ইসলামি শাস্ত্রীয় পরিভাষায় 'জিহাদ' এবং 'কিতাল' শব্দ দুটি প্রায়শই সমার্থক হিসেবে ব্যবহৃত হলেও, উচ্চতর গবেষণাধর্মী বিশ্লেষণে এদের মধ্যে গভীর ভাষাতাত্ত্বিক, আইনি এবং দার্শনিক পার্থক্য বিদ্যমান। এই পার্থক্যটি অনুধাবন করা অত্যন্ত জরুরি, কারণ সমকালীন ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবং সমরদর্শনের আলোচনায় এই দুটি শব্দের সংমিশ্রণ অনেক সময় ভুল ধারণার জন্ম দেয়। জিহাদ একটি ব্যাপক ও সামগ্রিক প্রক্রিয়া, যার লক্ষ্য হলো সত্যের প্রতিষ্ঠা এবং মিথ্যার বিনাশ; অন্যদিকে কিতাল হলো সেই প্রক্রিয়ার একটি নির্দিষ্ট এবং সীমিত কৌশলগত পর্যায়, যা সশস্ত্র সংঘাতের সাথে সম্পৃক্ত। এই প্রবন্ধটি এই দুই ধারণার মধ্যকার সূক্ষ্ম সীমারেখা এবং তাদের পারস্পরিক সম্পর্ককে তাত্ত্বিক ও প্রামাণিক আলোকে বিশ্লেষণ করবে।
১. জিহাদের ভাষাতাত্ত্বিক ও পারিভাষিক স্বরূপ
ভাষাতাত্ত্বিকভাবে 'জিহাদ' শব্দটি আরবি 'জাহাদা' (جَهَدَ) ধাতু থেকে উদ্ভূত, যার মূল অর্থ হলো কঠোর পরিশ্রম করা, সর্বোচ্চ চেষ্টা করা বা কোনো কাজে নিজেকে নিয়োজিত করে চরম কষ্ট সহ্য করা। এটি কেবল যুদ্ধের সাথে সম্পৃক্ত নয়, বরং যেকোনো সৎ উদ্দেশ্যে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টাকেই জিহাদ বলা হয়। ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী রহ. এই শব্দের ভাষাতাত্ত্বিক মূল আলোচনায় উল্লেখ করেছেন:
والجهادبكسر الجيم أصله لغة المشقة ، يقال : جهدت جهادا بلغت المشقة[1]
এই ইবারাত থেকে স্পষ্ট হয় যে, জিহাদের মূল ভিত্তি হলো 'মাশাক্কাহ' বা কষ্টসাধ্য প্রচেষ্টা। যখন এই ভাষাতাত্ত্বিক অর্থটি শরয়ী পরিভাষায় রূপান্তরিত হয়, তখন এর পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। শরয়ী পরিভাষায় জিহাদ হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এবং তাঁর দ্বীন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পরিচালিত সকল প্রকার সংগ্রাম। এটি কেবল সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর অন্তর্ভুক্ত হলো নফসের সাথে সংগ্রাম (জিহাদুন নফস), অর্থ ব্যয় করে দ্বীনের সহায়তা করা (জিহাদ বিল মাল), এবং সত্যের দাওয়াত প্রদান করা। সুতরাং, জিহাদ একটি সামগ্রিক জীবনদর্শন এবং নিরন্তর চলমান একটি প্রক্রিয়া, যা মুমিনের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে বিদ্যমান থাকে।
পারিভাষিক সংজ্ঞায় জিহাদকে যখন সশস্ত্র সংগ্রামের সাথে যুক্ত করা হয়, তখন তার একটি নির্দিষ্ট আইনি রূপ লাভ করে। এই ক্ষেত্রে জিহাদ বলতে বোঝায় সেই সকল কাফেরদের বিরুদ্ধে লড়াই করা যাদের সাথে কোনো চুক্তি বা নিরাপত্তা চুক্তি (ধিম্মাহ) নেই। এই সংজ্ঞার গুরুত্ব বুঝাতে বলা হয়েছে:
الجهاد في الاصطلاح الشرعي: هوالقتال في سبيل الله ضدَّ الكفار الذين لا عهد لهم ولا ذمة، وما يمُتُ إلى القتال بصلة من دعوة إليه، ومساعدة عليه[2]
