খণ্ড 38
ফন্ট:100%
থিম:

২.১ দাওয়াহর আমন্ত্রণ: লিয়হিয়ান গোত্রের প্রতারণামূলক কৌশল

২.১ দাওয়াহর আমন্ত্রণ: লিয়হিয়ান গোত্রের প্রতারণামূলক কৌশল

ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও বনু লিহইয়ানের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থান

উহুদ যুদ্ধের পরবর্তী সময়কালটি ছিল মদিনা রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত নাজুক এবং ভূ-রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল। উহুদ প্রান্তরে মুসলিম বাহিনীর সাময়িক বিপর্যয় এবং ক্ষয়ক্ষতির ফলে আরবের বিভিন্ন পৌত্তলিক ও বেদুইন গোত্রগুলোর মধ্যে এই ধারণার জন্ম নেয় যে, মদিনার সামরিক কর্তৃত্ব ও রাজনৈতিক প্রভাব দুর্বল হয়ে পড়েছে। এই সুযোগে মদিনা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য বিভিন্ন প্রান্তিক গোত্রগুলো গোপনে ও প্রকাশ্যে জোটবদ্ধ হতে শুরু করে। এই ভূ-রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান অনুঘটক ছিল বনু লিহইয়ান গোত্র, যারা মূলত বনু হুযাইল গোত্রের একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী ও যুদ্ধবাজ শাখা ছিল। উহুদ যুদ্ধের পরপরই বনু লিহইয়ানের গোত্রপ্রধান সুফিয়ান ইবনে খালিদ আল-হুযালী মদিনায় এক ভয়াবহ আকস্মিক আক্রমণের উদ্দেশ্যে বিশাল সৈন্যবাহিনী সংগঠিত করতে শুরু করে [1]

রাসুলুল্লাহ সা. তাঁর সুতীক্ষ্ণ গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে এই আসন্ন বিপদের কথা জানতে পারেন এবং মদিনার সামগ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে একটি প্রাক-প্রস্তুতিমূলক বা প্রতিরক্ষামূলক আঘাত (Preemptive Strike) হানার সিদ্ধান্ত নেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি আবদুল্লাহ ইবনে উনাইস রা. নামক একজন বীর সাহাবিকে সুফিয়ান ইবনে খালিদের গতিবিধি রোধ করার জন্য প্রেরণ করেন। আবদুল্লাহ ইবনে উনাইস রা. অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে শত্রুশিবিরে প্রবেশ করে সুফিয়ান ইবনে খালিদকে হত্যা করেন এবং তার মস্তক মদিনায় নিয়ে আসেন [2] । এই সফল অভিযানের ফলে বনু লিহইয়ানের সামরিক দম্ভ চূর্ণ হয়ে যায় এবং তারা চরম মনস্তাত্ত্বিক পরাজয়ের সম্মুখীন হয়। কিন্তু এই পরাজয় তাদের অন্তরে প্রতিশোধের এক তীব্র ও গোপন দাবানল জ্বালিয়ে দেয়।

বনু লিহইয়ান ভালো করেই জানত যে, সরাসরি সামরিক সংঘর্ষে মদিনা রাষ্ট্রের সুশৃঙ্খল বাহিনীর মুখোমুখি হওয়ার সামর্থ্য তাদের নেই। তাই তারা প্রথাগত যুদ্ধের পরিবর্তে অপ্রতিসম যুদ্ধকৌশল (Asymmetric Warfare) এবং কূটনৈতিক প্রতারণার আশ্রয় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা এমন এক কূটকৌশল প্রণয়ন করে, যার মাধ্যমে মদিনার প্রথম সারির নেতৃত্ব বা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের ফাঁদে ফেলে হত্যা করে তাদের ক্ষয়প্রাপ্ত সম্মান পুনরুদ্ধার করা যায়। এই মনস্তাত্ত্বিক অবস্থান থেকেই তারা মদিনা রাষ্ট্রের সবচেয়ে সংবেদনশীল ও উদার নীতি—অর্থাৎ 'দাওয়াহর প্রচার ও প্রসার'-কে তাদের প্রতারণার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেয় [3]

«بعث رسول الله صلى الله عليه وسلم عبد الله بن أنيس إلى سفيان بن خالد بن نبيح الهذلي... ليقتله» [4] ছদ্মবেশী কূটনৈতিক মিশন: আদল ও কারাহ গোত্রের আগমন

