অসিয়ত করে যান। ফলে সালমান রা. ধারাবাহিকভাবে চারজন প্রখ্যাত সন্ন্যাসীর শিষ্যাত্ব গ্রহণ করেন:
- প্রথমতঃ শামের বিশপ: যার কাছ থেকে তিনি তাওহীদের প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন।
- দ্বিতীয়তঃ মোসুলের (Mosul) সন্ন্যাসী: শামের বিশপের মৃত্যুর পর তাঁর নির্দেশে মোসুলে গিয়ে এক মহৎ ও নিষ্ঠাবান তাওহীদপন্থী আলেমের অধীনে নিজেকে সঁপে দেন।
- তৃতীয়তঃ নসীবীনের (Nisibis) সন্ন্যাসী: মোসুলের আলেমের ইন্তেকালের পর তাঁরই সুপারিশক্রমে নসীবীনের এক সাধকের দরবারে উপস্থিত হন এবং সেখানেও সত্যের খেদমতে নিয়োজিত থাকেন।
- চতুর্থতঃ আম্মুরিয়ার (Amorium/এশিয়া মাইনর) সন্ন্যাসী: নসীবীনের আলেমের অসিয়তে তিনি আনাতোলিয়ার আম্মুরিয়াতে পৌঁছান। সেখানে তিনি নিজের শ্রমের বিনিময়ে কয়েকটি গরু ও ছাগলের মালিক হন এবং জ্ঞানার্জন অব্যাহত রাখেন।
আম্মুরিয়ার সন্ন্যাসী যখন মৃত্যুর মুখোমুখি হন, তখন সালমান রা. ব্যাকুল হয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করেন— "হে গুরু, আপনার মৃত্যুর পর আপনি আমাকে কার কাছে যাওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন?" তখন সেই শেষ আসকোটিক মহাত্মা উত্তর দেন, "হে বৎস! পৃথিবীতে এখন আমার জানা মতে এমন কেউ বেঁচে নেই যে আমাদের ন্যায় বিশুদ্ধ একত্ববাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। মানবজাতি সত্যচ্যুত হয়ে বিকৃতির চরম সীমায় পৌঁছেছে। তবে তোমার জন্য সুসংবাদ, অন্তিম নবির (Prophet of the End Times) আবির্ভাবের সময় অত্যন্ত সন্নিকট। তিনি ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের দ্বীনের ওপর প্রেরিত হবেন এবং আরবের খেজুর বাগানবেষ্টিত দুটি আগ্নেয় শিলাখণ্ডের (حرّتان) মধ্যবর্তী ভূমিতে হিজরত করবেন" [5] ।
আম্মুরিয়ার সন্ন্যাসী সালমান ফারসিকে রা. শেষ নবির এমন তিনটি অলৌকিক ও স্পষ্ট ভৌত-চরিত্রগত চিহ্ন (Prophetic Marks/Seal of Prophethood) প্রদান করেন, যা দ্বারা তাঁকে নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা সম্ভব। সন্ন্যাসীর জবানীতে সেই ৩টি চিহ্ন ছিল:
«هو لا يأكل الصدقة، ويقبل الهدية، وبين كتفيه خاتم النبوة»১. তিনি সদকা (দান)-র বস্তু ভক্ষণ করবেন না।
২. তিনি হাদিয়া (উপহার) গ্রহণ করবেন এবং তা ভক্ষণ করবেন।
৩. তাঁর দুই কাঁধের মধ্যবর্তী স্থানে 'নবুওয়াতের মোহর' (Khatam an-Nubuwwah) মুদ্রিত থাকবে।
৩. দাসত্বের শৃঙ্খল ও ইয়াছরিবে আগমন: ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও ঐশ্বরিক নিয়তি
সন্ন্যাসীর প্রদত্ত সংকেত ও ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্র মাথায় নিয়ে সালমান ফারসি রা. আরবের উদ্দেশ্যে যাত্রা করার জন্য ব্যগ্র হয়ে ওঠেন। পথিমধ্যে আরবের 'বনু কালব' (Banu Kalb) গোত্রের একটি বাণিজ্যিক কাফেলার সাথে তাঁর সাক্ষাৎকার হয়। সালমান রা. তাঁর জীবনের একমাত্র সম্বল— সেই গরু ও ছাগলগুলো কাফেলাকে প্রদান করে বিনিময়ে তাঁকে আরবের ভূমিতে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ জানান। কিন্তু ওয়াদি আল-কুরা (Wadi al-Qura) পৌঁছানোর পর বনু কালবের ব্যবসায়ীরা বিশ্বাসঘাতকতা করে। তারা সালমানকে রা. একজন স্বাধীন পারসিক অভিজাত ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও বেআইনিভাবে দাস হিসেবে এক ইহুদির নিকট বিক্রি করে দেয় [6] ।