এখানে লক্ষ্যণীয় যে, সশস্ত্র সংগ্রাম বা কিতাল হলো জিহাদের একটি অংশ মাত্র। তবে যখন জিহাদ শব্দটি কেবল যুদ্ধের অর্থে ব্যবহৃত হয়, তখন তা একটি বিশেষ আইনি বাধ্যবাধকতার রূপ নেয়। তবে সামগ্রিকভাবে জিহাদ হলো একটি বৃহত্তর কৌশলগত ফ্রেমওয়ার্ক, যার ভেতরে কিতাল একটি নির্দিষ্ট অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই সামগ্রিকতা বুঝাতে অনেক ক্ষেত্রে বলা হয় যে, জিহাদ কখনো শেষ হয় না, কারণ নফসের সাথে সংগ্রাম এবং সত্যের দাওয়াত মৃত্যু পর্যন্ত চলমান থাকে।
২. কিতালের আইনি সংজ্ঞা ও সীমাবদ্ধতা
কিতাল (Qital) শব্দটি আরবি 'কাতলা' (قتل) ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ হলো হত্যা করা বা যুদ্ধ করা। জিহাদ যেখানে একটি ব্যাপক প্রক্রিয়া, কিতাল সেখানে একটি নির্দিষ্ট কার্যকলাপে রূপান্তর। আইনি দৃষ্টিতে কিতাল হলো সশস্ত্র সংঘাতের সেই পর্যায়, যেখানে অস্ত্রশস্ত্রের মাধ্যমে শত্রুর মোকাবিলা করা হয়। কিতাল সর্বদা জিহাদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, কিন্তু প্রতিটি জিহাদ কিতাল নয়। উদাহরণস্বরূপ, একজন মুমিন যখন তার কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে, তখন তা জিহাদ হলেও তা কিতাল নয়।
কিতালের প্রয়োগ অত্যন্ত কঠোর আইনি শর্তাবলির ওপর নির্ভরশীল। এটি কেবল তখনই বৈধ হয় যখন দ্বীনের প্রতিরক্ষা বা নিপীড়িত মানুষের মুক্তির জন্য সশস্ত্র সংঘাত অপরিহার্য হয়ে পড়ে। কিতালের মূল লক্ষ্য হলো শত্রুর সামরিক সক্ষমতা হ্রাস করা এবং শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। এটি একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত, যা রাষ্ট্রপ্রধান বা সর্বোচ্চ নেতৃত্বের নির্দেশে পরিচালিত হয়। কিতালের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনের মতো নির্দিষ্ট কিছু বিধি-নিষেধ রয়েছে, যা যুদ্ধের বর্বরতাকে নিয়ন্ত্রণ করে।
কিতাল এবং জিহাদের এই পার্থক্যটি বুঝতে হলে আমাদের 'আমরে বিল মারুফ' বা সৎকাজের আদেশ এবং মন্দকাজের নিষেধের ধারণার দিকে তাকাতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে সত্যের কথা বলা বা অন্যায়ের প্রতিবাদ করা জিহাদের অন্তর্ভুক্ত, যা কিতালের স্তরে পৌঁছানোর আগেই লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হয়। যেমন শেখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. উল্লেখ করেছেন যে, সৎকাজের আদেশ এবং মন্দকাজের নিষেধ হলো সেই মূল ভিত্তি যার মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর কিতাবসমূহ নাজিল করেছেন। [3] । এই সামাজিক ও নৈতিক সংগ্রামটি জিহাদের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, কিন্তু এটি কিতালের সংজ্ঞায় পড়ে না। সুতরাং, কিতাল হলো জিহাদের সেই চরম পর্যায়, যেখানে কথা বা যুক্তির পরিবর্তে অস্ত্রের ভাষা ব্যবহৃত হয়।