হিজরি চতুর্থ বর্ষের সফর মাসে মদিনার রাজনৈতিক অঙ্গনে এক আপাত-স্বস্তিদায়ক কিন্তু গভীর ষড়যন্ত্রমূলক কূটনৈতিক তৎপরতা দৃশ্যমান হয়। বনু লিহইয়ান সরাসরি মদিনার মুখোমুখি না হয়ে তাদের মিত্র ও অধীনস্থ দুটি গোত্র—আদল (عضل) এবং কারাহ (القارة)-কে মদিনায় প্রেরণ করে। এই দুই গোত্রের একটি প্রতিনিধি দল অত্যন্ত বিনয়ী ও ছদ্মবেশী কূটনৈতিক মিশন নিয়ে রাসুলুল্লাহ সা.-এর দরবারে উপস্থিত হয়। তারা নিজেদের গোত্রে ইসলামের প্রতি গভীর অনুরাগ এবং তাদের জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ ইসলাম গ্রহণ করেছে বলে মিথ্যা দাবি উত্থাপন করে [5]

প্রতিনিধি দলটি রাসুলুল্লাহ সা.-এর সামনে অত্যন্ত সুকৌশলে আরজি পেশ করে যে, তাদের গোত্রের নবদীক্ষিত মুসলিমদের পবিত্র কুরআন শিক্ষা দেওয়ার জন্য এবং ইসলামি শরিয়াহর বিধিবিধান ও ফিকহী মাসআলা-মাসায়েল বিস্তারিতভাবে শেখানোর জন্য মদিনা থেকে যেন একদল দক্ষ, জ্ঞানী ও নির্ভরযোগ্য শিক্ষক (কুররা) তাদের সাথে পাঠানো হয়। ঐতিহাসিক ইবনে হিশাম এই ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন যে, তারা রাসুলুল্লাহ সা.-এর দরবারে এসে বলেছিল, আমাদের মধ্যে ইসলামের আলো প্রবেশ করেছে, অতএব আপনি আমাদের সাথে আপনার এমন কিছু সাহাবিকে পাঠান যারা আমাদের দ্বীনের গভীর জ্ঞান দান করবেন এবং কুরআন পাঠ করাবেন [6] । এই কূটনৈতিক প্রস্তাবটি ছিল মূলত একটি 'ট্রোজান হর্স' বা ছদ্মবেশী ফাঁদ, যার মূল লক্ষ্য ছিল মদিনার বুদ্ধিবৃত্তিক ও আধ্যাত্মিক স্তম্ভ তথা শীর্ষস্থানীয় সাহাবিদের মদিনা থেকে বের করে এনে বনু লিহইয়ানের প্রতিশোধের লালসার শিকার বানানো [7]

তৎকালীন আরবের কূটনৈতিক প্রথা অনুযায়ী, কোনো গোত্র যদি দ্বীন শেখার জন্য শিক্ষক বা প্রতিনিধি দল দাবি করত, তবে মদিনা রাষ্ট্র তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিত। আদল ও কারাহ গোত্রের প্রতিনিধিরা এই কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও রাসুলুল্লাহ সা.-এর দাওয়াহর প্রতি ব্যাকুলতাকে অত্যন্ত সুনিপুণভাবে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছিল। তারা মদিনার নীতিনির্ধারকদের মনে এই বিশ্বাস জন্মাতে সক্ষম হয়েছিল যে, তাদের এই মিশন সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক এবং বিশুদ্ধ ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে প্রণোদিত। কিন্তু পর্দার আড়ালে বনু লিহইয়ানের সাথে তাদের চুক্তি ছিল যে, তারা মদিনার এই প্রতিনিধি দলকে বনু লিহইয়ানের হাতে তুলে দেবে এবং বিনিময়ে বিপুল পরিমাণ উপঢৌকন ও রাজনৈতিক সুবিধা লাভ করবে [8]

«قدم على رسول الله صلى الله عليه وسلم بعد أحد رهط من عضل والقارة، فقالوا: يا رسول الله إن فينا إسلاما، فابعث معنا نفرا من أصحابك يفقهوننا في الدين، ويقرئوننا القرآن» [9] দাওয়াহর প্রসারে মদিনা রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ও কৌশলগত উদারতা

মদিনা রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম মূল ভিত্তি ছিল 'আদর্শিক সম্প্রসারণ' (Ideological Expansion)। রাসুলুল্লাহ সা.-এর রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক দর্শনে দাওয়াহর গুরুত্ব ছিল যেকোনো সামরিক বিজয়ের চেয়ে অনেক বেশি। উহুদ যুদ্ধের পরবর্তী কঠিন পরিস্থিতিতেও যখন মদিনার চারপাশ শত্রুপক্ষ দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিল, তখনও রাসুলুল্লাহ সা. দাওয়াহর কোনো সুযোগ হাতছাড়া করতে চাননি। আদল ও কারাহ গোত্রের এই প্রস্তাবকে তিনি মদিনা রাষ্ট্রের আদর্শিক সীমানা বৃদ্ধির একটি সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করেন। যদিও মদিনার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক ছিল, তবুও কৌশলগত উদারতা (Strategic Generosity) প্রদর্শন করে তিনি এই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেননি [10]

