১১.১.২ দাঈদের সুরক্ষা ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বসমূহ
ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থার উন্মেষ ও বিকাশের ইতিহাসে আদর্শিক প্রচারক বা দাঈদের নিরাপত্তা বিধান কেবল একটি নৈতিক দায়িত্ব ছিল না, বরং তা ছিল নবগঠিত মদিনা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, ভূ-রাজনৈতিক অস্তিত্ব এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। মহানবি সা. মদিনায় যে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, তার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল দ্বীনের দাওয়াতকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া এবং এই মহতী কাজে নিয়োজিত প্রতিনিধিদের জানমালের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সমকালীন বিশ্বরাজনীতি ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রেক্ষাপটে বিচার করলে দেখা যায়, সপ্তম শতকের সেই অস্থিতিশীল আরব উপদ্বীপে রাসুলুল্লাহ সা. কর্তৃক প্রবর্তিত দাঈ ও কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের সুরক্ষানীতি আধুনিক ‘কূটনৈতিক দায়মুক্তি’ (Diplomatic Immunity) এবং ‘রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা দায়িত্ব’ (Responsibility to Protect)-এর ধারণাকে বহু পূর্বেই অত্যন্ত সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করেছিল।
১. ভূমিকা ও তাত্ত্বিক ভিত্তি: দাঈদের সুরক্ষা ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব
ইসলামি রাষ্ট্রদর্শনে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং নাগরিক সুরক্ষার তাত্ত্বিক ভিত্তিটি অত্যন্ত গভীর ও সুসংহত। একটি আদর্শিক রাষ্ট্রের প্রধানতম দায়িত্ব হলো তার আদর্শিক প্রতিনিধিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যারা রাষ্ট্রের বার্তা বহির্বিশ্বে পৌঁছে দেন। রাসুলুল্লাহ সা. মদিনা রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে এই দায়িত্বকে ঐশী নির্দেশনার আলোকে বিন্যস্ত করেছিলেন। ইসলামি আইনশাস্ত্রের অন্যতম প্রধান নীতি হলো, রাষ্ট্র তার সীমানার ভেতরে এবং বাইরে তার প্রতিনিধিদের নিরাপত্তা দিতে আইনত বাধ্য। এই তাত্ত্বিক ভিত্তির মূল উৎস রাসুলুল্লাহ সা.-এর বিখ্যাত হাদিস:
“মনে রেখো, তোমরা প্রত্যেকেই একেকজন রাখাল (দায়িত্বশীল) এবং তোমাদের প্রত্যেককেই নিজ নিজ অধীনস্থদের সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে। অতএব, জনগণের ওপর অধিষ্ঠিত শাসক হলেন তাদের অভিভাবক এবং তিনি তাঁর প্রজাসাধারণের সুরক্ষার জন্য জবাবদিহি করতে বাধ্য।” [1] এই হাদিসের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যাখ্যা অত্যন্ত স্পষ্ট। রাষ্ট্রপ্রধান কেবল অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্যই দায়ী নন, বরং রাষ্ট্রের আদর্শিক ও কূটনৈতিক মিশনগুলোর নিরাপত্তা বিধানও তাঁর অপরিহার্য কর্তব্যের অন্তর্ভুক্ত। ক্লাসিক্যাল রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আল-মাওয়ার্দী তাঁর ‘আল-আহকাম আস-সুলতানিয়্যাহ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, ইসলামি রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান কাজ হলো ‘হিফজুদ্দীন’ (ধর্মের সংরক্ষণ) এবং ‘সিয়াসাতুদ দুনিয়া’ (পার্থিব শাসন পরিচালনা)। এই দ্বিমুখী দায়িত্বের সফল বাস্তবায়নের জন্য দাঈদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের জন্য একটি বাধ্যতামূলক আইনি ও রাজনৈতিক দায়িত্ব [2] । যখন কোনো দাঈ বা প্রতিনিধিকে দাওয়াতী কাজের জন্য কোনো গোত্র বা রাষ্ট্রে পাঠানো হতো, তখন তিনি মদিনা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতেন। ফলে তাঁর ওপর যেকোনো আঘাত মদিনা রাষ্ট্রের ওপর আঘাত হিসেবে গণ্য হতো। এই তাত্ত্বিক কাঠামোটিই পরবর্তীকালে মুসলিম উম্মাহর সামরিক ও কূটনৈতিক নীতি নির্ধারণে প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে।