৩. জিহাদ ও কিতালের দার্শনিক ও কৌশলগত পার্থক্য
জিহাদ এবং কিতালের মধ্যে দার্শনিক পার্থক্যটি মূলত 'উদ্দেশ্য' (Objective) এবং 'উপায়' (Means)-এর মধ্যে পার্থক্য। জিহাদ হলো একটি উচ্চতর লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য, যার মূল দর্শন হলো 'তাকওয়া' এবং 'ইবাদত'। এর লক্ষ্য হলো আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করা এবং মানবজাতিকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে আনা। অন্যদিকে, কিতাল হলো সেই লক্ষ্য অর্জনের একটি সাময়িক এবং বিশেষ উপায়। দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে, জিহাদ হলো একটি নিরন্তর আধ্যাত্মিক এবং সামাজিক বিবর্তন, আর কিতাল হলো সেই বিবর্তনের পথে আসা সশস্ত্র বাধা দূর করার একটি প্রক্রিয়া।
কৌশলগতভাবে, জিহাদকে একটি 'গ্র্যান্ড স্ট্র্যাটেজি' (Grand Strategy) হিসেবে দেখা যেতে পারে, যার মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা, অর্থনৈতিক চাপ, মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ এবং শেষ পর্যায়ে সশস্ত্র সংঘাত অন্তর্ভুক্ত। কিতাল হলো এই গ্র্যান্ড স্ট্র্যাটেজির একটি 'ট্যাকটিক্যাল অপারেশন' (Tactical Operation)। যখন কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং শত্রুর আগ্রাসন চরম আকার ধারণ করে, তখনই কিতালের প্রয়োজন হয়। এই কৌশলগত পার্থক্যের কারণে জিহাদকে কেবল 'পবিত্র যুদ্ধ' (Holy War) হিসেবে অনুবাদ করা ভুল, কারণ এটি কেবল যুদ্ধের সাথে সম্পৃক্ত নয়। বরং এটি একটি সামগ্রিক জীবন সংগ্রাম।
এই দার্শনিক পার্থক্যটি আরও স্পষ্ট হয় যখন আমরা জিহাদের বিভিন্ন স্তরের কথা চিন্তা করি। যেমন, বিদআত নির্মূল করা, সামাজিক কুসংস্কার দূর করা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া—এই সবকিছুই জিহাদের অন্তর্ভুক্ত। এই প্রসঙ্গে বলা হয়েছে:
أنّ معرفتهم بمسمّى الجهاد معرفة مدخولة، وإلاّ فإنّ تحطيم البدع والمحدثات والقضاء على المفاسد والمنكرات ... كلّ ذلك من الجهاد في سبيل الله[4]
উপরোক্ত ইবারাতটি প্রমাণ করে যে, জিহাদের পরিধি অত্যন্ত বিস্তৃত। যখন কোনো সমাজ সংস্কারক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াই করেন, তিনি মূলত জিহাদ করছেন, কিন্তু তিনি কিতাল করছেন না। এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ যারা জিহাদকে কেবল কিতালের সাথে একীভূত করে ফেলে, তারা ইসলামের সামগ্রিক সংস্কারবাদী দর্শনকে সংকীর্ণ করে ফেলে। জিহাদ হলো একটি সামগ্রিক মুক্তি প্রক্রিয়া, আর কিতাল হলো সেই মুক্তির পথে আসা সশস্ত্র প্রতিবন্ধকতার অপসারণ।
৪. নবিজীর যুগে সংগ্রামের বিবর্তন ও বাস্তব প্রয়োগ