রাসুলুল্লাহ সা. এই মিশনের জন্য এমন একদল সাহাবিকে নির্বাচন করেন যারা ছিলেন একাধারে কুরআনের হাফেজ, ফকীহ এবং অত্যন্ত বিশ্বস্ত। ঐতিহাসিক সূত্রগুলোতে প্রেরিত সাহাবিদের সংখ্যা নিয়ে কিছুটা মতভেদ পাওয়া যায়। সহীহ বুখারীর বর্ণনা অনুযায়ী এই সংখ্যা ছিল দশ জন, আবার ইবনে ইসহাকের বর্ণনা অনুযায়ী এই সংখ্যা ছিল ছয় জন [11] । এই প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব প্রদান করা হয় আসিম ইবনে সাবিত রা. অথবা মারসাদ ইবনে আবি মারসাদ আল-গানাভী রা.-কে। এই সাহাবিগণ ছিলেন মদিনার আধ্যাত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র। মদিনা রাষ্ট্র তার এই মূল্যবান মানবসম্পদকে আরবের প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রেরণের মাধ্যমে প্রমাণ করেছিল যে, তারা কেবল একটি আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না, বরং সমগ্র আরবে একটি শান্তিময় ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ [12]

এই সিদ্ধান্তের পেছনে মদিনা রাষ্ট্রের সমষ্টিগত নিরাপত্তার (Collective Security) একটি সূক্ষ্ম হিসাবও ছিল। রাসুলুল্লাহ সা. চেয়েছিলেন আরবের বিভিন্ন গোত্রের সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করে মদিনার চারপাশের বৈরী বলয়কে ভেঙে ফেলতে। যদি আদল ও কারাহ গোত্র সত্যিকার অর্থেই ইসলাম গ্রহণ করে থাকে, তবে তা মদিনার জন্য একটি বিশাল কৌশলগত বিজয় হিসেবে গণ্য হতো। কিন্তু এই মহান ও উদার পররাষ্ট্রনীতির আড়ালে যে বনু লিহইয়ানের চরম বিশ্বাসঘাতকতা ও রক্তক্ষয়ী ষড়যন্ত্র লুকিয়ে ছিল, তা ছিল তৎকালীন বাহ্যিক রাজনৈতিক হিসাব-নিকেশের অতীত। মদিনার এই প্রতিনিধি দল যখন তাদের যাত্রা শুরু করে, তখন তারা কেবল দাওয়াহর বাণী প্রচারের উদ্দেশ্যে এক মহান মিশনে বের হয়েছিলেন, কিন্তু তারা জানতেন না যে তারা এক ভয়াবহ ও পূর্বপরিকল্পিত ফাঁদের দিকে ধাবিত হচ্ছেন [13]

«بعث النبي صلى الله عليه وسلم سرية عينا، وأمر عليهم عاصم بن ثابت» [14]
""
২.১ দাওয়াহর আমন্ত্রণ: লিয়হিয়ান গোত্রের প্রতারণামূলক কৌশল
আমাদের নবী সা. সীরাত বিশ্বকোষ
ha-mims.world
এ আর্টিকেলের কুইজ(5টি প্রশ্ন)

২.১ দাওয়াহর আমন্ত্রণ: লিয়হিয়ান গোত্রের প্রতারণামূলক কৌশল কুইজ

1 / 5

দাওয়াহর আমন্ত্রণ জানিয়ে প্রতারণা করেছিল কোন গোত্র?

এই আর্টিকেলটি কেমন লাগলো?

এই গবেষণাকে সহায়তা করুন

সীরাত বিশ্বকোষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আপনার সামান্য সহায়তা এই গবেষণাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

bKash / Nagad01XXXXXXXXXX(Send Money)
☕ Ko-fi দিয়ে সহায়তা

রেফারেন্স: "সীরাত বিশ্বকোষ" লিখুন

🌟 Ha-mim's World-এর একটি গবেষণা ও জ্ঞান-প্রযুক্তি প্রকল্প

কমিউনিটি রিফ্লেকশন

এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি কী শিখলেন বা আপনার অনুভূতি কী, তা সবার সাথে শেয়ার করুন।

আপনার রিফ্লেকশন শেয়ার করতে দয়া করে লগইন করুন।

লোড হচ্ছে...