২. মদিনা সনদ ও যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা
হিজরতের পর মদিনায় শান্তি, শৃঙ্খলা ও পারস্পরিক সহাবস্থান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে রাসুলুল্লাহ সা. যে ঐতিহাসিক ‘মদিনা সনদ’ (وثيقة المدينة) প্রণয়ন করেছিলেন, তা ছিল যৌথ নিরাপত্তা (Collective Security) ও প্রতিরক্ষার এক অনন্য দলিল। এই সনদের মাধ্যমে মদিনার বিভিন্ন মুসলিম ও অমুসলিম গোত্রকে একটি একক রাজনৈতিক সত্তা বা ‘উম্মাহ’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সনদের অন্যতম প্রধান দিক ছিল মদিনার অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং যেকোনো নাগরিকের ওপর অন্যায় আক্রমণের বিরুদ্ধে যৌথ প্রতিরোধ গড়ে তোলা।
মদিনা সনদের নিরাপত্তা সংক্রান্ত ধারাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এতে মদিনা রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিক, বিশেষ করে যারা রাষ্ট্রের বিশেষ দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন, তাদের সুরক্ষাকে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। সনদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারায় বলা হয়েছে:
“নিশ্চয়ই ইহুদিরা তাদের ব্যয়ভার বহন করবে এবং মুসলমানরা তাদের ব্যয়ভার বহন করবে। আর এই সনদে স্বাক্ষরকারী কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে কেউ যুদ্ধ লিপ্ত হলে, তারা একে অপরকে সাহায্য করতে বাধ্য থাকবে।” [3] এই যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য ছিল মদিনাকে একটি নিরাপদ দুর্গে পরিণত করা, যেখান থেকে দাঈগণ নির্ভয়ে আরবের বিভিন্ন প্রান্তে দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে যেতে পারেন। মদিনা সনদের এই নিরাপত্তা বলয় কেবল মদিনার ভৌগোলিক সীমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা মদিনা রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রেরিত প্রতিনিধিদের ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য ছিল [4] । কোনো দাঈ যদি মদিনার বাইরে গিয়ে আক্রান্ত হতেন, তবে মদিনা সনদ অনুযায়ী তা সমগ্র মদিনা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল বলে গণ্য হতো। এই আইনি ও রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার কারণেই মদিনা রাষ্ট্র তার প্রতিনিধিদের সুরক্ষায় তাৎক্ষণিক ও কঠোর সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পেরেছিল, যা আরবের যাযাবর গোত্রগুলোর মনে মদিনা রাষ্ট্রের শক্তি ও মর্যাদা সম্পর্কে এক গভীর ভীতি ও শ্রদ্ধাবোধ তৈরি করেছিল।
৩. ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়া: রাজী ও বি’রে মাউনা
ইসলামের দাওয়াতী ইতিহাসে হিজরি চতুর্থ সনে সংঘটিত ‘রাজী’ (الرجيع) এবং ‘বি’রে মাউনা’ (بئر معونة)-এর ট্র্যাজেডি দুটি ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং একই সাথে তা রাষ্ট্রীয় সুরক্ষানীতির ক্ষেত্রে এক টার্নিং পয়েন্ট। এই দুটি ঘটনায় বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে মদিনা রাষ্ট্রের বহুসংখ্যক যোগ্য ও দক্ষ দাঈকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়, যা মদিনা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও মর্যাদাকে চরম চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছিল।
রাজীর ঘটনায় আদল ও কারাহ গোত্রের অনুরোধে রাসুলুল্লাহ সা. দশজন দাঈর একটি দল পাঠান, যাদের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আসিম বিন সাবিত রা.। কিন্তু পথিমধ্যে লহিয়ান গোত্রের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে তারা আক্রান্ত হন এবং বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে শাহাদাত বরণ করেন [5] । এর কিছুদিন পরই সংঘটিত হয় বি’রে মাউনার ভয়াবহ ট্র্যাজেডি। আবু বারা আমের বিন মালিকের আশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে রাসুলুল্লাহ সা. সত্তরজন বিশিষ্ট ক্বারী ও দাঈর একটি দল নজদ অভিমুখে প্রেরণ করেন, যার নেতৃত্বে ছিলেন মুনজির বিন আমর রা.। কিন্তু আমের বিন তুফায়েলের প্ররোচনায় বনু রিল, জাকওয়ান ও উসায়্যাহ গোত্রগুলো বি’রে মাউনা নামক স্থানে এই নিরপরাধ দাঈদের অবরুদ্ধ করে নির্মমভাবে হত্যা করে।