ইহুদি মনিবের অধীনে দাসত্বের প্রথমার্ধে সালমান রা. ওয়াদি আল-কুরার খেজুর বাগান তদারকি করতেন। কিছুদিন পর সেই ইহুদির এক চাতুস্পর্শীয় জ্ঞাতি ভাই— যিনি বনু কুরাইজা (Banu Qurayzha) গোত্রের সদস্য ছিলেন— তিনি সালমানকে রা. ক্রয় করে ইয়াছরিবে (মদিনা) নিয়ে আসেন। মদিনায় পদার্পণ করেই সালমান রা. আম্মুরিয়ার সন্ন্যাসীর দূরদর্শী বর্ণনার সাথে ভৌগোলিক মিল প্রত্যক্ষ করেন। কঙ্করময় কালচে শিলাখণ্ড এবং অজস্র খেজুর বাগানে ঘেরা এই ইয়াছরিবই যে সেই কাঙ্ক্ষিত প্রফেটিক ল্যান্ড, তা তিনি তৎক্ষণাৎ চিনতে পারেন।
দাসত্বের চরম নিষ্পেষণ ও কঠোর শারীরিক পরিশ্রমের মাঝেও সালমানের রা. অন্তরে জ্বলছিল সত্য দর্শনের চিরন্তন শিখা। তিনি অপেক্ষায় ছিলেন সেই মহামানবের, যিনি মক্কার বুকে তাওহীদের দাওয়াত দিয়ে হিজরত করে এই ইয়াছরিবে আগমন করবেন। তাঁর এই যাত্রা কেবল ভৌগোলিক স্থানান্তর ছিল না, বরং তা ছিল প্রাচীন সাসানীয় ও বাইজেন্টাইন পৌত্তলিক ও বিকৃত দ্বৈতবাদ থেকে উদীয়মান আসমানী অহীর দিকে এক অভূতপূর্ব কৌশলগত ও আধ্যাত্মিক অগ্রযাত্রা।
৪. নববী চিহ্নাদি (Prophetic Marks) যাচাই এবং সত্যের প্রত্যক্ষ সত্যতা নিরূপণ
মদিনায় রাসুলুল্লাহ সা.-এর আগমনের বার্তা যখন পৌঁছাল, সালমান রা. তখন তাঁর মনিবের খেজুর গাছের উঁচুতে উঠে কাজ করছিলেন। নিচে তাঁর মনিব ও এক আত্মীয় আলোচনা করছিল যে, মক্কা থেকে আগত এক ব্যক্তি নাকি নিজেকে নবি দাবি করছে এবং কুবা (Quba) নামক স্থানে লোকজন তার চারপাশে সমবেত হচ্ছে। এই কথা শুনতেই সালমানের রা. শরীরে শিহরণ জেগে ওঠে। তিনি দ্রুত গাছ থেকে নেমে এসে ব্যাকুল কণ্ঠে প্রশ্ন করে ওঠেন, "তোমরা কী বলছ?" এতে ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁর কঠোর মনিব তাঁকে সজোরে এক চড় মেরে বলে, "তোমার এতে কী কাজ? নিজের কাজে মন দাও!" [7]
ঐশ্বরিক চিহ্নাদি যাচাইয়ের বৈজ্ঞানিক ও বস্তুনিষ্ঠ প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করেন সালমান রা.। সন্ন্যাসীর দেওয়া তিনটি প্রফেটিক মার্কস একে একে পরীক্ষা করার জন্য তিনি তাঁর জমানো অল্প কিছু খেজুর নিয়ে কুবায় রাসুলুল্লাহ সা.-এর খেদমতে উপস্থিত হন।
প্রথম পরীক্ষা (সদকা বর্জন):
সালমান রা. রাসুলুল্লাহ সা.-এর সামনে খেজুর পেশ করে বললেন, "আমি শুনেছি আপনি এবং আপনার সঙ্গীরা অত্যন্ত অভাবগ্রস্ত ও দূরবর্তী স্থান থেকে আগত পথিক। এটি আমার পক্ষ থেকে রাখা সদকা (দান)।" রাসুলুল্লাহ সা. স্বহস্তে সেই খেজুর গ্রহণ না করে তাঁর সাহাবিদের বললেন,
«كُلُوا» (তোমরা খাও), কিন্তু তিনি নিজে একটি খেজুরও মুখে তুললেন না। সালমান রা. স্বগত কণ্ঠে বললেন: "এটি প্রথম চিহ্ন!" [8] ।দ্বিতীয় পরীক্ষা (হাদিয়া গ্রহণ):
রাসুলুল্লাহ সা. মদিনার অভ্যন্তরে প্রবেশ করলে সালমান রা. পুনরায় কিছু খেজুর নিয়ে তাঁর নিকট উপস্থিত হন এবং বললেন, "আমি লক্ষ্য করলাম আপনি সদকার বস্তু ভক্ষণ করেন না। তাই এটি আমার পক্ষ থেকে আপনার জন্য একটি 'হাদিয়া' বা উপহার।" এবার রাসুলুল্লাহ সা. বিসমিল্লাহ বলে নিজে তা ভক্ষণ করলেন এবং সাহাবিদেরও তাঁর সাথে শরিক হতে বললেন। সালমান রা. হৃদয়ে গভীর প্রত্যয় নিয়ে উচ্চারণ করলেন: "এটি দ্বিতীয় চিহ্ন!"