রাসুলুল্লাহ সা.-এর জীবনচরিত পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, জিহাদ এবং কিতালের প্রয়োগ সময়ের সাথে সাথে এবং পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে বিবর্তিত হয়েছে। মক্কী যুগে জিহাদের রূপ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে কিতালের কোনো অনুমতি ছিল না; বরং জিহাদ ছিল ধৈর্য ধারণ, দাওয়াত প্রদান এবং মনস্তাত্ত্বিক দৃঢ়তার মাধ্যমে ঈমান রক্ষা করা। এই পর্যায়টি ছিল মূলত 'জিহাদুন নফস' এবং 'জিহাদ বিল লিসান' (ভাষার মাধ্যমে জিহাদ)-এর চরম উদাহরণ।
মদিনায় হিজরতের পর যখন একটি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি হলো, তখন জিহাদের সংজ্ঞায় কিতাল বা সশস্ত্র সংগ্রামের সংযোজন ঘটল। তবে এই সংযোজনটি ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত এবং কৌশলগত। আকাবায় অনুষ্ঠিত দুটি বায়াতের মধ্যে এই বিবর্তনটি স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়। প্রথম আকাবার বায়াত ছিল মূলত নৈতিক ও আদর্শিক অঙ্গীকারের ওপর ভিত্তি করে, যা অনেকটা নারীদের বায়াতের মতো ছিল। কিন্তু দ্বিতীয় আকাবার বায়াত ছিল অনেক বেশি কঠোর এবং বাস্তবমুখী। এই বায়াতের মাধ্যমে সাহাবায়ে কেরাম রা. সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন।
মুনিরা আল-গাদবান রহ. এই দুই বায়াতের মধ্যকার পার্থক্য বিশ্লেষণ করে লিখেছেন:
لقد وجدنا الفرق شاسعا بين بيعة العقبة الأولى والثانية، فالأولى لا تتجاوز التمسك بمبادىء الإسلام، وعدم المعصية... أما العقبة الثانية ففيها تكاليف أضخم، ومشاق أشد... وأن يمنع رسوله (ص) ويحميه، وينصره كما لو تعرض في نفسه وزوجه وعرضه للموت أو الاعتداء شيء[5]
এই বিশ্লেষণ থেকে বোঝা যায় যে, প্রথম বায়াতটি ছিল আদর্শিক জিহাদের অংশ, আর দ্বিতীয় বায়াতটি ছিল কিতালের প্রস্তুতির অংশ। এখানে 'সুরক্ষা' এবং 'সাহায্য' করার অঙ্গীকার ছিল মূলত সশস্ত্র সংঘাতের সম্ভাবনাকে সামনে রেখে। এমনকি এই বায়াতের গুরুত্ব বোঝাতে আব্বাস ইবনে আবদিল মুত্তালিব রা. (যিনি তখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি) সাহাবিদের সতর্ক করেছিলেন যে, তারা এমন এক চুক্তিতে আবদ্ধ হচ্ছেন যার পরিণতি হতে পারে অত্যন্ত ভয়াবহ। তিনি বলেছিলেন যে, তারা 'লাল ও কালো' (আরব ও অন-আরব) সকলের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অঙ্গীকার করছেন। [6] ।
এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, কিতাল কখনোই জিহাদের একমাত্র পথ ছিল না, বরং এটি ছিল একটি বিশেষ প্রয়োজন। নবিজীর সা. যুগে কিতালের প্রয়োগ ছিল মূলত আত্মরক্ষা এবং দ্বীনের প্রচারের পথে আসা সশস্ত্র বাধা দূর করার জন্য। কিতাল ছিল একটি শেষ অস্ত্র, যা কেবল তখনই ব্যবহৃত হতো যখন অন্য সব পথ বন্ধ হয়ে যেত। এই বিবর্তনটি আমাদের শেখায় যে, জিহাদ হলো একটি দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য, আর কিতাল হলো সেই লক্ষ্যের পথে আসা সাময়িক এবং প্রয়োজনীয় একটি সামরিক পদক্ষেপ।