এই দুটি ঘটনায় রাসুলুল্লাহ সা. রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে অত্যন্ত তীব্র ও সুদূরপ্রসারী প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন। প্রথমত, তিনি আধ্যাত্মিক ও মনস্তাত্ত্বিক স্তরে উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ করতে এক মাস ধরে পাঁচ ওয়াক্ত সালাতে ‘কুনূতে নাযেলা’ (قنوت النازلة) পাঠ করেন, যেখানে তিনি এই ঘাতক গোত্রগুলোর ওপর আল্লাহর লানত ও শাস্তির দুআ করেন:
“নিশ্চয়ই নবি সা. এক মাস পর্যন্ত কুনূত পাঠ করেছিলেন, যেখানে তিনি রিল ও জাকওয়ান গোত্রের বিরুদ্ধে বদদুআ করেন।” [6] দ্বিতীয়ত, এই ট্র্যাজেডির পর মদিনা রাষ্ট্র তার সামরিক কৌশল পরিবর্তন করে। ঘাতকদের শাস্তি দিতে এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পুনরুদ্ধার করতে রাসুলুল্লাহ সা. বনু লহিয়ানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান (غزوة بني لحيان) পরিচালনা করেন [7] । এই অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল আরবের গোত্রগুলোকে এই বার্তা দেওয়া যে, মদিনা রাষ্ট্রের দাঈ ও প্রতিনিধিদের রক্ত সস্তা নয়; তাদের ওপর আঘাত হানলে রাষ্ট্র তার চরম প্রতিশোধ গ্রহণ করবে। এই কঠোর অবস্থান আরবের ভূ-রাজনীতিতে মদিনা রাষ্ট্রের প্রতিরোধ ক্ষমতা (Deterrence) বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল।
৪. সামরিক ও কূটনৈতিক কৌশল: মুতার যুদ্ধ ও কূটনৈতিক দায়মুক্তি
ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থায় কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের নিরাপত্তা ও দায়মুক্তির বিষয়টি কতটা সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো হিজরি অষ্টম সনে সংঘটিত ‘মুতার যুদ্ধ’ (غزوة مؤتة)। এই যুদ্ধটি ছিল মূলত কূটনৈতিক দায়মুক্তি (Diplomatic Immunity) লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে মদিনা রাষ্ট্রের একটি চরম ও ঐতিহাসিক সামরিক প্রতিক্রিয়া।
রাসুলুল্লাহ সা. তাঁর বিশিষ্ট সাহাবি হারিস বিন উমাইর আল-আজদী রা.-কে রোমান সাম্রাজ্যের অধীনস্থ বুসরার গভর্নরের কাছে ইসলামের দাওয়াত সংবলিত একটি চিঠি দিয়ে দূত হিসেবে প্রেরণ করেন। কিন্তু পথিমধ্যে বলকার শাসক শুরাহবিল বিন আমর আল-গাসসানী তাঁকে আটক করে এবং অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যা করে। সমকালীন আন্তর্জাতিক নিয়ম এবং আরবের ঐতিহ্য অনুযায়ী, দূত বা কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের হত্যা করা ছিল চরম অপরাধ এবং সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণার শামিল।
এই সংবাদ মদিনায় পৌঁছানোর পর রাসুলুল্লাহ সা. অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন এবং তাৎক্ষণিকভাবে তিন হাজার সৈন্যের একটি বিশাল বাহিনী প্রস্তুত করেন, যা ছিল মদিনা রাষ্ট্রের ইতিহাসে তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে বড় দূরপাল্লার সামরিক অভিযান। এই বাহিনীর সেনাপতি হিসেবে তিনি পর্যায়ক্রমে জায়েদ বিন হারিসা রা., জাফর বিন আবি তালিব রা. এবং আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহা রা.-কে মনোনীত করেন [8] । আর-রাহীকুল মাখতূম গ্রন্থে এই অভিযানের গুরুত্ব বর্ণনা করে বলা হয়েছে যে, রোমানদের মতো পরাশক্তির বিরুদ্ধে এই অভিযান পরিচালনা করা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, কিন্তু কূটনৈতিক প্রতিনিধির হত্যার বিচার না করলে মদিনা রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক মর্যাদা ও নিরাপত্তা ধূলিসাৎ হয়ে যেত [9] ।
আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থে ইবনে কাসির উল্লেখ করেছেন যে, মুতার যুদ্ধ কেবল একটি সামরিক সংঘাত ছিল না, বরং তা ছিল বিশ্বমঞ্চে মদিনা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও কূটনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার এক বলিষ্ঠ ঘোষণা:
“রাসুলুল্লাহ সা.-এর প্রেরিত দূতকে হত্যা করা হয়েছিল, আর তিনি ছাড়া তাঁর অন্য কোনো দূতকে এভাবে হত্যা করা হয়নি। ফলে তিনি তাদের বিরুদ্ধে এই বাহিনী প্রেরণ করেছিলেন।” [10] এই অভিযানের মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ সা. বিশ্বকে দেখিয়েছিলেন যে, ইসলামি রাষ্ট্র তার আদর্শিক ও কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের সুরক্ষায় পৃথিবীর যেকোনো পরাশক্তির মুখোমুখি হতে দ্বিধাবোধ করে না। এটি ছিল আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনের সেই নীতির বাস্তবায়ন, যেখানে বলা হয়েছে যে, কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের ওপর আক্রমণ সরাসরি প্রেরণকারী রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য হবে।
৫. আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ইসলামি আইনের তুলনামূলক বিশ্লেষণ
আধুনিক আন্তর্জাতিক আইন, বিশেষ করে ১৯৬১ সালের ‘ভিয়েনা কনভেনশন অন ডিপ্লোম্যাটিক রিলেশনস’ (Vienna Convention on Diplomatic Relations)-এর মাধ্যমে কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের যে নিরাপত্তা ও দায়মুক্তি প্রদান করা হয়েছে, তার সাথে রাসুলুল্লাহ সা. প্রবর্তিত সুরক্ষানীতির এক বিস্ময়কর মিল খুঁজে পাওয়া যায়। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় যাকে ‘রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার দায়িত্ব’ (Responsibility to Protect) বলা হয়, ইসলাম তা চৌদ্দশত বছর পূর্বেই অত্যন্ত কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করেছিল।
ইসলামি আইনশাস্ত্রে ‘আমান’ (নিরাপত্তা বা অভয়দান) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা। যখন কোনো অমুসলিম প্রতিনিধি বা দাঈ ইসলামি রাষ্ট্রে প্রবেশ করেন, অথবা ইসলামি রাষ্ট্রের কোনো প্রতিনিধি বহির্বিশ্বে যান, তখন তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা উভয় রাষ্ট্রের জন্য একটি আইনি বাধ্যবাধকতা হয়ে দাঁড়ায়। আলুকাহ ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান ভিত্তিই ছিল দাওয়াত ও তার অনুসারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যার জন্য জিহাদ ও সামরিক বাহিনী গঠন করা হয়েছিল [11] ।
আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান যেখানে কেবল ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক স্বার্থে কূটনৈতিক নিরাপত্তা প্রদান করে, সেখানে ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা একে একটি ধর্মীয় ও নৈতিক কর্তব্য হিসেবে গণ্য করে। রাসুলুল্লাহ সা. কেবল মুসলিম দাঈদের সুরক্ষাই নিশ্চিত করেননি, বরং মদিনায় আগত শত্রুভাবাপন্ন গোত্রের দূতদেরও পূর্ণ নিরাপত্তা দিয়েছিলেন। যেমন, মুসাইলামাতুল কাযযাবের দুই দূত যখন মদিনায় এসে রাসুলুল্লাহ সা.-এর নবুওয়াতকে অস্বীকার করেছিল, তখন তিনি তাদের বলেছিলেন:
“যদি এমন নিয়ম না থাকত যে দূতদের হত্যা করা যায় না, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের দুজনের শিরশ্ছেদ করতাম।” [12] এই নীতিটি প্রমাণ করে যে, ইসলামে কূটনৈতিক নিরাপত্তা কেবল পারস্পরিক সুবিধার ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত নয়, বরং তা একটি সার্বজনীন মানবিক ও আইনি নীতি, যা যেকোনো পরিস্থিতিতে মেনে চলা আবশ্যক। রাসুলুল্লাহ সা.-এর এই দূরদর্শী ও নীতিগত অবস্থানই মদিনা রাষ্ট্রকে একটি সুশৃঙ্খল, ন্যায়পরায়ণ এবং আন্তর্জাতিকভাবে মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল, যা পরবর্তী প্রজন্মের মুসলিম শাসকদের জন্য রাষ্ট্র পরিচালনার এক শাশ্বত গাইডলাইন হিসেবে রয়ে গেছে।