তৃতীয় পরীক্ষা (নবুওয়াতের মোহর দর্শন):
চূড়ান্ত প্রমাণের জন্য সালমান রা. জানাজায় অংশগ্রহণকারী রাসুলুল্লাহ সা.-এর পেছনে 'বাকী আল-গারকাদ' (Baqi al-Gharqad) গোরস্থানে উপস্থিত হন। রাসুলুল্লাহ সা. দুটি চাদর পরিহিত অবস্থায় সাহাবিদের মাঝে বসে ছিলেন। সালমান রা. ব্যাকুলভাবে তাঁর চাদরের ফাঁক দিয়ে দুই কাঁধের মধ্যবর্তী স্থান দর্শনের চেষ্টা করছিলেন। রাসুলুল্লাহ সা. সালমানের এই অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ অনুসন্ধিৎসা অনুধাবন করতে পারলেন। তিনি স্বীয় আলখাল্লা বা চাদরটি পিঠের দিক থেকে কিছুটা সরিয়ে দিলেন। সালমান রা. রাসুলুল্লাহ সা.-এর দুই স্কন্ধের মাঝে কবুতরের ডিমের ন্যায় উচু, দ্যুতিময় সেই ঐতিহাসিক 'নবুওয়াতের মোহর' (Khatam an-Nubuwwah) প্রত্যক্ষ করলেন [9] ।
ঐশ্বরিক আলামত প্রত্যক্ষ করতেই সালমান ফারসির রা. বহু বছরের কান্না, আত্মিক ক্ষুধা ও দীর্ঘ কষ্টের অবসান ঘটল। তিনি হাউমাউ করে কেঁদে উঠে রাসুলুল্লাহ সা.-কে জড়িয়ে ধরলেন, সেই নবুওয়াতের মোহরে অসংখ্য চুমু দিলেন এবং সাথে সাথে শাহাদাত পাঠ করে ইসলামের শীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করলেন।
৫. 'সালমান মিন্না আহলাল বাইত': সামাজিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক তাৎপর্য এবং ইসলামি সার্বজনীনতা
সালমান ফারসির রা. ইসলাম গ্রহণ কেবল একজন ব্যক্তির ধর্মান্তর ছিল না; এটি ছিল বর্ণপ্রথা, জাতীয়তাবাদ ও শৌভিনিবাদের (Shu'ubiyyah) বিরুদ্ধে ইসলামের সার্বজনীনতার এক মহা-ঘোষণা। দাসত্বের কারণে তিনি বদর ও উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেননি। পরবর্তীতে রাসুলুল্লাহ সা.-এর দিকনির্দেশনায় এবং সাহাবিদের সহায়তায় বিপুল পরিমাণ খেজুর গাছ রোপণ ও নির্দিষ্ট পরিমাণ স্বর্ণ আদায়ের শর্তে (মুকাতাবাত) তিনি দাসত্ব থেকে মুক্তি লাভ করেন [10] । দাসত্বমুক্তির পর তিনি খন্দকের যুদ্ধ (Battle of Trench) থেকে শুরু করে প্রতিটি ঐতিহাসিক অভিযানে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। খন্দকের যুদ্ধে পারস্যের সমরকৌশল অনুসরণে মদিনা রক্ষার্থে পরিখা খননের প্রজ্ঞাপূর্ণ প্রস্তাবটি তিনিই প্রদান করেছিলেন, যা খন্দকের যুদ্ধে মুসলমানদের অভাবনীয় বিজয় এনে দেয় [11] ।
খন্দকের পরিখা খননের সময় আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যে সালমানকে রা. নিজ নিজ দলের অংশ দাবি করার এক ভ্রাতৃত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতা শুরু হয়। মুহাজিরগণ বললেন, "সালমান আমাদের লোক", আনসারগণ বললেন, "সালমান আমাদের লোক।" তখন রাসুলুল্লাহ সা. মানব ইতিহাসের অন্যতম সেরা মর্যাদা প্রদান করে ঘোষণা করলেন:
«سَلْمَانُ مِنَّا أَهْلَ الْبَيْتِ»"সালমান কোনো নির্দিষ্ট দলের নয়, সালমান আমাদের— আমার আহলে বাইতের (পরিবারের) অন্তর্ভুক্ত।" [12] ।
সালমান ফারসির রা. স্থান এতই উচ্চে পৌঁছেছিল যে, হযরত আলি রা. তাঁর জ্ঞান ও আধ্যাত্মিক গভীরতা সম্পর্কে বলেন:
«عَلِمَ الْعِلْمَ الأَوَّلَ وَالْعِلْمَ الآخِرَ، وَهُوَ بَحْرٌ لا يَنْزَفُ، وَهُوَ مِنَّا أَهْلَ الْبَيْتِ»"তিনি পূর্ববর্তী (আসমানী কিতাবসমূহের) জ্ঞান এবং পরবর্তী (কুরআন ও সুন্নাহর) জ্ঞান অর্জন করেছেন। তিনি এক অক্ষয় জ্ঞান-সমুদ্র, এবং তিনি আমাদের আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত।" [13] ।
ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম রহ. কর্তৃক সংকলিত হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, সুরা জুমুআহ-এর «وآخرين منهم لما يلحقوا بهم» আয়াতটি নাজিল হলে সাহাবিগণ এর তাৎপর্য জানতে চান। রাসুলুল্লাহ সা. স্বীয় হস্ত সালমান ফারসির রা. স্কন্ধে রেখে এর ব্যাখ্যায় এরশাদ করেন:
«لَوْ كَانَ الإِيمَانُ عِنْدَ الثُّرَيَّا لَنَالَهُ رِجَالٌ أَوْ رَجُلٌ مِنْ هَؤُلاَءِ»"যদি ঈমান সুরাইয়া (Pleiades) নক্ষত্রমণ্ডলেও অবস্থান করত, তবে ফারস (পারস্যের) সন্তানদের মধ্য থেকে কিছু লোক বা এক ব্যক্তি অবশ্যই সেখানে পৌঁছে তা লাভ করত।" [14] ।
ইসলামের ইতিহাসের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে সালমান ফারসি রা. বংশীয় আভিজাত্যের অন্ধ অহংকার চূর্ণ করেছিলেন। যখন হযরত সাদ বিন আবী ওয়াক্কাস রা. ও অন্যান্যরা তাঁদের কুরাইশ ও আরব বংশলতিকা নিয়ে আলোচনা করছিলেন, তখন সালমানকে রা. তাঁর বংশ পরিচয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি কোনো পারসিক রাজকীয় বংশের দোহাই না দিয়ে স্বর্বোচ্চ আত্মমর্যাদার সাথে ঐতিহাসিক জবাব দিয়েছিলেন:
«أَنَا سَلْمَانُ ابْنُ الإِسْلَامِ»"আমি সালমান, ইসলামের সন্তান (ইসলামের পুত্র)।" [15] ।
হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা. এই উত্তর শুনে কেঁদে ফেলেন এবং সাদ রা.-কে উদ্দেশ করে বলেন, "তুমিও কি জানো আমি কে? আমি উমর, ইসলামের সন্তান, এবং সালমান ইবনুল ইসলামের ভাই!" এটিই ছিল রাসুলুল্লাহ সা. প্রেরিত আসমানী দাওয়াতের সেই বৈপ্লবিক চরিত্র, যা গোত্রীয়, ভাষাগত ও ভৌগোলিক প্রথা ভেঙে একমাত্র 'আকীদা ও ঈমানের' ভিত্তিতে বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল। সালমান ফারসি রা. তাঁর দীর্ঘ অনুসন্ধানের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন যে, সত্যের প্রতি নিষ্ঠা ও ত্যাগ থাকলে দূরত্ব বা দাসত্বের শৃঙ্খল ঐশ্বরিক হেদায়েতের পথে কোনো প্রতিবন্ধক হতে পারে না।